+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এতক্ষণে আমরা কোরাণ শরীফের পনের ভাগের চৌদ্দ ভাগ শেষ করেছি। এ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে উম্মার মুসলিম ভাতৃত্বের বিকাশের অগ্রগতি।
এই সূরাতে এসে ধারাবাহিকতাতে সাময়িক যতি টানা হয়েছে। পরবর্তী পনেরটি সূরা হচ্ছে গীতি কবিতা। এর অধিকাংশ মক্কাতে অবতীর্ণ। এই সূরাগুলির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন। এগুলিকে অন্য ধর্মের প্রার্থনা সঙ্গীত বা ধর্মীয় সংগীতের সাথে তুলনা করা চলে যা আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে পূর্ণ। কোরাণের এই সূরাগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এগুলির সৌন্দর্য, গভীর অর্থ, মহনীয়তা, চমৎকারিত্ব এবং সর্বপরি মনের উপরে এর প্রভাব, অতুলনীয়। যেহেতু এই সূরাগুলির উৎস মহাজ্যোতির্ময় প্রভুর মহান অস্তিত্বকে ধারণ করে, সেহেতু এগুলির হেদায়েতের আলো অন্তরের গভীর অন্ধকারকে বিদির্ণ করে প্রবেশ লাভে সক্ষম। যদিও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনকেই মনে হয় প্রকৃত সত্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে প্রকৃত জীবনের নগন্য ও সামান্য পরিমাণ এবং দ্রুত অপসৃয়মান। এ সব সূরার ভাবধারাকে প্রকাশের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকধর্মী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা আমাদের চেনা জানার জগতের আধ্যাত্মিক দিগন্তকে উন্মোচিত করে।
পরলোকের অনন্ত জীবনের তুলনায় ইহলোকের অস্তিত্ব ছায়ার ন্যায়। বাইরের চাকচিক্যময় পার্থিব জীবন ও গভীর আধ্যাত্মিক জীবনের তুলনার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
এই সূরাটি মধ্য মক্কান সূরা ; ৬৯ ও ৭০ নং সূরার অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বক্ষণে এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। এ সূরাতে আল্লাহকে সম্বোধন করা হয়েছে রাহমান [ পরম করুণাময় ] হিসেবে। যে ভাবে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে রব [ প্রভু ও প্রতিপালক ] এবং রাহ্মান হিসেবে ৬৯ নং সূরাতে।
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৫৫৫৪। যখন আমরা আল্লাহ্র নামকে মহিমান্বিত করি তার দ্বারা আমরা কি বুঝাতে চাই ? আমরা বুঝাতে চাই যে, আমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ সমূহ সনাক্ত করতে সক্ষম এবং তা আমরা সর্বান্তকরণে ঘোষণা করি। আমাদের সকল সমৃদ্ধি ও সুখ শান্তি তাঁরই দান। "যার হাতে রয়েছে সর্বময় কর্তৃত্ব।" - আল্লাহ্ যিনি সকল বিশ্বের প্রভু এবং নিখিল বিশ্বের সকল ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের সীমিত জ্ঞানে পার্থিব জীবনে আমরা প্রভুত্ব অথবা ক্ষমতাকে সাধারণভাবে ভালো এবং বদান্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখে থাকি। কিন্তু আল্লাহ্র রাজত্বে এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য নাই। তিনি-ই সেই সর্বশক্তিমান প্রভু যার বদান্যতা তুলনাহীন।
৫৫৫৫। 'Mulk' অর্থ রাজত্ব, প্রভুত্ব, সার্বভৌমত্ব, ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা। 'সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান ' বাক্যটি দ্বারা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্ তাঁর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা রাখেন ; পৃথিবীর কোনও শক্তিই তাঁকে বাধা দান করতে সক্ষম নয়। এখানে আল্লাহ্র বদান্যতা বা মঙ্গল ইচ্ছাকে তাঁর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতসমূহে বিষদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
৫৫৫৬। ' তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন।' লক্ষ্য করুন এই আয়াতে "জীবনের" উল্লেখের পূর্বে "মরণ" উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াত [ ২ : ১৮ ] এর বর্ণনা হচ্ছে " অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদের জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুণরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তাঁর দিকেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে। " আবার সূরা [ ৫৩ : ৪৪ ] আয়াতের বর্ণনাতে মৃত্যুর উল্লেখ জীবনের পূর্বে করা হয়েছে। এ সব আয়াত থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে,
১) পৃথিবীর জীবন শুরুর পূর্বে হয়তো আমরা ছিলাম অস্তিত্ববিহীন বা অন্যরূপে বিরাজমান;
২) পৃথিবীতে আমরা যে ভাবে অবস্থান করছি একদিন সে জীবনের অবসান ঘটবে, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে না। কারণ আত্মা অমর। শুধু আত্মার সামনে থাকবে পর্দা বা বাঁধার প্রাচীর যা উল্লেখ আছে সূরা [ ২৩ : ১০০] আয়াতে 'Barzak' শব্দটি দ্বারা। এই পর্দার আবরণ থাকবে দৈহিক মৃত্যুর পর থেকে শেষ বিচারের পূর্ব পর্যন্ত। শেষ বিচারের দিনে এই পর্দার অবসান ঘটবে এবং পরে প্রত্যেকের জন্য হবে নূতন জীবনে যাত্রা। সে জীবন হবে অনন্ত জীবন নূতন পৃথিবীতে নূতন আঙ্গিকে যার উল্লেখ আছে সূরা [ ১৪ : ৪৮ ] আয়াতে।
৫৫৫৭। আমরা জানি না পৃথিবীতে আগমনের পূর্বে আমাদের অবস্থান কি ছিলো, আবার পৃথিবীর জীবনকে মৃত্যুর মাধ্যমে ত্যাগ করার পরে আমাদের অবস্থান কি হবে। আমাদের চেতনা শুধু এই পার্থিব জীবনকেই ঘিরে থাকে। এ কথা কেউ যেনো মনে না করে যে জীবন শুধুমাত্র পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রে আনন্দ উৎসবের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; এ জীবন উদ্দেশ্য বিহীন, মৃত্যুই জীবনের সমাপ্তি এনে দেবে। যদিও পার্থিব জীবন শুরু করার পূর্বের অবস্থা এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান আমরা কল্পনা করতে পারি না; কিন্তু আল্লাহ্ আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এই আয়াতের মাধ্যমে। জীবনের বৃহত্তর ও মহত্তর উদ্দেশ্য রয়েছে এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেককে উত্তম কর্ম বা সৎ কাজের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। এ পৃথিবীর জীবনে, পৃথিবীর জীবনকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করবার জন্য "তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।"
৫৫৫৮। মানুষ দুর্বলচিত্ত। এই দুর্বলচিত্ত মানুষ জীবনের বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে সক্ষম। কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি "পরাক্রমশালী " এবং তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। তিনি ক্ষমাশীল অন্যথায় দুর্বল মানুষের পক্ষে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব ছিলো না।
৫৫৫৯। দেখুন সূরা [ ৬৫ : ১২ ] আয়াত ও টিকা ৫৫২৬ - ২৭। আকাশকে বর্ণনা করা হয়েছে সপ্তাকাশ হিসেবে। বর্তমান বিজ্ঞান মহাকাশের রহস্যভেদে আত্মনিয়োগ করেছে - তারা স্বীকার করে যে মহাকাশের রহস্য তারা খুব কমই জানে। হয়তো তা হবে সাতটি ছায়াপথের সমষ্টি - ভবিষ্যতের বিজ্ঞানই বলে দেবে এর সমাধান। আমরা অনন্ত নক্ষত্রবীথির মাঝে ক্ষুদ্র মানব সন্তান যার অস্তিত্ব বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অতি নগণ্য। আমাদের দৃষ্টিতে যা ভাস্বর তা হচ্ছে অনন্তের বিশাল ব্যপ্তির মাঝে অপরূপ শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য। যেখানে ছায়াপথে বিরাজমান শত শত নক্ষত্রপুঞ্জ নির্দিষ্ট নিয়মে ছুটে চলেছে যার ক্ষুদ্র অংশই পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি পথে ভাস্বর। মহাশূন্যের এই বিশালত্বের ধারণাই মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে স্রষ্টার বিশালত্বের ধারণায়। তবেই উপলব্ধির সিড়ি বেয়ে আমরা অর্ন্তদৃষ্টির মাধ্যমে পরলোকের জীবনের বিশালত্ব অনুভব করতে পারবো।
৫৫৬০। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে অসীম আকাশের উপমার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ষমতার ও বিশালত্বের প্রতি। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড আল্লাহ্র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এই প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্র ক্ষমতার প্রতি যা নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আমাদের বলা হয়েছে অনন্ত নীলাকাশ এবং এর মাঝে বিরাজমান নক্ষত্রপুঞ্জ পুনঃপুনঃ গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করি না কেন আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে আমরা কোন ত্রুটি বা বিশৃঙ্খলা বের করতে পারবো না। তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতা, সমন্বিত, নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আল্লাহ্র সৃষ্ট সপ্ত আকাশ এত বিশাল যে সে বিশালত্বের ধারণা করা আমাদের মত ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে অসম্ভব। পর্যবেক্ষণ আমাদের দৃষ্টিকে ক্লান্ত করে দেবে তবুও আমরা এর শেষ দেখতে পাব না। এমনকি জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ টেলিস্কোপের সাহাযেও আকাশের শেষ প্রান্ত দেখা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ হাবেল টেলিস্কোপ স্থাপন করেছেন মহাশূন্যে - যার সাহায্যে প্রতিনিয়ত অনন্ত নক্ষত্র বীথির, নিঃসীম নীল আকাশের ছবি পৃথিবীর মানুষ প্রাপ্ত হচ্ছে। মানুষ আশ্চর্য হয়ে যায় আকাশের সীমাহীন ব্যপ্তি লক্ষ্য করে। যত মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে, তত মানুষ মহাকাশের বিশালত্বের ধারণাতে হতবাক হয়ে পড়ছে। মহাকাশের রহস্যের কোন সীমা নাই। এই বিশাল সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে কোনও ত্রুটি নাই। যদি সামান্যতম ত্রুটিও থাকতো তবে গ্রহ নক্ষত্র পরস্পর সংঘর্ষে মহাকাশে বিপর্যয় ঘটে যেতো। এ থেকে মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্বের ধারণা করতে বলা হয়েছে।
৫৫৬১। "নিকটবর্তী আকাশের" জন্য দেখুন টিকা সূরা [ ৩৭: ৫ ] আয়াতের টিকা ৪০৩৫।
৫৫৬২। নির্মেঘ রাতের আকাশে যে উল্কাখন্ডের পতন হয়, তা প্রতীকের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে সূরা [ ১৫ : ১৬- ১৮ ] আয়াতে এবং টিকাতে ১৯৫১ - ৫৪ ] উল্কাকেও সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য কারণ বলা হয়েছে, " উহাদের করেছি শয়তানকে বিতাড়ণের ক্ষেপনাস্ত্র।" কিন্তু কেউ যদি এ সব বস্তুর প্রতি অযৌক্তিকভাবে, কুসংস্কারবশতঃ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, যা তাদের কল্পনা প্রসূত, তবে তারা কি জলন্ত অগ্নির শাস্তি নিয়ে খেলা করছে না ? সে শাস্তির পরিমাণ র্নিধারণ করার ক্ষমতা কারও নাই।
৫৫৬৩। পূর্বের আয়াত সমূহে নক্ষত্রপুঞ্জকে বলা হয়েছে আকাশের সৌন্দর্য প্রদীপরূপে। নিঃসীম মহাশূন্যে নক্ষত্রপুঞ্জ ছুটে চলেছে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মাধ্যমে। দৃশ্যমান আকাশে কোথাও বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু কোন তারা যদি তার গতিপথে বাধাপ্রাপ্ত হয় তবে তা বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয় ও শেষ পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। উল্কা খন্ড হচ্ছে তারই প্রমাণ। এই উপমার সাহায্যে আধ্যাত্মিক জগতকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন কেউ তার প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, এর থেকে বড় পাপ, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতে আর কি আছে ? কারণ আমাদের স্রষ্টা, আমাদের প্রতিপালক শুধুমাত্র আমাদের কল্যাণ প্রত্যাশী। সুতারাং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম হচ্ছে জাহান্নামের আগুন যার বর্ণনা আছে পরবর্তী দুটো আয়াতে। উল্কা যেরূপ বাধাপ্রাপ্ত হলে ছাই হয়ে যায়, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জগতও সেরূপ খোদাদ্রোহিতার ফলে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
সূরা মুল্ক
Page 1 of 3
সূরা মুল্ক বা সম্রাজ্য - ৬৭
৩০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা ও সার সংক্ষেপ : এতক্ষণে আমরা কোরাণ শরীফের পনের ভাগের চৌদ্দ ভাগ শেষ করেছি। এ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে উম্মার মুসলিম ভাতৃত্বের বিকাশের অগ্রগতি।
এই সূরাতে এসে ধারাবাহিকতাতে সাময়িক যতি টানা হয়েছে। পরবর্তী পনেরটি সূরা হচ্ছে গীতি কবিতা। এর অধিকাংশ মক্কাতে অবতীর্ণ। এই সূরাগুলির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন। এগুলিকে অন্য ধর্মের প্রার্থনা সঙ্গীত বা ধর্মীয় সংগীতের সাথে তুলনা করা চলে যা আধ্যাত্মিক ভাবধারাতে পূর্ণ। কোরাণের এই সূরাগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এগুলির সৌন্দর্য, গভীর অর্থ, মহনীয়তা, চমৎকারিত্ব এবং সর্বপরি মনের উপরে এর প্রভাব, অতুলনীয়। যেহেতু এই সূরাগুলির উৎস মহাজ্যোতির্ময় প্রভুর মহান অস্তিত্বকে ধারণ করে, সেহেতু এগুলির হেদায়েতের আলো অন্তরের গভীর অন্ধকারকে বিদির্ণ করে প্রবেশ লাভে সক্ষম। যদিও ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনকেই মনে হয় প্রকৃত সত্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে প্রকৃত জীবনের নগন্য ও সামান্য পরিমাণ এবং দ্রুত অপসৃয়মান। এ সব সূরার ভাবধারাকে প্রকাশের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকধর্মী ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যা আমাদের চেনা জানার জগতের আধ্যাত্মিক দিগন্তকে উন্মোচিত করে।
পরলোকের অনন্ত জীবনের তুলনায় ইহলোকের অস্তিত্ব ছায়ার ন্যায়। বাইরের চাকচিক্যময় পার্থিব জীবন ও গভীর আধ্যাত্মিক জীবনের তুলনার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
এই সূরাটি মধ্য মক্কান সূরা ; ৬৯ ও ৭০ নং সূরার অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বক্ষণে এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। এ সূরাতে আল্লাহকে সম্বোধন করা হয়েছে রাহমান [ পরম করুণাময় ] হিসেবে। যে ভাবে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে রব [ প্রভু ও প্রতিপালক ] এবং রাহ্মান হিসেবে ৬৯ নং সূরাতে।
সূরা মুল্ক বা সম্রাজ্য - ৬৭
৩০ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। মহিমান্বিত ৫৫৫৪ তিনি, যার হাতে রয়েছে সর্বময় কর্তৃত্ব ৫৫৫৫। সকল বিষয়ের উপরে তিনি সর্বশক্তিমান ; -
৫৫৫৪। যখন আমরা আল্লাহ্র নামকে মহিমান্বিত করি তার দ্বারা আমরা কি বুঝাতে চাই ? আমরা বুঝাতে চাই যে, আমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ সমূহ সনাক্ত করতে সক্ষম এবং তা আমরা সর্বান্তকরণে ঘোষণা করি। আমাদের সকল সমৃদ্ধি ও সুখ শান্তি তাঁরই দান। "যার হাতে রয়েছে সর্বময় কর্তৃত্ব।" - আল্লাহ্ যিনি সকল বিশ্বের প্রভু এবং নিখিল বিশ্বের সকল ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের সীমিত জ্ঞানে পার্থিব জীবনে আমরা প্রভুত্ব অথবা ক্ষমতাকে সাধারণভাবে ভালো এবং বদান্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখে থাকি। কিন্তু আল্লাহ্র রাজত্বে এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য নাই। তিনি-ই সেই সর্বশক্তিমান প্রভু যার বদান্যতা তুলনাহীন।
৫৫৫৫। 'Mulk' অর্থ রাজত্ব, প্রভুত্ব, সার্বভৌমত্ব, ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা। 'সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান ' বাক্যটি দ্বারা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ্ তাঁর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতা রাখেন ; পৃথিবীর কোনও শক্তিই তাঁকে বাধা দান করতে সক্ষম নয়। এখানে আল্লাহ্র বদান্যতা বা মঙ্গল ইচ্ছাকে তাঁর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতসমূহে বিষদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
২। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ এবং জীবন ৫৫৫৬, যেনো তিনি পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম ৫৫৫৭। এবং তিনি ক্ষমতায় পরাক্রমাশালী। বারে বারে ক্ষমাশীল ৫৫৫৮।
৫৫৫৬। ' তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন।' লক্ষ্য করুন এই আয়াতে "জীবনের" উল্লেখের পূর্বে "মরণ" উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াত [ ২ : ১৮ ] এর বর্ণনা হচ্ছে " অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তিনি তোমাদের জীবন্ত করেছেন, আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন ও পুণরায় জীবন্ত করবেন, পরিণামে তাঁর দিকেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে। " আবার সূরা [ ৫৩ : ৪৪ ] আয়াতের বর্ণনাতে মৃত্যুর উল্লেখ জীবনের পূর্বে করা হয়েছে। এ সব আয়াত থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে,
১) পৃথিবীর জীবন শুরুর পূর্বে হয়তো আমরা ছিলাম অস্তিত্ববিহীন বা অন্যরূপে বিরাজমান;
২) পৃথিবীতে আমরা যে ভাবে অবস্থান করছি একদিন সে জীবনের অবসান ঘটবে, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে না। কারণ আত্মা অমর। শুধু আত্মার সামনে থাকবে পর্দা বা বাঁধার প্রাচীর যা উল্লেখ আছে সূরা [ ২৩ : ১০০] আয়াতে 'Barzak' শব্দটি দ্বারা। এই পর্দার আবরণ থাকবে দৈহিক মৃত্যুর পর থেকে শেষ বিচারের পূর্ব পর্যন্ত। শেষ বিচারের দিনে এই পর্দার অবসান ঘটবে এবং পরে প্রত্যেকের জন্য হবে নূতন জীবনে যাত্রা। সে জীবন হবে অনন্ত জীবন নূতন পৃথিবীতে নূতন আঙ্গিকে যার উল্লেখ আছে সূরা [ ১৪ : ৪৮ ] আয়াতে।
৫৫৫৭। আমরা জানি না পৃথিবীতে আগমনের পূর্বে আমাদের অবস্থান কি ছিলো, আবার পৃথিবীর জীবনকে মৃত্যুর মাধ্যমে ত্যাগ করার পরে আমাদের অবস্থান কি হবে। আমাদের চেতনা শুধু এই পার্থিব জীবনকেই ঘিরে থাকে। এ কথা কেউ যেনো মনে না করে যে জীবন শুধুমাত্র পৃথিবীর কর্মক্ষেত্রে আনন্দ উৎসবের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; এ জীবন উদ্দেশ্য বিহীন, মৃত্যুই জীবনের সমাপ্তি এনে দেবে। যদিও পার্থিব জীবন শুরু করার পূর্বের অবস্থা এবং মৃত্যুর পরের অবস্থান আমরা কল্পনা করতে পারি না; কিন্তু আল্লাহ্ আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এই আয়াতের মাধ্যমে। জীবনের বৃহত্তর ও মহত্তর উদ্দেশ্য রয়েছে এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেককে উত্তম কর্ম বা সৎ কাজের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। এ পৃথিবীর জীবনে, পৃথিবীর জীবনকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করবার জন্য "তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।"
৫৫৫৮। মানুষ দুর্বলচিত্ত। এই দুর্বলচিত্ত মানুষ জীবনের বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে সক্ষম। কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি "পরাক্রমশালী " এবং তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। তিনি ক্ষমাশীল অন্যথায় দুর্বল মানুষের পক্ষে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব ছিলো না।
৩। তিনিই স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ ৫৫৫৯। তুমি পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোন ত্রুটি দেখতে পাবে না। সুতারাং পুণরায় তোমার দৃষ্টিকে ফেরাও, [ দেখ ] কোন ত্রুটি দেখতে পাও কি?
৫৫৫৯। দেখুন সূরা [ ৬৫ : ১২ ] আয়াত ও টিকা ৫৫২৬ - ২৭। আকাশকে বর্ণনা করা হয়েছে সপ্তাকাশ হিসেবে। বর্তমান বিজ্ঞান মহাকাশের রহস্যভেদে আত্মনিয়োগ করেছে - তারা স্বীকার করে যে মহাকাশের রহস্য তারা খুব কমই জানে। হয়তো তা হবে সাতটি ছায়াপথের সমষ্টি - ভবিষ্যতের বিজ্ঞানই বলে দেবে এর সমাধান। আমরা অনন্ত নক্ষত্রবীথির মাঝে ক্ষুদ্র মানব সন্তান যার অস্তিত্ব বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অতি নগণ্য। আমাদের দৃষ্টিতে যা ভাস্বর তা হচ্ছে অনন্তের বিশাল ব্যপ্তির মাঝে অপরূপ শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য। যেখানে ছায়াপথে বিরাজমান শত শত নক্ষত্রপুঞ্জ নির্দিষ্ট নিয়মে ছুটে চলেছে যার ক্ষুদ্র অংশই পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি পথে ভাস্বর। মহাশূন্যের এই বিশালত্বের ধারণাই মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে স্রষ্টার বিশালত্বের ধারণায়। তবেই উপলব্ধির সিড়ি বেয়ে আমরা অর্ন্তদৃষ্টির মাধ্যমে পরলোকের জীবনের বিশালত্ব অনুভব করতে পারবো।
৪। পুণরায় বারে বারে তুমি দৃষ্টি ফেরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে ৫৫৬০।
৫৫৬০। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে অসীম আকাশের উপমার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ষমতার ও বিশালত্বের প্রতি। বিশ্ব ব্রহ্মান্ড আল্লাহ্র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এই প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আল্লাহ্র ক্ষমতার প্রতি যা নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আমাদের বলা হয়েছে অনন্ত নীলাকাশ এবং এর মাঝে বিরাজমান নক্ষত্রপুঞ্জ পুনঃপুনঃ গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করি না কেন আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে আমরা কোন ত্রুটি বা বিশৃঙ্খলা বের করতে পারবো না। তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতা, সমন্বিত, নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত। আল্লাহ্র সৃষ্ট সপ্ত আকাশ এত বিশাল যে সে বিশালত্বের ধারণা করা আমাদের মত ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে অসম্ভব। পর্যবেক্ষণ আমাদের দৃষ্টিকে ক্লান্ত করে দেবে তবুও আমরা এর শেষ দেখতে পাব না। এমনকি জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ টেলিস্কোপের সাহাযেও আকাশের শেষ প্রান্ত দেখা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ হাবেল টেলিস্কোপ স্থাপন করেছেন মহাশূন্যে - যার সাহায্যে প্রতিনিয়ত অনন্ত নক্ষত্র বীথির, নিঃসীম নীল আকাশের ছবি পৃথিবীর মানুষ প্রাপ্ত হচ্ছে। মানুষ আশ্চর্য হয়ে যায় আকাশের সীমাহীন ব্যপ্তি লক্ষ্য করে। যত মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে, তত মানুষ মহাকাশের বিশালত্বের ধারণাতে হতবাক হয়ে পড়ছে। মহাকাশের রহস্যের কোন সীমা নাই। এই বিশাল সৃষ্টি কৌশলের মধ্যে কোনও ত্রুটি নাই। যদি সামান্যতম ত্রুটিও থাকতো তবে গ্রহ নক্ষত্র পরস্পর সংঘর্ষে মহাকাশে বিপর্যয় ঘটে যেতো। এ থেকে মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্বের ধারণা করতে বলা হয়েছে।
৫। আর নিশ্চয় আমি [ দুনিয়ার ] নিকটতম আসমানকে ৫৫৬১ সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং এই সব [ প্রদীপকে ] করেছি শয়তানকে বিতাড়ণের ক্ষেপনাস্ত্র ৫৫৬২। এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি।
৫৫৬১। "নিকটবর্তী আকাশের" জন্য দেখুন টিকা সূরা [ ৩৭: ৫ ] আয়াতের টিকা ৪০৩৫।
৫৫৬২। নির্মেঘ রাতের আকাশে যে উল্কাখন্ডের পতন হয়, তা প্রতীকের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে সূরা [ ১৫ : ১৬- ১৮ ] আয়াতে এবং টিকাতে ১৯৫১ - ৫৪ ] উল্কাকেও সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য কারণ বলা হয়েছে, " উহাদের করেছি শয়তানকে বিতাড়ণের ক্ষেপনাস্ত্র।" কিন্তু কেউ যদি এ সব বস্তুর প্রতি অযৌক্তিকভাবে, কুসংস্কারবশতঃ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, যা তাদের কল্পনা প্রসূত, তবে তারা কি জলন্ত অগ্নির শাস্তি নিয়ে খেলা করছে না ? সে শাস্তির পরিমাণ র্নিধারণ করার ক্ষমতা কারও নাই।
৬। যারা তাদের প্রভু [ ও প্রতিপালককে ] ৫৫৬৩, প্রত্যাখান করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। উহা অতি মন্দ গন্তব্যস্থল।
৫৫৬৩। পূর্বের আয়াত সমূহে নক্ষত্রপুঞ্জকে বলা হয়েছে আকাশের সৌন্দর্য প্রদীপরূপে। নিঃসীম মহাশূন্যে নক্ষত্রপুঞ্জ ছুটে চলেছে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মাধ্যমে। দৃশ্যমান আকাশে কোথাও বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু কোন তারা যদি তার গতিপথে বাধাপ্রাপ্ত হয় তবে তা বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হয় ও শেষ পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। উল্কা খন্ড হচ্ছে তারই প্রমাণ। এই উপমার সাহায্যে আধ্যাত্মিক জগতকে তুলে ধরা হয়েছে। যখন কেউ তার প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, এর থেকে বড় পাপ, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতে আর কি আছে ? কারণ আমাদের স্রষ্টা, আমাদের প্রতিপালক শুধুমাত্র আমাদের কল্যাণ প্রত্যাশী। সুতারাং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম হচ্ছে জাহান্নামের আগুন যার বর্ণনা আছে পরবর্তী দুটো আয়াতে। উল্কা যেরূপ বাধাপ্রাপ্ত হলে ছাই হয়ে যায়, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জগতও সেরূপ খোদাদ্রোহিতার ফলে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
