Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪১৩ বার
+ - R Print

সূরা যারিয়াত

সূরা যারিয়াত বা ধূলিঝঞা - ৫১

৬০ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাগুলির অন্যতম। এরূপ সাতটি সুরাকে একটি শ্রেণী বা গ্রুপে সন্নিবেশিত করা হয়েছে যা প্রত্যাদেশ ও পারলৌকিক জীবন সম্বন্ধে আলোচনা করে। সকল বাধা বিপত্তির বিরুদ্ধে সত্যের অপ্রতিদ্বন্দী বিজয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে এই সূরাতে।

সার সংক্ষেপ : বাতাস মৃদুমন্দ বা বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রবাহিত হতে পারে ; অথবা ঝঞার গতিতে বা প্রচন্ড বেগে সর্বদিকে। কিন্তু যে সত্য আল্লাহ্‌ প্রেরণ করেছেন তা অবশ্যই স্থায়ী হবে, যার সাহায্যে তোমরা তোমাদের চারিপার্শ্বেই বা অন্তরের মাঝে তাঁর নিদর্শন অনুভব করবে। [ ৫১ : ১ - ২৩ ]।

অতীতের ঘটনা এবং বর্তমানে যা পর্যবেক্ষণ কর সবই তোমাদের কৃতকর্মের পরিণতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আল্লাহ্‌ তাঁর অপার করুণার নিদর্শন স্বরূপ সতর্ককারী প্রেরণ করেছেন। যদি তোমরা তাঁকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান কর তবে যা ক্ষতি তা তোমাদেরই। [ ৫১ : ২৪ - ৬০ ]।

সূরা যারিয়াত বা ধূলিঝঞা - ৫১

৬০ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। শপথ ধূলিঝঞার ৪৯৮৬, ৪৯৮৭

৪৯৮৬। আয়াত নং ১ - ৪ পর্যন্ত চারটি শপথ বাক্যের উচ্চারণ করা হয়েছে। যে সত্যের বর্ণনা আয়াত [৫ - ৬ ] করা হয়েছে, সেই সত্যের একত্ব ও সন্দেহাতীতের স্বাক্ষর এই শপথগুলি। এগুলি আল্লাহ্‌র ক্ষমতা ও কল্যাণ হস্তের স্বাক্ষর; তাঁর বিশ্বজনীন পরিকল্পনার স্বাক্ষর এবং ভালো ও মন্দের শেষ পরিণতির স্বাক্ষর যখন ন্যায় বিচারের মাধ্যমে প্রত্যেককে প্রত্যেকের কর্মফল দেয়া হবে।

৪৯৮৭। 'ধুলিঝঞা ' - প্রকৃতির এক প্রচন্ড শক্তি, যখন ঝড়ের গতিতে তা প্রবাহিত হয়, তখন তার ধ্বংসলীলা সকলেই অবগত। সমস্ত প্রকৃতি ধূলিতে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। ধূলিঝঞা হচ্ছে বাতাসের এক রুদ্র মূর্তি যার  শুধুমাত্র ক্ষতিকর দিক থাকে তা সত্য নয়। সাধারণ বাতাস প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। উদ্ভিদ জগত তাদের বীজের বিস্তার ঘটায় বাতাসের মাধ্যমে। ভূপৃষ্ঠের তাপের তারতম্য অনুযায়ী বাতাসের গতিবেগ ও বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। ফলে ভূপৃষ্ঠ বাসপোযোগী হয়। বায়ু প্রবাহ জলীয় বাষ্পকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিচালিত করে মেঘরূপে - ফলে শুষ্ক ধরাতল বৃষ্টির পানিতে সঞ্জিবীত হয়ে শস্য শ্যামল রূপ ধারণ করে। বাতাস কখনও রুদ্র মূর্তিতে ঝড়রূপে, কখনও মৃদুমন্দ হিল্লোলে প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীর জীবনকে ফুল, ফল, ফসলে ভরিয়ে তোলে। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ আধ্যাত্মিক জীবনে প্রচন্ড শক্তি রূপে কাজ করে থাকে। একে বাধা দান করার ক্ষমতা কারও নাই। সকল বাধা-বিপত্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বাধ্য। প্রত্যাদেশের সত্য সর্বদা নির্দ্দেশ করে সেই দিনের প্রতি যা অবশ্যম্ভাবী, যে দিন হবে কর্মফল দিবস; যার প্রতি লক্ষ্য রেখে সারা সৃষ্টি আবর্তিত হচ্ছে

০২। এবং শপথ তারই যা উত্তোলন করে এবং বহন করে বোঝার ভার ৪৯৮৮ ;

৪৯৮৮। বায়ুকে মেঘপুঞ্জ বা জলীয় বাষ্পের ভারী বোঝা বহনকারী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে অথবা বায়ুকে মেঘের বোঝা বহনকারীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। যাই-ই হোক না কেন এও আল্লাহ্‌র এক কুদরত। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশও ঠিক সেরূপ, মানুষের আত্মার ভারী বোঝা বহন করে দুরে সরিয়ে ফেলে। ফলে যুগে যুগের প্রাচীন প্রথা, কুসংস্কার, পাপ বিদূরীত হয়ে মানুষকে তার শেষ পরিণতির শুভ ফলের দিকে পরিচালিত করে।

০৩। এবং শপথ মৃদু ও স্বচ্ছন্দগতি [ নৌযানের ] ৪৯৮৯

৪৯৮৯। এখানে বাতাসের মৃদু মন্দ স্বচ্ছন্দ গতির কথা বলা হয়েছে যা নৌযানের পালকে ফুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে, ফলে বাণিজ্য তরী তার নির্দ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। অথবা নৌযানের কথা বলা হয়েছে, পানির মধ্যে যার স্বচ্চন্দ গতির উল্লেখ এখানে এবং আরও অন্যান্য আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে 'Jara' এই শব্দটির দ্বারা যেমন দেখুন [২ : ১৬৪ ] আয়াতে।

০৪। এবং শপথ তাদের যারা আল্লাহ্‌র আদেশে ন্যায্যভাবে [ কর্ম ] বণ্টন করে ৪৯৯০ ;
৪৯৯০। "যারা কর্ম বন্টন করে " বাক্যটি দ্বারা আল্লাহ্‌র বিভিন্ন অনুমোদিত প্রতিনিধিদের কথা বলা হয়েছে যারা আল্লাহ্‌র বিভিন্ন অনুগ্রহ মানুষের জন্য দুনিয়াতে নিয়ে আসেন যেমন : বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, বায়ু চাপ মেঘের সঞ্চালন ইত্যাদি। এসব কর্মবন্টন এক সুনির্দ্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলে, যা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দ্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশেও সেরূপ আল্লাহ্‌র অপার অনুগ্রহ যা মানুষের কল্যাণের জন্য প্রেরণ করা হয়।

০৫। নিশ্চয়ই তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সত্য ৪৯৯১ ;

৪৯৯১। "প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি " - আল্লাহ্‌ প্রতিশ্রুতি দান করেছেন অনুতাপকারীদের তাঁর ক্ষমা ও দয়া এবং পাপী ও আল্লাহকে প্রত্যাখানকারীদের জন্য ন্যায় বিচার ও শাস্তি এবং পারলৌকিক জীবনের প্রতিশ্রুতি। এ কথা বলা হয়েছে যে পৃথিবীর জীবনই শেষ কথা নয় মৃত্যুর পরে আছে স্থায়ী ও অনন্ত জীবন। পৃথিবীর জীবন হচ্ছে সে জীবনের জন্য প্রস্তুতি ক্ষেত্র মাত্র।

০৬। অবশ্যই ন্যায় বিচার অবশ্যম্ভাবী ৪৯৯২।

৪৯৯২। 'Din' প্রতিটি লোককে তার প্রাপ্য অনুযায়ী অংশ দেওয়া। এই শব্দটি ব্যবহার হয়েছে শেষ বিচারের দিনের পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর জীবনের সকল অসমতা, সকল অন্যায়, অবিচারের সেদিন সমতা আনায়ন করা হবে।

০৭। শপথ বহু পথ বিশিষ্ট আসমানের ৪৯৯৩।

৪৯৯৩। কোটি কোটি তারার মেলা হচ্ছে সূদূর নক্ষত্রমন্ডলী। নভোমন্ডলে অসংখ্য গ্রহ, নক্ষত্র নির্দ্দিষ্ট গতিপথ অতিক্রম করে চলছে, আবার ধূমকেতু বা উল্কারা অনির্দ্দিষ্টের পানে ধেয়ে চলেছে। এরূপ কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে যে নভোমন্ডল, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তা গবেষণার বিষয়বস্তু। " বহু পথ বিশিষ্ট আকাশ " হচ্ছে গ্রহ, নক্ষত্র, তারকারাজি, ধূমকেতু, উল্কা প্রভৃতির বিভিন্ন গতিপথ - যা উচ্চতর বিজ্ঞানের যেমন জোতির্বিজ্ঞান, অংক শাস্ত্রের বিষয়বস্তু। কিন্তু মানুষ খুব কমই জ্ঞান ধারণ করে এ সম্বন্ধে। কিন্তু গ্রহ, নক্ষত্র, তারকারাজি এদের সম্বন্ধে আল্লাহ্‌র এক নির্দ্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

০৮। সত্যিই তোমরা পরস্পর বিরোধী মতবাদে লিপ্ত ৪৯৯৪।

৪৯৯৪। যারা বিভিন্ন মতবাদের দ্বারা বিভ্রান্ত, তারাই হয় সন্দেহ বাতিক। পরলোকের জীবনকে অস্বীকার দ্বারা কোনও মতবাদই আধ্যাত্মিক জীবনকে সমুন্নত রাখতে সক্ষম নয়।

০৯। এর দ্বারা যারা বিভ্রান্ত হওয়ার তারাই [সত্য থেকে ] বিভ্রান্ত হয়

১০। যারা মিথ্যার কারবারী তারা ধবংস হোক, -

১১। যারা অবহেলা ভরে ভুলের সমুদ্রে [ডুবে] রয়েছে ৪৯৯৬।

৪৯৯৬। যারা আল্লাহ্‌র বাণীকে পরিত্যাগ করে তারা সত্যভ্রষ্ট। আধ্যাত্মিক জগতে তারা বিপদজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু তারা জানে না। কারণ তারা বিভ্রান্ত।

১২। তারা জিজ্ঞাসা করে, " কবে ন্যায় বিচারের দিন আসবে ?"

১৩। [ এটা হবে ] সেদিন, যেদিন তাদের যাচাই করা হবে [ এবং পরীক্ষা করা হবে ] আগুনের উপরে।

১৪। [বলা হবেঃ ] " তোমাদের শাস্তিকে আস্বাদন কর; কেননা ইহাই তা যা তোমরা দ্রুত করতে চেয়েছিলে ৪৯৯৭। "

৪৯৯৭। পৃথিবীতে অবিশ্বাসীরা পরিহাস ভরে বলে থাকে যে, পরলোকে যদি শাস্তি থেকেই থাকে তবে তা ত্বরাণ্বিত করা হোক। কিন্তু যখন তা সত্যিকার ভাবে তাদের উপরে নিপতিত হবে, তখন তারা বুঝতে পারবে যে কত ভয়াবহ সে শাস্তি। দেখুন [ ২৫ : ২০৪। আয়াত ও টিকা ৩২৩০।

১৫। পূণ্যাত্মারা, সেদিন তারা বাগান ও প্রস্রবণের মধ্যে থাকবে ৪৯৯৮;

৪৯৯৮। শরীর ও মনের সর্বোচ্চ ও প্রকৃত প্রশান্তিকে কোরাণের বহু স্থানে বাগান ও প্রস্রবণ এই উপমার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।