Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪৩৩ বার
+ - R Print

সূরা মুদ্দাছ্‌ছির

সূরা মুদ্দাছ্‌ছির বা বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত -৭৪

৫৬ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এই সূরাটি পূর্বোক্ত সূরার সমসাময়িক। বিষয়বস্তুও প্রায় একই। প্রার্থনা এবং আল্লাহ্‌র প্রশংসা করা, বিপদ বিপযর্য়ের সময়ে যখন আধ্যাত্মিক জগত চাপের মুখে থাকে তখন ধৈর্য্য ধারণের প্রয়োজনীয়তা। যারা অন্যায়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে দুঃখ ও দুর্দ্দশার সৃষ্টি করেছে, তারা পরলোকে নিদারুণ যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা লাভ করবে।


সূরা মুদ্দাছ্‌ছির বা বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত -৭৪

৫৬ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

১। ওহে [ পোষাকে ] আবৃত মানুষ ৫৭৭৮।

৫৭৭৮। অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে এই সূরাটি প্রাথমিক। প্রাথমিক সূরার এই আয়াতে দুটি চিন্তার ধারা পাশাপাশি বিরাজ করছে।

১) প্রথমতঃ আয়াতটির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভাবে রাসুলকে (সা) সম্বোধন করা হয়েছে।

২) বিশ্বের সকল যুগের সকল মানুষের জন্য আছে আধ্যাত্মিক উপদেশ।

প্রথমত : ১) যে সময়ে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়,তখন রাসুল নবুয়ত লাভ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ধ্যানমগ্ন অবস্থা যা বস্ত্রাচ্ছিদ অবস্থার সাথে তুলনীয়। যে অবস্থায় তিনি সর্ব অবস্থায় থাকতেন বা আল্লাহকে খুজঁতেন তা কেটে গেছে। তাকে আদেশ করা হয়েছে যে তিনি নির্ভিক ভাবে প্রকাশ্যে আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারে অগ্রসর হবেন। যদিও তিনি সর্বদাই ছিলেন পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত পবিত্রতাই নয়, তাঁর সকল কাজ নিবেদিত হতে হবে সমাজে শুধুমাত্র আল্লাহর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার জন্য। পূর্বপুরুষদের সকল জঘন্য প্রথা এবং দেবদেবীর উপাসনা অবশ্যই বিদূরিত করতে হবে। আল্লাহ্‌র নবী সারা বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ যা তাঁর ব্যক্তিত্ব থেকে প্রবাহিত। এর জন্য তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট থেকে কোনও পুরষ্কার বা প্রশংসা দাবী করেন না। বরং ঘটনা ছিলো এর উল্টো। তার উপরে অত্যাচার ও নির্যাতনের ঝড় বয়ে যায়। সে সময়ে তাঁকে ধৈর্য্য ধারণ করতে বলা হয় আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য।

২) দ্বিতীয়তঃ সাধারণ পর্যায়ে বিপদ বিপর্যয়ের মাধ্যমে এরূপ অবস্থা আসতে পারে, সেক্ষেত্রে নবী করিমের জীবনী ও কর্ম ক্ষেত্র আমাদের জন্য হবে পথের দিশারী।

২। ওঠ, এবং সতর্ক কর,

৩। এবং তোমার প্রভুকে মহিমান্বিত কর !

৪। এবং তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ, ৫৭৭৯

৫৭৭৯। সম্ভবতঃ এই আয়াতটি তাৎক্ষণিক কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে। রাসুলকে (সা) অত্যাচার ও নির্যাতন করার জন্য মোশরেক আরবেরা তার শরীর ও পোষাকে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করতো।

৫। সকল অনাচার পরিত্যাগ কর। ৫৭৮০

৫৭৮০। 'Rujz' বা 'Rijz'অর্থ অপবিত্রতা। সাধারণ ভাবে পৌত্তলিকতাকে বুঝানো হয়েছে। 'Rujz' নামে মোশরেক আরবদের কোন দেবতা থাকাও সম্ভব হতে পারে।

৬। [ বিনিময়ে ] অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করো না ৫৭৮১

৫৭৮১। সাধারণতঃ আমরা কাউকে কিছু দেই বিনিময়ে কিছু লাভ করার জন্য। সংসারে দেয়া নেয়ার বাণিজ্য সর্বকালের। সাধারণভাবে আমরা যা দেই তার থেকে অধিক এবং আমাদের কাছে যা মূল্যবান বলে প্রতীয়মান হয় তাই লাভে আগ্রহী হই। এ হচ্ছে পার্থিব জীবনের বাণিজ্য ও তার হিসাব। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনের বাণিজ্যের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা। যারা আত্মিক গুণে সমৃদ্ধ তারা দেবেন কিন্তু বিনিময়ে কিছু দাবী বা আশা করেন না। তারা আল্লাহ্‌র সৃষ্টির সেবা করেন শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের আশায়।

৭। বরং আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ধৈর্য্য ধারণ কর এবং দৃঢ় থাক। ৫৭৮২

৫৭৮২। যদিও উপদেশটি রাসুলের জন্য ছিলো তবে তার আবেদন সর্বকালের সর্বযুগের, সর্বসাধারণের জন্য। আল্লাহ্‌র রাস্তায়, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করা অত্যন্ত দূরূহ ব্যাপার। বাধা বিপত্তি, অসম্মান, নির্যাতন, যে কোন সৎকাজকে বাধা দানে বিপর্যস্ত করে ফেলে। সে ক্ষেত্রেই আমাদের প্রদর্শন করতে হবে চরিত্রের দৃঢ়তা ও ধৈর্য্য এবং সৎকাজে বিশ্বস্তভাবে লেগে থাকার যোগ্যতা। যদি আমাদের প্রকৃত ঈমান থাকে এবং আমরা সর্বান্তঃকরণে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীল হই, তবে আমরা জানবো যে, আল্লাহ্‌ সকল কল্যাণের মালিক, সর্বোচ্চ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী, সর্বশক্তিমান। সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে সকল সৎ কাজ সফলতা লাভ করবেই, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে।

৮। অবশেষে যখন, শিঙ্গা বাজানো হবে,

৯। সেদিন হবে এক কঠিন দিন, ৫৭৮৩

১০। যারা কাফের তাদের জন্য নিশ্চয় তা সহজ হবে না।

৫৭৮৩। আল্লাহ্‌র রহমত প্রত্যাশীদের বর্ণনা শেষে তারই পটভূমিতে তুলে ধরা হয়েছে পাপীদের অবস্থানকে। সাধারণতঃ পৃথিবীর ভোগ বিলাসের জীবনে পাপীরা থাকে আত্ম নিমগ্ন ও পরিতৃপ্ত। কিন্তু শেষ বিচারের দিনে তাদের অবস্থা কি হবে ? শেষের সে দিন হবে বড়ই ভয়ঙ্কর।

১১। যে [ প্রাণীকে ] আমি সৃষ্টি করেছি [ রিক্ত ] ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার সাথে আমাকে একা [ বুঝাপড়া ]করতে ছেড়ে দাও। ৫৭৮৪, ৫৭৮৫।

১২। যাকে আমি দান করেছিলাম বিপুল ধন-সম্পদ

৫৭৮৪। প্রকৃত ন্যায় বিচারের মালিক একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌। তিনিই একমাত্র পারেন মানুষকে শাস্তি দান করতে। পৃথিবীর মানুষের জ্ঞান ও বিচার বুদ্ধি অত্যন্ত সীমিত। তার পক্ষে সত্যের সূদূর প্রসারী রূপকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবীর মূল্যবোধের মানদন্ডে আজকে যা মনে হয় ন্যায় ও সত্য আগামীতে তা পরিবতির্ত হয়ে যেতে পারে। একমাত্র আল্লাহ্‌-ই জানেন চিরসত্যের প্রকৃতরূপ। সুতারাং আল্লাহ্‌-ই একমাত্র জানেন ন্যায়বিচারের এবং করুণার সীমারেখা। সেই আল্লাহ্‌র কাছে সব কিছু ন্যাস্ত করতে হবে।

৫৭৮৫। " আমি সৃষ্টি করেছি [ রিক্ত ] ও নিঃস্ব অবস্থায় " এই বাক্যটির অর্থ হচ্ছে পৃথিবীতে সকল মানুষকে আল্লাহ্‌ সমভাবে সৃষ্টি করেন নাই। হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেরূপ সমান নয়, সেরূপ সকল মানুষের মানসিক দক্ষতা সমান নয়। পৃথিবীর সভ্যতাকে এক সুনির্দ্দিষ্ট পরিণতির দিকে পরিচালিত করার জন্য, আল্লাহ্‌ সকলকে সমান মানসিক দক্ষতা দান করেন নাই। সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি,প্রতিভা এগুলি সবই আল্লাহ্‌র দান। মানুষ ইচ্ছা করলেই এ সকলের অধিকারী হতে পারে না। মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে নিরাভরণ ও একা। আল্লাহ্‌-ই তাঁকে বিভিন্ন নেয়ামতে সজ্জিত করেছেন যার দায়িত্ব তাকে বহন করতে হবে।

১৩। [ সর্বদা ] পাশে থাকার জন্য পুত্রগণ ৫৭৮৬;

১৪। যার [ জীবনকে ] করেছিলাম মসৃণ এবং আরামদায়ক !

৫৭৮৬। পৃথিবীতে যারা সফল পুরুষ, সাধারণতঃ তাদের থাকে অঢেল সম্পদ, অগণিত অনুসারী, পরিবার,পরিজন বা পুত্র কন্যাগণ যারা সর্বদা তার চতুর্পার্শ্বে থেকে তাকে সংসার সমরাংগনে সাহায্য করতে প্রস্তুত। পৃথিবীতে তাদের জীবন হয় অত্যন্ত মসৃণ, রুচিশীল, পরিশীলিত এবং আরামদায়ক। কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রতিটি সম্পদের দায়িত্ব বর্তমান, যে দায়িত্বের জবাবদিহিতা আল্লাহ্‌র নিকট প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

১৫। এরপরেও সে হয় লোভী এবং [ কামনা করে ] আমি তাকে আরও দেই ; ৫৭৮৭

৫৭৮৭। সাধারণতঃ মানুষ আল্লাহ্‌র দেয়া নেয়ামত স্বরূপ যে সব মানসিক দক্ষতা সমূহের অধিকারী হয়, সে সম্বন্ধে সে এতটাই কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব প্রকাশ করে যে, সে ভুলে যায় যে এ সব সে জন্মসূত্রে লাভ করেছে মহান আল্লাহ্‌র নিকট থেকে। পাপীদের ধারণা যে, এ সবের একচ্ছত্র মালিক একমাত্র সে। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহকে সে সনাক্ত করতে অক্ষম হয়। ফলে সে সম্পদ ও অনুগ্রহের যে দায়িত্ব তা বহন করতে হয় অপারগ। তাঁর ধারণা জন্মে যে, তার প্রতি দেয়া আল্লাহ্‌র সকল অনুগ্রহের মালিক সে নিজে। সে যত এই অনুগ্রহ লাভ করে তত সে আরও পাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়ে। লোভ তার সকল সত্ত্বাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে সে আল্লাহ্‌র নিদর্শন ও বিধান সমূহের প্রতি ইচ্ছাকৃত ভাবে বধির হয়ে পড়ে এবং আল্লাহ্‌র বিধানের প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ ভাবেই সে তার নিজস্ব সর্বনাশের কারণ হয়।

১৬। না তা হবার নয়। কেননা নিশ্চয় সে আমার নিদর্শন সমূহের বিরোধী।

১৭। শীঘ্রই আমি তাকে পরিদর্শন করবো পর্ববতপ্রমাণ বিপর্যয় দ্বারা ৫৭৮৮

৫৭৮৮। 'Mount of calamities' বা পর্বত প্রমাণ দুর্যোগ বা বিপর্যয় " যে ভাবেই তা প্রকাশ করা হোক না কেন তার অন্তনির্হিত তাৎপর্য একই থাকে আর তা হচ্ছে পুঞ্জীভূত বিপর্যয় যা সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে সঞ্চিত হতে থাকে।