Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪৩০ বার
+ - R Print

সূরা মা'আরিজ

সূরা মা'আরিজ বা আরোহণের সোপান - ৭০

৪৪ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাটির বিষয়বস্তু পূর্ববর্তী সূরার সমগোত্রীয়, ধৈর্য ও সময়ের রহস্য বেহেশতের আরোহণের পথ প্রদর্শন করবে। মন্দ বা পাপ এবং ভালো বা পূণ্য প্রত্যেকেই তার শেষ পরিণতি লাভ করবে।

সময়ের ক্রমপঞ্জি অনুযায়ী এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ প্রথম দিকের সূরাগুলির শেষ দিকে অথবা মক্কাতে অবস্থানের মধ্যবর্তী সময়ের প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়। মক্কী সূরাগুলির মধ্যে এই সূরাটির অবস্থান সম্ভবতঃ ৬৯ নং সূরা অবতীর্ণ হওয়ার স্বল্প দিন পরেই।

সূরা মা'আরিজ বা আরোহণের সোপান - ৭০

৪৪ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। একজন জিজ্ঞাসাকারী শাস্তিকে আহ্বান করেছিলো ৫৬৭৫, -

২। অবিশ্বাসীদের জন্য, যা প্রতিরোধ করার কেহ নাই, - ইহা আসবে আল্লাহ্‌র নিকট থেকে,

৫৬৭৫। যারা জিজ্ঞাসা করে কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে ? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তাদের অন্তরের সন্দেহই ব্যক্ত হয়। এর উত্তর হচ্ছে সময়ের রহস্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্‌র নিকট বর্তমান যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির সীমার বাইরে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিষ আছে যা মানুষকে অন্তরঙ্গ ভাবে স্পর্শ করে,যার প্রভাবে তার নৈতিক চরিত্র এবং ভবিষ্যতের কল্যাণ প্রভাবিত হয়। এগুলি হচ্ছে বিশ্বাস করা যে :

১) শেষ বিচার অবশ্যই সংঘটিত হবে, কেহ তা প্রতিরোধ করতে পারবে না।

২) কাফেরদের জন্য তা হবে ভয়াবহ শাস্তি ; কিন্তু পূণ্যাত্মাদের ভয়ের কোন কারণ থাকবে না।

৩) এটা হবে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দেয় শাস্তি, যিনি ন্যায় বিচার ও দয়া উভয়েরই মালিক। এ শাস্তি অন্ধ দুর্যোগ হবে না তা হবে ন্যায়ের উপরে প্রতিষ্ঠিত। এবং

৪) এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ্‌র আর একটি উপাধিকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তা হচ্ছে "উর্দ্ধে আরোহণের সোপান সমূহের প্রভু" যার অর্থ যদিও তাঁর সিংহাসনের অবস্থান উর্দ্ধে, কিন্তু তাঁর করুণাধারা তাঁর সিংহাসনের বাইরে নয়। আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ধারাই হচ্ছে তাঁর নিকট পৌঁছানোর সিঁড়ি।

৩। [শাস্তি ] আসবে আল্লাহ্‌র নিকট থেকে যিনি উর্দ্ধে আরোহণের সোপান সমূহের প্রভু। ৫৬৭৬

৫৬৭৬। "Ma'arij " - উর্দ্ধলোকের সিড়ি বা সোপান। সূরা [ ৪৩ : ৩৩ ] আয়াতে রয়েছে, " রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিড়ি যাহাতে উহারা আরোহণ করে; যেখানে "Ma'arij" শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূরাতে এই শব্দটি আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নশ্বর দেহের অধিকারী মানুষ কি সেই সমুচ্চ মর্যদার অধিকারী আল্লাহ্‌র নিকট পৌঁছাতে সক্ষম ? আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ও দয়া মানুষকে ফেরেশতাদের উপরে মর্যদা দান করেছেন। এ ভাবেই মানুষ সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হয়। কিন্তু এ পথ খুব বন্ধুর। এ পথ একদিনে বা অল্প সময়ে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। দেখুন পরবর্তী দুইটি টিকা।

৪। ফেরেশতাগণ ও রুহু ৫৬৭৭ আল্লাহ্‌র দিকে আরোহণ করে এমন দিনে যার পরিমাণ পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ৫৬৭৮

৫৬৭৭। "Ruh" - বা আত্মা। দেখুন সূরা [ ৭৮ : ৩৮ ] আয়াত যেখানে বলা হয়েছে "রূহু" ও ফিরিশতাগণ "। আবার সূরা [ ৯৭ : ৪ ] আয়াতে বলা হয়েছে, " ফিরিশতাগণ ও রূহু "। সূরা [ ১৬ : ২ ] আয়াতে বর্ণিত রূহু শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে 'ওহী' শব্দটি দ্বারা। কোন কোন তফসীরকারের মত্যে রূহু শব্দটি দ্বারা জিব্রাঈল ফিরিশতাকে বুঝানো হয়। রূহুকে বিভিন্ন ভাবে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু মওলানা ইউসুফ আলী সাহেবের মতে রূহু শব্দটির অর্থ আরও ব্যপক হওয়া প্রয়োজন, তা হলে যে কোন বর্ণনা প্রসঙ্গে তা ব্যবহৃত হতে পারে। মানুষকে আল্লাহ্‌ রূহু দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। রূহু হচ্ছে পরমাত্মার অংশ যা আল্লাহ্‌ ফুৎকারের সাহায্যে মানুষের ভিতরে আত্মারূপে প্রবেশ ঘটিয়েছেন। দেখুন সূরা [ ১৫ : ২৯ ] আয়াত। এভাবেই আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্‌ আমাদের সুউচ্চ মর্যদা দান করেছেন এবং তাঁর সান্নিধ্যের আলোকের যোগ্য করেছেন।

৫৬৭৮। ফিরিশতা ও রূহু আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা অর্জন করে থাকে বহু বছরের সাধনায়। এই মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত যোগ্যতা অর্জন, আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ যোগ্যতা ব্যতীত সম্ভব নয়। এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য বহু সময়ের প্রয়োজন ; পৃথিবীর মাপকাঠিতে তা হয়তো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতের জন্য তা হবে এক মূহুর্ত বা একদিন। এ ভাবেই সময়ের আপেক্ষিক ধারণাকে প্রকাশ করা হয়েছে যার ব্যাখ্যা একমাত্র বিজ্ঞানই দিতে পারে। দেখুন সূরা [ ৩২ : ৪ - ৫ ] ও টিকা ৩৬৩২ এবং ৩৬৩৪।

৫। সুতারাং তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর, পরম [ সন্তোষজনক ] ধৈর্য। ৫৬৭৯

৫৬৭৯। আল্লাহ্‌ রাসুলের (সা) জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধারণের প্রতি উপদেশ দান করেছেন। রাসুলের (সা) প্রতি অত্যাচার ও নির্যাতন যখন ছিলো প্রতিদিনের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাঁকে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করতে বা ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দান করেছেন। বিপদ ও বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে অভিযোগের প্রবণতা দেখা যায়। মানুষ তার দুভার্গ্যের জন্য সকলকে দোষী করার প্রয়াস পায়। তাঁর এই অভিযোগ কখনও হয় প্রকাশ্য কখনও অপ্রকাশ্য। তার এই অভিযোগ পূর্ণ অসহায়ত্ব কোন ধৈর্য প্রদর্শন নয়। এই আয়াতে যে ধৈর্যের উল্লেখ করা হয়েছে তা "পরম ধৈর্য "। অর্থাৎ জীবনের সকল অবস্থাতেই আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করা এবং দুঃখ -বিপদ, বিপর্যয়কে আল্লাহ্‌র দান হিসেবে গ্রহণ করে এ সবের মাঝে নিহিত আল্লাহ্‌র মঙ্গল ইচ্ছাকে অনুসন্ধান করার নামই হচ্ছে "পরম ধৈর্য" বা "Patience of beautiful Contentment"। মোমেন বান্দারা বিশ্বাস করবে যে তাদের জীবনে যাই-ই ঘটুক না কেন তা আল্লাহ্‌ প্রেরণ করেছেন বান্দার কল্যাণের জন্য, যেমনটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম নবী করিমের জীবনে। এরূপ ধৈর্য্য হচ্ছে বেহেশতি শান্তির প্রতীক, কারণ তা উৎসারিত হয় আল্লাহ্‌র প্রতি পবিত্রতম বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা থেকে।

৬। ওরা ঐ দিনকে মনে করে সুদূর পরাহত [ ঘটনা ]।

৭। কিন্তু আমি দেখছি ইহা [ অতি ] আসন্ন। ৫৬৮০

৫৬৮০। পাপীরা পার্থিব জীবনে অনেক সময়েই তাদের পাপের জন্য সমুচিত শাস্তি, লাভ করে না। সুতারাং তাদের ধারণা হয় যে পাপের শাস্তি বহু দূর বা প্রকৃত পক্ষে এরূপ শাস্তির অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা সন্ধিহান হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ্‌ বলেছেন যে সময়ের বৃহত্তর পরিসরে এবং আল্লাহ্‌র বিশ্বজনীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তা অতি নিকটে। কারণ সময়ের যে ধারণা আমরা করে থাকি তা আপেক্ষিক মাত্র, যে ধারণা আধ্যাত্মিক জগতের জন্য প্রযোজ্য নয়। পাপীদের পাপের শাস্তি এই পৃথিবীর জীবনে ঘটতেও পারে বা না ঘটতেও পারে, কিন্তু পরলোকের জীবনে তা অবশ্যই ঘটবে।

৮। সে দিন আকাশ হবে গলিত তামার ন্যায় ৫৬৮১

৫৬৮১। দেখুন সূরা [ ১৮: ২৯ ] আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে দোযখে পাপীদের উত্তপ্ত গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয় পান করানো হবে। এবং সূরা [ ৪৪ : ৪৫ ] আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে যে, তাদের খাদ্য হবে গলিত ধাতুর ন্যায় যা তাদের পেটের মাঝে ফুটতে থাকবে। এই আয়াতে বলা হয়েছে কেয়ামত দিবসে আকাশ হবে গলিত ধাতুর ন্যায়। অনেকের মতে তা হবে তেলের তলানির মত গাদ। এ সব উপমার সাহায্যে এ সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে, সেদিন এই চেনা জানা পৃথিবী ও পৃথিবীর উপরে বেষ্টনীকৃত সুউচ্চ নীল আকাশ সব কিছুই বিকৃত হয়ে যাবে ও বীভৎস রূপ ধারণ করবে।

৯। পর্বত সমূহ হবে পশমের মত ৫৬৮২,

৫৬৮২। দেখুন সূরা [ ১০১ : ৫ ] আয়াত, যেখানে পর্বত সমূহকে ধনিত তুলার মত বলা হয়েছে। পর্বত হচ্ছে কাঠিন্য, স্থায়িত্ব, বিশালত্বের প্রতীক। যে পর্বতকে পার্থিব জীবনে অবিনশ্বর রূপে প্রতীয়মান হয়, সেই পবর্তও সেদিন রঙ্গীন পশমের ন্যায় হাল্‌কা নমনীয় বোধ হবে।

১০। বন্ধু বন্ধুর খোঁজ খবর নেবে না ৫৬৮৩, -

৫৬৮৩। কেয়ামত দিবসে এই চেনা জানা পৃথিবী এতটাই পরিবর্তিতত হয়ে যাবে যে, স্বর্গ ও মর্তকে বিভেদ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেদিন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কও হয়ে পড়বে কুৎসিত ও ভয়াবহ। কারণ পাপীরা পৃথিবীতে পাপে নিমগ্ন ছিলো। ফলে তাদের মন মানসিকতা থেকে পবিত্রতা দূরীভূত হয়ে পাপের কালিমাতে ঢেকে যাবে। ফলে অন্ধকার আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেয়। তাদের এই অন্ধকারচ্ছন্ন আত্মা বাইরের পৃথিবীর লোকের দৃষ্টিগোচর না হলেও, হাশরের ময়দানে তাদের পাপের বিবরণ সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হবে। ফলে পাপীরা সেদিন তাদের কৃতকর্মের পরিণাম উপলব্ধিতে সমর্থ হবে এবং ভয়ে আতঙ্কে ও শঙ্কায় তাদের অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে পড়বে। সেদিন তারা উপলব্ধি করবে যে আত্মীয়, স্বজন, বন্ধু, বান্ধব কেউই কারও উপকারে আসবে না। সেদিন তারা নিকতম বন্ধুকেও পরিত্যাগ করবে এবং তাদের দর্শনেও তাদের মাঝে উদ্বেগ ও দুঃশ্চিন্তার জন্ম দেবে।

১১। যদিও তাদের রাখা হবে একে অপরের দৃষ্টি সীমার মধ্যে; অপরাধীরা সেদিনের শাস্তির বদলে দিতে চাইবে তার সন্তানদের, ৫৬৮৪ -

৫৬৮৪। পার্থিব জীবনেও পাপীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বার্থপরতা। তাদের সকল পাপের উৎস মুখ হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ। হাশরের ময়দানেও তারা এই মানসিকতা থেকে মুক্তি লাভ করবে না। তাদের পাপ মুক্তির জন্য তাদের সন্তান-সন্ততি, তার পরিবার,বন্ধু বান্ধব, যারা পার্থিব জীবনে তাকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সঙ্গ দান করেছিলো, তাদের সকলকে মুক্তিপণ হিসেবে দান করতে দ্বিধা বোধ করবে না। তাদের উদ্বেগ দুশ্চিন্তা ও স্বার্থপরতা এরূপ বীভৎসরূপ ধারণ করবে।