+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : মদিনায় অবতীর্ণ ছোট সূরাগুলির মধ্যে দশটি সূরার যে শ্রেণীর উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে এটি তৃতীয় নম্বর। এই শ্রেণীর সূরাগুলিতে মুসলিম উম্মার জীবন বিধানের বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে দেখুন ৫৭ নং সূরার ভূমিকা। এই সূরার বিশেষ বিষয় হচ্ছে যে কিভাবে উম্মার বিরুদ্ধে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা তাদেরই পরাজয়ের কারণ হয়েছিলো। অপরপক্ষে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে উম্মার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন দৃঢ় হয়। ইহুদী গোত্র বানু নাদিরের উদাহরণের সাহায্যে উপরের বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৪র্থ হিজরীর রবিউল মাসে।
এখান থেকে সূরাটির অবতীর্ণ কাল সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।
সার সংক্ষেপ : বিশ্বাসঘাতক ইহুদীদের বিতারণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। ইহুদীদের নিরাপদ দূর্গ ও মিত্র শক্তি তাদের রক্ষা করতে সক্ষম হয় নাই। সব কিছুই বৃথা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজেদের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। এ সকলই আল্লাহ্র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর। যিনি সুন্দর নামের যোগ্য। [ ৫৯ : ১ - ২৪ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৫৩৬৮। এই সূরাটির প্রারম্ভের আয়াত যা ৫৭ নং সূরার প্রারম্ভিক আয়াতের [ ৫৭ : ১ ] অনুরূপ। উভয় সূরার বিষয় বস্তু হচ্ছে আল্লাহ্র পরিকল্পনা ও বিচক্ষণ সদয় তত্বাবধান। পূর্বের সূরাটিতে মক্কা বিজয়ের উল্লেখের মাধ্যমে বিনয় ও নম্রতা শিক্ষাদান করা হয়েছে। এই সূরার ক্ষেত্রে বানু নাদের গোত্রের আলোচনা করা হয়েছে ; বিশ্বাসঘাতকতার জন্য যাদের মদিনার উপকন্ঠ থেকে বহিঃষ্কার করা হয়,কোনও রূপ সশস্ত্র সংঘর্ষ ব্যতীত।
৫৩৬৯। হিজরত করে রাসুলুল্লাহ্ (সা) মদিনা পৌঁছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে সর্ব প্রথম মদিনা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইহুদী গোত্র সমূহের সাথে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। এই চুক্তি ইতিহাসখ্যাত 'মদিনা চুক্তি ' যার দ্বারা ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে শান্তিতে বসবাসের অঙ্গীকার দান করে। মদিনা থেকে তিন মাইল দক্ষিণে মদিনা শহরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলো বানু নাদের নামক ইহুদী গোত্রের বাস, যদিও তারা মুসলিমদের সাথে শান্তিতে বসবাসের অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছিলো, কিন্তু তারা ৩য় হিজরী শাওয়াল মাসে সংঘটিত ওহদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এই ঘটনার চারমাস পরে ৪র্থ হিজরীর রবিউল মাসে এদের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রাসুলুল্লাহ্ [সা ] প্রথমে তাদের মদিনা থেকে চলে যেতে নির্দ্দেশ দেন। এই আদেশ অমান্য করায় তিনি তাদের দুর্গ অবরোধ করেন [ হি : ৪/ খৃ ৬২৫ ]। প্রথমে ইহুদীরা ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দান করে নাই - কারণ তাদের দূর্গ ও মিত্র শক্তির উপরে উপরে তাদের ছিলো অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু মুসলমানেরা যখন ইহুদীদের দুর্গ অবরোধ করলো, ইহুদীদের মিত্র শক্তিরা কোনও সাহায্য বা সহযোগীতার হাত সম্প্রসারিত করলো না, ফলে তারা কিছুদিন পরে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয় এবং মুসলমানেরা তাদের মদিনা ত্যাগে বাধ্য করেন। ইহুদীদের অধিকাংশ সিরিয়াতে তাদের আত্মীয় স্বজনের নিকট গমন করে, অবশিষ্ট অংশ খাইবারে গমন করে। দেখুন [ ৩৩ : ২৭ ] আয়াতের টিকা ৩৭০৫। বানু নাদেররা চুক্তি ভঙ্গের দ্বারা যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, মৃত্যুদন্ডই ছিলো তার উপযুক্ত জবাব। কিন্তু আল্লাহ্র নবী তাদের জীবন ভিক্ষা দেন এবং তাদের পশু সম্পদ ও অন্যান্য জিনিষসহ মদিনা ত্যাগের অনুমতি দান করেন।
৫৩৭০। "তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, তারা নির্বাসিত হবে।" - অর্থাৎ পবিত্র মুসলিম রক্তপাত ব্যতীত, কোনরকম সংঘর্ষ ব্যতীত এরূপ বিজয় লাভ ঘটবে তা ছিলো মুসলমানদের কল্পনাতীত।
৫৩৭১। ইহুদীদের ভূমিকা ছিলো দ্বৈত। তারা একদিকে মদিনার মুসলমানদের সাথে রাসুলের (সা) নেতৃত্বে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো, অপরদিকে তারা গোপনে মক্কার প্যাগানদের সাথে আবু জহলের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতো এবং তাদের সাথে মদিনার মোনাফেকরাও ষড়যন্ত্রে যোগদান করে। এমনকি আল্লাহ্র রাসুল (সা ) যখন একদিন তাদের মাঝে ছিলেন, তারা রাসুলুল্লাহ্ কে (সা ) হত্যার ষড়যন্ত্র করে। এ ভাবেই তারা আতিথেয়তার অবমাননা ও তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে। তাদের ধারণা ছিলো বিপদে মক্কার কোরাইশরা ও মদিনার মোনাফেকরা তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু প্রকৃত বিপদের সময়ে ইহুদীদের মিত্র শক্তিরা সাহায্যের জন্য কোনও চেষ্টাও করলো না। মুসলমানরো তাদের দুর্গ অবরোধ করে ছিলো এগারো দিন। এই এগারো দিনে তাদের অসহায়ত্বের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য জিনিষের সরবরাহ বন্দ করে দেয়া হয়। অবরোধের প্রয়োজনীয় কৌশল হিসেবে মুসলমানেরা দুর্গের বাইরের সকল খেজুর গাছ সমূহ কর্তন করে ফেলেন। তাদের অসহায়ত্ব তাদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। তাদের অন্তর শঙ্কায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা শর্তাধীনে আত্ম সমর্পন করে। কিন্তু তারা তাদের দুর্গ ত্যাগের প্রাক্কালে, নিজ হস্তে তাদের বাড়ী ঘর ধ্বংস করে। দেখুন পরবর্তী টিকা।
৫৩৭২। ইহুদীদের আত্মসমর্পনের পরে তাদের দশদিন সময় দেয়া হয়, পরিবার পরিজনসহ সে স্থান ত্যাগ করার জন্য এবং তাদের অনুমতি দেয়া হয় বহনযোগ্য বস্তু যা তাদের সাধ্যে কুলায় তা তাদের সাথে বহন করার জন্য। মুসলমানেরা যাতে তাদের আবাসসমূহ ব্যবহার করতে না পারে সে কারণে তারা নিজ হস্তে তাদের আবাস সমূহ ধ্বংস করে ফেলে। অবরোধের পরিণতিতে মুসলমানদের দ্বারা যে ধ্বংস সংঘটিত হওয়ার কথা ছিলো, সে কাজকে ইহুদীরা নিজেরাই ত্বরান্বিত ও সমাপ্ত করলো। এ ভাবেই আল্লাহ্র পরিকল্পনা কার্যকর হয়। যে জ্ঞানী, সেই শুধু পারে ঘটনার উর্দ্ধে উঠে হৃদয় দিয়ে অনুভবের মাধ্যমে আল্লাহ্র কৌশলী কার্যকে উপলব্ধি করতে। যার আছে অন্তর্দৃষ্টি বা মনের চোখ একমাত্র সেই পারে প্রকৃত ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে।
৫৩৭৩। বানু নাদের গোত্র যে মন্দ কাজ করেছিলো তার পরিবর্তে তাদের অক্ষত অবস্থায় বিতারণ ছিলো প্রকৃতপক্ষে খুব কম শাস্তি। এ শাস্তি ছিলো আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত। আল্লাহ্ তাদের আর একবার সুযোগ দান করেছিলেন কিন্তু তাদেরই সমগোত্র বানু কোরাইজারা সেরূপ সুযোগ লাভ করে নাই। বানু নাদেরদের ঘটনার দুবছর পরে অনুরূপ ঘটনায় বানু কোরাইজাদের পরিণতি ঘটেছিলো অন্যরূপ। দেখুন [ ৩৩ : ২৬ ] আয়াত ও টিকা।
৫৩৭৪। বানু নাদেরদের প্রতি শাস্তির কারণ গুলি নিম্নরূপ : তারা আল্লাহ্র রাসুলের (সা) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা আল্লাহ্র বাণীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করে এবং শত্রুদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ ভাবেই তারা আল্লাহ্র পবিত্র ইচ্ছা ও পরিকল্পনার বিরুদ্ধাচারণ করে। আল্লাহ্র বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং বিদ্রোহ করা ভয়াবহ অপরাধ। তবুও এক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাদের জন্য নমনীয় শাস্তির ব্যবস্থা করেন।
৫৩৭৫। অপ্রয়োজনে ফলের গাছ কাটা বা শষ্যের ক্ষতি করা বা যে কোন ধ্বংসযজ্ঞ, যা বিশেষতঃ যুদ্ধের সময়ে সংঘটিত হয়, এরূপ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামে বিনা প্রয়োজনে শত্রুদের সম্পদ, বৃক্ষ, শষ্যের কোন ক্ষতি করা নিষিদ্ধ তবে সমর কৌশলের প্রয়োজনে, শত্রুদের উপরে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যতটুকু ক্ষতি করা প্রয়োজন তা করা বিধিসম্মত। তবে যতদূর সম্ভব বৃক্ষ ও শষ্যের ক্ষতি সাধন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এগুলি হচ্ছে আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত আইন যা মুসলিমরা সমরক্ষেত্রে মেনে চলতেন।
মন্তব্য : এরই প্রেক্ষিতে ১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনাটি কতটুকু যুক্তি সঙ্গত ; বিবেকবান মুসলিমদের তা চিন্তা করতে হবে।
৫৩৭৬। ''বিদ্রোহী, সীমালংঘনকারী'' অর্থাৎ এখানে বানু নাদের গোত্রকে বুঝানো হয়েছে। এদের উদ্ধতপনা, অহংকারকে আল্লাহ্ লাঞ্ছনার মাধ্যমে বিনীত করেন। তাদের দুরভিসন্ধি করার ক্ষমতাকে আল্লাহ্ ধ্বংস করেন। যদিও এখানে 'সীমালংঘনকারী' শব্দটি দ্বারা নির্দ্দিষ্ট পাপাচারী গোষ্ঠিকে বুঝানো হয়েছে, তবে তা পৃথিবীর সর্বকালের পাপাচারীদের জন্য তা প্রযোজ্য।
৫৩৭৭। এই অবরোধকালে কোন অশ্বারোহী বাহিনী বা উষ্ট্রবাহিনী ব্যবহার হয় নাই। 'ফায়' শব্দটির অর্থ যে সম্পদ যুদ্দ ব্যতীত হস্তগত হয় ও যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় রাসুলের (সা ) তত্বাবধানে। প্রকৃত পক্ষে বানু নাদেররা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করে। এ তো আল্লাহ্রই কুদরত। আল্লাহ্ তাদের অন্তরের মাঝে ভয়, শঙ্কা ও ত্রাসের সঞ্চার করেন যার ফলে তারা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করে। দেখুন [ ৫৯ : ২ ] আয়াত।
৫৩৭৮। আল্লাহ্র পবিত্র পরিকল্পনা কত বিভিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয় তা অনুধাবন করা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে অসাধ্য। কখনও তা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয়, কখনও তা বিনা যুদ্ধে হয়। এতো আল্লাহ্রই ক্ষমতার প্রকাশ মাত্র।
সূরা হাশ্র
Page 1 of 3
সূরা হাশ্র বা জনতা -৫৯
২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : মদিনায় অবতীর্ণ ছোট সূরাগুলির মধ্যে দশটি সূরার যে শ্রেণীর উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে এটি তৃতীয় নম্বর। এই শ্রেণীর সূরাগুলিতে মুসলিম উম্মার জীবন বিধানের বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে দেখুন ৫৭ নং সূরার ভূমিকা। এই সূরার বিশেষ বিষয় হচ্ছে যে কিভাবে উম্মার বিরুদ্ধে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা তাদেরই পরাজয়ের কারণ হয়েছিলো। অপরপক্ষে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে উম্মার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন দৃঢ় হয়। ইহুদী গোত্র বানু নাদিরের উদাহরণের সাহায্যে উপরের বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৪র্থ হিজরীর রবিউল মাসে।
এখান থেকে সূরাটির অবতীর্ণ কাল সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।
সার সংক্ষেপ : বিশ্বাসঘাতক ইহুদীদের বিতারণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। ইহুদীদের নিরাপদ দূর্গ ও মিত্র শক্তি তাদের রক্ষা করতে সক্ষম হয় নাই। সব কিছুই বৃথা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজেদের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। এ সকলই আল্লাহ্র জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর। যিনি সুন্দর নামের যোগ্য। [ ৫৯ : ১ - ২৪ ]।
সূরা হাশ্র বা জনতা -৫৯
২৪ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে; সকলেই আল্লাহ্র প্রশংসা এবং মহিমা ঘোষণা করে ৫৩৬৮। নিশ্চয়ই তিনি মহাশক্তিধর, প্রজ্ঞাময়।
৫৩৬৮। এই সূরাটির প্রারম্ভের আয়াত যা ৫৭ নং সূরার প্রারম্ভিক আয়াতের [ ৫৭ : ১ ] অনুরূপ। উভয় সূরার বিষয় বস্তু হচ্ছে আল্লাহ্র পরিকল্পনা ও বিচক্ষণ সদয় তত্বাবধান। পূর্বের সূরাটিতে মক্কা বিজয়ের উল্লেখের মাধ্যমে বিনয় ও নম্রতা শিক্ষাদান করা হয়েছে। এই সূরার ক্ষেত্রে বানু নাদের গোত্রের আলোচনা করা হয়েছে ; বিশ্বাসঘাতকতার জন্য যাদের মদিনার উপকন্ঠ থেকে বহিঃষ্কার করা হয়,কোনও রূপ সশস্ত্র সংঘর্ষ ব্যতীত।
২। তিনিই, কিতাবীদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী ৫৩৬৯, তাদের প্রথম বার সমবেত ভাবে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, তারা নির্বাসিত হবে ৫৩৭০, এবং তারা ধারণা করেছিলো যে, তাদের [ দুর্ভেদ্য ] দুর্গগুলি তাদের আল্লাহ্র [ আজাব ] থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহ্র [শাস্তি ] এমন এক দিক থেকে এলো, যা ছিলো তাদের ধারণাতীত ৫৩৭১ এবং যা তাদের অন্তরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলো। সুতারাং তারা তাদের নিজ হস্ত দ্বারা ও মোমেনদের হস্ত দ্বারা নিজেদের বাড়ী -ঘর ধ্বংস করে ফেললো ৫৩৭২। হে চক্ষুষ্মান ! এর থেকে উপদেশ গ্রহণ কর।
৫৩৬৯। হিজরত করে রাসুলুল্লাহ্ (সা) মদিনা পৌঁছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে সর্ব প্রথম মদিনা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইহুদী গোত্র সমূহের সাথে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। এই চুক্তি ইতিহাসখ্যাত 'মদিনা চুক্তি ' যার দ্বারা ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে শান্তিতে বসবাসের অঙ্গীকার দান করে। মদিনা থেকে তিন মাইল দক্ষিণে মদিনা শহরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিলো বানু নাদের নামক ইহুদী গোত্রের বাস, যদিও তারা মুসলিমদের সাথে শান্তিতে বসবাসের অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছিলো, কিন্তু তারা ৩য় হিজরী শাওয়াল মাসে সংঘটিত ওহদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। এই ঘটনার চারমাস পরে ৪র্থ হিজরীর রবিউল মাসে এদের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রাসুলুল্লাহ্ [সা ] প্রথমে তাদের মদিনা থেকে চলে যেতে নির্দ্দেশ দেন। এই আদেশ অমান্য করায় তিনি তাদের দুর্গ অবরোধ করেন [ হি : ৪/ খৃ ৬২৫ ]। প্রথমে ইহুদীরা ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দান করে নাই - কারণ তাদের দূর্গ ও মিত্র শক্তির উপরে উপরে তাদের ছিলো অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু মুসলমানেরা যখন ইহুদীদের দুর্গ অবরোধ করলো, ইহুদীদের মিত্র শক্তিরা কোনও সাহায্য বা সহযোগীতার হাত সম্প্রসারিত করলো না, ফলে তারা কিছুদিন পরে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয় এবং মুসলমানেরা তাদের মদিনা ত্যাগে বাধ্য করেন। ইহুদীদের অধিকাংশ সিরিয়াতে তাদের আত্মীয় স্বজনের নিকট গমন করে, অবশিষ্ট অংশ খাইবারে গমন করে। দেখুন [ ৩৩ : ২৭ ] আয়াতের টিকা ৩৭০৫। বানু নাদেররা চুক্তি ভঙ্গের দ্বারা যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো, মৃত্যুদন্ডই ছিলো তার উপযুক্ত জবাব। কিন্তু আল্লাহ্র নবী তাদের জীবন ভিক্ষা দেন এবং তাদের পশু সম্পদ ও অন্যান্য জিনিষসহ মদিনা ত্যাগের অনুমতি দান করেন।
৫৩৭০। "তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, তারা নির্বাসিত হবে।" - অর্থাৎ পবিত্র মুসলিম রক্তপাত ব্যতীত, কোনরকম সংঘর্ষ ব্যতীত এরূপ বিজয় লাভ ঘটবে তা ছিলো মুসলমানদের কল্পনাতীত।
৫৩৭১। ইহুদীদের ভূমিকা ছিলো দ্বৈত। তারা একদিকে মদিনার মুসলমানদের সাথে রাসুলের (সা) নেতৃত্বে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলো, অপরদিকে তারা গোপনে মক্কার প্যাগানদের সাথে আবু জহলের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতো এবং তাদের সাথে মদিনার মোনাফেকরাও ষড়যন্ত্রে যোগদান করে। এমনকি আল্লাহ্র রাসুল (সা ) যখন একদিন তাদের মাঝে ছিলেন, তারা রাসুলুল্লাহ্ কে (সা ) হত্যার ষড়যন্ত্র করে। এ ভাবেই তারা আতিথেয়তার অবমাননা ও তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে। তাদের ধারণা ছিলো বিপদে মক্কার কোরাইশরা ও মদিনার মোনাফেকরা তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু প্রকৃত বিপদের সময়ে ইহুদীদের মিত্র শক্তিরা সাহায্যের জন্য কোনও চেষ্টাও করলো না। মুসলমানরো তাদের দুর্গ অবরোধ করে ছিলো এগারো দিন। এই এগারো দিনে তাদের অসহায়ত্বের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য জিনিষের সরবরাহ বন্দ করে দেয়া হয়। অবরোধের প্রয়োজনীয় কৌশল হিসেবে মুসলমানেরা দুর্গের বাইরের সকল খেজুর গাছ সমূহ কর্তন করে ফেলেন। তাদের অসহায়ত্ব তাদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। তাদের অন্তর শঙ্কায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং তারা শর্তাধীনে আত্ম সমর্পন করে। কিন্তু তারা তাদের দুর্গ ত্যাগের প্রাক্কালে, নিজ হস্তে তাদের বাড়ী ঘর ধ্বংস করে। দেখুন পরবর্তী টিকা।
৫৩৭২। ইহুদীদের আত্মসমর্পনের পরে তাদের দশদিন সময় দেয়া হয়, পরিবার পরিজনসহ সে স্থান ত্যাগ করার জন্য এবং তাদের অনুমতি দেয়া হয় বহনযোগ্য বস্তু যা তাদের সাধ্যে কুলায় তা তাদের সাথে বহন করার জন্য। মুসলমানেরা যাতে তাদের আবাসসমূহ ব্যবহার করতে না পারে সে কারণে তারা নিজ হস্তে তাদের আবাস সমূহ ধ্বংস করে ফেলে। অবরোধের পরিণতিতে মুসলমানদের দ্বারা যে ধ্বংস সংঘটিত হওয়ার কথা ছিলো, সে কাজকে ইহুদীরা নিজেরাই ত্বরান্বিত ও সমাপ্ত করলো। এ ভাবেই আল্লাহ্র পরিকল্পনা কার্যকর হয়। যে জ্ঞানী, সেই শুধু পারে ঘটনার উর্দ্ধে উঠে হৃদয় দিয়ে অনুভবের মাধ্যমে আল্লাহ্র কৌশলী কার্যকে উপলব্ধি করতে। যার আছে অন্তর্দৃষ্টি বা মনের চোখ একমাত্র সেই পারে প্রকৃত ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে।
৩। এবং আল্লাহ্ যদি তাদের জন্য নির্বাসনের আদেশ না দিতেন ৫৩৭৩, তবে তিনি এই পৃথিবীতেই তাদের শাস্তি দান করতেন। এবং পরলোকে তাদের জন্য [ নিশ্চয়ই ] আগুনের শাস্তি রয়েছে।
৫৩৭৩। বানু নাদের গোত্র যে মন্দ কাজ করেছিলো তার পরিবর্তে তাদের অক্ষত অবস্থায় বিতারণ ছিলো প্রকৃতপক্ষে খুব কম শাস্তি। এ শাস্তি ছিলো আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত। আল্লাহ্ তাদের আর একবার সুযোগ দান করেছিলেন কিন্তু তাদেরই সমগোত্র বানু কোরাইজারা সেরূপ সুযোগ লাভ করে নাই। বানু নাদেরদের ঘটনার দুবছর পরে অনুরূপ ঘটনায় বানু কোরাইজাদের পরিণতি ঘটেছিলো অন্যরূপ। দেখুন [ ৩৩ : ২৬ ] আয়াত ও টিকা।
৪। তার কারণ তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলো। এবং কেহ যদি আল্লাহ্র বিরুদ্ধাচারণ করে ৫৩৭৪ ; নিশ্চয় আল্লাহ্ কঠিন শাস্তিদাতা।
৫৩৭৪। বানু নাদেরদের প্রতি শাস্তির কারণ গুলি নিম্নরূপ : তারা আল্লাহ্র রাসুলের (সা) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা আল্লাহ্র বাণীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করে এবং শত্রুদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এ ভাবেই তারা আল্লাহ্র পবিত্র ইচ্ছা ও পরিকল্পনার বিরুদ্ধাচারণ করে। আল্লাহ্র বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং বিদ্রোহ করা ভয়াবহ অপরাধ। তবুও এক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাদের জন্য নমনীয় শাস্তির ব্যবস্থা করেন।
৫। [ হে মুসলমানেরা ! ] তোমরা সতেজ খেজুর গাছগুলি কাট, অথবা তাদের মূলের উপরে স্থির রেখে দাও, তা ঘটে থাকে আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে ৫৩৭৫, এবং তা এ জন্য যে, আল্লাহ্ বিদ্রোহী, সীমালংঘনকারীদের যেনো অপমানে আচ্ছাদিত করতে পারেন ৫৩৭৬।
৫৩৭৫। অপ্রয়োজনে ফলের গাছ কাটা বা শষ্যের ক্ষতি করা বা যে কোন ধ্বংসযজ্ঞ, যা বিশেষতঃ যুদ্ধের সময়ে সংঘটিত হয়, এরূপ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামে বিনা প্রয়োজনে শত্রুদের সম্পদ, বৃক্ষ, শষ্যের কোন ক্ষতি করা নিষিদ্ধ তবে সমর কৌশলের প্রয়োজনে, শত্রুদের উপরে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যতটুকু ক্ষতি করা প্রয়োজন তা করা বিধিসম্মত। তবে যতদূর সম্ভব বৃক্ষ ও শষ্যের ক্ষতি সাধন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এগুলি হচ্ছে আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত আইন যা মুসলিমরা সমরক্ষেত্রে মেনে চলতেন।
মন্তব্য : এরই প্রেক্ষিতে ১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনাটি কতটুকু যুক্তি সঙ্গত ; বিবেকবান মুসলিমদের তা চিন্তা করতে হবে।
৫৩৭৬। ''বিদ্রোহী, সীমালংঘনকারী'' অর্থাৎ এখানে বানু নাদের গোত্রকে বুঝানো হয়েছে। এদের উদ্ধতপনা, অহংকারকে আল্লাহ্ লাঞ্ছনার মাধ্যমে বিনীত করেন। তাদের দুরভিসন্ধি করার ক্ষমতাকে আল্লাহ্ ধ্বংস করেন। যদিও এখানে 'সীমালংঘনকারী' শব্দটি দ্বারা নির্দ্দিষ্ট পাপাচারী গোষ্ঠিকে বুঝানো হয়েছে, তবে তা পৃথিবীর সর্বকালের পাপাচারীদের জন্য তা প্রযোজ্য।
৬। আল্লাহ্ তাঁর রসুলকে যে অনুগ্রহ দান করেছেন, [এবং যা কেড়ে নিয়েছেন] ইহুদীদের থেকে - তার জন্য তোমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ কর নাই ৫৩৭৭। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর রাসুলদের, যার উপরে খুশী ক্ষমতা দান করেন। সকল কিছুর উপরে আল্লাহ্ শক্তিমান ৫৩৭৮।
৫৩৭৭। এই অবরোধকালে কোন অশ্বারোহী বাহিনী বা উষ্ট্রবাহিনী ব্যবহার হয় নাই। 'ফায়' শব্দটির অর্থ যে সম্পদ যুদ্দ ব্যতীত হস্তগত হয় ও যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় রাসুলের (সা ) তত্বাবধানে। প্রকৃত পক্ষে বানু নাদেররা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করে। এ তো আল্লাহ্রই কুদরত। আল্লাহ্ তাদের অন্তরের মাঝে ভয়, শঙ্কা ও ত্রাসের সঞ্চার করেন যার ফলে তারা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পন করে। দেখুন [ ৫৯ : ২ ] আয়াত।
৫৩৭৮। আল্লাহ্র পবিত্র পরিকল্পনা কত বিভিন্নভাবে বাস্তবায়িত হয় তা অনুধাবন করা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে অসাধ্য। কখনও তা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হয়, কখনও তা বিনা যুদ্ধে হয়। এতো আল্লাহ্রই ক্ষমতার প্রকাশ মাত্র।
