+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এ পর্যন্ত আমরা কোরাণের দশ ভাগের নয়ভাগ শেষ করেছি। কোরাণের সূরাগুলির ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তাদের বিশৃঙ্খল ভাবে সাজানো হয় নাই। তাদের অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের ক্রমপঞ্জি অনুযায়ী না সাজিয়ে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সাজানো যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। এ পর্যন্ত নূতন উম্মতের সৃষ্টি এবং তাদের আধ্যাত্মিক বিকাশের বিধান সমূহের বিবরণ বর্ণনা করা শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট এক দশমাংশের বিবরণকে দুভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে দশটি সূরা এগুলি হচ্ছে সূরা নং ৫৭ নং থেকে ৬৬ পর্যন্ত। এই সূরাগুলি মদিনাতে অবতীর্ণ হয় এবং প্রত্যেকটি সূরাতে মুসলিম উম্মার সামাজিক জীবনের বিশেষ বিশেষ বিষয়ের উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সূরা নং ৬৭ থেকে সূরা নং ১১৪ পর্যন্ত যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গীতধর্মী। অর্থাৎ গানের ন্যায় ছোট্ট কবিতা। এগুলি প্রতিটিতেই আধ্যাত্মিক জীবনের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে যার ভাষার সৌন্দর্য অতুলনীয়, যা অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।
বর্তমান সূরাটির বিষয়বস্তু হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতে - বিনয়ের বিপরীতে আত্মম্ভরিতা ও একগুঁয়ে অহংকারের অবস্থান। সাবধান করা হয়েছে যে, সংসার বিমুখতা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা নয়। মদিনাতে অবতীর্ণ এই সূরাটি সম্ভবতঃ মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয় ৮ম হিজরীতে।
সার সংক্ষেপ : আল্লাহ্র ক্ষমতা ও জ্ঞান সর্ব কিছুকে পরিবৃত্ত করে রেখেছে। হৃদয়ের সন্দেহ ভয়, উদ্যমহীনতা ত্যাগ করে বিনয়, দান এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। পৃথিবীর কর্মজগত থেকে অবসর নেয়ার মধ্যে কোন আত্মিক মুক্তি নাই। [ ৫৭ : ১- ২৯ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৫২৭৪। হাদীদ বা লৌহ। লোহা হচ্ছে মজবুত শক্ত ও স্থায়ীত্বের প্রতীক। লোহার প্রকৃত গুণাবলী ও উৎকর্ষতা এখানেই নিহিত। এই সূরার মূল বিষয়বস্তুকে এরই পটভূমিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রকৃত বিনয়, একাগ্রতা ও বিশ্বস্ততা এবং দানের পটভূমিতে যার বিপরীত পটভূমি হচ্ছে সন্ন্যাস জীবন ও কৃপণতা। দেখুন নীচের আয়াত [ ৫৭ : ২৫ ]।
৫২৭৫। পূর্বের সূরার [ ৫৬: ৯৬ ] আয়াতের সাথে এই আয়াতকে সংযুক্ত করলে সমগ্র আয়াতটির গূঢ় অর্থ অনুধাবন করা যায়।
৫২৭৬। 'Batin' - এই শব্দটির ভাবধারা হচ্ছে "গুপ্ত " অর্থাৎ যা কিছু প্রকাশ্য তার বিপরীত। আল্লাহ্র নিদর্শন সর্বত্র বিদ্যমান। আমাদের সর্ব অবয়ব ভিতর ও বাহিরে সর্বত্র তাঁর নিদর্শন বিদ্যমান। সকল ভালো জিনিষের অভ্যন্তরে তাঁরই স্বাক্ষর নিহিত। এই আয়াতে আল্লাহ্র গুণাবলীকে জোড়ায় জোড়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। "প্রথম এবং শেষ " "ব্যক্ত এবং অব্যক্ত'' ; " ক্ষমতা এবং জ্ঞান" ; জীবন ও মৃত্যুর মালিক"; ইত্যাদি শব্দগুলি আল্লাহ্র গুণাবলী প্রকাশের জন্য জোড়ায় জোড়ায় ব্যবহার দ্বারা মানুষের জীবনের ক্ষুদ্রতা, নশ্বরতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এ ভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে যে "জীবন বিমুখতা ও নম্রতা বা বিনয় " অমিতব্যয়িতা ও দান এক নয়।
৫২৭৭। "ছয় দিবসে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।" - এই বিবরণ অন্যান্য আরও সূরাতে বিদ্যমান। যেমন দেখুন [ ৪১ : ৯ - ১২ ] ও এগুলির টিকা এবং [ ৭: ৫৪ ] আয়াত ও টিকা ১০৩৯। আরও দেখুন নিম্ন লিখিত আয়াত সমূহ [ ১০: ৩ ] ; [ ১১ : ৭ ] ; [ ২৫ : ৫৯ ] [৩২ : ৪ ]।
৫২৭৮। দেখুন [ ১০ : ৩ ] আয়াত ও টিকা ১৩৮৬। বাইবেলের বর্ণনার ন্যায় এ কথা বিশ্বাস করার কোনও যৌক্তিকতা নাই যে, আল্লাহ্ ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করে সপ্তম দিনে বিশ্রামে চলে যান। এই আয়াতটিকে এ ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়; সর্ব সৃষ্টির বাহ্যিক আকৃতি সৃষ্টি হয়েছে ছয় দিনে। কিন্তু আল্লাহ্র সৃষ্টি ক্ষমতা এখানেই থেমে যায় নাই। বিবর্তনের মাধ্যমে তা ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছে। সর্ব সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মাঝে তিনি বিদ্যমান, তাঁর সৃষ্টি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। এভাবেই তিনি সর্বদা তাঁর আরশে বিদ্যমান। " অর্থাৎ পৃথিবীর সকল কিছুই আল্লাহ্র প্রবর্তিত আইন দ্বারা পরিচালিত হয় ; তিনি সর্বজ্ঞ।
৫২৭৯। আল্লাহ্ সর্বত্র বিদ্যমান। তিনি সময় ও স্থানের উর্দ্ধে। তবুও তিনি সকল স্থানে ও সকল সময়ে বিরাজমান। মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলেও তাঁর উপস্থিতি সর্বদা বিদ্যমান। তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা। এই অনুভব যদি মানুষ আত্মার মাঝে ধারণ করতে পারে তবে তার পক্ষে কোনও পাপ কাজ করা অসম্ভব।
৫২৮০। দেখুন আয়াত [ ৫৭ : ২ ] যেখানে "আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তারই অধীনে" বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ্র সর্বময় কর্তৃত্বকে প্রকাশ করার জন্য। সেই একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে বিমূর্ত ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য। বলা হয়েছে যা বিমূর্ত বা অদৃশ্য যেমন মানুষের চিন্তার জগত, তার উপরেও আল্লাহ্ কর্তৃত্বশালী। - দৃশ্য বা অদৃশ্য সব কিছুই শেষ পর্যন্ত তার নিকট ফিরে যাবে। আল্লাহ্র জ্ঞান সর্ব বিষয়ে অবগত। মানুষের নিঃসঙ্গ চিন্তাধারা আল্লাহ্র জ্ঞানের বাইরে না।
৫২৮১। পৃথিবীতে ক্ষমতা, প্রভাব -প্রতিপত্তি, অর্থ-সম্পদ, মেধা -মননশক্তি; প্রতিভা ; সব কিছুই আল্লাহ্র দান। যে কেউ আল্লাহ্র এই সব দানের যে কোন নেয়ামত লাভ করে থাকে; তার জন্য সেই নেয়ামতের দায়িত্ব ভারও অর্পিত হয়ে থাকে। আল্লাহ্ এই সব নেয়ামত দান করেন কারণ, মানুষ যাতে এ সবের ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভে ধন্য হতে পারে। সৎ কাজে মানুষ উৎসাহী ও প্রতিযোগীতামূলক হবে, আর তাই-ই হচ্ছে প্রকৃত দান করা বা ব্যয় করা। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য "ব্যয়" বা দান করাই হচ্ছে বিশ্বাস বা ঈমান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। এই আয়াতে আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন যে, আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্র আইন অনুযায়ী, যারা সৎকাজে ব্যয় করে তাদের জন্য আছে মহাপুরষ্কার।
৫২৮২। " আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনার তোমাদের কি কারণ থাকতে পারে ? " এই ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা সূদূর প্রসারী এবং গভীর যা শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়। শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই বাক্যটির মূল ভাবার্থ হচ্ছে : " পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে চর্তুদিকে আল্লাহ্র এত নিদর্শন ছড়ানো আছে যে, তা দেখে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করাই অস্বাভাবিক ইত্যাদি। " একই রূপ বাক্যের প্রয়োগ করা হয়েছে আয়াত ১০।
৫২৮৩। এই অংগীকার' কে দুভাবে প্রকাশ করা যায়।
১) যখন কেউ আল্লাহ্র একত্ব ও কর্তৃত্বকে স্বীকার করে নেয় তখন পরোক্ষভাবে তার উপরে আল্লাহ্র সাধারণ হুকুম সমূহ মানার অপ্রকাশ্য বাধ্যবাধকতা থাকে যেমন আল্লাহ্র সেবা করা ও মনুষত্বের সেবা করা ইত্যাদি। দেখুন অংগীকার পূর্ণ করার ব্যাপারে আয়াত [ ৫ : ১ ] ও টিকা ৬৮২।
২) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানেরা রাসুলের (সা) সাথে অংগীকারে আবদ্ধ হন যে তারা আল্লাহ্র সেবায় নিয়োজিত থাকবেন এবং রাসুলের (সা) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। যেমন : আকাবা উপত্যকার অংগীকার [ দেখুন ৫ : ৭ ] আয়াত ও টিকা ৭০৫ ] এবং হুদায়বিয়া প্রান্তরে রাসুলের (সা) প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার অংগীকার দেখুন [ ৪৮ : ১০ ] আয়াত ও টিকা ৪৮৭৭। এই চুক্তিদ্বয় ইহুদীদের সিনাই পর্বতে হযরত মুসার সাথে সম্পাদিত চুক্তির সাথে তুলনীয়। দেখুন [ ২ : ৬৩ ] আয়াত ও টিকা নং ৭৮। " আল্লাহ্ তোমাদের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করিয়াছেন।" এই বাক্যটি দ্বারা উপরের দুইটি অংগীকারকেই বোঝানো হয়।
৫২৮৪। "বান্দার প্রতি " এর দ্বারা রাসুল (সা) কে বোঝানো হয়েছে। তাঁর নিকট যে সব নিদর্শন প্রেরণ করা হয় সেগুলি হলো ১) কোরাণের আয়াত সমূহ এবং ২) রাসুলের (সা) জীবন ও কাজ। রাসুলের (সা ) জীবনের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করেছেন।
৫২৮৫। "আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী আল্লাহ্রই অধিকারভুক্ত।" দেখুন [ ৩ : ১৮০ ] আয়াত ও টিকা ৪৮৫। আরও দেখুন [৬ : ১৬৫ ] আয়াতের টিকা ৯৮৮ এবং [ ১৫ : ২৩ ] আয়াতের টিকা ১৯৬৪।
৫২৮৬। মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমানেরা কোরাইশদের সর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং ইসলাম ধীরে ধীরে আরবের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের সীমানায় অগ্রসর হয় এবং পৃথিবীতে মুসলমান তথা ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষা প্রদর্শন করতে হয়েছে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের সংগ্রাম ও ত্যাগ ছিলো অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক। হত্যা, অত্যাচার ও নির্যাতন ছিলো তাদের নিত্য সঙ্গী। এই হচ্ছে আয়াতের পটভূমি। তবে এর আবেদন সার্বজনীন। যুগ কাল অতিক্রান্ত। যারা আল্লাহ্র রাস্তায় সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করে তারা সকল সময়েই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু যারা সফলতা লাভের পূর্বে অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেও আল্লাহ্র রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করে থাকে তারা অধিক সম্মানীয় আল্লাহ্র চোখে।
সূরা হাদীদ
Page 1 of 4
সূরা হাদীদ বা লৌহ - ৫৭
২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এ পর্যন্ত আমরা কোরাণের দশ ভাগের নয়ভাগ শেষ করেছি। কোরাণের সূরাগুলির ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তাদের বিশৃঙ্খল ভাবে সাজানো হয় নাই। তাদের অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের ক্রমপঞ্জি অনুযায়ী না সাজিয়ে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সাজানো যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। এ পর্যন্ত নূতন উম্মতের সৃষ্টি এবং তাদের আধ্যাত্মিক বিকাশের বিধান সমূহের বিবরণ বর্ণনা করা শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট এক দশমাংশের বিবরণকে দুভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে দশটি সূরা এগুলি হচ্ছে সূরা নং ৫৭ নং থেকে ৬৬ পর্যন্ত। এই সূরাগুলি মদিনাতে অবতীর্ণ হয় এবং প্রত্যেকটি সূরাতে মুসলিম উম্মার সামাজিক জীবনের বিশেষ বিশেষ বিষয়ের উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সূরা নং ৬৭ থেকে সূরা নং ১১৪ পর্যন্ত যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গীতধর্মী। অর্থাৎ গানের ন্যায় ছোট্ট কবিতা। এগুলি প্রতিটিতেই আধ্যাত্মিক জীবনের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে যার ভাষার সৌন্দর্য অতুলনীয়, যা অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।
বর্তমান সূরাটির বিষয়বস্তু হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতে - বিনয়ের বিপরীতে আত্মম্ভরিতা ও একগুঁয়ে অহংকারের অবস্থান। সাবধান করা হয়েছে যে, সংসার বিমুখতা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা নয়। মদিনাতে অবতীর্ণ এই সূরাটি সম্ভবতঃ মক্কা বিজয়ের পরে অবতীর্ণ হয় ৮ম হিজরীতে।
সার সংক্ষেপ : আল্লাহ্র ক্ষমতা ও জ্ঞান সর্ব কিছুকে পরিবৃত্ত করে রেখেছে। হৃদয়ের সন্দেহ ভয়, উদ্যমহীনতা ত্যাগ করে বিনয়, দান এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে আল্লাহ্র হেদায়েতের আলো অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। পৃথিবীর কর্মজগত থেকে অবসর নেয়ার মধ্যে কোন আত্মিক মুক্তি নাই। [ ৫৭ : ১- ২৯ ]।
সূরা হাদীদ বা লৌহ - ৫৭
২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহ্র প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করে ৫২৭৫। নিশ্চয়ই তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
৫২৭৪। হাদীদ বা লৌহ। লোহা হচ্ছে মজবুত শক্ত ও স্থায়ীত্বের প্রতীক। লোহার প্রকৃত গুণাবলী ও উৎকর্ষতা এখানেই নিহিত। এই সূরার মূল বিষয়বস্তুকে এরই পটভূমিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রকৃত বিনয়, একাগ্রতা ও বিশ্বস্ততা এবং দানের পটভূমিতে যার বিপরীত পটভূমি হচ্ছে সন্ন্যাস জীবন ও কৃপণতা। দেখুন নীচের আয়াত [ ৫৭ : ২৫ ]।
৫২৭৫। পূর্বের সূরার [ ৫৬: ৯৬ ] আয়াতের সাথে এই আয়াতকে সংযুক্ত করলে সমগ্র আয়াতটির গূঢ় অর্থ অনুধাবন করা যায়।
২। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই অধীনে। তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। সকল কিছুর উপরে তিনি ক্ষমতাশালী।
৩। তিনিই আদি এবং তিনিই অন্ত। তিনি প্রকাশ্য এবং তিনিই গুপ্ত ৫২৭৬। সকল কিছুর পূর্ণ জ্ঞান তিনি রাখেন।
৩। তিনিই আদি এবং তিনিই অন্ত। তিনি প্রকাশ্য এবং তিনিই গুপ্ত ৫২৭৬। সকল কিছুর পূর্ণ জ্ঞান তিনি রাখেন।
৫২৭৬। 'Batin' - এই শব্দটির ভাবধারা হচ্ছে "গুপ্ত " অর্থাৎ যা কিছু প্রকাশ্য তার বিপরীত। আল্লাহ্র নিদর্শন সর্বত্র বিদ্যমান। আমাদের সর্ব অবয়ব ভিতর ও বাহিরে সর্বত্র তাঁর নিদর্শন বিদ্যমান। সকল ভালো জিনিষের অভ্যন্তরে তাঁরই স্বাক্ষর নিহিত। এই আয়াতে আল্লাহ্র গুণাবলীকে জোড়ায় জোড়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। "প্রথম এবং শেষ " "ব্যক্ত এবং অব্যক্ত'' ; " ক্ষমতা এবং জ্ঞান" ; জীবন ও মৃত্যুর মালিক"; ইত্যাদি শব্দগুলি আল্লাহ্র গুণাবলী প্রকাশের জন্য জোড়ায় জোড়ায় ব্যবহার দ্বারা মানুষের জীবনের ক্ষুদ্রতা, নশ্বরতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এ ভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে যে "জীবন বিমুখতা ও নম্রতা বা বিনয় " অমিতব্যয়িতা ও দান এক নয়।
৪। তিনিই আকাশমন্ডলী এবং পৃথিবী ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন ৫২৭৭। এবং অতঃপর তিনি [ কর্তৃত্বের ] আসনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ৫৭৭৮। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যা কিছু প্রবেশ করে ও যা কিছু তা থেকে বের হয়, এবং আকাশ থেকে যা কিছু নামে ও যা কিছু আকাশে উত্থিত হয়, তিনি [ সব ] জানেন। তোমরা যেখানেই থাক না কেন - তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন ৫২৭৯। তোমরা যা কর, আল্লাহ্ ভালোভাবেই তা দেখেন।
৫২৭৭। "ছয় দিবসে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।" - এই বিবরণ অন্যান্য আরও সূরাতে বিদ্যমান। যেমন দেখুন [ ৪১ : ৯ - ১২ ] ও এগুলির টিকা এবং [ ৭: ৫৪ ] আয়াত ও টিকা ১০৩৯। আরও দেখুন নিম্ন লিখিত আয়াত সমূহ [ ১০: ৩ ] ; [ ১১ : ৭ ] ; [ ২৫ : ৫৯ ] [৩২ : ৪ ]।
৫২৭৮। দেখুন [ ১০ : ৩ ] আয়াত ও টিকা ১৩৮৬। বাইবেলের বর্ণনার ন্যায় এ কথা বিশ্বাস করার কোনও যৌক্তিকতা নাই যে, আল্লাহ্ ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করে সপ্তম দিনে বিশ্রামে চলে যান। এই আয়াতটিকে এ ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়; সর্ব সৃষ্টির বাহ্যিক আকৃতি সৃষ্টি হয়েছে ছয় দিনে। কিন্তু আল্লাহ্র সৃষ্টি ক্ষমতা এখানেই থেমে যায় নাই। বিবর্তনের মাধ্যমে তা ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করছে। সর্ব সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মাঝে তিনি বিদ্যমান, তাঁর সৃষ্টি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। এভাবেই তিনি সর্বদা তাঁর আরশে বিদ্যমান। " অর্থাৎ পৃথিবীর সকল কিছুই আল্লাহ্র প্রবর্তিত আইন দ্বারা পরিচালিত হয় ; তিনি সর্বজ্ঞ।
৫২৭৯। আল্লাহ্ সর্বত্র বিদ্যমান। তিনি সময় ও স্থানের উর্দ্ধে। তবুও তিনি সকল স্থানে ও সকল সময়ে বিরাজমান। মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলেও তাঁর উপস্থিতি সর্বদা বিদ্যমান। তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা। এই অনুভব যদি মানুষ আত্মার মাঝে ধারণ করতে পারে তবে তার পক্ষে কোনও পাপ কাজ করা অসম্ভব।
৫। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই অধীনে। আল্লাহ্র-ই দিকে সমস্ত বিষয় প্রত্যানীত হবে। ৫২৮০।
৬। তিনিই রাত্রিকে দিবসের সাথে মিলিয়ে দেন এবং দিবসকে রাত্রির সাথে মিলিত করেন। [ সকল ] হৃদয়ের গোপন কথা তিনি পরিপূর্ণ অবগত।
৬। তিনিই রাত্রিকে দিবসের সাথে মিলিয়ে দেন এবং দিবসকে রাত্রির সাথে মিলিত করেন। [ সকল ] হৃদয়ের গোপন কথা তিনি পরিপূর্ণ অবগত।
৫২৮০। দেখুন আয়াত [ ৫৭ : ২ ] যেখানে "আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তারই অধীনে" বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ্র সর্বময় কর্তৃত্বকে প্রকাশ করার জন্য। সেই একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে বিমূর্ত ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য। বলা হয়েছে যা বিমূর্ত বা অদৃশ্য যেমন মানুষের চিন্তার জগত, তার উপরেও আল্লাহ্ কর্তৃত্বশালী। - দৃশ্য বা অদৃশ্য সব কিছুই শেষ পর্যন্ত তার নিকট ফিরে যাবে। আল্লাহ্র জ্ঞান সর্ব বিষয়ে অবগত। মানুষের নিঃসঙ্গ চিন্তাধারা আল্লাহ্র জ্ঞানের বাইরে না।
৭। তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ্ তোমাদের যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা থেকে [ দানে ] ব্যয় কর ৫২৮১। নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে এবং [ দানে ] ব্যয় করে - তাদের জন্য আছে মহা পুরষ্কার।
৫২৮১। পৃথিবীতে ক্ষমতা, প্রভাব -প্রতিপত্তি, অর্থ-সম্পদ, মেধা -মননশক্তি; প্রতিভা ; সব কিছুই আল্লাহ্র দান। যে কেউ আল্লাহ্র এই সব দানের যে কোন নেয়ামত লাভ করে থাকে; তার জন্য সেই নেয়ামতের দায়িত্ব ভারও অর্পিত হয়ে থাকে। আল্লাহ্ এই সব নেয়ামত দান করেন কারণ, মানুষ যাতে এ সবের ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভে ধন্য হতে পারে। সৎ কাজে মানুষ উৎসাহী ও প্রতিযোগীতামূলক হবে, আর তাই-ই হচ্ছে প্রকৃত দান করা বা ব্যয় করা। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য "ব্যয়" বা দান করাই হচ্ছে বিশ্বাস বা ঈমান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। এই আয়াতে আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন যে, আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্র আইন অনুযায়ী, যারা সৎকাজে ব্যয় করে তাদের জন্য আছে মহাপুরষ্কার।
৮। আল্লাহ্র প্রতি ঈমান না আনার তোমাদের কি কারণ থাকতে পারে ৫২৮২, এবং রসুল তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান করছেন। [ অথচ ] আল্লাহ্ তো পূর্বেই তোমাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন ৫২৮৩, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
৫২৮২। " আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনার তোমাদের কি কারণ থাকতে পারে ? " এই ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা সূদূর প্রসারী এবং গভীর যা শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়। শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই বাক্যটির মূল ভাবার্থ হচ্ছে : " পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে চর্তুদিকে আল্লাহ্র এত নিদর্শন ছড়ানো আছে যে, তা দেখে আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করাই অস্বাভাবিক ইত্যাদি। " একই রূপ বাক্যের প্রয়োগ করা হয়েছে আয়াত ১০।
৫২৮৩। এই অংগীকার' কে দুভাবে প্রকাশ করা যায়।
১) যখন কেউ আল্লাহ্র একত্ব ও কর্তৃত্বকে স্বীকার করে নেয় তখন পরোক্ষভাবে তার উপরে আল্লাহ্র সাধারণ হুকুম সমূহ মানার অপ্রকাশ্য বাধ্যবাধকতা থাকে যেমন আল্লাহ্র সেবা করা ও মনুষত্বের সেবা করা ইত্যাদি। দেখুন অংগীকার পূর্ণ করার ব্যাপারে আয়াত [ ৫ : ১ ] ও টিকা ৬৮২।
২) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানেরা রাসুলের (সা) সাথে অংগীকারে আবদ্ধ হন যে তারা আল্লাহ্র সেবায় নিয়োজিত থাকবেন এবং রাসুলের (সা) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। যেমন : আকাবা উপত্যকার অংগীকার [ দেখুন ৫ : ৭ ] আয়াত ও টিকা ৭০৫ ] এবং হুদায়বিয়া প্রান্তরে রাসুলের (সা) প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার অংগীকার দেখুন [ ৪৮ : ১০ ] আয়াত ও টিকা ৪৮৭৭। এই চুক্তিদ্বয় ইহুদীদের সিনাই পর্বতে হযরত মুসার সাথে সম্পাদিত চুক্তির সাথে তুলনীয়। দেখুন [ ২ : ৬৩ ] আয়াত ও টিকা নং ৭৮। " আল্লাহ্ তোমাদের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করিয়াছেন।" এই বাক্যটি দ্বারা উপরের দুইটি অংগীকারকেই বোঝানো হয়।
৯। তিনিই একমাত্র, যিনি তাঁর বান্দাকে সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রেরণ করেছেন ৫২৮৪, এবং যেনো তিনি তোমাদের অন্ধকারের অতল থেকে আলোতে পরিচালিত করতে পারেন। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অসীম দয়াময় এবং করুণাময়।
৫২৮৪। "বান্দার প্রতি " এর দ্বারা রাসুল (সা) কে বোঝানো হয়েছে। তাঁর নিকট যে সব নিদর্শন প্রেরণ করা হয় সেগুলি হলো ১) কোরাণের আয়াত সমূহ এবং ২) রাসুলের (সা) জীবন ও কাজ। রাসুলের (সা ) জীবনের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করেছেন।
১০। আল্লাহ্র রাস্তায় খরচ না করার কি কারণ তোমাদের থাকতে পারে ? অথচ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী আল্লাহ্রই অধিকারভূক্ত ৫২৮৫। যারা [ মক্কা ] বিজয়ের পূর্বে [ মুক্ত হস্তে ] ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে, এবং পরবর্তী সময়ে [ মক্কা বিজয়ের পরে ] যারা তা করেছে উভয়ে সমান নয় ৫২৮৬। তারা মর্যদায় শ্রেষ্ঠ তাদের অপেক্ষা যারা পরবর্তী কালে [ মুক্ত হস্তে ] ব্যয় করে এবং যুদ্ধ করে। কিন্তু আল্লাহ্ সকলের জন্যই উত্তম [ পুরষ্কারের ] প্রতিশ্রুতি দিতেছেন। তোমরা যা কর আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে সম্যক অবগত।
৫২৮৫। "আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী আল্লাহ্রই অধিকারভুক্ত।" দেখুন [ ৩ : ১৮০ ] আয়াত ও টিকা ৪৮৫। আরও দেখুন [৬ : ১৬৫ ] আয়াতের টিকা ৯৮৮ এবং [ ১৫ : ২৩ ] আয়াতের টিকা ১৯৬৪।
৫২৮৬। মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমানেরা কোরাইশদের সর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং ইসলাম ধীরে ধীরে আরবের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের সীমানায় অগ্রসর হয় এবং পৃথিবীতে মুসলমান তথা ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের ত্যাগ তিতিক্ষা প্রদর্শন করতে হয়েছে সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলমানদের সংগ্রাম ও ত্যাগ ছিলো অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক। হত্যা, অত্যাচার ও নির্যাতন ছিলো তাদের নিত্য সঙ্গী। এই হচ্ছে আয়াতের পটভূমি। তবে এর আবেদন সার্বজনীন। যুগ কাল অতিক্রান্ত। যারা আল্লাহ্র রাস্তায় সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করে তারা সকল সময়েই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু যারা সফলতা লাভের পূর্বে অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেও আল্লাহ্র রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করে থাকে তারা অধিক সম্মানীয় আল্লাহ্র চোখে।
