+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : দশটি ছোট ছোট সূরার শ্রেণীর এটি হলো ষষ্ঠ সূরা; যে দশটি সূরার শ্রেণী শুরু হয়েছে ৫৭ নং সূরা থেকে।
এই সূরার বিশেষ বিষয়বস্তু হচ্ছে, আল্লাহ্র এবাদত ও আল্লাহকে হৃদয়ের মাঝে উপলব্ধি করার জন্য সামাজিক সংসর্গ ও সম্পর্ক প্রয়োজন। আল্লাহ্র বাণী ধনী -গরীব ; জ্ঞানী অজ্ঞ সকলের জন্য, যেনো তারা আত্মশুদ্ধির দ্বারা প্রজ্ঞা সম্পন্ন হতে পারে।
এই সূরার অবতীর্ণ কাল কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে নাই। সুতারাং এর অবতীর্ণ কালের কোন বিশেষত্ব নাই। সম্ভবতঃ এই সূরাটির অবতীর্ণ কাল হচ্ছে মদিনাতে রাসুলের (সা) অবস্থানের প্রথম দিকে যথা : ২য় থেকে ৫ম হিজরীর মধ্যে।
সার সংক্ষেপ : অজ্ঞ জনগণের মাঝে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের পবিত্রতা ও জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। এই প্রত্যাদেশ শুধু তাদের জন্যই নয়, অন্যান্য কিতাবধারীদের জন্যও প্রযোজ্য, যারা তাদের কিতাবের বাণীকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। ভক্তি সহকারে সমবেত [ শুক্রবারে ] প্রার্থনায় যোগদান কর। পার্থিব বিষয়বস্তু যেনো এ থেকে তোমাদের বিচ্যুত না করে। [ ৬২ : ১ - ১১ ]
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৫৪৪৯। দেখুন [ ৫৯ : ২৪ ] আয়াতের টিকা ৫৪০৮। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, 'Sabbaha' এবং 'yusabbihu' এর মধ্যে। এখানে দ্বিতীয় ক্রিয়াপদটির প্রকাশকে প্রয়োগ করা হয়েছে, প্রকৃত অবস্থাকে বুঝানোর জন্য। " পৃথিবীর সকল কিছুই আল্লাহ্র মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা করে।" কারণ আল্লাহ্র করুণা ও দয়া তার সকল সৃষ্ট জীবকে পরিবৃত্ত করে রেখেছে। আল্লাহ্ তাঁর প্রত্যাদেশ অশিক্ষিত, অজ্ঞ ও জ্ঞানী সকলের জন্য সমভাবে প্রেরণ করেছেন। জ্ঞানীরা যখন প্রকৃত জ্ঞান যা আল্লাহকে অনুধাবনে শিক্ষা দেয়, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে [ অর্থকরী ] জ্ঞানের ভারে নুব্জ হয়ে পড়ে তাদের জন্য আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের জ্ঞান বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।
৫৪৫০। দেখুন সূরা [ ৫৯: ২৩ ] আয়াত ও টিকা ৫৪০২। এই আয়াতে পূর্বের [ ৫৯ : ২৩ ] আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ্র দুটি গুণবাচক উপাধির পুণরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং [ ৫৯ : ২৪ ] আয়াত থেকে দুটি গুণবাচক উপাধির পুণরাবৃত্তি করা হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহ্র স্বর্গীয় গুণাবলীর স্মৃতিচারণ করা হয়েছে মাত্র।
৫৪৫১। "উম্মীদের " - এই শব্দটি দ্বারা রাসুলের (সা ) সমসাময়িক অজ্ঞ আরব এবং কিতাবধারী জাতিদের বোঝানো হয়েছে, যাদের মাঝে শিক্ষার প্রসার সত্বেও প্রকৃত সত্যকে অনুধাবনে যারা ছিলো অক্ষম। এদের কথা বলা হয়েছে ৫ নং আয়াতে। সমষ্টিগত ভাবে না নিয়ে যদি ব্যক্তিগত ভাবেও ধরা হয় তবুও এই আয়াতটির মমার্থ হচেছ আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সকল মানুষের কল্যাণের জন্য। জ্ঞানী [ অর্থকরী বিদ্যায় ] বা মূর্খতার মাঝে কোনও ভেদাভেদ নাই।
৫৪৫২। "তাহার আয়াত সমূহ " - ইংরেজীতে আয়াত সমূহের অনুবাদ করা হয়েছে 'Sign' বা নিদর্শন হিসেবে। সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্পীসত্তার নিদর্শন বিদ্যমান। সৃষ্টির বিশ্ব ভূবনের মাঝে যে নিয়ম, শৃঙ্খলা বিদ্যমান তা স্রষ্টার প্রজ্ঞারই সাক্ষর। কোরাণের আয়াত সমূহ আল্লাহ্র প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের বর্ণনায় সমৃদ্ধ। এখানে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে আল্লাহ্র 'কিতাব ' সমূহের কথা।
৫৪৫৩। দেখুন [ ২ : ১২৯ ] আয়াত ও টিকা নং ১২৯। পূর্বের আয়াতে [ আয়াত - ১ ] আল্লাহ্র গুণবাচক নাম সমূহের বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিপতি। সুতারাং পৃথিবীর সকল প্রাণ এবং বস্তু তারই সদয় তত্বাবধানের অর্ন্তগত। ধনী-গরীব,ছোট বড়, জ্ঞানী - মূর্খ সকলের কল্যাণের জন্য তিনি নবী ও রসুলদের প্রেরণ করে থাকেন। আল্লাহ্ মহাপবিত্র - সুতারাং তিনি পাপী ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের পাপ ও কুসংস্কার মুক্ত করে পবিত্র করেন। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী - সুতারাং যাকে খুশী তিনি তাঁর অনুগ্রহ দানে ধন্য করতে সক্ষম [ আয়াত ৩]। আল্লাহ্ প্রজ্ঞাময়, সুতারাং তিনি কিতাবের দ্বারা লিখিত ভাবে বা অন্যান্য মাধ্যমের দ্বারা মানুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দান করেন। অন্যান্য মাধ্যম : অর্থাৎ মানব জীবনের মাধ্যমে বা জীবন বিধানের বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে বা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টির অনুধাবনের মাধ্যমে ইত্যাদি। এ ভাবেই বিশ্বস্রষ্টা মানুষকে পবিত্র করে তাকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।
৫৪৫৪। অজ্ঞতা, ব্যক্তি বা জাতির জন্য আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ ও অনুগ্রহ লাভের পক্ষে বাধা নয়। আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের পূর্বশর্ত হচ্ছে ব্যক্তি বা জাতি তা লাভ করার জন্য আগ্রহান্বিত হবে এবং নিজেকে সে ভাবে প্রস্তুত করবে। সৎ জীবন যাপনের মাধ্যমে আত্মাকে প্রত্যাদেশ লাভের উপযুক্ত করতে হয় এবং অবাধ্যতা ত্যাগ করে বিনয়ের মাধ্যমে, প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভ করা যায়।
৫৪৫৫। " তাদের মধ্যে অপর লোকদেরও [শিক্ষা দেয়)। " - এই বাক্যটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদেরই যারা সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞ। অর্থাৎ রাসুলের (সা ) মাধ্যমে যে সত্যকে আল্লাহ্ প্রেরণ করেছেন, তা রাসুলের (সা) সমসাময়িক চতুপার্শ্বের আরব, আরব ব্যতীত অন্য দেশীয় এবং যারা রাসুলের (সা) পরবর্তী যুগে বাস করবেন যাদের সাথে রাসুলের ব্যক্তিগত কোন সম্পর্ক নাই, তাদের সকলের জন্য এই আয়াত সমূহের সত্য প্রেরণ করা হয়েছে।
৫৪৫৬। আল্লাহ্র বিচক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি পৃথিবীতে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন নেয়ামত দান করে থাকেন। আল্লাহ্ অফুরন্ত নেয়ামতের অধিকারী।
৫৪৫৭। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ তাঁর বাণী পৃথিবীময় প্রচারের জন্য ইহুদীদের বিশেষ ভাবে নির্বাচিত করেছিলেন কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তারা প্রকৃত সত্যকে ভুলে যায় এবং দূর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে। 'তাওরাত' ছিল তাদের ধর্মগ্রন্থ যার মাধ্যমে আল্লাহ্র বাণী বিশ্ব মানবের জন্য প্রেরণ করা হয়। কিন্তু তারা সে বাণীর মর্মার্থ ভুলে যায় এবং আনুষ্ঠানিকতাকে তাদের ধর্মরূপে পরিগণিত করে। ইহুদীদের জাতিগত আভিজাত্য যা তারা দাবী করে তা তাদের কাজের দ্বারা প্রমাণিত হয় না। ইহুদীরা তাদের নিজ গোষ্ঠিভূত বহু পয়গম্বরকে হত্যা করেছে। যখনই তাদের নিজেদের মতের সাথে সত্যের বিরোধ ঘটেছে তখনই তারা তাদের হত্যা করেছে। এভাবে তারা তওরাতের শিক্ষাকে অস্বীকার করেছে। এদেরই উপমা হচ্ছে ভারবাহী গাধার ন্যায়। গাধা যেরূপ পিঠে কি বহন করে সে সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং বাহিত বোঝা দ্বারা সে কোন উপকৃত হয় না সেরূপ হচ্ছে ইহুদীদের দৃষ্টান্ত। তাওরাতের সত্য দ্বারা তারা উপকৃত হয় নাই।
মন্তব্য : আজকের বাংলাদেশের মুসলিমরা যারা শুধুমাত্র আরবীতে কোরাণ পড়ে কোরাণের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করেন কিন্তু এ শিক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে জীবনে প্রতিফলিত করেন না তাদের অবস্থাও ঐ ভারবাহী গাধার ন্যায় - পিঠে কি বহন করে জানে না। কোরাণে আল্লাহ্ কি হুকুম দিয়েছেন তা সম্বন্ধে তারা অজ্ঞ। দেখুন [ ২ : ৯১ ও টিকা ৯৬ ]।
৫৪৫৮। আল্লাহ্ এই আয়াতে ইহুদীদের সম্বোধন করে দেন এই বলে যারা দাবী করে তারাই একমাত্র সত্যের ধারক, বাহক ও রক্ষক। তারা অবাধ্যভাবে আল্লাহ্র হুকুমকে অস্বীকার করে, কিন্তু কল্পনা করে যে তারাই স্বর্গীয় হুকুম সমূহের তত্বাবধায়ক এবং তাদের দাবী অন্যায় যে তারা কল্পনা তারা আল্লাহ্ কর্তৃক বিশেষ ভাবে নির্বাচিত হওয়ার ফলে শেষ বিচারের দিনে তারা শাস্তি থেকে অব্যহতি লাভ করবে [ ২ : ৮৮ ]। এতো আল্লাহ্র নিন্দা ব্যতীত, অন্য কিছু নয়। বর্তমানের ইহুদীদের যে ধর্ম তা আল্লাহ্র সত্যের বিরোধিতা বই অন্য কিছু নয়, যে ধর্ম তাদের রাসুল হযরত মুসা প্রচারিত ধর্মের বিকৃত রূপ।
৫৪৫৯। দেখুন সূরা [ ২ : ৯৪ - ৯৬ ] আয়াত। যদি ইহুদীরা প্রকৃতই বিশ্বাস করে যে, তারা আল্লাহ্র বন্ধু তবে তারা কেন মৃত্যু কামনা করে না ? কারণ মৃত্যু তাদের খুব শীঘ্রই আল্লাহ্র সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দান করবে। কিন্তু দেখা যায় ইহুদীরাই সকল জাতির মধ্যে পার্থিব জীবন ও সম্পদের জন্য তীব্র আকাঙ্খা পোষণ করে ও জাগতিক আরাম আয়েশের মাঝে জীবন অতিবাহিত করতে আগ্রহী। তারা ভালোভাবেই জানে যে, স্বার্থপরতা, সম্পদের আকাঙ্খা তাদের পাপের পথে ঠেলে দেবে এবং যা হবে আল্লাহ্র বাণীকে অস্বীকার করার শেষ পরিণতি। সুতারাং তারা মৃত্যুকে কখনও কামনা করবে না।
৫৪৬০। পরলোকের জীবনে আমাদের ভুলে যাওয়া জীবনের সকল কর্ম টেলিভিশনের ছবির ন্যায় আমাদের দৃষ্টিপথে ভাস্বর হবে। আমরা দেখতে চাই বা না চাই আমাদের 'হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে" - আমাদের সে সকল কৃতকর্ম আমাদের জানিয়ে দেয়া হবে। আমাদের চোখের সম্মুখ থেকে বিভ্রান্তির মায়াজাল ছিন্ন হয়ে যাবে। প্রকৃত সত্যকে করা হবে ভাস্বর। আমাদের প্রতিটি কর্মের উদ্দেশ্য বা নিয়ত, গোপনীয়তা সব কিছু সেদিন হবে সর্ব সমক্ষে প্রকাশিত। আমাদের মনের গহনের ছোট ছোট পাপ যা পৃথিবীতে প্রকাশ লাভ করে নাই সেদিন আল্লাহ্ আমাদের দেখাবেন তার পরিণতি। দেখাবেন পাপ কি ভাবে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতাকে মলিন করে দেয় যার প্রভাব ইহকালকে অতিক্রম করে পরলোকের অনন্ত জীবন পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মানুষের নিজস্ব কাল্পনিক ধ্যান ধারণা সেদিন অন্তর্হিত হবে মরিচিকার ন্যায়।
সূরা জুম'আ
Page 1 of 2
সূরা জুম'আ অথবা [ শুক্রবারের ] সমবেত প্রার্থনা - ৬২
১১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : দশটি ছোট ছোট সূরার শ্রেণীর এটি হলো ষষ্ঠ সূরা; যে দশটি সূরার শ্রেণী শুরু হয়েছে ৫৭ নং সূরা থেকে।
এই সূরার বিশেষ বিষয়বস্তু হচ্ছে, আল্লাহ্র এবাদত ও আল্লাহকে হৃদয়ের মাঝে উপলব্ধি করার জন্য সামাজিক সংসর্গ ও সম্পর্ক প্রয়োজন। আল্লাহ্র বাণী ধনী -গরীব ; জ্ঞানী অজ্ঞ সকলের জন্য, যেনো তারা আত্মশুদ্ধির দ্বারা প্রজ্ঞা সম্পন্ন হতে পারে।
এই সূরার অবতীর্ণ কাল কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে নাই। সুতারাং এর অবতীর্ণ কালের কোন বিশেষত্ব নাই। সম্ভবতঃ এই সূরাটির অবতীর্ণ কাল হচ্ছে মদিনাতে রাসুলের (সা) অবস্থানের প্রথম দিকে যথা : ২য় থেকে ৫ম হিজরীর মধ্যে।
সার সংক্ষেপ : অজ্ঞ জনগণের মাঝে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের পবিত্রতা ও জ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। এই প্রত্যাদেশ শুধু তাদের জন্যই নয়, অন্যান্য কিতাবধারীদের জন্যও প্রযোজ্য, যারা তাদের কিতাবের বাণীকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। ভক্তি সহকারে সমবেত [ শুক্রবারে ] প্রার্থনায় যোগদান কর। পার্থিব বিষয়বস্তু যেনো এ থেকে তোমাদের বিচ্যুত না করে। [ ৬২ : ১ - ১১ ]
সূরা জুম'আ অথবা [ শুক্রবারের ] সমবেত প্রার্থনা - ৬২
১১ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহ্র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে ৫৪৪৯; যিনি সার্বভৌম, মহাপবিত্র, শক্তিতে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় ৫৪৫০।
৫৪৪৯। দেখুন [ ৫৯ : ২৪ ] আয়াতের টিকা ৫৪০৮। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, 'Sabbaha' এবং 'yusabbihu' এর মধ্যে। এখানে দ্বিতীয় ক্রিয়াপদটির প্রকাশকে প্রয়োগ করা হয়েছে, প্রকৃত অবস্থাকে বুঝানোর জন্য। " পৃথিবীর সকল কিছুই আল্লাহ্র মহিমা ও প্রশংসা ঘোষণা করে।" কারণ আল্লাহ্র করুণা ও দয়া তার সকল সৃষ্ট জীবকে পরিবৃত্ত করে রেখেছে। আল্লাহ্ তাঁর প্রত্যাদেশ অশিক্ষিত, অজ্ঞ ও জ্ঞানী সকলের জন্য সমভাবে প্রেরণ করেছেন। জ্ঞানীরা যখন প্রকৃত জ্ঞান যা আল্লাহকে অনুধাবনে শিক্ষা দেয়, তা থেকে বিচ্যুত হয়ে [ অর্থকরী ] জ্ঞানের ভারে নুব্জ হয়ে পড়ে তাদের জন্য আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের জ্ঞান বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।
৫৪৫০। দেখুন সূরা [ ৫৯: ২৩ ] আয়াত ও টিকা ৫৪০২। এই আয়াতে পূর্বের [ ৫৯ : ২৩ ] আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ্র দুটি গুণবাচক উপাধির পুণরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং [ ৫৯ : ২৪ ] আয়াত থেকে দুটি গুণবাচক উপাধির পুণরাবৃত্তি করা হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহ্র স্বর্গীয় গুণাবলীর স্মৃতিচারণ করা হয়েছে মাত্র।
২। তিনিই নিরক্ষর ৫৪৫১ মানুষের জন্য তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট আয়াত সমূহ ৫৪৫২ আবৃত্তি করে, তাদের পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় কিতাব ৫৪৫৩ ও প্রজ্ঞা। যদিও ইতিপূর্বে তারা ছিলো সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ৫৪৫৪।
৫৪৫১। "উম্মীদের " - এই শব্দটি দ্বারা রাসুলের (সা ) সমসাময়িক অজ্ঞ আরব এবং কিতাবধারী জাতিদের বোঝানো হয়েছে, যাদের মাঝে শিক্ষার প্রসার সত্বেও প্রকৃত সত্যকে অনুধাবনে যারা ছিলো অক্ষম। এদের কথা বলা হয়েছে ৫ নং আয়াতে। সমষ্টিগত ভাবে না নিয়ে যদি ব্যক্তিগত ভাবেও ধরা হয় তবুও এই আয়াতটির মমার্থ হচেছ আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সকল মানুষের কল্যাণের জন্য। জ্ঞানী [ অর্থকরী বিদ্যায় ] বা মূর্খতার মাঝে কোনও ভেদাভেদ নাই।
৫৪৫২। "তাহার আয়াত সমূহ " - ইংরেজীতে আয়াত সমূহের অনুবাদ করা হয়েছে 'Sign' বা নিদর্শন হিসেবে। সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্পীসত্তার নিদর্শন বিদ্যমান। সৃষ্টির বিশ্ব ভূবনের মাঝে যে নিয়ম, শৃঙ্খলা বিদ্যমান তা স্রষ্টার প্রজ্ঞারই সাক্ষর। কোরাণের আয়াত সমূহ আল্লাহ্র প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের বর্ণনায় সমৃদ্ধ। এখানে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে আল্লাহ্র 'কিতাব ' সমূহের কথা।
৫৪৫৩। দেখুন [ ২ : ১২৯ ] আয়াত ও টিকা নং ১২৯। পূর্বের আয়াতে [ আয়াত - ১ ] আল্লাহ্র গুণবাচক নাম সমূহের বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিপতি। সুতারাং পৃথিবীর সকল প্রাণ এবং বস্তু তারই সদয় তত্বাবধানের অর্ন্তগত। ধনী-গরীব,ছোট বড়, জ্ঞানী - মূর্খ সকলের কল্যাণের জন্য তিনি নবী ও রসুলদের প্রেরণ করে থাকেন। আল্লাহ্ মহাপবিত্র - সুতারাং তিনি পাপী ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের পাপ ও কুসংস্কার মুক্ত করে পবিত্র করেন। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী - সুতারাং যাকে খুশী তিনি তাঁর অনুগ্রহ দানে ধন্য করতে সক্ষম [ আয়াত ৩]। আল্লাহ্ প্রজ্ঞাময়, সুতারাং তিনি কিতাবের দ্বারা লিখিত ভাবে বা অন্যান্য মাধ্যমের দ্বারা মানুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দান করেন। অন্যান্য মাধ্যম : অর্থাৎ মানব জীবনের মাধ্যমে বা জীবন বিধানের বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে বা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টির অনুধাবনের মাধ্যমে ইত্যাদি। এ ভাবেই বিশ্বস্রষ্টা মানুষকে পবিত্র করে তাকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।
৫৪৫৪। অজ্ঞতা, ব্যক্তি বা জাতির জন্য আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ ও অনুগ্রহ লাভের পক্ষে বাধা নয়। আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভের পূর্বশর্ত হচ্ছে ব্যক্তি বা জাতি তা লাভ করার জন্য আগ্রহান্বিত হবে এবং নিজেকে সে ভাবে প্রস্তুত করবে। সৎ জীবন যাপনের মাধ্যমে আত্মাকে প্রত্যাদেশ লাভের উপযুক্ত করতে হয় এবং অবাধ্যতা ত্যাগ করে বিনয়ের মাধ্যমে, প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভ করা যায়।
৩। তাদের মধ্যে অপর লোকদেরও [ শিক্ষা দেয় ] যারা এখনও তাদের সাথে যোগ দেয় নাই ৫৪৫৫। আল্লাহ্ শক্তিতে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
৫৪৫৫। " তাদের মধ্যে অপর লোকদেরও [শিক্ষা দেয়)। " - এই বাক্যটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদেরই যারা সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞ। অর্থাৎ রাসুলের (সা ) মাধ্যমে যে সত্যকে আল্লাহ্ প্রেরণ করেছেন, তা রাসুলের (সা) সমসাময়িক চতুপার্শ্বের আরব, আরব ব্যতীত অন্য দেশীয় এবং যারা রাসুলের (সা) পরবর্তী যুগে বাস করবেন যাদের সাথে রাসুলের ব্যক্তিগত কোন সম্পর্ক নাই, তাদের সকলের জন্য এই আয়াত সমূহের সত্য প্রেরণ করা হয়েছে।
৪। ইহা আল্লাহ্রই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন ৫৪৫৬। আল্লাহ্ তো সর্বোচ্চ অনুগ্রহের মালিক।
৫৪৫৬। আল্লাহ্র বিচক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি পৃথিবীতে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন নেয়ামত দান করে থাকেন। আল্লাহ্ অফুরন্ত নেয়ামতের অধিকারী।
৫। যাদের উপরে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে যারা সে দায়িত্ব বহনে অকৃতকার্য হয়েছিলো, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে বৃহৎ গ্রন্থখন্ড বহনকারী গাধার ন্যায়, [ যে গ্রন্থের কিছু বুঝে না ] ৫৪৫৭। যে সম্প্রদায় আল্লাহ্র আয়াত সমূহ মিথ্যা গণ্য করেছে কত নিকৃষ্ট তাদের উপমা। যারা পাপ করে আল্লাহ্ তাদের সৎপথ প্রদর্শন করেন না।
৫৪৫৭। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ তাঁর বাণী পৃথিবীময় প্রচারের জন্য ইহুদীদের বিশেষ ভাবে নির্বাচিত করেছিলেন কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তারা প্রকৃত সত্যকে ভুলে যায় এবং দূর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে। 'তাওরাত' ছিল তাদের ধর্মগ্রন্থ যার মাধ্যমে আল্লাহ্র বাণী বিশ্ব মানবের জন্য প্রেরণ করা হয়। কিন্তু তারা সে বাণীর মর্মার্থ ভুলে যায় এবং আনুষ্ঠানিকতাকে তাদের ধর্মরূপে পরিগণিত করে। ইহুদীদের জাতিগত আভিজাত্য যা তারা দাবী করে তা তাদের কাজের দ্বারা প্রমাণিত হয় না। ইহুদীরা তাদের নিজ গোষ্ঠিভূত বহু পয়গম্বরকে হত্যা করেছে। যখনই তাদের নিজেদের মতের সাথে সত্যের বিরোধ ঘটেছে তখনই তারা তাদের হত্যা করেছে। এভাবে তারা তওরাতের শিক্ষাকে অস্বীকার করেছে। এদেরই উপমা হচ্ছে ভারবাহী গাধার ন্যায়। গাধা যেরূপ পিঠে কি বহন করে সে সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং বাহিত বোঝা দ্বারা সে কোন উপকৃত হয় না সেরূপ হচ্ছে ইহুদীদের দৃষ্টান্ত। তাওরাতের সত্য দ্বারা তারা উপকৃত হয় নাই।
মন্তব্য : আজকের বাংলাদেশের মুসলিমরা যারা শুধুমাত্র আরবীতে কোরাণ পড়ে কোরাণের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করেন কিন্তু এ শিক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে জীবনে প্রতিফলিত করেন না তাদের অবস্থাও ঐ ভারবাহী গাধার ন্যায় - পিঠে কি বহন করে জানে না। কোরাণে আল্লাহ্ কি হুকুম দিয়েছেন তা সম্বন্ধে তারা অজ্ঞ। দেখুন [ ২ : ৯১ ও টিকা ৯৬ ]।
৬। বল : " ওহে ইহুদীগণ ! ৫৪৫৮। যদি তোমরা মনে কর যে, সমস্ত মানব গোষ্ঠির মধ্য তোমরাই [ শুধুমাত্র ] আল্লাহ্র বন্ধু, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর - যদি তোমরা সত্যবাদী হও।" ৫৪৫৯
৫৪৫৮। আল্লাহ্ এই আয়াতে ইহুদীদের সম্বোধন করে দেন এই বলে যারা দাবী করে তারাই একমাত্র সত্যের ধারক, বাহক ও রক্ষক। তারা অবাধ্যভাবে আল্লাহ্র হুকুমকে অস্বীকার করে, কিন্তু কল্পনা করে যে তারাই স্বর্গীয় হুকুম সমূহের তত্বাবধায়ক এবং তাদের দাবী অন্যায় যে তারা কল্পনা তারা আল্লাহ্ কর্তৃক বিশেষ ভাবে নির্বাচিত হওয়ার ফলে শেষ বিচারের দিনে তারা শাস্তি থেকে অব্যহতি লাভ করবে [ ২ : ৮৮ ]। এতো আল্লাহ্র নিন্দা ব্যতীত, অন্য কিছু নয়। বর্তমানের ইহুদীদের যে ধর্ম তা আল্লাহ্র সত্যের বিরোধিতা বই অন্য কিছু নয়, যে ধর্ম তাদের রাসুল হযরত মুসা প্রচারিত ধর্মের বিকৃত রূপ।
৫৪৫৯। দেখুন সূরা [ ২ : ৯৪ - ৯৬ ] আয়াত। যদি ইহুদীরা প্রকৃতই বিশ্বাস করে যে, তারা আল্লাহ্র বন্ধু তবে তারা কেন মৃত্যু কামনা করে না ? কারণ মৃত্যু তাদের খুব শীঘ্রই আল্লাহ্র সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দান করবে। কিন্তু দেখা যায় ইহুদীরাই সকল জাতির মধ্যে পার্থিব জীবন ও সম্পদের জন্য তীব্র আকাঙ্খা পোষণ করে ও জাগতিক আরাম আয়েশের মাঝে জীবন অতিবাহিত করতে আগ্রহী। তারা ভালোভাবেই জানে যে, স্বার্থপরতা, সম্পদের আকাঙ্খা তাদের পাপের পথে ঠেলে দেবে এবং যা হবে আল্লাহ্র বাণীকে অস্বীকার করার শেষ পরিণতি। সুতারাং তারা মৃত্যুকে কখনও কামনা করবে না।
৭। কিন্তু তারা কখনও [মৃত্যু ] কামনা করবে না, কারণ তাদের হাত যে [ কাজ ] তাদের পূর্বে প্রেরণ করেছে [ তার জন্য ]। যারা পাপ করে আল্লাহ্ তাদের সম্বন্ধে ভালোভাবে অবগত আছেন।
৮। বল : " যে মৃত্যু থেকে তোমরা পলায়ন কর, সেই মৃত্যু তোমাদের অবশ্যই ধরবে। অতঃপর তোমাদের ফেরত পাঠানো হবে গোপন ও প্রকাশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ্র নিকট। এবং [ পৃথিবীতে ] তোমরা যা করতে তার [ সত্যতা ] সম্বন্ধে তোমাদের জানিয়ে দেয়া হবে। ৫৪৬০
৮। বল : " যে মৃত্যু থেকে তোমরা পলায়ন কর, সেই মৃত্যু তোমাদের অবশ্যই ধরবে। অতঃপর তোমাদের ফেরত পাঠানো হবে গোপন ও প্রকাশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ্র নিকট। এবং [ পৃথিবীতে ] তোমরা যা করতে তার [ সত্যতা ] সম্বন্ধে তোমাদের জানিয়ে দেয়া হবে। ৫৪৬০
৫৪৬০। পরলোকের জীবনে আমাদের ভুলে যাওয়া জীবনের সকল কর্ম টেলিভিশনের ছবির ন্যায় আমাদের দৃষ্টিপথে ভাস্বর হবে। আমরা দেখতে চাই বা না চাই আমাদের 'হস্ত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে" - আমাদের সে সকল কৃতকর্ম আমাদের জানিয়ে দেয়া হবে। আমাদের চোখের সম্মুখ থেকে বিভ্রান্তির মায়াজাল ছিন্ন হয়ে যাবে। প্রকৃত সত্যকে করা হবে ভাস্বর। আমাদের প্রতিটি কর্মের উদ্দেশ্য বা নিয়ত, গোপনীয়তা সব কিছু সেদিন হবে সর্ব সমক্ষে প্রকাশিত। আমাদের মনের গহনের ছোট ছোট পাপ যা পৃথিবীতে প্রকাশ লাভ করে নাই সেদিন আল্লাহ্ আমাদের দেখাবেন তার পরিণতি। দেখাবেন পাপ কি ভাবে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতাকে মলিন করে দেয় যার প্রভাব ইহকালকে অতিক্রম করে পরলোকের অনন্ত জীবন পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মানুষের নিজস্ব কাল্পনিক ধ্যান ধারণা সেদিন অন্তর্হিত হবে মরিচিকার ন্যায়।
