Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪১৪ বার
+ - R Print

সূরা তূর

সূরা তূর বা পর্বত - ৫২

৪৯ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : মক্কাতে অবতীর্ণ সাতটি সূরার শ্রেণীর এটি তৃতীয় সূরা। দেখুন শ্রেণীর ১ নম্বর সূরার ভূমিকা।

পূর্ববর্তী সূরার ন্যায় এটি মক্কাতে ইসলামের প্রথম আবির্ভাবের সময়ে অবতীর্ণ হয়। যে বিষয়গুলির উপরে এই সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ : প্রত্যাদেশ হচ্ছে আল্লাহ্‌র নিদর্শন, এর মধ্যে পূর্ববর্তী সময়ে যে সব প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে তাও অন্তর্গত। পারলৌকিক জীবন অবশ্য সত্য এবং আমাদের সে জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য।

সার সংক্ষেপ : পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশসহ সকল প্রত্যাদেশ আল্লাহ্‌র নিদর্শন। ভালো কাজ ও মন্দ কাজের উপযুক্ত প্রতিফল বিদ্যমান। কিভাবে মানুষ প্রত্যাদেশের সত্যকে অস্বীকার করে ? [ ৫২ : ১ - ৪৯ ]।

সূরা তূর বা পর্বত - ৫২

৪৯ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। শপথ তূর পর্বতের ৫০৩৭।

৫০৩৭। এখানে পাঁচটি জিনিষের শপথ করা হয়েছে। আয়াত ১ - ৬ পর্যন্ত পাঁচটি নিদর্শনের প্রতি আবেদন করা হয়েছে। আয়াত নং ৭ - ২৮ পর্যন্ত মৃত্যু পরবর্তী পারলৌকিক জীবনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যা তিন ভাগে উপস্থাপন করা হয়েছে। শেষ বিচারের দিনে এই চেনা জানা পৃথিবী অদৃশ্য হয়ে যাবে [ ৭-১০ আয়াত ] ; পাপীরা পাপের শাস্তি ভোগ করবে [ ১১ - ১৬ আয়াত ] ; পূণ্যাত্মারা ভবিষ্যতে আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও ভালোবাসার স্বাদ গ্রহণ করবে অপার শান্তির মাধ্যমে। [ ১৭- ২৮ ] আয়াত ]

০২। শপথ লিখিত বিধানের ৫০৩৮

০৩। যা আছে উম্মুক্ত পত্রে ;

৫০৩৮। দেখুন উপরেরর টিকা, যে পাঁচটি নিদর্শনের শপথ করা হয়েছে সেগুলি হচ্ছে : ১) তূর পর্বতের [ আয়াত ১ ] ; ২) উম্মুক্ত পত্রে লিখিত কিতাবের [ আয়াত ২ - ৩ ] ; ৩) বায়তুল মামূরের [ আয়াত ৪ ] ; ৪) সমুন্নত আকাশের [ আয়াত ৫ ] ; এবং ৫) উদ্বেলিত সমুদ্রের [ আয়াত ৬ ]।

১) এগুলির ব্যাখ্যা নিম্নরূপ : প্রতিটি নিদর্শন আক্ষরিক অর্থের সাথে সংযুক্ত। তূর পর্বতে বা সিনাই পর্বতে হযরত মুসা তাঁর প্রতি আল্লাহ্‌র প্রেরিত প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন ; দেখুন [৯৫ : ২ ] আয়াত, যেখানে পবিত্র মক্কা নগরীর পাশাপাশি এর উল্লেখ আছে [ ৯৫ : ৩ ]। হযরত ঈসার ক্ষেত্রে যায়তুন বা জলপাই পাহাড়ের  কথা বলা হয়েছে ; দেখুন [ ৯৫ :১ ] আয়াত। বাইবেলে বলা হয়েছে [ Mar xxiv . 3 – 51 ] যে এখান থেকেই হযরত ঈসা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের শেষ বিচারের ঘোষণা দান করেন। হযরত মুহম্মদের (সা ) বেলাতে তিনি প্রথম আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ লাভ করেন হেরা বা আলোর পাহাড়ে। সুতারাং কিতাবধারী জাতিদের জন্য পর্বতের শপথ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

২) "উম্মুক্ত পত্রে লিখিত কিতাব " অর্থাৎ যাতে আল্লাহ্‌র চিরন্তন বাণীসমূহ লিখিত থাকে। যখন প্রত্যাদেশসমূহ মানুষের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়, তখন তাকে বলা হয়েছে লিখিত কিতাব, যেনো তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য রূপে ধরা পড়ে। এই কিতাবের বর্ণনাতে বলা হয়েছে যে তা লিখিত আছে উম্মুক্ত পত্রে। এর আসল অর্থ প্রাচীন কালে লেখার জন্য কাগজের স্থলে ব্যবহৃত হতো, পাতলা চামড়া বা পার্চমেন্ট যা বেলনাকারে পাকিয়ে রাখা হতো। তাই এর অনুবাদ করা হয়েছে পত্র। এই পত্রকে যখন উম্মুক্ত করা হতো বা পাকানো অবস্থা মুক্ত করা হতো তখন যে কেউ তা দেখতে পেতো এবং তা থেকে হেদায়েত গ্রহণ করতে পারতো।

০৪। শপথ বায়তুল মামুরের,৫০৩৯

৫০৩৯। ৩) উপরের দুটি টিকা দেখুন। বায়তুন মামুরের শাব্দিক অর্থ এমন গৃহ যেখানে সর্বদা জনসমাগম হয়। কেউ কেউ মনে করেন এর দ্বারা ফেরেশতাদের এবাদত করবার স্থানকে বোঝায়। মওলানা ইউসুফ আলীর মতে বায়তুল মামুর দ্বারা কাবা ঘরকে বোঝানো হয়েছে যাকে আমাদের রাসুল (সা) পবিত্র করেন এবং আল্লাহ্‌র এবাদতের জন্য নিবেদন করেন।

০৫। শপথ সমুন্নত আকাশের ; ৫০৪০

৫০৪০। "সমুন্নত আকাশ " - আকাশকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এর ব্যপ্তি, সীমা মানুষের বর্ণনার বাইরে।

০৬। [ আরো ] শপথ উদ্বেলিত সমুদ্রের ; ৫০৪১, ৫০৪২

৫০৪১। "উদ্বেলিত সমুদ্রের " - অর্থাৎ আদিগন্ত বিস্তৃত, বিশাল, সীমাহীন জলরাশি হচ্ছে সমুদ্র। 'Masjur' শব্দটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে ফুলে ফেঁপে ওঠা শক্তিশালী সমুদ্রের বিশাল ঢেউ যা প্রচন্ড বেগে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ছে। দেখুন [ ৮১ : ৬ ] আয়াত যা এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর নিশ্চিহ্ন হওয়া এবং শেষ বিচারের দিনের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরে।

৫০৪২। উপরের বর্ণিত পাঁচটি নিদর্শনের শপথের মাধ্যমে মানুষের জন্য মৃত্যু পরবর্তী শেষ বিচারের দিনের প্রতি ইঙ্গিত দান করা হয়েছে। শেষ বিচারের দিন অবশ্যম্ভাবী সত্য। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এই নিদর্শনগুলিকে ক্রম অনুযায়ী ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সর্বোচ্চ নিদর্শন যা মানুষের অনুভূতির সূদূর প্রান্তে থাকে তার উপস্থাপন করা হয়েছে সর্বাগ্রে এবং মানুষের অনুভূতির খুব কাছের জিনিষকে উপস্থাপন করা হয়েছে সর্বশেষে। উপস্থাপনের ধারাটি এরূপ : আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ যা সর্বোচ্চ নিদর্শন মানুষের ভাষাতে প্রকাশ লাভ করে রাসুলদের মাধ্যমে ; ঐশ্বরিক এবাদতের বিশ্বজনীন আবেদন ; উপরে নক্ষত্রশোভিত সমুন্নত আকাশ; নীচে পৃথিবী বেষ্টনকারী সমুদ্র যা জীবন ও গতিতে সমৃদ্ধ। এ সমস্তই নির্দ্দেশ করে আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব সম্বন্ধে এবং আল্লাহ্‌র নিকট হিসাব - নিকাশের দিনকে। শেষ বিচারের দিনকে কেউই প্রতিহত করতে পারবে না।

০৭। নিশ্চয়ই তোমার প্রভুর শাস্তি অবশ্যই আসবে ; -

০৮। কেহই তা রোধ করতে পারবে না ; -

০৯। যেদিন নভোমন্ডল মহাকম্পনে কাঁপতে থাকবে ৫০৪৩

৫০৪৩। শেষ বিচারের দিনকে দুভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১) " নভোমন্ডল মহাকম্পনে কাঁপতে থাকবে।" পার্থিব জীবনে আকাশের এইরূপ কল্পনা করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। কারণ পৃথিবীর জীবনে আমরা আকাশকে দেখি মুক্ত প্রশান্ত, উদার স্থির নীলাকাশ যা মানুষের মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। রাতের নক্ষত্র খচিত আকাশ মানুষের চেতনাকে সূদূরে মহাবিশ্বে বিলিন করে। প্রতিটি গ্রহ, নক্ষত্র, তারকারাজি সকলেই আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আইন নিভুর্লভাবে মেনে চলেছে বিরামহীন ভাবে। আকাশ মন্ডলীর কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা দৃষ্টিগোচর হয় না - সর্বত্র বিরাজ করে অপার শান্তি। শেষ বিচারের দিনে নভোমন্ডলের এই শান্তির রূপ পরিবর্তিত হয়ে যাবে ; নূতন পৃথিবীর সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয় বর্ণনার জন্য দেখুন পরবর্তী টিকা।

১০। এবং পাহাড়-পর্বত দিগ-দিগন্তে [ ঝড়া পাতার ন্যায় ] উড়ে যাবে ৫০৪৪

৫০৪৪। সুউচ্চ পর্বতমালাকে দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা যায়। এ কথা বলা হয়েছে যে, পর্বত পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠকে চলমান শিলার কম্পন থেকে রোধ করে [ ১৩ : ৩ ] [ ১৫ : ১৯ ] [ ২১ : ৩১ ] [ ৩১ : ১০ ] [ ১৬ : ১৫ ] যার সত্যতা মেলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায়। পার্থিব জীবনে আমরা যাকে মনে করি দৃঢ়, অচঞ্চল, কাঠিন্যের প্রতিমূর্তি হাশরের দিনে তা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাবে। দৃঢ়তার প্রতীক যে পর্বত সকলই পরলোকে মরীচিকার ন্যায় মিথ্যা বলে প্রতিভাত হবে এবং অদৃশ্য হয়ে যাবে। [ ৭৮ : ২০ ]।

১১। সেদিন তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা [ সত্যকে ] মিথ্যা বলে জেনেছে ; - ৫০৪৫

১২। যারা ক্রীড়াচ্ছলে অসার কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে।

৫০৪৫। " মিথ্যাশ্রয়ী " বলতে তাদেরই বোঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ্‌র সত্যকে অস্বীকার করে; ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে ক্রীড়াচ্ছলে,সত্য ভাষণ, সত্যের প্রকাশকে তারা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ; জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিককে তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে। এরা হচ্ছে মোনাফেক। অনেক সময়েই এরা প্রকাশ্যে সত্যকে অস্বীকার করার সাহস প্রদর্শন করে না ; কিন্তু গোপনে সত্যের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করে তা থেকে লাভবান হয়। এ সব লোকই জীবন ভরে সন্দেহের মাঝে দোদুল্যমান হয়ে জীবন কাটায়। প্রকাশ্যে বা গোপনে যে কোনও ভাবে সত্যকে অস্বীকার করা বা তার ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা হচেছ সত্যের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধাচারণ করা। এর পরেও যদি কেউ অনুতপ্ত হয়ে আত্মসংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র করুণা ভিক্ষা করে তবে আল্লাহ্‌র ক্ষমার দ্বার সকলের জন্য উন্মুক্ত।

১৩। সেদিন তাদের বাঁধাহীন ভাবে জাহান্নামের আগুনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে।

১৪। বলা হবে ৫০৪৬, " এই সেই আগুন যাকে তোমরা মিথ্যা মনে করতে,