+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : সম্ভবতঃ এই সূরাটি প্রাথমিক মক্কী সূরাগুলির অন্যতম। অবশ্য এর কয়েকটি আয়াত বাদে।
এই সূরার বিষয়বস্তুতে তুলনা করা হয়েছে যারা ভালোকে গ্রহণ করে তাদের সাথে যারা মন্দকে গ্রহণ করে তাদের পটভূমিতে।
এই সূরার শিরোনাম প্রাচীন কালের প্যাগান আরবদের ধারণার ব্যাখ্যা দান করে। তারা ধারণা করতো যে, 'সময়' হচ্ছে অসীম যা সৃষ্টির আদি থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিদ্যমান ও বহমান এবং অসীম অনন্ত সময় ভবিষ্যতেও চিরদিন বিদ্যমান থাকবে। "সময়ের " এই সীমাহীনতাই মানুষের সকল পরিণতির জন্য দায়ী। সূরা [ ৪৫ : ২৪ ] আয়াতে আমরা পড়েছি যে, " তারা বলে আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। " অর্থাৎ মানব সভ্যতা,মানুষের সুখ, দুঃখ সবই মহাকালের পরিক্রমায় স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাদের এই ধারণা ভুল। 'সময় ' কোন অসীম বা বির্মূত বস্তু নয়। 'সময়কেও' সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা কোন সীমাহীন বস্তু নয় - এরও একদিন শেষ হবে। সময়ের ধারণা হচ্ছে আপেক্ষিক, যা আইনেস্টাইন প্রমাণ করে গেছেন। একমাত্র আল্লাহ্ই হচ্ছেন অনন্ত অসীম; আদি অন্তহীন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ং অস্তিমান, প্রকৃত বাস্তব। আল্লাহ্র প্রতি আরোপিত গুণাবলী আমরা আমাদের কাল্পনিক বস্তু 'সময়কে ' আরোপ করবো না।
মক্কী সূরাগুলির ন্যায় এই সূরাটির সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে সমৃদ্ধ। সুতারাং সূরাগুলির তফসীর বা ব্যাখ্যা করার সময়ে এ সত্যকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে।
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৫৮৩০। 'দহর ' বা কাল প্রবাহ যার অর্থ হচ্ছে আদি ও অন্তহীন সময়ের ধারণা।
৫৮৩১। এ কথা সত্য যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের বহু পূর্বেই এই বিশ্বভূবনের সৃষ্টি হয়েছে। ভূতাত্বিক গবেষণায় এ কথার সত্যতা প্রমাণ করে। দেখুন সূরা [ ২ : ৩০- ৩১ ] আয়াত যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির পূর্বাভাষ। " স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলিলেন, " আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি'', তারা বললো, " আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে ? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতিগান ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।" ফেরেশতাদের এই বক্তব্য থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেও পৃথিবীতে এমন সব প্রাণী বিদ্যমান ছিলো যারা অশান্তি ও রক্তপাত ঘটাতো। কারণ অনাগত মানুষের ভবিষ্যত দেখার ক্ষমতা ফেরেশতাদের ছিলো না, পৃথিবীতে সে সময়ে যারা [ ডাইনোসর ] অবস্থান করছিলো তাদেরই প্রেক্ষাপটে মানুষ সৃষ্টি সম্বন্ধে ফেরেশতারা উপরিউক্ত উক্তি প্রয়োগ করে। বিজ্ঞান বলে মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিলো।
৫৮৩২। ' মিলিত শুক্র বিন্দু ' - নূতন প্রাণ সৃষ্টির পূর্বে ডিম্ব কোষকে শুক্রনুদ্বারা নিষিক্ত হওয়া প্রয়োজন। এ কথা বিশ্বের সকল প্রাণীর জন্য যেরূপ প্রযোজ্য, মানুষের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। তবে মানুষের বেলায় পার্থক্য হচ্ছে, মানুষের এই নশ্বর দেহ ধারণ করে অতীন্দ্রিয় আত্মা, যার ফলে তাঁকে দান করা হয়েছে কতকগুলি মানসিক দক্ষতা যা ঐশ্বরিক গুণাবলী ধারণ করতে সক্ষম। যে কোন নির্দ্দেশ সে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে [ যা প্রকাশ করা হয়েছে শ্রবণশক্তি দ্বারা ]। মানুষের আছে বুদ্ধিমত্তা এবং আধ্যাত্মিক অর্ন্তদৃষ্টি ও বিবেক [যা প্রকাশ করা হয়েছে দৃষ্টি শক্তি দ্বারা ]। এ ভাবেই মানুষকে সৃষ্টির অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করা হয়েছে।
মানুষকে দান করা হয়েছে " সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি "। এসব মানসিক দক্ষতার কারণেই সে পৃথিবীতে আল্লাহ্র প্রতিনিধি [ ২ : ৩০ ]। আল্লাহ্র দেয়া এই সব মানসিক ক্ষমতার সে সঠিক সদ্ব্যবহার করেছে কি না সেই জবাবদিহিতাই হবে মানুষের মনুষ্য জন্মের প্রধান সমস্যা। সুতারাং তাঁকে আল্লাহ্ যেমন পথের দিক্নির্দ্দেশনা দান করবেন, ঠিক সেরূপ ভাবে পরীক্ষাও করে নেবেন।
৫৮৩৩। আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশেষ মানসিক দক্ষতা দ্বারা। সঠিক ব্যবহারের ফলে এ সব মানসিক দক্ষতা সমূহ ঐশ্বরিক গুণাবলী আত্মার মাঝে ধারণ করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই-ই নয়, এ সব দক্ষতাকে সঠিক পথে প্রয়োগের জন্য পথ নির্দ্দেশ দান করেছেন প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এবং পথের দিশারী হিসেবে নবী রসুলদের প্রেরণ করেছেfন। যদি মানুষ কৃতজ্ঞ হয়, তবে সে আল্লাহ্র নির্দ্দেশিত পথকে গ্রহণ করে নিজেকে মোমেন বান্দারূপে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং পূণ্যাত্মাদের অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি সে কৃতজ্ঞ না হয় তবে সে আল্লাহ্র নির্দ্দেশিত পথকে পরিত্যাগ করবে। যার ফলে তার সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অপব্যবহারের ফলে সে ন্যায়কে ত্যাগ করে অন্যায়কে গ্রহণ করবে, সত্য ও ভালো তার নিকট হবে অবহেলিত এবং সে মিথ্যা ও মন্দকে জীবনে ওতপ্রেতভাবে গ্রহণ করবে। এ ভাবেই সে মিথ্যা, অন্যায় ও অসত্যের বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়বে। পাপের ভারে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি হয়ে পড়বে নুব্জ, কুব্জ - সে হারাবে আত্মার ভালোকে গ্রহণ করার আত্মিক স্বাধীনতা। তার বিবেক হবে তমসাচ্ছন্ন যা তাকে ন্যায় ও সত্যের পথে চালিত করতে পারতো। ফলে সে দোযখের শাস্তির আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। দেখুন পরবর্তী আয়াত। ভালো ও মন্দ কে গ্রহণ করার স্বাধীনতা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ ভাবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির উপরে।
৫৮৩৪। দেখুন সূরা [ ১৩ : ৫ ] ; [ ৩৪ : ৩৩ ] ; [ ৪০ : ৭১ ]। এই আয়াতটি গভীর অর্থবোধক এবং প্রতীকধর্মী। পাপের পরিণাম পাপীর আত্মাতে অষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। পাপের কারণে সত্যের আলোর প্রদীপ বা বিবেকের আলো তার আত্মার মাঝে নির্বাপিত হয়ে যায়। ফলে সে প্রকৃত সত্যকে চিনতে পারে না। যার ফলে সে সংস্কার, অভ্যাস, কুসংস্কার, সামাজিক রীতিনীতর দাসে পরিণত হয়। একেই সে ধর্ম মনে করে। এগুলি তার বিবেককে শৃঙ্খলিত করে ফেলে - সংস্কারের জোয়াল তার আত্মাকে করে নীপিড়িত, আত্মার অবস্থান হয় শ্বাসরুদ্ধকর। ফলে আত্মার সুক্ষ অনুভূতির [fine instict ] মৃত্যু ঘটে। তার অনুভূতি হয় আবেগ তাড়িত পশুর ন্যায়। ঘৃণা-বিদ্বেষ, হিংসা, হতাশা তার সর্বসত্তাকে ঘিরে ফেলে যার থেকে সে মুক্তি পায় না। এগুলির উপমা হচ্ছে লৌহ বেড়ি। যদিও এ সব আত্মা আল্লাহ্র অনুগ্রহের জন্য ব্যকুল হয়, তবুও সে তার পাপের জোয়াল থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয় না। আল্লাহ্র অনুগ্রহের আলো, করুণাধারার, বারি একমাত্র পূণ্যাত্মাদের আত্মার মাঝেই প্রবেশ লাভ করে।
৫৮৪২। " কাফূর " - আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ হচ্ছে কর্পূর। বেহেশতি শান্তির, ঝরণার এ হচ্ছে এক উপাদান। বেহেশতি পানীয় যা পবিত্র, সুস্বাদু, উপাদেয়, যাতে কাফূর মসলা যোগ করা হয়, সুগন্ধযুক্ত করার জন্য। যে পানীয় প্রমত্ততা আনায়ন করে না, বরং তা শক্তিদায়ক, সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর ও উপযোগী। সাধারণতঃ প্রাচ্য দেশে কর্পূরকে এর সতেজ অনুভূতি ও শক্তিদায়ক উপযোগীতার জন্য ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
৫৮৩ ৬। ' তারা ' অর্থাৎ পূণ্যাত্মাগণ। পূণাত্মাদের চেনা যাবে তাদের গুণাবলীর দ্বারা। এসব গুণাবলীর বিবরণ আছে আয়াত [ ৭ - ১০ ] পর্যন্ত। এ সব পূণ্যাত্মারা পরলোকের জীবনে সীমাহীন প্রশান্তি সুখ ভোগ করবেন যার বর্ণনা আছে আয়াতে [ ১১ - ১২ ] পর্যন্ত।
৫৮৩৭। দেখুন [ ২২ : ২৯ ] আয়াত। এই আয়াত দ্বারা যে সব কর্তব্যকে বুঝানো হয়েছে তা হচ্ছে আধ্যাত্মিক কর্তব্য বা আল্লাহ্র প্রতি মানুষের কর্তব্য। পরবর্তী আয়াতে এই কর্তব্যের রূপরেখা বর্ণনা করা হয়েছে। এসব হচ্ছে মানবতার জন্য কাজ করা অথবা মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য। যারা তা করেন তারাই আল্লাহ্র সাথে কৃত সকল অঙ্গীকার বা ওয়াদা পালন করেন [ ৫: ১ আয়াত এবং টিকা ৬৮২ ]। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে, আল্লাহ্র সৃষ্ট জীবের প্রতি বা পৃথিবীর সকল সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে মানুষের কর্তব্য। এই কর্তব্যই হচ্ছে মানুষের অঙ্গীকার আল্লাহ্র সাথে।
৫৮৩৮। পূণ্যাত্মারা ভয় করেন শেষ বিচারের দিনের। যেদিন পার্থিব পাপের পরিণতি হবে ভয়াবহ যা চিন্তার অতীত। এবং যেদিন পার্থিব সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে।
৫৮৩৯। 'বন্দী' শব্দটি দ্বারা সে যুগের যুদ্ধবন্দীদের বুঝানো হয়েছে। ইসলাম পূর্ব যুগে ও ইসলামের যুগে যুদ্ধ বন্দীদের নিজেদের খাদ্যের সংস্থান নিজেদেরই করতে হতো এবং নিজেদের মুক্তিপণ নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হতো। এমন কি সাধারণ অপরাধী যারা জেলখানাতে থাকতো, তাদেরও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করতো তাদের আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধব অথবা বন্দীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে সেই খরচ বহন করা হতো। তবে 'বন্দী' শব্দটি সংকীর্ণাথে ব্যবহার না করে ব্যপক অর্থে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
মানুষ শুধু যে কারাগারেই বন্দী থাকে তা সত্য নয়। বন্দী এই শব্দটি প্রতীকধর্মী যা বৃহত্তর মানবগোষ্ঠির জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন আধ্যাত্মিক ভাবে বন্দী যাদের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক মুক্তি ঘটে নাই। কিন্তু যারা মুক্তির জন্য ব্যকুল। এরূপ ক্ষেত্রে পূণ্যাত্মাদের দায়িত্ব তাদের আত্মিক মুক্তির জন্য সাহায্য করা। 'বন্দী' শব্দটি ব্যপক অর্থে মূক প্রাণীজগতকেও বুঝানো যায় যারা মানুষের দয়ার উপরে নির্ভরশীল। এরূপক্ষেত্রে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মানুষের। এ ভাবেই প্রকৃতিকে সংরক্ষণের দায়িত্ব এসে যায় মানুষের উপরে। দেখুন [ ৯০ : ১৩] আয়াত ও টিকা ৬১৪০।
৫৮৪০। এই আয়াতের যে ভাষ্য তা দাতা কর্তৃক সরবে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নাই। এই আয়াতের যে বক্তব্য তা হবে দাতা ব্যক্তিদের মনের কথা এবং দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও মানসিকতা।
৫৮৪১। এই আয়াতের যে ভয়ংকর দিনের কথা বলা হয়েছে সেই দিন হচ্ছে পাপীদের জন্য পাপের পরিণতি দিবস। তবে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, পৃথিবীতে আমরা কেউই সম্পূর্ণ পাপমুক্ত নই। সুতারাং প্রকৃত মুক্তিলাভের জন্য আমাদের প্রয়োজন আল্লাহ্র ক্ষমা ও করুণা। সুতারাং পূণ্যাত্মাদের অন্তর থাকে ভয়ে ও শঙ্কায় পরিপূর্ণ। কারণ তারা জানে যে তারা সাধারণ মানুষ, সুতারাং তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্বেও তারা আল্লাহ্র প্রতি কর্তব্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হন নাই। সুতারাং আল্লাহ্র ক্ষমা ও করুণার আশাই সর্বোচ্চ আশা এবং পাপের পরিণাম থেকে মুক্তিলাভের উপায়।
৫৮৪২। দেখুন [ ৭৫ : ২২ - ২৩ ] আয়াত।
৫৮৪৩। দেখুন [ ২২ : ২৩ ] আয়াত।
৫৮৪৪। দেখুন [ ১৮ : ৩১ ] আয়াত।
৫৮৪৫। পরলোকের অভিজ্ঞতা পৃথিবীর জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। কারণ সে পৃথিবী হবে সম্পূর্ণ নূতন পৃথিবী যার সাথে আমাদের এই চেনা জানা পৃথিবীর কোনও সামঞ্জস্যই থাকবে না। দৈহিক আরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরিবেশের তাপমাত্রা। দেহ অত্যাধিক উষ্ণতা বা শীতলতা কোনটাই সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যে তাপমাত্রা সুখপ্রদ সেটাতেই আমরা আরাম পাই। এই সুখের অনুভূতিকেই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫৮৪৬। বৃক্ষের ছায়া ও ফলমূল দ্বারা আরাম আয়েশের অনুভূতিকে বুঝানো হয়েছে। এসব বর্ণনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গত সুখের অনুভূতিকেই বুঝানো হয়েছে।
৫৮৪৭। দেখুন [ ৪৩ : ৭১ ] আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে, " তাদের পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্রে।" এ সব বর্ণনা দ্বারা মহার্যতা, দুষ্প্রাপ্যতা, ও নিখাঁদ উজ্জ্বলতা প্রকাশ করা হয়েছে, যার কল্পনা করা পৃথিবীতে সম্ভব নয়।
সূরা দাহ্র
Page 1 of 2
সূরা দাহ্র বা ইনসান বা সময় - ৭৬
৩১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : সম্ভবতঃ এই সূরাটি প্রাথমিক মক্কী সূরাগুলির অন্যতম। অবশ্য এর কয়েকটি আয়াত বাদে।
এই সূরার বিষয়বস্তুতে তুলনা করা হয়েছে যারা ভালোকে গ্রহণ করে তাদের সাথে যারা মন্দকে গ্রহণ করে তাদের পটভূমিতে।
এই সূরার শিরোনাম প্রাচীন কালের প্যাগান আরবদের ধারণার ব্যাখ্যা দান করে। তারা ধারণা করতো যে, 'সময়' হচ্ছে অসীম যা সৃষ্টির আদি থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিদ্যমান ও বহমান এবং অসীম অনন্ত সময় ভবিষ্যতেও চিরদিন বিদ্যমান থাকবে। "সময়ের " এই সীমাহীনতাই মানুষের সকল পরিণতির জন্য দায়ী। সূরা [ ৪৫ : ২৪ ] আয়াতে আমরা পড়েছি যে, " তারা বলে আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদের ধ্বংস করে। " অর্থাৎ মানব সভ্যতা,মানুষের সুখ, দুঃখ সবই মহাকালের পরিক্রমায় স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাদের এই ধারণা ভুল। 'সময় ' কোন অসীম বা বির্মূত বস্তু নয়। 'সময়কেও' সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা কোন সীমাহীন বস্তু নয় - এরও একদিন শেষ হবে। সময়ের ধারণা হচ্ছে আপেক্ষিক, যা আইনেস্টাইন প্রমাণ করে গেছেন। একমাত্র আল্লাহ্ই হচ্ছেন অনন্ত অসীম; আদি অন্তহীন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ং অস্তিমান, প্রকৃত বাস্তব। আল্লাহ্র প্রতি আরোপিত গুণাবলী আমরা আমাদের কাল্পনিক বস্তু 'সময়কে ' আরোপ করবো না।
মক্কী সূরাগুলির ন্যায় এই সূরাটির সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে সমৃদ্ধ। সুতারাং সূরাগুলির তফসীর বা ব্যাখ্যা করার সময়ে এ সত্যকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে।
সূরা দাহ্র বা ইনসান বা সময় - ৭৬
৩১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। কালের প্রবাহে মানুষের জন্য এমন এক সময় কি ছিলো না যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিলো না ৫৮৩০, ৫৮৩১ ?
৫৮৩০। 'দহর ' বা কাল প্রবাহ যার অর্থ হচ্ছে আদি ও অন্তহীন সময়ের ধারণা।
৫৮৩১। এ কথা সত্য যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের বহু পূর্বেই এই বিশ্বভূবনের সৃষ্টি হয়েছে। ভূতাত্বিক গবেষণায় এ কথার সত্যতা প্রমাণ করে। দেখুন সূরা [ ২ : ৩০- ৩১ ] আয়াত যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে মানুষ সৃষ্টির পূর্বাভাষ। " স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলিলেন, " আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি'', তারা বললো, " আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে ? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতিগান ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।" ফেরেশতাদের এই বক্তব্য থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে মানুষের পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেও পৃথিবীতে এমন সব প্রাণী বিদ্যমান ছিলো যারা অশান্তি ও রক্তপাত ঘটাতো। কারণ অনাগত মানুষের ভবিষ্যত দেখার ক্ষমতা ফেরেশতাদের ছিলো না, পৃথিবীতে সে সময়ে যারা [ ডাইনোসর ] অবস্থান করছিলো তাদেরই প্রেক্ষাপটে মানুষ সৃষ্টি সম্বন্ধে ফেরেশতারা উপরিউক্ত উক্তি প্রয়োগ করে। বিজ্ঞান বলে মানুষ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিলো।
২। আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি একবিন্দু মিলিত শুক্রবিন্দু থেকে, যেনো তাকে আমি পরীক্ষা করতে পারি। সুতারাং আমি তাকে দান করেছিলাম শোনার ও দেখার ক্ষমতা। ৫৮৩২
৫৮৩২। ' মিলিত শুক্র বিন্দু ' - নূতন প্রাণ সৃষ্টির পূর্বে ডিম্ব কোষকে শুক্রনুদ্বারা নিষিক্ত হওয়া প্রয়োজন। এ কথা বিশ্বের সকল প্রাণীর জন্য যেরূপ প্রযোজ্য, মানুষের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। তবে মানুষের বেলায় পার্থক্য হচ্ছে, মানুষের এই নশ্বর দেহ ধারণ করে অতীন্দ্রিয় আত্মা, যার ফলে তাঁকে দান করা হয়েছে কতকগুলি মানসিক দক্ষতা যা ঐশ্বরিক গুণাবলী ধারণ করতে সক্ষম। যে কোন নির্দ্দেশ সে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে [ যা প্রকাশ করা হয়েছে শ্রবণশক্তি দ্বারা ]। মানুষের আছে বুদ্ধিমত্তা এবং আধ্যাত্মিক অর্ন্তদৃষ্টি ও বিবেক [যা প্রকাশ করা হয়েছে দৃষ্টি শক্তি দ্বারা ]। এ ভাবেই মানুষকে সৃষ্টির অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করা হয়েছে।
মানুষকে দান করা হয়েছে " সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি "। এসব মানসিক দক্ষতার কারণেই সে পৃথিবীতে আল্লাহ্র প্রতিনিধি [ ২ : ৩০ ]। আল্লাহ্র দেয়া এই সব মানসিক ক্ষমতার সে সঠিক সদ্ব্যবহার করেছে কি না সেই জবাবদিহিতাই হবে মানুষের মনুষ্য জন্মের প্রধান সমস্যা। সুতারাং তাঁকে আল্লাহ্ যেমন পথের দিক্নির্দ্দেশনা দান করবেন, ঠিক সেরূপ ভাবে পরীক্ষাও করে নেবেন।
৩। আমি তাকে পথের নির্দ্দেশ দেখিয়েছিলাম, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ হবে [ যা হবে তার ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল ] ৫৮৩৩
৫৮৩৩। আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশেষ মানসিক দক্ষতা দ্বারা। সঠিক ব্যবহারের ফলে এ সব মানসিক দক্ষতা সমূহ ঐশ্বরিক গুণাবলী আত্মার মাঝে ধারণ করতে সক্ষম হয়। শুধু তাই-ই নয়, এ সব দক্ষতাকে সঠিক পথে প্রয়োগের জন্য পথ নির্দ্দেশ দান করেছেন প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এবং পথের দিশারী হিসেবে নবী রসুলদের প্রেরণ করেছেfন। যদি মানুষ কৃতজ্ঞ হয়, তবে সে আল্লাহ্র নির্দ্দেশিত পথকে গ্রহণ করে নিজেকে মোমেন বান্দারূপে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং পূণ্যাত্মাদের অন্তর্ভূক্ত হবে। যদি সে কৃতজ্ঞ না হয় তবে সে আল্লাহ্র নির্দ্দেশিত পথকে পরিত্যাগ করবে। যার ফলে তার সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অপব্যবহারের ফলে সে ন্যায়কে ত্যাগ করে অন্যায়কে গ্রহণ করবে, সত্য ও ভালো তার নিকট হবে অবহেলিত এবং সে মিথ্যা ও মন্দকে জীবনে ওতপ্রেতভাবে গ্রহণ করবে। এ ভাবেই সে মিথ্যা, অন্যায় ও অসত্যের বেড়াজালে বন্দী হয়ে পড়বে। পাপের ভারে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি হয়ে পড়বে নুব্জ, কুব্জ - সে হারাবে আত্মার ভালোকে গ্রহণ করার আত্মিক স্বাধীনতা। তার বিবেক হবে তমসাচ্ছন্ন যা তাকে ন্যায় ও সত্যের পথে চালিত করতে পারতো। ফলে সে দোযখের শাস্তির আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। দেখুন পরবর্তী আয়াত। ভালো ও মন্দ কে গ্রহণ করার স্বাধীনতা নির্ভর করবে সম্পূর্ণ ভাবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির উপরে।
৪। প্রত্যাখানকারীদের জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি শৃঙ্খল,বেড়ি,ও লেলিহান অগ্নি। ৫৮৩৪
৫৮৩৪। দেখুন সূরা [ ১৩ : ৫ ] ; [ ৩৪ : ৩৩ ] ; [ ৪০ : ৭১ ]। এই আয়াতটি গভীর অর্থবোধক এবং প্রতীকধর্মী। পাপের পরিণাম পাপীর আত্মাতে অষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। পাপের কারণে সত্যের আলোর প্রদীপ বা বিবেকের আলো তার আত্মার মাঝে নির্বাপিত হয়ে যায়। ফলে সে প্রকৃত সত্যকে চিনতে পারে না। যার ফলে সে সংস্কার, অভ্যাস, কুসংস্কার, সামাজিক রীতিনীতর দাসে পরিণত হয়। একেই সে ধর্ম মনে করে। এগুলি তার বিবেককে শৃঙ্খলিত করে ফেলে - সংস্কারের জোয়াল তার আত্মাকে করে নীপিড়িত, আত্মার অবস্থান হয় শ্বাসরুদ্ধকর। ফলে আত্মার সুক্ষ অনুভূতির [fine instict ] মৃত্যু ঘটে। তার অনুভূতি হয় আবেগ তাড়িত পশুর ন্যায়। ঘৃণা-বিদ্বেষ, হিংসা, হতাশা তার সর্বসত্তাকে ঘিরে ফেলে যার থেকে সে মুক্তি পায় না। এগুলির উপমা হচ্ছে লৌহ বেড়ি। যদিও এ সব আত্মা আল্লাহ্র অনুগ্রহের জন্য ব্যকুল হয়, তবুও সে তার পাপের জোয়াল থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয় না। আল্লাহ্র অনুগ্রহের আলো, করুণাধারার, বারি একমাত্র পূণ্যাত্মাদের আত্মার মাঝেই প্রবেশ লাভ করে।
৫। পূণ্যাত্মারা পান করবে এমন পানীয় যাতে [ বেহেশতি ] কাফূর মিশ্রিত থাকবে, ৫৮৩৫
৬। এমন একটি প্রস্রবণ যেখান থেকে আল্লাহ্র ভক্ত বান্দাগণ পান করবে, এবং তা প্রবাহিত করতে পারবে পর্যাপ্ত পরিমাণে।
৬। এমন একটি প্রস্রবণ যেখান থেকে আল্লাহ্র ভক্ত বান্দাগণ পান করবে, এবং তা প্রবাহিত করতে পারবে পর্যাপ্ত পরিমাণে।
৫৮৪২। " কাফূর " - আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ হচ্ছে কর্পূর। বেহেশতি শান্তির, ঝরণার এ হচ্ছে এক উপাদান। বেহেশতি পানীয় যা পবিত্র, সুস্বাদু, উপাদেয়, যাতে কাফূর মসলা যোগ করা হয়, সুগন্ধযুক্ত করার জন্য। যে পানীয় প্রমত্ততা আনায়ন করে না, বরং তা শক্তিদায়ক, সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর ও উপযোগী। সাধারণতঃ প্রাচ্য দেশে কর্পূরকে এর সতেজ অনুভূতি ও শক্তিদায়ক উপযোগীতার জন্য ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
৭। তারা ৫৮৩৬, [ তাদের ] প্রতিজ্ঞা পালন করে এবং সেদিনকে ভয় করে ৫৮৩৭, যে দিনের অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়বে ব্যপক ভাবে। ৫৮৩৮
৫৮৩ ৬। ' তারা ' অর্থাৎ পূণ্যাত্মাগণ। পূণাত্মাদের চেনা যাবে তাদের গুণাবলীর দ্বারা। এসব গুণাবলীর বিবরণ আছে আয়াত [ ৭ - ১০ ] পর্যন্ত। এ সব পূণ্যাত্মারা পরলোকের জীবনে সীমাহীন প্রশান্তি সুখ ভোগ করবেন যার বর্ণনা আছে আয়াতে [ ১১ - ১২ ] পর্যন্ত।
৫৮৩৭। দেখুন [ ২২ : ২৯ ] আয়াত। এই আয়াত দ্বারা যে সব কর্তব্যকে বুঝানো হয়েছে তা হচ্ছে আধ্যাত্মিক কর্তব্য বা আল্লাহ্র প্রতি মানুষের কর্তব্য। পরবর্তী আয়াতে এই কর্তব্যের রূপরেখা বর্ণনা করা হয়েছে। এসব হচ্ছে মানবতার জন্য কাজ করা অথবা মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য। যারা তা করেন তারাই আল্লাহ্র সাথে কৃত সকল অঙ্গীকার বা ওয়াদা পালন করেন [ ৫: ১ আয়াত এবং টিকা ৬৮২ ]। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে, আল্লাহ্র সৃষ্ট জীবের প্রতি বা পৃথিবীর সকল সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে মানুষের কর্তব্য। এই কর্তব্যই হচ্ছে মানুষের অঙ্গীকার আল্লাহ্র সাথে।
৫৮৩৮। পূণ্যাত্মারা ভয় করেন শেষ বিচারের দিনের। যেদিন পার্থিব পাপের পরিণতি হবে ভয়াবহ যা চিন্তার অতীত। এবং যেদিন পার্থিব সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে।
৮। আল্লাহ্র প্রতি ভালোবাসা [ প্রকাশের জন্য ] তারা অভাবগ্রস্থ,এতিম, এবং বন্দীদের আহার করায় ৫৮৩৯।
৫৮৩৯। 'বন্দী' শব্দটি দ্বারা সে যুগের যুদ্ধবন্দীদের বুঝানো হয়েছে। ইসলাম পূর্ব যুগে ও ইসলামের যুগে যুদ্ধ বন্দীদের নিজেদের খাদ্যের সংস্থান নিজেদেরই করতে হতো এবং নিজেদের মুক্তিপণ নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হতো। এমন কি সাধারণ অপরাধী যারা জেলখানাতে থাকতো, তাদেরও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করতো তাদের আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধব অথবা বন্দীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে সেই খরচ বহন করা হতো। তবে 'বন্দী' শব্দটি সংকীর্ণাথে ব্যবহার না করে ব্যপক অর্থে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
মানুষ শুধু যে কারাগারেই বন্দী থাকে তা সত্য নয়। বন্দী এই শব্দটি প্রতীকধর্মী যা বৃহত্তর মানবগোষ্ঠির জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন আধ্যাত্মিক ভাবে বন্দী যাদের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক মুক্তি ঘটে নাই। কিন্তু যারা মুক্তির জন্য ব্যকুল। এরূপ ক্ষেত্রে পূণ্যাত্মাদের দায়িত্ব তাদের আত্মিক মুক্তির জন্য সাহায্য করা। 'বন্দী' শব্দটি ব্যপক অর্থে মূক প্রাণীজগতকেও বুঝানো যায় যারা মানুষের দয়ার উপরে নির্ভরশীল। এরূপক্ষেত্রে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মানুষের। এ ভাবেই প্রকৃতিকে সংরক্ষণের দায়িত্ব এসে যায় মানুষের উপরে। দেখুন [ ৯০ : ১৩] আয়াত ও টিকা ৬১৪০।
৯। [ এই বলে ], " শুধুমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমরা তোমাদের আহার্য দান করি। তোমাদের নিকট থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও চাই না। ৫৮৪০
৫৮৪০। এই আয়াতের যে ভাষ্য তা দাতা কর্তৃক সরবে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নাই। এই আয়াতের যে বক্তব্য তা হবে দাতা ব্যক্তিদের মনের কথা এবং দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও মানসিকতা।
১০। " আমরা আমাদের প্রভুর নিকট থেকে এক বিপর্যয়কারী ক্রোধের আশংকা করি।" ৫৮৪১
৫৮৪১। এই আয়াতের যে ভয়ংকর দিনের কথা বলা হয়েছে সেই দিন হচ্ছে পাপীদের জন্য পাপের পরিণতি দিবস। তবে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, পৃথিবীতে আমরা কেউই সম্পূর্ণ পাপমুক্ত নই। সুতারাং প্রকৃত মুক্তিলাভের জন্য আমাদের প্রয়োজন আল্লাহ্র ক্ষমা ও করুণা। সুতারাং পূণ্যাত্মাদের অন্তর থাকে ভয়ে ও শঙ্কায় পরিপূর্ণ। কারণ তারা জানে যে তারা সাধারণ মানুষ, সুতারাং তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্বেও তারা আল্লাহ্র প্রতি কর্তব্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সক্ষম হন নাই। সুতারাং আল্লাহ্র ক্ষমা ও করুণার আশাই সর্বোচ্চ আশা এবং পাপের পরিণাম থেকে মুক্তিলাভের উপায়।
১১। কিন্তু আল্লাহ্ তাদের রক্ষা করবেন সেদিনের অনিষ্ট থেকে, এবং তাদের উপরে বর্ষণ করবেন, সৌন্দর্যের আলো ৫৮৪২, এবং [ নির্মল ] আনন্দ।
৫৮৪২। দেখুন [ ৭৫ : ২২ - ২৩ ] আয়াত।
১২। এবং যেহেতু তারা ধৈর্য্যশীল এবং দৃঢ়চেতা, তিনি তাদের পুরস্কৃত করবেন উদ্যান ও রেশমের বস্ত্র দ্বারা ৫৮৪৩।
৫৮৪৩। দেখুন [ ২২ : ২৩ ] আয়াত।
১৩। [ সেখানে ] তারা হেলান দিয়ে সমাসীন হবে উচ্চ সিংহাসনে, ৫৮৪৪ সেখানে তারা সূর্যের [ প্রখর তাপ ] দেখতে পাবে না, তীব্র শীতও অনুভব করবে না। ৫৮৪৫
৫৮৪৪। দেখুন [ ১৮ : ৩১ ] আয়াত।
৫৮৪৫। পরলোকের অভিজ্ঞতা পৃথিবীর জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। কারণ সে পৃথিবী হবে সম্পূর্ণ নূতন পৃথিবী যার সাথে আমাদের এই চেনা জানা পৃথিবীর কোনও সামঞ্জস্যই থাকবে না। দৈহিক আরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরিবেশের তাপমাত্রা। দেহ অত্যাধিক উষ্ণতা বা শীতলতা কোনটাই সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যে তাপমাত্রা সুখপ্রদ সেটাতেই আমরা আরাম পাই। এই সুখের অনুভূতিকেই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪। তাদের উপরে নীচু হয়ে থাকবে [ বৃক্ষের সুশীতল ] ছায়া এবং গুচ্ছ গুচ্ছ ফল অবনত হয়ে ঝুলে থাকবে। ৫৮৪৬
৫৮৪৬। বৃক্ষের ছায়া ও ফলমূল দ্বারা আরাম আয়েশের অনুভূতিকে বুঝানো হয়েছে। এসব বর্ণনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গত সুখের অনুভূতিকেই বুঝানো হয়েছে।
১৫। তাদের পরিবেশন করা হবে, রূপার পাত্রে, এবং স্ফটিকের পানপাত্রে, - ৫৮৪৭
৫৮৪৭। দেখুন [ ৪৩ : ৭১ ] আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে, " তাদের পরিবেশন করা হবে স্বর্ণের থালা ও পানপাত্রে।" এ সব বর্ণনা দ্বারা মহার্যতা, দুষ্প্রাপ্যতা, ও নিখাঁদ উজ্জ্বলতা প্রকাশ করা হয়েছে, যার কল্পনা করা পৃথিবীতে সম্ভব নয়।
