Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪৪১ বার
+ - R Print

সূরা তাকভীর

সূরা তাকভীর অথবা ভাঁজ করা -৮১

২৯ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এটা একটি প্রাথমিক মক্কী সূরা। সম্ভবতঃ ধারাবাহিকতায় এটি ষষ্ঠ বা সপ্তম। পৃথিবী ও বিশ্বভূবনের শেষ পরিণতির বা ধ্বংসের চিত্র আঁকা হয়েছে এই সূরাতে [ ১ - ৩ ]। সেই সাথে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বকে তুলে ধরা হয়েছে [১৪ নং ] আয়াত। এই বর্ণনার পরেই বলা হয়েছে যে কোরাণের প্রত্যাদেশ সত্য, এবং তা অবতীর্ণ করা হয়েছে জিব্রাইল ফেরেশতার মাধ্যমে। এটা কোন আবেগে আচ্ছন্নকারী কবির অসংলগ্ন রচনা নয়। প্রত্যাদেশকে প্রেরণ করা হয়েছে মানুষের আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধির জন্য [ ১৪ -২৯]।

এই সূরাটি ৮২নং সূরার সাথে তুলনা করা চলে। ৮২নং সূরাটি ও এই সূরাটি এক সাথে পাঠ করা উচিত।

সূরা তাকভীর অথবা ভাঁজ করা -৮১

২৯ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। যখন সূর্য ৫৯৬৯ [ তার অত্যুজ্জ্বল আলোসহ ] ভাঁজ করা হবে ৫৯৭০;

৫৯৬৯। এই সূরাতে [ ১ - ১৩ ] পর্যন্ত আয়াত সমূহ 'যখন' শব্দটি দ্বারা শর্তাধীন করা হয়েছে ১৪ নং স্বতন্ত্র বাক্যের অধীনে। এমন একটি সময় আসবে যখন এই চেনা জানা পৃথিবীর সকল কাজ স্তব্ধ হয়ে যাবে। সেদিন প্রতিটি আত্মা জানতে পারবে তাঁর কর্মফল। পুণরুত্থান হবে প্রতিটি আত্মার ব্যক্তিগত বিপদ। সেই বিপদের দিনে সারা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং মানুষের সম্মুখে তাঁর কৃতকর্মের বিবরণ উম্মুক্ত করা হবে।

৫৯৭০। শর্তাধীন বাক্যগুলির সংখ্যা ১২। এই ১২টি বাক্য দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ছয়টি মানুষের বাহ্যিক বা শারিরীক অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। শেষের ছয়টি অন্তরের বা আত্মার সাথে সম্পৃক্ত। আসুন আমরা একটা একটা করে বিশ্লেষণ করি। ১) প্রকৃতিতে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আলো, তাপ এবং শক্তি [ বিদ্যুৎ বা চুম্বক শক্তি ] যার সবই আমরা লাভ করি সূর্য থেকে। সূর্য পৃথিবীর সকল আলো, তাপ ও শক্তির উৎস। যার ফলে পৃথিবীর সকল প্রাণ সূর্যের উপরে নির্ভরশীল। যদিও সূর্যের সাথে পৃথিবীর প্রাণের অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তবুও সূর্যের দূরত্ব আমাদের থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে। সেদিন সূর্য তার জ্যোতি হারাবে। বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে যে, এমন একদিন আসবে যেদিন সূর্য নিভে যাবে অর্থাৎ নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটবে। বিজ্ঞানের এই বর্তমান তত্ব কোরাণের আয়াতেরই প্রতিধ্বনি মাত্র। যেদিন সূর্যের মৃত্যু ঘটবে সেদিন সে তার মধ্যাকর্ষণ শক্তি হারাবে। ফলে সূর্যের সাথে সাথে সারা সৌরমন্ডল লন্ডভন্ড হয়ে পড়বে। কিন্তু আত্মা হবে অক্ষয় ও অমর।

২। যখন নক্ষত্র রাজি তাদের দীপ্তি হারিয়ে খসে পড়বে; ৫৯৭১

৫৯৭১। ২) সূর্যের আলোর পরেই আলোর উৎস হচ্ছে তারার আলো। পৃথিবীর চন্দ্রের কথা বলা হয় নাই কারণ, চাঁদের আলো সূর্যেরই প্রতিফলিত রশ্মিমাত্র। পৃথিবীর আদি যুগ থেকে নভোমন্ডলে তারাদের অবস্থান স্থির হয়ে আছে। কিন্তু সেদিন তারারাও স্থির থাকবে না। বিশ্বভূবনের সাথে সাথে সারা নভোমন্ডল লন্ডভন্ড হয়ে পড়বে, তারারাও তাদের জ্যোতি হারাবে।

৩। যখন পর্বতসমূহ [ মরিচীকার ন্যায় ] অদৃশ্য হয়ে যাবে ৫৯৭২ ;

৫৯৭২। দেখুন [ ৭৮: ২০ ] আয়াত। ৩) পৃথিবীতে পর্বত হচ্ছে স্থায়ীত্ব ও কাঠিন্যের প্রতীক। সুউচ্চ কঠিন শিলার পর্বতমালা যুগ যুগ ধরে অটল অনড় ভাবে পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন তারাও,মরিচীকার ন্যায় অদৃশ্য হয়ে যাবে। তাদের স্থায়ীত্ব বা কাঠিন্যের কোন মূল্য থাকবে না।

৪। যখন দশ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রী বাচ্চাসহ পরিত্যাগ করা হবে ; ৫৯৭৩

৫৯৭৩। ৪) উষ্ট্র হচ্ছে আরবদেশের গৃহপালিত পশু ও সম্পদের প্রতীক। গর্ভবতী উষ্ট্র আরবে সে সময়ে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদরূপে পরিগণিত হতো - কারণ দুধ ও বাচ্চা। সে কারণেই উষ্ট্রের উপমা দান করা হয়েছে। সাধারাণতঃ গর্ভবতী উষ্ট্রকে অত্যন্ত যত্নের সাথে রাখা হয়। সেদিন যখন পৃথিবীর পরিচিত সকল বস্তু অদৃশ্য হয়ে যাবে, মানুষ তার সম্পদের হিসাব রাখতেও ভুলে যাবে। গর্ভবতী উষ্ট্রও উপেক্ষিত হবে। অর্থাৎ মানুষ সেদিন মূল্যবান সম্পদও উপেক্ষা করবে। সেদিনের চিত্র কোন ভাবেই বর্তমান পৃথিবীর কোন কিছুর সাথেই তুলনীয় হবে না।

৫। যখন বন্য পশুসকল [ মানুষের সাথে ] একত্র করা হবে ; ৫৯৭৪

৫৯৭৪। ৫) সেদিনের চিত্র বর্তমান পৃথিবীর চিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। সাধারণ ভাবে বন্য পশুরা ও মানুষ একে অপরকে ভয় করে। তারা মানুষের বাসভূমি থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু সেদিন মানুষের আবাসস্থল ও পশুর আবাসস্থলের মাঝে কোনও পার্থক্য থাকবে না। আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা মানুষ ও পশু উভয়কে সন্ত্রস্ত করে তুলবে যার ফলে পরস্পরের অস্তিত্ব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে না। মানুষ পশু সব একাকার হয়ে মিলে মিশে যাবে।

৬। যখন সমুদ্র সকল ফুটতে থাকবে ও উথলিয়ে উঠবে ; ৫৯৭৫

৫৯৭৫। দেখুন [ ৫২ : ৬ ] আয়াত ও টিকা ৫০৪১। ৬) পৃথিবী ধ্বংসের বর্ণনা প্রসঙ্গে সমুদ্রের বর্ণন করা হয়েছে। ধবংসের সেই প্রচন্ডতাতে সমুদ্র যে রূপ ধারণ করবে তারই সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণভাবে সমুদ্র তার সীমা কখনও অতিক্রম করে না। জলভাগ ও স্থলভাগের সীমা নির্ধারিত আছে। কিন্তু সেদিন প্রচন্ড রোষে সমুদ্র ফুঁসে উঠবে। উত্তাল তরঙ্গ স্থলভাগের সকল বাঁধাকে অতিক্রম করে আছড়ে পড়বে। স্থলভাগ ও জলভাগের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পড়বে। স্থায়ী বা নূতন পৃথিবী সৃষ্টির প্রাক্কালে এ ভাবেই পুরাতন পৃথিবী টুকরা টুকরা হয়ে ভেঙ্গে পড়বে। কিন্তু এগুলি সবই হচ্ছে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবর্তন যে পরিবর্তন রোজ কেয়ামতের প্রতীক। এই পরিবর্তনকে মানুষের বাহ্যিক বা শারীরিক পরিবর্তনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। পরবর্তী [ ৭- ১২ ] আয়াত পর্যন্ত নূতন পৃথিবীর বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে বর্তমান পৃথিবীর অসামঞ্জস্য থাকবে না।

৭। যখন আত্মাসমূহকে বাছাই করা হবে [ সমগোত্রীয়কে একত্রে সংযুক্ত করার জন্য ]; ৫৯৭৬

৫৯৭৬। এই আয়াতটি বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজীতে অনুবাদ হয়েছে নিম্নরূপঃ " When the souls are sorted out [ Being joined , like with like ]।" পূর্বের আয়াতে [ ৫৬ : ৭ ] বলা হয়েছে যে, মানুষকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হবে যথা, আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য প্রাপ্ত ব্যক্তিরা, ডানদিকের দল ও বামদিকের দল। এই শ্রেণী বিভাগ হচ্ছে প্রধান শ্রেণী বিভাগ। এই আয়াত দ্বারা ব্যপক ভাবে পৃথিবীর অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। ৭) পৃথিবীর এই শিক্ষানবীশকালে ভালো-মন্দ, পাপ-পূণ্য, জ্ঞান-অজ্ঞতা,ক্ষমতা-দম্ভ ইত্যাদি পরস্পর মিশে থাকে ওতপ্রেতভাবে। কিন্তু নূতন পৃথিবী, যা সৃষ্টি হবে,সেখানে এরূপ মিশ্রণ থাকবে না। সকলেরই পূর্ণ সত্য প্রকাশিত হবে, প্রকৃত মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রত্যেকের শ্রেণী বিভাগ করা হবে। কারণ নূতন পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, বা পাপ - পূণ্যের সংঘর্ষে শান্তি ও শৃঙ্খলা বারে বারে বিঘ্নিত হবে না। সে পৃথিবী হবে শান্তি ও শৃঙ্খলার পরিপূর্ণ চিত্র।

৮। যখন [ সদ্যজাত ] জীবন্ত সমাধিস্ত কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে ;

৯। কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিলো ; ৫৯৭৭

৫৯৭৭। ৮) পৃথিবীতে যুগে যুগে যারা অসহায় তারা অন্যায় ও অবিচারের দ্বারা নিগৃহিত হয়ে থাকে। কত নিরপরাধ জীবন পাপের যুপকাষ্ঠে বলি হয়ে যায়, বিচারের বাণী নিরবে নিভৃত কাঁদে, প্রতিকার বিহীন ভাবে। এ সব পাপ ও অন্যায় এমন ভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে যে বাইরের পৃথিবীতে তার কোনও চিহ্নমাত্র থাকে না, যার সাহায্যে অপরাধীকে শাস্তি দান করা যায়। কোরেশদের জন্য এরূপ একটি পাপ ছিলো মেয়ে শিশু হত্যা : দেখুন [ ১৫ : ৫৮- ৫৯ ] এবং টিকা ২০৮৪। এই পাপকে তারা পাপ মনে করতো না, কারণ সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আপাতঃদৃষ্টিতে তা ছিলো ন্যায়সঙ্গত গোপন ষড়যন্ত্র। এবং এ ব্যাপারে তাদের কোনও জবাবদিহিতা ছিলো না। পৃথিবীর কোন কাজই মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাবে না। বিচার দিবসে সকল কর্মই ন্যায় বিচারের সম্মুখীন হবে। নিহত শিশুকেই জিজ্ঞাসা করা হবে যে, কি অপরাধে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো ? সে তো কোনও অপরাধ করে নাই, অপরাধীর গোপন সকল কর্ম-কান্ডই তার অপরাধের সাক্ষী হবে। এ ভাবেই মানুষের সকল গোপন পাপ সেদিন গোপন থাকবে না। প্রকাশ্য হয়ে পড়বে ও ন্যায় বিচারের সম্মূখীন হবে।

১০। যখন আমলনামা সকল উন্মোচন করে রাখা হবে ; ৫৯৭৮

৫৯৭৮। ৯) আমলনামা দ্বারা মানুষের জীবনের যাবতীয় কর্ম যাতে সংরক্ষিত হয়, তাকেই বুঝানো হয়। মানুষের জীবনের ভালো কাজ ও মন্দ কাজ সবই উম্মোচিত হয়ে পড়বে শেষ বিচারের দিনে। দেখুন [ ৫০ : ১৭-১৮ ] আয়াত ও টিকা ৪৯৫৪ ; আরও দেখুন সূরা [৮২ : ১১ - ১২ ] আয়াত। পার্থিব জীবনে গোপনীয়তা অবলম্বন করা সম্ভব, কিন্তু পারলৌকিক জীবনে কোনও কিছুই গোপন থাকবে না। পৃথিবীর প্রতিটি গোপনীয়তা, ভালো বা মন্দ কাজ সব কিছু সেখানে প্রকাশ পাবে,সর্বত্র প্রকাশিত হবে চরম সত্য। জীবনের চলার পথে ছোট ছোট ঘটনাবলী যা মানুষ ভুলে যায়, মনের গোপন রাখা উদ্দেশ্য, মর্মবেদনা যা প্রকাশ্য ছিলো না, অবহেলা, অনাদর বা সাহায্য সহযোগীতা এক কথায় জীবন ছন্দের প্রতিটি মূহুর্ত রেকর্ড হয়ে থাকবে আর বিচার দিবসে সেই রেকর্ড বা আমলনামা সর্ব সমক্ষে উম্মোচিত হবে।

১১। যখন উচ্চ আসমানের আবরণ অপসারিত করা হবে ; ৫৯৭৯

৫৯৭৯। ১০) 'আসমান' দ্বারা জাহান্নামের আগুন, বেহেশত উভয়কেই বুঝানো হয়েছে। এ দুটি হবে পরলোকে পাপী ও পূণ্যাত্মাদের বাসস্থান। "আকাশের আবরণ অপসারণ " বাক্যটি রূপক ধর্মী। পশুর চামড়া ছাড়িয়ে নেবার পরে তার দেহের অভ্যন্তরের প্রতিটি বস্তু যেমন রক্ত, মাংস, ভিতরের অংগ প্রত্যঙ্গ দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। কারণ সেগুলি ধরে রাখার মত কোন আবরণ থাকে না। ঠিক সেরূপ হবে প্রতিটি আত্মার অবস্থা।

১২। যখন জাহান্নামের আগুনকে উদ্দীপিত করা হবে ; ৫৯৮০

৫৯৮০। ১১) জাহান্নামের অগ্নি হবে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর আুগনের থেকেও ভয়ঙ্কর। এ আগুন অন্তরের অন্তঃস্থলকে পুড়িয়ে দেবে। পাপকে অনুধাবনের তীব্র গ্লানি, অনুতাপ, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, আত্মার অন্তঃস্থলে তীব্র দহনের সৃষ্টি করবে।

১৩। এবং যখন বেহেশতকে ৫৯৮১ নিকটে আনা হবে ; ৫৯৮২

৫৯৮১। ১২) শেষে বলা হয়েছে জান্নাতের কথা - যা দৃষ্টিগোচর হবে বা কাছে আনা হবে কিন্তু বেহেশতে দাখিল করার কথা বলা হয় নাই। কারণ তাদের চোখের আবরণ সরে যাবে ফলে তারা প্রকৃত অবস্থা দেখতে ও বুঝতে পারবে। প্রতিটি আত্মাই তা জানতে ও বুঝতে পারবে।