Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪২৯ বার
+ - R Print

সূরা হাক্‌কা

সূরা হাক্‌কা বা নিশ্চিত সত্য - ৬৯

৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাটি মধ্য মক্কান সূরা। "নিশ্চিত সত্য কখনও হারিয়ে যাবে না। তা অবশ্যই অসত্যের উপরে বিজয় লাভ করবে। সুতারাং জীবনে মিথ্যা প্রলোভন দ্বারা বিভ্রান্ত হবে না। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ প্রকৃত বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।



সূরা হাক্‌কা বা নিশ্চিত সত্য - ৬৯

৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


১। নিশ্চিত সত্য ৫৬৩৫।

৫৬৩৫। "Al- Haqqa" - নিশ্চিত সত্য। এই সেই অবশ্যাম্ভবী ঘটনা যা অবশ্যই ঘটবেই। সেদিন সকল ভান ও মিথ্যার আবরণ অপসারিত হয়ে প্রকৃত সত্য সর্বসমক্ষে উদ্ঘাটিত হবে। ধারাবাহিক তিনটি প্রশ্নের মাধ্যমে সেই অবশ্যাম্ভবী ঘটনার রহস্যকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই রহস্যের সমাধান হিসেবে আ'দ, সামুদ ও পৃথিবীর অন্যান্য প্রাচীন জাতিদের উল্লেখ করা হয়েছে। এ সব জাতি আল্লাহ্‌র সত্যকে প্রত্যাখান করেছিলো, ফলে তারা তাদের নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছিলো এই পৃথিবীতেই যা তাদের পরলোকের মহাপ্রলয়ের প্রতীক স্বরূপ।

২। কি সেই নিশ্চিত সত্য ?

৩। ঐ নিশ্চিত সত্য তুমি কি ভাবে অনুধাবন করবে ?

৪। আ'দ ও সামুদ ৫৬৩৬ সম্প্রদায় অস্বীকার করেছিলো মহাপ্রলয় ৫৬৩৭

৫৬৩৬। প্রাচীন যুগের এই দুই প্রাচীন জাতির জন্য দেখুন সূরা [ ৭ : ৭৩ ] আয়াতের টিকা ১০৪৩ এবং [ ৭ : ৬৫ ] আয়াতের টিকা ১০৪০।

৫৬৩৭। শেষ বিচারের দিনের ভয়াবহতার এক বিশেষ বর্ণনা 'Qaria' শব্দটি সূরা নং ১০১ এর শিরোনাম।

৫। সামুদ জাতি ধ্বংস হয়েছিলো বজ্র ও বিদ্যুতের প্রলয়ংকরী ঝড় দ্বারা ৫৬৩৮।

৫৬৩৮। পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছে তাদের বিভিন্ন ধরণের পাপের কারণে। সামুদ জাতি ধনী ও গরীবের শ্রেণীবিন্যাস এতটাই আসক্ত ছিলো যে তারা গরীবকে মানুষের পর্যায়ে স্বীকৃতি দিত না। তারা গরীবকে শোষণ ও নির্যাতিত করতো। সালেহ্‌ নবী তাদের মাঝে আল্লাহ্‌র বাণী প্রচার করেন। এবং গরীবের অধিকারের প্রতীক স্বরূপ আল্লাহ্‌র তরফ থেকে একটি উষ্ট্রী আনায়ন করেন যার ধনীদের চারণ ভূমিতে এবং জলাশয়ে অধিকার থাকবে। দেখুন [ ৭ : ৭৩ ] আয়াতের টিকা ১০৪৪। কিন্তু সামুদ জাতির লোকেরা উষ্ট্রীটিকে বধ করে। ফলে এক প্রলয়ংকর বিপর্যয়ে তারা সকলে ধ্বংস হয়ে যায়।

৬। এবং আ'দ সম্প্রদায় ধ্বংস হয়েছিলো প্রচন্ড ঝঞ্ঝা বায়ু দ্বারা ৫৬৩৯ ;

৫৬৩৯। সম্পদের প্রাচুর্যে আ'দ সম্প্রদায় অন্যায়কারীরূপে পরিণত হয়েছিলো। হুদ নবী বৃথাই তাদের মাঝে সত্য ও ন্যায়ের বাণী প্রচার করেছিলেন। তারা হুদ নবীকে প্রত্যাখান করে ফলে এক প্রচন্ড ঝঞাবায়ু দ্বারা তাদের ধ্বংস করা হয়। দেখুন [ ৭ : ৬৫ ] আয়াতের টিকা ১০৪০ এবং আয়াত [ ৪১ : ১৫ - ১৬ ] ও টিকা ৪৪৮৩ এবং ৫৪:

৭। তিনি বায়ুকে তাদের উপরে প্রচন্ডরূপে প্রবাহিত করেছিলেন সাত রাত্রি ও আট দিন। ফলে তুমি তাদের [ সমস্ত ] সম্প্রদায়কে মাটিতে লুটিয়ে পড়া অবস্থায় দেখতে পেতে, যেনো তারা হচ্ছে উল্টে পড়া খেজুর গাছের ফাঁপা গুড়ি। ৫৬৪০

৫৬৪০। আ'দ জাতির লোকেরা যখন ঝঞ্ঝা বায়ু দ্বারা মৃত্যু মুখে পতিত হয়, তাদের সেই অবস্থার চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে এক অপূর্ব উপমার সাহায্যে। অন্তঃসারশূন্য, কান্ডের অভ্যন্তর ভাগ শূন্য খেজুর, বা পাম গাছ যেরূপে ঝড়ের বেগ সহ্য করতে না পেরে শেকড়সহ উল্টিয়ে পড়ে যায়, তখনকার খেজুর বা পাম গাছের যে দৃশ্য হয় ঠিক সেরূপ দৃশ্যেরই অবতারণা তারা করে। সাধারণ ভাবে বলা হয়ে থাকে যে আ'দ জাতির লোকেরা ছিলো অত্যন্ত লম্বা। সুতারাং তাদের উপমা খেজুর বা পাম গাছের সাথে উপযুক্ত হয়েছে।

৮। এরপরে তাদের কাউকে কি তুমি বেঁচে থাকতে দেখতে পাও ৫৬৪১ ?

৫৬৪১। আ'দ জাতির উপরে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিলো তা ছিলো সর্বগ্রাসী, ভয়ংকর। আ'দ জাতি সম্পূর্ণ ধবংস প্রাপ্ত হয়েছিলো শুধু তাদের শাখা যাদের সামুদ জাতিরূপে অভিহিত করা হতো তারা সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা লাভ করে। দেখুন টিকা ৫৬৩৬।

৯। ফেরাউন ৫৬৪২, ও তার পূর্ববর্তীরা ৫৬৪৩ এবং উল্টে পড়া নগরীর [ অধিবাসীরা ] ৫৬৪৪ পাপাচারে লিপ্ত ছিলো।

৫৬৪২। ফেরাউনের কাহিনীর জন্য দেখুন সূরা [ ৭ : ১০৩ - ১৩৭ ] আয়াত ও আয়াত সমূহের টিকাসমূহ। ফেরাউনের সময়ে হযরত মুসাকে আল্লাহ্‌র রাসুল রূপে প্রেরণ করা হয়। ফেরাউন ছিলো এক দুবির্নীত অহংকারী উদ্ধত প্রকৃতির ব্যক্তি যার ফলে তার পতনও ঘটে অনুরূপ প্রচন্ডভাবে।

৫৬৪৩। সূরা [ ৭ : ৫৯ - ১৫৮ ] আয়াত সমূহে ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যুগে যুগে পাপকার্যের দরুণ ধ্বংস প্রাপ্ত জাতি সমূহের অবস্থান। সেখানে আরম্ভ করা হয়েছে নূহ্‌ নবী থেকে পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে আ'দ, সামুদ, জনপদবাসী, মিদিয়ানবাসী এবং হযরত মুসার সমসাময়িক সম্প্রদায় বৃন্দের কাহিনী। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে ঘটনার যে চিত্র পঞ্জি আঁকা হয়েছে তা সময়ের বিশাল ক্যানভাসের পটভূমিতে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এই অংকিত ক্যানভাসের কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান করছে হযরত মুসার কাহিনী। এর পরে উল্লেখ করা হয়েছে মোশরেক আরবদের কাহিনী যাদের মাঝে শেষ নবীর আগমন ঘটে। এই ছিলো ঘটনার ধারাবাহিকতা। এই সূরাতে বিশদভাবে কিছু বর্ণনা করা হয় নাই। ঘটনার ধারাবাহিকতাকে পরিপূর্ণতা লক্ষ্য করা যায়। আ'দ, সামুদ জাতির উল্লেখ করা হয়েছে প্রথমে, তার পরে ফেরাউন ও সর্বশেষে নূহ্‌ নবীর উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা যায় আ'দ ও সামুদ জাতিরা ছিলো আবরদের সংস্কৃতিভূক্ত। আর এই সূরাতে বিশেষ ভাবে মক্কার মোশরেক আরবদের উল্লেখ না করে ফেরাউনের উল্লেখ করা হয়েছে এবং অন্য সকল হচ্ছে, " তার পূর্ববর্তীরা। "

৫৬৪৪। 'নগরীর অধিবাসী ' দ্বারা সদম ও গোমরাহ্‌ নগরকে বুঝানো হয়েছে এবং এর অধিবাসীদের। এই জনপদবাসীদের মাঝে লূত নবী প্রেরণ করা হয়। দেখুন সূরা [ ৯: ৭০] আয়াত ও টিকা ১৩৩০ এবং [ ৭ : ৮০ - ৮৪ ] আয়াত ও টিকা ১০৪৯।

১০। এবং [ প্রত্যেকে ] তাদের প্রভুর রসুলকে অমান্য করেছিলো। সুতারাং তিনি তাদের অপরিসীম শাস্তি দিলেন।

১১। যখন, [ নূহ্‌ এর বন্যার ] পানি সীমা অতিক্রম করেছিলো ৫৬৪৫, তখন আমি [ হে মানুষ ] তোমাদের বহন করেছিলাম ভাসমান [ নৌকায় ],

৫৬৪৫। নূহ্‌ নবীর মহাপ্লাবনের জন্য দেখুন সূরা [ ৭ : ৫৯- ৬৪ ] আয়াত ; এবং সূরা [ ১১ : ২৫ - ৪৯ ] আয়াত। আল্লাহ্‌র হুকুমে নূহ্‌ নবী বিশাল নৌকা প্রস্তুত করতে থাকেন যা তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য হাসি ও ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত হয়। দেখুন [ ১১ : ৩৮] আয়াত ও টিকা ১৫৩১। আল্লাহ্‌ মহাপ্লাবন থেকে তার সৃষ্টিকে রক্ষার জন্য নৌকা তৈরী করতে হুকুম দেন। সেই মহাপ্লাবন থেকে শুধু তারাই রক্ষা পেয়েছিলো যারা ছিলেন বিশ্বাসী বা মোমেন। যেহেতু নৌযানটি আল্লাহ্‌র হুকুমে ও সদয় তত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিলো, সুতারাং আল্লাহ্‌ তাদের সেই নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলেন।

১২। এই উদ্দেশ্যে যে, উহাকে আমি তোমাদের জন্য উপদেশ স্বরূপ করবো, ৫৬৪৬। [ এই কাহিনী শুনে ] কর্ণ তা স্মৃতিতে ধরে রাখবে, এবং [ উপদেশ হিসেবে ] স্মরণ রাখবে। ৫৬৪৭।

৫৬৪৬। হযরত নূহ্‌ এর কাহিনীর মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বযুগের মানব সন্তানকে এই উপদেশ দান করা হয়েছে যে মন্দ কাজের শেষ পরিণতি সর্বদা ভয়াবহ। ভালোকে সব সময়ে আল্লাহ্‌ স্বয়ং উদ্ধার করেন।

৫৬৪৭। বাইবেলে একটি প্রবাদ বাক্য আছে যে, "He that hath ears to hear , let him hear." [ Matt xi 15 ] । বাইবেলে ও কোরাণে যে 'শ্রুতির ' উল্লেখ করা হয়েছে তা সাধারণ শোনা বা শ্রুতির সমপর্যায় নয়। এই শোনার ক্ষমতা হচ্ছে : আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞানের বার্তা হৃদয়ে বুঝতে বা অনুভব করার ক্ষমতা। যা চিরন্তন সত্য ও ন্যায়, সেই বাণীকে হৃদয়ের কন্দরে অনুভব করার ক্ষমতা, শারীরিক ভাবে শোনার ক্ষমতার বহু উর্দ্ধেলোকে যার অবস্থান। বাইবেলে যেখানে বলে ; ''সেই সত্য শোনার ক্ষমতা যার আছে তাকে সেই সত্য শুনতে দাও। সেখানে কোরাণ বলে, অনেকে জ্ঞান, প্রজ্ঞার কথা শুনতে চায় এবং শোনার সময়ে তারা ভাবে আপ্লুত হয়ে পড়ে, এ কথা সত্য। কিন্তু যদি তারা সেই সত্যকে এবং সত্যের বাণীর শিক্ষাকে তাদের অন্তরে ও জীবনে স্থায়ী ভাবে ধারণ করে রাখতে আগ্রহী না হয় তবে তারা তা ভুলে যাবে। " কর্ণ তা স্মৃতিতে ধরে রাখবে " - অর্থাৎ কর্ণ শুধু শোনেই না, আল্লাহ্‌র বাণীর মাহত্ম্য ও সত্যকে জীবনে সংরক্ষণ করে থাকে। সত্যের প্রবেশ হতে হবে অন্তরের গভীরে হৃদয়ের কন্দরে, ইন্দ্রিয়ের অগোচরে যা হৃদয়কে ভরিয়ে দেবে সত্যের আলোকে আর তাই-ই হচ্ছে আল্লাহ্‌র কাম্য।

১৩। যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে - একটি মাত্র ফুৎকার ৫৬৪৮, -

৫৬৪৮। এই আয়াতে অবতীর্ণ করা হয়েছে সেই অবশ্যাম্ভবী ঘটনার। সে ঘটনা হচ্ছে শেষ বিচারের দিন -যা এই সূরার বিষয়বস্তু। এই ফুৎকার হচ্ছে প্রথম ফুৎকার যার উল্লেখ করা হয়েছে সূরা [ ৩৯: ৬৮ ] আয়াতে ও টিকা নং ৪৩৪৩।

১৪। এবং পৃথিবী আন্দোলিত হবে, এবং এর উপরের পর্বতসমূহ ৫৬৪৯ এক ধাক্কাতে চূর্ণবিচূর্ণ হবে,

৫৬৪৯। এই আয়াত ও পরবর্তী আয়াত সমূহে সেই অবশ্যাম্ভবী ঘটনা বা কেয়ামতের উল্লেখ করা হয়েছে, যেদিন এই চেনা পৃথিবী আমাদের সম্মুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে। পর্বতের উল্লেখ বিশেষ ভাবে এই আয়াতে করা হয়েছে, কারণ পর্বত হচ্ছে কাঠিন্যের, বিশালত্বের ও স্থায়ীত্বের প্রতীক স্বরূপ। সেই পবর্তও সেদিন ধূলার ন্যায় হয়ে যাবে চূর্ণবিচূর্ণ" অর্থাৎ পর্বত তার আকৃতি বা গঠন হারাবে সেই ভয়াবহ ধাক্কায়।