Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪৩৭ বার
+ - R Print

সূরা নাবা'

সূরা নাবা' অথবা মহা সংবাদ -৭৮

৪০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সুন্দর মক্কী সূরাটি পূর্ববর্তী [ ৭৭ নং সূরা ] সূরার ন্যায় প্রাথমিক মক্কী সূরা নয়, আবার সূরা নং ৭৬ এর ন্যায় পরেও অবতীর্ণ হয় নাই, তবে এর সমসাময়িক।

এই সূরার আয়াতগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্‌র সদয় তত্বাবধানের চিত্র অংকন করা হয়েছে যা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতি ইঙ্গিত দান করে থাকে, যে সময়ে পাপ ও মন্দ ধ্বংস হয়ে যাবে ও ভালো ও পূণ্য স্থায়িত্ব লাভ করবে। সেই সাথে যারা আল্লাহ্‌র আশ্রয় কামনা করে, তাদের সকলকে সেই আশ্রয়ে আহ্বান করা হয়েছে।


সূরা নাবা' অথবা মহা সংবাদ -৭৮

৪০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

১। তারা কি বিষয়ে বিতর্ক করছে ?

২। মহা -সংবাদ সম্বন্ধে ৫৮৮৯।

৫৮৮৯। 'মহা-সংবাদ ' - মহাসংবাদ দ্বারা বুঝানো হয়েছে কেয়ামত দিবস বা পুণরুত্থান দিবসকে। ইহুদী ও খৃষ্টানদের মাঝে পুণরুত্থান দিবস সম্বন্ধে বিভিন্ন মতবাদ চালু আছে। প্রকৃত পক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্টে এ সম্বন্ধে কোনও কিছুই বিবৃত করা হয় নাই, এবং খৃষ্টের সময়েও পুণরুত্থানকে অস্বীকার করা হয়। মোশরেক আরবদের মাঝেও পরলোকের জীবন সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা ছিলো না। সুতারাং খৃষ্টান, ইহুদী ও মোশরেক আরবেরা পুণরুত্থান দিবস বা মহাসংবাদ সম্বন্ধে সংবাদ জানতে চেয়েছে।

সূরা [৩৮ : ৬৭ ] আয়াতে মহাসংবাদ দ্বারা বুঝানো হয়েছে সর্বশক্তিমানের প্রত্যাদেশ বা কোরাণ বা রাসুলের (সা) প্রচারিত, 'সত্য '। এই সত্য বা কোরাণের আবির্ভাব সম্বন্ধে সে সময়ে মোশরেকদের মাঝে সন্দেহ ও তর্কের সৃষ্টি করে। যেহেতু কোরাণের 'সত্য' পুনরুত্থান ও শেষ বিচারের উপরে অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকে, সে জন্য সূরা ৭৮ নং এবং সূরা ৩৮ নং এ উল্লেখিত মহা সংবাদ দ্বারা একই বিষয়বস্তুকে বুঝানো হয়েছে।

৩। যে বিষয়ে তাদের মতৈক্য নাই।

৪। সত্য-সত্যই শীঘ্রই তারা জানতে পারবে,

৫। সত্য-সত্যই শীঘ্রই তারা জানতে পারবে,

৬। আমি কি ভূমিকে বিস্তৃত স্থান করি নাই, ৫৮৯০।

৭। এবং পর্বত সমূহকে পেরেক ?

৫৮৯০। দেখুন [ ১৬ : ১৫ ] আয়াতের টিকা ২০৩৮। আরও দেখুন [ ১৩ : ৩ ] এবং [ ১৫ : ১৯ ] আয়াত। এসব আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌ ভূমন্ডলকে কার্পেটের ন্যায় বিস্তৃত করেছেন এবং কার্পেটকে স্বস্থানে রাখার জন্য যেরূপ পেরেকের প্রয়োজন হয় সেরূপ পর্বতকে সৃষ্টি করেছেন, যেনো ভূঅভ্যন্তরস্ত চলমান শিলারাশির কম্পন থেকে ভূপৃষ্ঠকে রক্ষা করে। এই সূরাতে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির নিদর্শন সমূহকে একের পরে এক উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিশদ চিত্র অংকন করা হয়েছে [ ৬ - ৭ ] আয়াতে। এর পরে এসেছে মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টির বিষয়। তার পরে ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে মানুষের বিশ্রাম ও কাজকে যা সম্পৃক্ত করা হয়েছে রাত্রি ও দিনের সাথে [ ৮- ১১ ] আয়াত। অসীম নীল আকাশ যা বিন্যস্ত করা হয়েছে সপ্ত আকাশে এবং সুশোভিত করা হয়েছে অত্যুজ্জ্বল আলোকমালাতে [ ১২ - ১৩ ] আয়াত। মেঘ ও বৃষ্টি এবং ফসলের প্রাচুর্য। এভাবেই আকাশ, পৃথিবী ও মানুষকে এক সূত্রে গ্রথিত করা হয়েছে [ ১৪ - ১৬ ] আয়াত। সৃষ্টির বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্বের প্রতি এবং পরলোকের জীবনের প্রতি।

৮। এবং তোমাদের কি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করি নাই,

৯। এবং বিশ্রামের জন্য নিদ্রা,

১০। এবং রাত্রিকে আবরণ স্বরূপ ৫৮৯১

৫৮৯১। রাত্রির অন্ধকারকে এখানে আবরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি একটি অপূর্ব সুন্দর উপমা। পোষাক বা আবরণ যেরূপ দেহকে শৈত্য ও অত্যাধিক গরম থেকে রক্ষা করে রাত্রির অন্ধকার সেরূপ, আত্মাকে কর্মব্যস্ত দিবসের সংগ্রাম থেকে সাময়িক মুক্তি দান করে থাকে। পার্থিব জগতের ক্লান্তিকর কর্মব্যস্ততা নিশিতের অন্ধকারের আবরণে সাময়িক অবসর লাভে সক্ষম হয়। ঘুম হচ্ছে বিশ্রামের প্রতীক। রাত্রির অন্ধকার মানুষকে সুপ্তির কোলে আশ্রয় দান করে বিশ্রামে সহায়তা করে।

১১। এবং জীবিকা আরহণের জন্য দিন ? ৫৮৯২

৫৮৯২। Ma'ash - এই শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে জীবিকা। জীবিকা শব্দটি দ্বারা প্রকৃত শব্দের খুব সংঙ্কীর্ণ অর্থ করা হয়েছে। শব্দটি দ্বারা জীবনের ও জীবন ধারণের সকল কর্মকান্ডকে বুঝানো হয়েছে। দিবসকে স্রষ্টা আলোকময় করেছেন যেনো মানুষ তাঁর কর্মব্যস্ততা সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে পারে।

১২। এবং [ আমি কি ] তোমাদের উপরে সপ্ত আকাশকে তৈরী করি নাই ? ৫৮৯৩

৫৮৯৩। দেখুন [ ৬৫ : ১২ ] আয়াতের টিকা ৫৫২৬ ; [ ২৩ : ১৭ ] আয়াতের টিকা ২৮৭৬; এবং [ ৩৭ : ৬] আয়াতের টিকা সমূহ।

১৩। এবং সেখানে কি স্থাপন করি নাই উজ্জ্বল প্রদীপ ? ৫৮৯৪

৫৮৯৪। "উজ্জ্বল দীপ" - অর্থাৎ সূর্য। দেখুন সূরা [ ২৫ : ৬১ ] ; [ ৩৩ : ৪৬ ] ; [ যেখানে রাসুলকে (সা) রূপক অলংকারে এ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ] এবং আয়াত [ ৭১ : ১৬ ]।

১৪। এবং আকাশ থেকে কি প্রচুর বারি বর্ষণ করি নাই, ৫৮৯৫

৫৮৯৫। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও সদয় তত্বাবধানকে চারটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ১) আমাদের চারিপার্শ্বের দৃশ্যমান জগত ও প্রকৃতির বিন্যাস [ আয়াত ৬-৭ ]। ২) মানুষের সৃষ্টি ; মানুষের দৈহিক, আধ্যাত্মিক ও মনোজগতের বৈশিষ্ট্য [ আয়াত ৮ - ১১ ]। ৩) নক্ষত্র খচিত আকাশ ও প্রদীপ্ত সূর্য [ আয়াত ১২ - ১৩ ]। ৪) আকাশ, পৃথিবী ও বায়ুর পরস্পর নির্ভরশীলতা যার প্রকাশ ঘটে পানি চক্রে যা মেঘ ও বৃষ্টির মাধ্যমে, পৃথিবীর উদ্ভিদ জগত ও শষ্য উৎপাদনের মাধ্যমে। এক কথায় বলতে হয় যে, আকাশ, পৃথিবী, বিশ্ব প্রকৃতি, সকল কিছুই আল্লাহ্‌র পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে শৃঙ্খলার সাথে কাজ করে চলেছে।

যার মন আছে, যে দেখতে জানে সেই বুঝতে পারে সমগ্র সৃষ্টির মাঝে বিশ্ববিধাতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ, মঙ্গলময় হাতের স্পর্শ, সদয় তত্বাবধান বিদ্যমান। এর পরেও কি তারা বিশ্বাস করবে না যে, যে বিধাতা এত কিছু করতে সক্ষম, তিনি নির্দ্দিষ্ট দিনে বা কেয়ামত দিবসে ভালোকে মন্দ থেকে আলাদা করতেও সক্ষম এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম ?

১৫। যার দ্বারা আমি উৎপন্ন করতে পারি শষ্য ও তরি-তরকারী,

১৬। ঘন সন্নিবিষ্ট উদ্যান ?

১৭। নিশ্চয়ই নির্ধারিত করা আছে বাছাই করার দিন ? ৫৮৯৬

৫৮৯৬। দেখুন [ ৩৭ : ২১ ] আয়াত ও টিকা ৪০৪৭ এবং [ ৩৬ : ৫৯] আয়াত ও টিকা ৪০০৫। শেষ বিচারের দিনকে বলা যায় ভালো ও মন্দকে আলাদা ভাবে সনাক্ত করার দিন। এই দিনকেই বলা হয়েছে "বিচার দিবস" বা ভালো ও মন্দের ফয়সালা দিবস।

১৮। যে দিন সিঙ্গাতে ফুঁ দেয়া হবে, এবং তোমরা দলে দলে সমাগত হবে। ৫৮৯৭,

৫৮৯৭। ইস্রাফীল হচ্ছেন ফেরেশতা যাকে আল্লাহ্‌ শিঙ্গাতে ফুঁৎকারের জন্য নিযুক্ত করেছেন। শিঙ্গাতে ফুৎকার হচ্ছে বিচার দিবসের পূর্ব ঘোষণা। দেখুন [ ৩৯: ৬৮ ] আয়াত ও টিকা ৪৩৪৩ এবং [ ৬৯ : ১৩ ] আয়াত ও টিকা ৫৬৪৮।

১৯। এবং আকাশকে উম্মুক্ত করে দেয়া হবে, মনে হবে সেখানে বহু দরজা বিদ্যমান, ৫৮৯৮

৫৮৯৮। বিচার দিবসের ঘোষণার সাথে সাথে যে পরিবর্তন হবে তারই বর্ণনা এখানে করা হয়েছে। পুরানো ও দৃশ্যমান বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সম্পূর্ণরূপে বদলে যাবে। এবং সেখানে নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে। শুধু পৃথিবীই নয় আকাশের দৃশ্যও সম্পূর্ণরূপে পরিবতির্ত হয়ে পড়বে। এই আয়াতে আকাশের এবং পরের আয়াতে পৃথিবীর পরিবর্তনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আকাশের রহস্যের দ্বার উম্মুক্ত করা হবে। সদৃঢ় পর্বতমালা মরীচিকার ন্যায় অদৃশ্য হয়ে যাবে।

২০। এবং পর্বত সমূহ অদৃশ্য হয়ে যাবে, যেনো তারা ছিলো মরিচীকা।

২১। নিশ্চয় জাহান্নাম অর্তকির্তে আক্রমণের জন্য ওঁৎ পেতে থাকবে, ৫৮৯৯

২২। সীমালংঘনকারীদের জন্য [ যা হবে ] গন্তব্যস্থল।

৫৮৯৯। দোযখ হচ্ছে পাপীদের বাসস্থান বা পাপের প্রতিমূর্তি। দোযখকে বর্ণনা করা হয়েছে সেই সব প্রাণীর সাথে যারা শিকার ধরার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। হিংস্র প্রাণী থেকে যেরূপ সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়, দোযখ থেকেও আমাদের সেরূপ সর্বদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যারা সীমালংঘনকারী,যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধাচারণ করে; তাদের জন্য দোযখের স্থান নির্ধারিত করা হয়েছে, যেখান থেকে আল্লাহ্‌র হুকুম ব্যতীত তাদের মুক্তি নাই। [ দেখুন ৬ : ১২৮ আয়াত ও টিকা ৯৫১ ]।

২৩। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে থাকবে।

২৪। কোনরকম শীতলতা তারা আস্বাদন করবে না অন্য কোন পানীয় নয়,

২৫। ফুটন্ত তরল, এবং প্রচন্ড ঠান্ডা ঘোলা, কালো তরল ব্যতীত - ৫৯০০

৫৯০০। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ১০ : ৪ ] ও টিকা ১৩৯০ ; আরও দেখুন [ ৩৮ : ৫৭ ] আয়াত ও টিকা ৪২১৩।

২৬। [ যা তাদের ] উপযুক্ত তুল্য বিনিময়। ৫৯০১

৫৯০১। আল্লাহ্‌র দেয়া সীমালংঘন করার প্রবণতা হচ্ছে একধরণের আধ্যাত্মিক ব্যাধি। এই ব্যাধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে এসব ব্যাধিগ্রস্থ লোক অনুতাপের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র দিকে মুখ ফেরাতে অস্বীকার করে। সীমালংঘণকারীদের শেষ পরিণতির বর্ণনা এখানে করা হয়েছে। দোযখের আগুন তাদের জন্য ক্রমান্বয়ে অধিক শাস্তিদায়ক হতে থাকবে। সে আগুনের তাপকে ঠান্ডা করার কোনও উপায় থাকবে না। তাঁদের খাদ্য ও পানীয় হবে পরস্পর বিরোধী বিশৃঙ্খল বস্তু যেমন : ফুটন্ত পানীয়, আবার ভয়াবহ ঠান্ডা,পূঁজের ন্যায় তরল পদার্থ। এই পরস্পর বিরোধী হওয়ার কারণ, তাদের আধ্যাত্মিক জীবনে পরস্পর বিরোধী বৈকল্য। সৃষ্টির আদিতে আত্মা থাকে পূত পবিত্র যার পবিত্রতা মানুষ নষ্ট করে পরস্পর বিরোধী বিশৃঙ্খল ও আত্মার অনুপযোগী চিন্তাধারা ও কর্মধারার মাধ্যমে। তাদের পরস্পর বিরোধী চিন্তার ও কর্মের পরিণতি হবে পরস্পর বিরোধী শাস্তি। আত্মার মাঝে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে পরিণতিতে তারা আত্মার শান্তি ও শৃঙ্খলা হারাবে এবং এদের জন্যই আছে পরস্পর বিরোধী উপযুক্ত শাস্তি।