Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৫ জন
আজকের পাঠক ৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭১ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪১৭ বার
+ - R Print

সূরা রাহ্‌মান

সূরা রাহ্‌মান বা [আল্লাহ্‌ ] পরম করুণাময় - ৫৫

৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : অধিকাংশ তফসীরকারের মতে এই সূরাটি মক্কাতে ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন যে এর অংশ বিশেষ মদিনাতে অবতীর্ণ হয়। এ কথা নিসংশয়ে বলা চলে যে সূরার অধিকাংশ মক্কাতে অবতীর্ণ হয়।

সূরাটি অত্যন্ত কাব্যিক ও আল্লাহ্‌র মহিমায় পরিপূর্ণ। বিশেষ ভাবে " তোমরা তোমাদিগের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে ? " বাক্যটি আল্লাহ্‌র মহিমা বর্ণনা শেষে এই সূরাতে পুনঃপুণঃ আবৃত্তি করা হয়েছে। এই সূরার ৭৮ টি আয়াতের মাঝে ৩১ বার এই লাইনটি আবৃত্তি করা হয়েছে।

সাতটি সূরার শ্রেণীটি যা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ অনুগ্রহ এবং পরলোক সম্পর্কে আলোচনা করে অবতীর্ণ হয়, সেই শ্রেণীর মাঝে এই সূরাটি ষষ্ঠ। দেখুন ৫০ নং সূরার ভূমিকা।

এই সূরাটিতে সঙ্গীতের ধূয়ার মত একটি লাইনের পুণঃ আবৃত্তির মাধ্যমে সূরাটির বিশেষ বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যেকটি আয়াতের বাচনভঙ্গীতে বিষয়বস্তুকে দ্বৈতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ভাবে যুক্তির উত্থাপন করা হয়েছে যে, যদিও সৃষ্টির সব কিছুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু এসবের সৃষ্টি কর্তা একজনই। সৃষ্টির সকল কিছুই তাঁরই অনুগ্রহে ধন্য এবং তাঁর কাছেই সব কিছুর প্রত্যার্পন।

সার সংক্ষেপ : পরম করুণাময় আল্লাহ্‌ মানুষের জন্য প্রত্যাদেশ প্রেরণ করে মানুষকে অশেষ অনুগ্রহ দান করেছেন। তিনি প্রতিটি বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, ভারসাম্য পূর্ণ করেছেন। সকল সৃষ্ট বস্তু তাঁর অনুগ্রহ লাভে ধন্য। কিন্তু একদিন সৃষ্টির সব কিছু শেষ হয়ে যাবে, শুধু রয়ে যাবে আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব। [ ৫৫ : ১ - ৩৪ ]।

সকল মন্দ ও পাপী তাদের পরিণতি লাভ করবে ; ঠিক সেরূপ সকল ভালো ও পূণ্যাত্মা তাদের পুরষ্কার। আল্লাহ্‌ যিনি পবিত্র, সম্মানিত, অনুগ্রহের মালিক, মহিমান্বিত। [ ৫৫ : ৩৫ - ৭৮ ]।

সূরা রাহ্‌মান বা [আল্লাহ্‌ ] পরম করুণাময় - ৫৫

৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। [আল্লাহ্‌ ] পরম করুণাময় !

০২। তিনিই কুর-আন শিক্ষা দিয়েছেন ৫১৭২।

৫১৭২। পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নিকট থেকে প্রত্যাদেশ বা কোরাণ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছে। কোরাণ আল্লাহ্‌র অসীম অনুগ্রহ ও ক্ষমার স্বাক্ষর। আল্লাহ্‌ সকল স্বর্গীয় জ্যোতির উৎস এবং তার জ্যোতি নিখিল বিশ্বভূবন ব্যপী বিকির্ণ হয়।

০৩। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন

০৪। তিনি ভাষা শিখিয়েছেন ৫১৭৩ [ এবং বুদ্ধিমত্তা তারই দান ]।

৫১৭৩। 'Bayan' বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন ; মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা; বিভিন্ন বস্তুর মাঝে সম্পর্ক পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারার ক্ষমতা এবং তা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা অর্থাৎ কার্যকরণ ক্ষমতা নিরূপণ তা প্রকাশ করার ক্ষমতা। আল্লাহ্‌ মানুষকে এই বিশেষ ক্ষমতা দান করেছেন যা সৃষ্টির অন্য প্রাণীকে দান করা হয় নাই। মানুষকে আল্লাহ্‌ দান করেছেন প্রত্যাদেশ যা আত্মাকে আলোকিত করতে সাহায্য করে, এ ব্যতীত প্রকৃতির মাঝে আল্লাহ্‌র নিদর্শনের মাধ্যমে এবং নবী রসুলদের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ্‌ আধ্যাত্মিক জগতে উন্নীত করতে সাহায্য করেন।

০৫। সূর্য ও চন্দ্র অনুসরণ করে [ নির্ধারিত ] কক্ষপথ ৫১৭৪ ;

৫১৭৪। জোতির্বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব নিভুর্লভাবে গণিত শাস্ত্রের সুক্ষ হিসাব মেনে চলে, যা আল্লাহ্‌র মহাজ্ঞানের স্বাক্ষর। এই আয়াতে বলা হয়েছে চন্দ্রের যেমন গতিপথ আছে, সূর্যেরও ঠিক সেরূপ গতিপথ বিদ্যমান যা সে অতিক্রম করে চলেছে। এতদিন পর্যন্ত মানুষের ধারণা ছিলো যে সূর্য স্থির। সম্প্রতি আবিষ্কার হয়েছে সূর্য এক নির্দ্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করছে যার বার্তা চৌদ্দশ বছর পূর্বে কোরাণ দান করেছে। আবার পৃথিবীর নির্দ্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তনের ফলে আমরা সূর্যকে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে দেখে থাকি। যার ফলে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন ঘটে, জোয়ার ভাটা হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে ইত্যাদি যার উপরে পৃথিবীর জীব ও উদ্ভিদ জগত নির্ভরশীল।

০৬। তৃণ-গুল্ম ৫১৭৫ ও বৃক্ষাদি তাঁরই সিজ্‌দারত ৫১৭৬ ;

৫১৭৫। 'Nagim' অর্থাৎ নক্ষত্রপুঞ্জ বা তরুলতা।এখানে উভয় অর্থই প্রযোজ্য হতে পারে।
৫১৭৬। প্রকৃতির মাঝে আল্লাহকে অনুভব করার কথা বারে বারে বলা হয়েছে। কারণ বিশ্ব প্রকৃতি আল্লাহ্‌র বিধান বা আইন বা হুকুম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। আল্লাহ্‌র নিদর্শন বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে অকৃপণ ভাবে ছড়িয়ে আছে। যে তা পাঠ করতে পারে সেই ধন্য। দেখূন সূরা [ ২২ : ১৮ ] ও টিকা ২৭৯০ ; সূরা [ ১৩ : ১৫ ] এবং সূরা [ ১৬ : ৪৮ - ৪৯ ]।

০৭। এবং তিনি নভোমন্ডলকে করেছেন সমুন্নত এবং তিনি স্থাপন করেছেন [ ন্যায় -অন্যায়ের ] মানদণ্ড ৫১৭৭

৫১৭৭। এই আয়াতের ন্যায়ের মানদন্ডকে পরবর্তী দুই আয়াতে সমন্বিত করে দেয়া হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে মানুষ সকলের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে ন্যায়ের সাথে চলবে। দ্বিতীয়তঃ বলা হয়েছে তার সর্বকাজে ন্যায্য মানদন্ড প্রতিষ্ঠিত করবে। এ ব্যাপারে কখনও সীমালংঘন করবে না অর্থাৎ ন্যায়ের মানদন্ড হচ্ছে স্বর্গীয় গুণাবলীর মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই মানদন্ডকে আক্ষরিকভাবে তিনটি প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। পূর্বের আয়াতগুলির মাধ্যমে :

১) ন্যায়ের মানদন্ড এক স্বর্গীয় গুণ ;

২) সমগ্র নভোমন্ডল গাণিতিক মানদন্ডের উপরে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।

৩) আকাশকে সমুন্নত করে নক্ষত্র পুঞ্জের মানদন্ড রক্ষা করা হয়েছে।

০৮। এই কারণে, যাতে তোমরা [ নির্দ্দিষ্ট ] মানদন্ডে সীমালংঘন না কর।

০৯। সুতারাং ন্যায়ের ভিত্তিতে ওজন কর, এবং মাপে কখনও কম দিও না ৫১৭৮।

৫১৭৮। "ন্যায়ের ভিত্তিতে ওজন কর " বাক্যটি আক্ষরিক ও আলংকারিক উভয় অর্থ বহন করে। মানুষ তার দৈনন্দিক প্রতিটি কাজে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হবে যেমন : ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতাকে উপযুক্ত প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া। সামাজিক জীবনে আমাদের প্রতিনিয়ত মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়। এখানে আমাদের মানুষের সাথে আচরণ প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বোচ্চ সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে। এই সততা যে শুধুমাত্র অন্য লোকের প্রতি প্রদর্শন করতে হবে তাই-ই নয় এই সততা ব্যক্তির নিজের জীবনেও প্রতিফলিত করতে হবে। যেমন চিন্তার সততা, বক্তব্যের সততা, কার্যের নিয়তের সততা, এবং আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্যের সততা। মানুষ মনের গহন গভীরের চিন্তাধারাকে অনুধাবন করতে না পারলেও আল্লাহ্‌র নিকট তা দিবালোকের ন্যায় সুষ্পষ্ট। মানুষ মনে করে যা প্রকাশ্য নয় তা পাপ নয়, সুতারাং সুযোগ পেলেই ছোটখাট প্রতারণা বা মিথ্যার আশ্রয় নিতে দ্বিধা বোধ করে না, অবশ্য যদি তাতে তার জীবিকার বা কোন পার্থিব কাজ সহজ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ্‌ বলেছেন ন্যায় নীতি হচ্ছে সকল ঐশ্বরিক গুণাবলীর কেন্দ্রবিন্দু।

সততা ও ন্যায়নীতি একটি সমাজের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে ঠিক যেমন গাণিতিক সুত্র নভোমন্ডলের ভারসাম্য বজায় রাখে। যে সমাজে সততা ও ন্যায়নীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, সে সমাজের ধ্বংস অনিবার্য; ঠিক যেরূপ হবে নভোমন্ডলের গাণিতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে। এরই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলকে বিচার করতে হবে।

১০। তিনিই পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন ৫১৭৯, [ তাঁর ] সৃষ্ট জীবের জন্য।

৫১৭৯। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ গুণে শেষ করা অসম্ভব। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের সামান্য ইঙ্গিত করা হয়েছে মাত্র। পৃথিবীতে জীবন ও পরিবেশ পরস্পর ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। উদ্ভিদ জগত বিভিন্ন ধরণের ফল এবং শষ্য দানা উৎপন্ন করে যার দ্বারা মানুষ ও প্রাণী জগত জীবন ধারণ করে। ফসল কেটে ঘরে তোলার পরে শষ্য দানা মানুষের খাদ্য ও খড় বিচালী পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। উদ্ভিদ জগত যে শুধুমাত্র খাদ্য সরবরাহ করে তাই-ই নয়, সুগন্ধ গুল্ম খাদ্য দ্রব্যকে সুস্বাদু করার জন্য মশলা উৎপন্ন করে থাকে। এসব হলো দেহের খাদ্য, মনের খাদ্যের জন্য উদ্ভিদ জগত অপূর্ব সুন্দর ফুলের জন্ম দেয় যার শোভা মানুষকে মুগ্ধ করে। এ সবই আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ মাত্র।

১১। সেখানে রয়েছে ফল এবং খেঁজুর গাছ যা উৎপন্ন করে [ আবরণযুক্ত ] ফলের কাঁদি।

১২। আর তুষযুক্ত ও পশুখাদ্য সম্বলিত শষ্যদানা এবং সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদ।

১৩। তাহলে তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রভুর কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে ৫১৮০ ?