+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এখন থেকে শুরু হচ্ছে সাতটি সূরার [ ৫০ -৫৬ ] একটি গ্রুপ বা শ্রেণী। এই সূরাগুলি মক্কাতে অবতীর্ণ হয়। এই সূরাগুলির বিষয়বস্তু হচ্ছে : আকাশ- বাতাস, প্রকৃতি, পৃথিবীর অতীত ইতিহাস, রসুলদের মুখ নিঃসৃত বাণী সব কিছু আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের স্বাক্ষর। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পরলোকের সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পূর্ববর্তী শ্রেণীর সূরাগুলি [ ৪৭ - ৪৯ ] নূতন মুসলিম উম্মার বহিঃর্বিশ্বের ও নিজেদের মাঝে আচরণ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান গ্রুপের সূরাগুলিতে বিশেষ ভাবে পরলোকের সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
এই বিশেষ সূরাটি মক্কী সূরাগুলির প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়। বিশ্ব প্রকৃতির প্রতি ও বিশ্ব ইতিহাসের পাপিষ্ঠদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অবগুণ্ঠন খোলার প্রয়াস করা হয়েছে [ দেখুন আয়াত ২২ ]।
সার সংক্ষেপ : যারা সন্দেহবাতিক, পরলোকে বিশ্বাস করে না তারা বিশ্বপ্রকৃতির দিকে, আকাশ ও নভোমন্ডলীর দিকে এবং ইতিহাস থেকে পাপীদের শেষ পরিণতির দিকে লক্ষ্য করুক। তাদের অন্তরের উপর থেকে অবগুণ্ঠন তুলে নেওয়ার পরেও কি তারা প্রত্যাদেশ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে ? [ ৫০ : ১ - ২৯ ]।
হিসাব নিকাশের দিন ও বাস্তবতার দিনই প্রকৃত সত্য। [ ৫ ০ : ৩০ - ৪৫ ]
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৪৯৪০। 'Majid' এই শব্দটি ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে 'Glorious' এবং শব্দটি বাংলাতে অনুবাদ করা হয়েছে "সম্মানিত" শব্দটি দ্বারা। অবশ্য 'মজিদ' একটি অত্যন্ত সুন্দর শব্দ, যার সঠিক সৌন্দর্য্য অনুবাদের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ; যার দ্বারা কোরাণকে ভূষিত করা হয়েছে। কোন ভাষার শব্দ দ্বারা কোরাণের দীপ্তিকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কোরাণের দীপ্তি উদিত সূর্যের ন্যায় ভাস্বর। সূর্য দিগন্তরেখা ত্যাগ করে যত উর্দ্ধে উদিত হতে থাকে ততই তার আলোর প্রখরতা ও দীপ্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কোরাণের বাণীও ঠিক তদ্রূপ ধীরে ধীরে মনের দিগন্তকে উদ্ভাসিত করে আধ্যাত্মিক তমসাকে দূর করে দেয়। কোরাণের বাণীর সৌন্দর্য্য যত হৃদয়ে ধারণ করা যায় তত এর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় হৃদয় মন আপ্লুত হয়ে পড়ে। এর বাণীর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চিরসত্য যা অক্ষয় এবং অবিনশ্বর। এই সত্যের সাথে যার একবার আধ্যাত্মিক যোগাযোগ ঘটা সম্ভব হয়েছে, সে জানে যে, সে অভিজ্ঞতা ভোলার নয়, যা প্রকাশের ভাষা পৃথিবীর কোনও সাহিত্যিকের নাই। যত এই অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়, তত আধ্যাত্মিক চক্ষু উম্মীলিত হয় - হৃদয়ের অন্ধকার কোরাণের আলোর দীপ্তিতে ধীরে ধীরে বিদূরিত হতে থাকে। আত্মার মাঝে কোরাণের দীপ্তি ও সৌন্দর্যের বিরল অনুভূতি যার কখনও ঘটে নাই তার পক্ষে সে অনুভূতি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারও পক্ষেও সে অনুভূতি প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। কোরাণ হচ্ছে রাসুলের (সা ) নবুয়তের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
৪৯৪১। কাফেরদের এই বিস্ময়বোধ করা ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার তাদেরই স্বগোত্রের একজন উদিত সূর্যের ন্যায় ভাস্বর, জোতির্ময় -এ কথা বিশ্বাস করা তাদের জন্য সত্যিই কষ্টকর। সূর্যের অস্তিত্বকে যেরূপ দিবাভাগে অস্বীকার করার উপায় নাই। অন্ধ ব্যতীত, কোনও চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দিবাভাগে সূর্যের দীপ্তিকে যেরূপ অস্বীকার করতে পারে না, ঠিক সেরূপ কাফেররাও রাসুলের (সা ) স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যাবলীকে অস্বীকার করতে পারছিলো না। ফলে তারা বিস্ময়ে ও অবিশ্বাসে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো।
উপদেশ : এ ভাবেই পৃথিবীতে যুগে যুগে সত্যের প্রকাশকে প্রথমেই বাঁধাপ্রাপ্ত হতে হয় তার স্বগোত্রের লোকদের দ্বারা এ ক্ষেত্রে বাংলা প্রবাদ বাক্যটি স্মরণীয় ; " গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।"
৪৯৪২। দেখুন আয়াত [ ৩৭ : ১৬ ]।
৪৯৪৩। এই নশ্বর দেহের মাঝে অমর আত্মার বাস যা পরমাত্মার অংশ। মৃত্যু পরবর্তীতে নশ্বর দেহের শুধুমাত্র ধ্বংস বা ক্ষয় ঘটে; আত্মা অমর, অবিনশ্বর। মৃত্তিকা শুধুমাত্র নশ্বর দেহকেই ধ্বংস করতে পারে। আত্মার উপরে এর কোনও ক্ষমতা বা একে ধ্বংস করার কোনও অধিকার নাই। আত্মার পার্থিব জীবনের সকল হিসাব আল্লাহ্র নিকট লওহে মাহ্ফুজে আমলনামায় রক্ষিত আছে।
৪৯৪৪। প্রকৃত সত্যকে দেখার পরেও যদি কেউ তা অস্বীকার করে, তবে তাদের বুদ্ধি, বিবেক ও মন হয়ে পড়বে তমসাচ্ছন্ন ও বিভ্রান্ত। বিশ্বভূবনের সকল কিছুতেই আল্লাহ্র মহিমা ছড়ানো। আল্লাহ্র কল্যাণ হস্তের স্পর্শে সকল কিছু ধন্য। প্রত্যাদেশ বা আল্লাহ্র প্রেরিত বাণীর মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করা হয়েছে। ইহজীবনের ভেদাভেদ, পার্থক্য, পরলোকে পূনঃর্বিন্যাস করা হবে ইহজীবনের কৃতকর্মের ভিত্তিতে। যদি কেউ আত্মার অমরত্বে ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে বুঝতে হবে সে মানব জীবন সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। তার স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তাধারা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ। তারা চেনা জানা পার্থিব পৃথিবীর সাথে অচেনা ও অজানা পৃথিবীর সমন্বয় সাধনে অক্ষম। তাদের মন সর্বদা "সংশয়ে দোদুল্যমান " থাকবে, এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্র বিধান।
৪৯৪৫। আল্লাহ্র অস্তিত্বকে অনুভব করতে হবে আত্মার মাঝে। বিশ্ব প্রকৃতি ও নভোমন্ডলে সর্বত্র তাঁর হাতের কল্যাণ স্পর্শ বিদ্যমান। আল্লাহ্র অস্তিত্বকে আত্মার মাঝে অনুভবের জন্য অবিশ্বাসীদের সম্মুখে একটি উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে কোটি কোটি তারকারাজি, ও গ্রহ নক্ষত্র শোভিত আকাশমন্ডলীর দিকে। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ও কোটি কোটি তারকারাজি ও নীহারীকাপুঞ্জ সকলকেই বিন্যস্ত করা হয়েছে এক সুনির্দ্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। যার ফলে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের গতি, শৃঙ্খলা ও নিয়মের মাঝে নিজ নিজ শৃঙ্খলা রক্ষা করে অসীম মহাশূন্যে ছুটে চলেছে। বিজ্ঞান বলে যে, এই নিয়ম ও শৃঙ্খলার মাঝে গণিত বিদ্যার সর্বোচ্চ নির্যাস বিদ্যমান যার প্রকৃত অনুধাবনে হৃদয় হয় এ সবের স্রষ্টার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় আপ্লুত। " তার মধ্যে কোনও ত্রুটি নাই" - বাক্যটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে নভোমন্ডলের গাণিতিক বিন্যাসে আল্লাহ্র জ্ঞানের মাঝে কোনও রূপ বৈষম্য ও বিভাজন লক্ষ্য করা যায় না।
৪৯৪৬। দেখুন [ ১৩ : ৩ ] আয়াত এবং [ ১৫ : ১৯ ] আয়াত ও টিকা ১৯৫৫। পৃথিবী যদিও গোল্ তবুও এর আয়তনের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব এত ক্ষুদ্র যে পৃথিবীর ভূমিকে মানুষের নিকট মনে হয় বিস্তৃত সমতল। কার্পেটকে যেরূপ পেরেকের মাধ্যমে স্বস্থানে সন্নিবেশিত করা হয়। পর্বতমালা ঠিক সেরূপ পৃথিবীর বিস্তৃত ভূমিকে স্বস্থানে রাখতে সাহায্য করে।
৪৯৪৭। দেখুন [ ২২ : ৫ ] ও টিকা ২৭৭৭। [ ১৩ : ৩ ] আয়াতের টিকা ১৮০৪ এ আভাষ দান করা হয়েছে উদ্ভিদ জগতের যৌনতা সম্বন্ধে।
৪৯৪৮। সৃষ্টির বিভিন্ন বস্তু " আল্লাহ্র অনুরাগী " দের আত্মার মাঝে; হৃদয়ের মাঝে গভীর " আল্লাহ্ প্রেম" ও ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে থাকে। তাঁরা এসব সৃষ্ট বস্তুর সম্বন্ধে চিন্তা করতে ভালোবাসে। প্রকৃতির সৃষ্ট বস্তুর সম্বন্ধে চিন্তা করা এবং তাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করাই হচ্ছে "বিজ্ঞানের" জ্ঞান। সুতারাং যারা বিজ্ঞানের সাধনা করে এবং এই সাধনা লব্ধ জ্ঞানকে আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতার ক্ষুদ্র প্রকাশরূপে অনুধাবন করে তারাই প্রকৃতরূপে আল্লাহ্র বিমূর্ত ধারণাকে আত্মার মাঝে অনুধাবন করে। সে ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যক্তির জন্য "উপদেশ স্বরূপ"।
মন্তব্য : অনেকেরই ধারণা বিজ্ঞানের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধ বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার বিমূর্ত ধারণাকে হৃদয়ের মাঝে মূর্তরূপে উপলব্ধি করতে হলে অবশ্যই বিজ্ঞানের জ্ঞানকে জানতে হবে। তবেই স্রষ্টার বিশালত্ব, ক্ষমতা, শিল্পসত্তা প্রতিদিনের জীবনে তাঁর কল্যাণকে অনুধাবন করা সম্ভব। এই আয়াতের মাধ্যমে এই সত্যকেই তুলে ধরা হয়েছে।
৪৯৪৯। প্রাকৃতিক বর্ণনার কি অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই আয়াতগুলিতে। যে কখনও আরবের মরুদ্যানের গ্রীষ্মের ও বসন্তের রূপ দর্শন করেছে - সেই একমাত্র অনুধাবন করতে পারবে এই আয়াতগুলির অবিস্মরণীয় চিত্র লেখাকে।
৪৯৫০। আরবের সম্প্রদায়কে যাদের আল্লাহ্ তাদের পাপের দরুণ শাস্তি প্রদান করেছিলেন - শুধুমাত্র তাদের নামের উল্লেখ করা হয়েছে এই আয়াতগুলিতে। তাদের কাহিনীর উল্লেখ আছে অন্যান্য সূরাতে। নিম্নোক্ত সূরাগুলির মধ্যে : নূহের সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ১১ : ২৫ - ৪৮ ] আয়াত এবং অন্যান্য আয়াত সমূহে। রাস্স সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২৫ : ৩৮ ] আয়াত ও টিকা ৩০৯৪। আ'দ ও সামুদ সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২৬ : ১২৩ - ১৫৮ ] আয়াত ও অন্যান্য আয়াত সমূহ। ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২ : ৪৯ - ৫০ ] আয়াত ও আয়াত সমূহ। লূতের সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ৭ : ৮০ - ৮৪ ] আয়াত ও অন্যান্য আয়াতসমূহ। আয়কার অধিবাসীদের জন্য দেখুন [ ১৫, ৭৮ - ৭৯ ] আয়াত ও টিকা ২০০০। এবং তুব্বা সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ৪৪ : ৩৭ ] আয়াত ও টিকা ৪৭১৫।
সূরা কাফ্
Page 1 of 3
সূরা কাফ্ - ৫০
৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এখন থেকে শুরু হচ্ছে সাতটি সূরার [ ৫০ -৫৬ ] একটি গ্রুপ বা শ্রেণী। এই সূরাগুলি মক্কাতে অবতীর্ণ হয়। এই সূরাগুলির বিষয়বস্তু হচ্ছে : আকাশ- বাতাস, প্রকৃতি, পৃথিবীর অতীত ইতিহাস, রসুলদের মুখ নিঃসৃত বাণী সব কিছু আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের স্বাক্ষর। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পরলোকের সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পূর্ববর্তী শ্রেণীর সূরাগুলি [ ৪৭ - ৪৯ ] নূতন মুসলিম উম্মার বহিঃর্বিশ্বের ও নিজেদের মাঝে আচরণ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান গ্রুপের সূরাগুলিতে বিশেষ ভাবে পরলোকের সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
এই বিশেষ সূরাটি মক্কী সূরাগুলির প্রথম দিকে অবতীর্ণ হয়। বিশ্ব প্রকৃতির প্রতি ও বিশ্ব ইতিহাসের পাপিষ্ঠদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অবগুণ্ঠন খোলার প্রয়াস করা হয়েছে [ দেখুন আয়াত ২২ ]।
সার সংক্ষেপ : যারা সন্দেহবাতিক, পরলোকে বিশ্বাস করে না তারা বিশ্বপ্রকৃতির দিকে, আকাশ ও নভোমন্ডলীর দিকে এবং ইতিহাস থেকে পাপীদের শেষ পরিণতির দিকে লক্ষ্য করুক। তাদের অন্তরের উপর থেকে অবগুণ্ঠন তুলে নেওয়ার পরেও কি তারা প্রত্যাদেশ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে ? [ ৫০ : ১ - ২৯ ]।
হিসাব নিকাশের দিন ও বাস্তবতার দিনই প্রকৃত সত্য। [ ৫ ০ : ৩০ - ৪৫ ]
সূরা কাফ্ - ৫০
৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। কাফ্, সম্মানিত কুর-আনের শপথ [ নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহ্র রাসুল ] ৪৯৪০।
৪৯৪০। 'Majid' এই শব্দটি ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে 'Glorious' এবং শব্দটি বাংলাতে অনুবাদ করা হয়েছে "সম্মানিত" শব্দটি দ্বারা। অবশ্য 'মজিদ' একটি অত্যন্ত সুন্দর শব্দ, যার সঠিক সৌন্দর্য্য অনুবাদের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ; যার দ্বারা কোরাণকে ভূষিত করা হয়েছে। কোন ভাষার শব্দ দ্বারা কোরাণের দীপ্তিকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কোরাণের দীপ্তি উদিত সূর্যের ন্যায় ভাস্বর। সূর্য দিগন্তরেখা ত্যাগ করে যত উর্দ্ধে উদিত হতে থাকে ততই তার আলোর প্রখরতা ও দীপ্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। কোরাণের বাণীও ঠিক তদ্রূপ ধীরে ধীরে মনের দিগন্তকে উদ্ভাসিত করে আধ্যাত্মিক তমসাকে দূর করে দেয়। কোরাণের বাণীর সৌন্দর্য্য যত হৃদয়ে ধারণ করা যায় তত এর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় হৃদয় মন আপ্লুত হয়ে পড়ে। এর বাণীর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং চিরসত্য যা অক্ষয় এবং অবিনশ্বর। এই সত্যের সাথে যার একবার আধ্যাত্মিক যোগাযোগ ঘটা সম্ভব হয়েছে, সে জানে যে, সে অভিজ্ঞতা ভোলার নয়, যা প্রকাশের ভাষা পৃথিবীর কোনও সাহিত্যিকের নাই। যত এই অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়, তত আধ্যাত্মিক চক্ষু উম্মীলিত হয় - হৃদয়ের অন্ধকার কোরাণের আলোর দীপ্তিতে ধীরে ধীরে বিদূরিত হতে থাকে। আত্মার মাঝে কোরাণের দীপ্তি ও সৌন্দর্যের বিরল অনুভূতি যার কখনও ঘটে নাই তার পক্ষে সে অনুভূতি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারও পক্ষেও সে অনুভূতি প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। কোরাণ হচ্ছে রাসুলের (সা ) নবুয়তের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
০২। তারা আশ্চর্য হয় যে ৪৯৪১, তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন সতর্ককারী এসেছে। সুতরাং অবিশ্বাসীরা বলে, " এটা তো বড় আশ্চর্য ব্যাপার !
৪৯৪১। কাফেরদের এই বিস্ময়বোধ করা ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার তাদেরই স্বগোত্রের একজন উদিত সূর্যের ন্যায় ভাস্বর, জোতির্ময় -এ কথা বিশ্বাস করা তাদের জন্য সত্যিই কষ্টকর। সূর্যের অস্তিত্বকে যেরূপ দিবাভাগে অস্বীকার করার উপায় নাই। অন্ধ ব্যতীত, কোনও চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দিবাভাগে সূর্যের দীপ্তিকে যেরূপ অস্বীকার করতে পারে না, ঠিক সেরূপ কাফেররাও রাসুলের (সা ) স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যাবলীকে অস্বীকার করতে পারছিলো না। ফলে তারা বিস্ময়ে ও অবিশ্বাসে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো।
উপদেশ : এ ভাবেই পৃথিবীতে যুগে যুগে সত্যের প্রকাশকে প্রথমেই বাঁধাপ্রাপ্ত হতে হয় তার স্বগোত্রের লোকদের দ্বারা এ ক্ষেত্রে বাংলা প্রবাদ বাক্যটি স্মরণীয় ; " গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।"
০৩। " সে কি ! আমরা যখন মরে যাব এবং ধূলিতে পরিণত হব, [ তারপর আবার পুণরায় জীবিত হব ] ? [ এ ধরণের ] প্রত্যাবর্তন আমাদের [ ধারণার ] বাইরে ৪৯৪২। "
৪৯৪২। দেখুন আয়াত [ ৩৭ : ১৬ ]।
০৪। আমি তো জানি মৃত্তিকা উহাদের কতটুকু ক্ষয় করে ৪৯৪৩। আমার নিকট সুরক্ষিত রয়েছে [ পূর্ণ হিসেবের ] নথি।
৪৯৪৩। এই নশ্বর দেহের মাঝে অমর আত্মার বাস যা পরমাত্মার অংশ। মৃত্যু পরবর্তীতে নশ্বর দেহের শুধুমাত্র ধ্বংস বা ক্ষয় ঘটে; আত্মা অমর, অবিনশ্বর। মৃত্তিকা শুধুমাত্র নশ্বর দেহকেই ধ্বংস করতে পারে। আত্মার উপরে এর কোনও ক্ষমতা বা একে ধ্বংস করার কোনও অধিকার নাই। আত্মার পার্থিব জীবনের সকল হিসাব আল্লাহ্র নিকট লওহে মাহ্ফুজে আমলনামায় রক্ষিত আছে।
০৫। তাদের নিকট সত্য আসার পরে তারা তা প্রত্যাখান করেছে। ফলে তারা রয়েছে সংশয়ে দোদুল্যমান ৪৯৪৪।
৪৯৪৪। প্রকৃত সত্যকে দেখার পরেও যদি কেউ তা অস্বীকার করে, তবে তাদের বুদ্ধি, বিবেক ও মন হয়ে পড়বে তমসাচ্ছন্ন ও বিভ্রান্ত। বিশ্বভূবনের সকল কিছুতেই আল্লাহ্র মহিমা ছড়ানো। আল্লাহ্র কল্যাণ হস্তের স্পর্শে সকল কিছু ধন্য। প্রত্যাদেশ বা আল্লাহ্র প্রেরিত বাণীর মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করা হয়েছে। ইহজীবনের ভেদাভেদ, পার্থক্য, পরলোকে পূনঃর্বিন্যাস করা হবে ইহজীবনের কৃতকর্মের ভিত্তিতে। যদি কেউ আত্মার অমরত্বে ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে বুঝতে হবে সে মানব জীবন সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। তার স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তাধারা বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ। তারা চেনা জানা পার্থিব পৃথিবীর সাথে অচেনা ও অজানা পৃথিবীর সমন্বয় সাধনে অক্ষম। তাদের মন সর্বদা "সংশয়ে দোদুল্যমান " থাকবে, এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্র বিধান।
০৬। তারা কি তাদের উর্দ্ধে অবস্থিত আকাশকে দেখে না ? - কিভাবে আমি তা নির্মাণ করেছি ও তাকে সুশোভিত করেছি। অথচ তার মধ্যে কোন ত্রুটি নাই ৪৯৪৫।
৪৯৪৫। আল্লাহ্র অস্তিত্বকে অনুভব করতে হবে আত্মার মাঝে। বিশ্ব প্রকৃতি ও নভোমন্ডলে সর্বত্র তাঁর হাতের কল্যাণ স্পর্শ বিদ্যমান। আল্লাহ্র অস্তিত্বকে আত্মার মাঝে অনুভবের জন্য অবিশ্বাসীদের সম্মুখে একটি উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য করতে বলা হয়েছে কোটি কোটি তারকারাজি, ও গ্রহ নক্ষত্র শোভিত আকাশমন্ডলীর দিকে। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ও কোটি কোটি তারকারাজি ও নীহারীকাপুঞ্জ সকলকেই বিন্যস্ত করা হয়েছে এক সুনির্দ্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। যার ফলে তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের গতি, শৃঙ্খলা ও নিয়মের মাঝে নিজ নিজ শৃঙ্খলা রক্ষা করে অসীম মহাশূন্যে ছুটে চলেছে। বিজ্ঞান বলে যে, এই নিয়ম ও শৃঙ্খলার মাঝে গণিত বিদ্যার সর্বোচ্চ নির্যাস বিদ্যমান যার প্রকৃত অনুধাবনে হৃদয় হয় এ সবের স্রষ্টার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় আপ্লুত। " তার মধ্যে কোনও ত্রুটি নাই" - বাক্যটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে নভোমন্ডলের গাণিতিক বিন্যাসে আল্লাহ্র জ্ঞানের মাঝে কোনও রূপ বৈষম্য ও বিভাজন লক্ষ্য করা যায় না।
০৭। এবং পৃথিবী, আমি তাকে বিস্তৃত করেছি, এবং তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় পর্বতমালা ৪৯৪৬এবং তাতে সব রকমের সুন্দর সুন্দর জিনিষ উৎপন্ন করেছি [ জোড়ায় জোড়ায় ] ৪৯৪৭ -
৪৯৪৬। দেখুন [ ১৩ : ৩ ] আয়াত এবং [ ১৫ : ১৯ ] আয়াত ও টিকা ১৯৫৫। পৃথিবী যদিও গোল্ তবুও এর আয়তনের তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব এত ক্ষুদ্র যে পৃথিবীর ভূমিকে মানুষের নিকট মনে হয় বিস্তৃত সমতল। কার্পেটকে যেরূপ পেরেকের মাধ্যমে স্বস্থানে সন্নিবেশিত করা হয়। পর্বতমালা ঠিক সেরূপ পৃথিবীর বিস্তৃত ভূমিকে স্বস্থানে রাখতে সাহায্য করে।
৪৯৪৭। দেখুন [ ২২ : ৫ ] ও টিকা ২৭৭৭। [ ১৩ : ৩ ] আয়াতের টিকা ১৮০৪ এ আভাষ দান করা হয়েছে উদ্ভিদ জগতের যৌনতা সম্বন্ধে।
০৮। আল্লাহ্র দিকে অভিমুখী প্রত্যেক ভক্ত বান্দার জন্য জ্ঞান ও উপদেশ স্বরূপ ৪৯৪৮।
৪৯৪৮। সৃষ্টির বিভিন্ন বস্তু " আল্লাহ্র অনুরাগী " দের আত্মার মাঝে; হৃদয়ের মাঝে গভীর " আল্লাহ্ প্রেম" ও ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে থাকে। তাঁরা এসব সৃষ্ট বস্তুর সম্বন্ধে চিন্তা করতে ভালোবাসে। প্রকৃতির সৃষ্ট বস্তুর সম্বন্ধে চিন্তা করা এবং তাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করাই হচ্ছে "বিজ্ঞানের" জ্ঞান। সুতারাং যারা বিজ্ঞানের সাধনা করে এবং এই সাধনা লব্ধ জ্ঞানকে আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতার ক্ষুদ্র প্রকাশরূপে অনুধাবন করে তারাই প্রকৃতরূপে আল্লাহ্র বিমূর্ত ধারণাকে আত্মার মাঝে অনুধাবন করে। সে ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যক্তির জন্য "উপদেশ স্বরূপ"।
মন্তব্য : অনেকেরই ধারণা বিজ্ঞানের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধ বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার বিমূর্ত ধারণাকে হৃদয়ের মাঝে মূর্তরূপে উপলব্ধি করতে হলে অবশ্যই বিজ্ঞানের জ্ঞানকে জানতে হবে। তবেই স্রষ্টার বিশালত্ব, ক্ষমতা, শিল্পসত্তা প্রতিদিনের জীবনে তাঁর কল্যাণকে অনুধাবন করা সম্ভব। এই আয়াতের মাধ্যমে এই সত্যকেই তুলে ধরা হয়েছে।
০৯। এবং আমি আকাশ থেকে কল্যাণকর বৃষ্টি প্রেরণ করি, এবং তা দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান এবং পরিপক্ক শস্যরাজি ;
১০। এবং সুউচ্চ [ রাজকীয়] পাম বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফলের বৃন্ত স্তরে স্তরে স্তুপিকৃত করা ; - ৪৯৪৯
১১। আল্লাহ্র বান্দাদের জন্য জীবিকা স্বরূপ। এই [ বৃষ্টি ] দ্বারা আমি মৃত ভূমিকে [ নূতন ] জীবন দান করি। এরূপই হবে [কেয়ামতের দিনের ] পুণরুত্থান।
১০। এবং সুউচ্চ [ রাজকীয়] পাম বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফলের বৃন্ত স্তরে স্তরে স্তুপিকৃত করা ; - ৪৯৪৯
১১। আল্লাহ্র বান্দাদের জন্য জীবিকা স্বরূপ। এই [ বৃষ্টি ] দ্বারা আমি মৃত ভূমিকে [ নূতন ] জীবন দান করি। এরূপই হবে [কেয়ামতের দিনের ] পুণরুত্থান।
৪৯৪৯। প্রাকৃতিক বর্ণনার কি অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই আয়াতগুলিতে। যে কখনও আরবের মরুদ্যানের গ্রীষ্মের ও বসন্তের রূপ দর্শন করেছে - সেই একমাত্র অনুধাবন করতে পারবে এই আয়াতগুলির অবিস্মরণীয় চিত্র লেখাকে।
১২। তাদের পূর্বে নূহের জাতি, রাস্স ও সামুদ সম্প্রদায় [ পরলোককে ] অস্বীকার করেছিলো ৪৯৫০,
৪৯৫০। আরবের সম্প্রদায়কে যাদের আল্লাহ্ তাদের পাপের দরুণ শাস্তি প্রদান করেছিলেন - শুধুমাত্র তাদের নামের উল্লেখ করা হয়েছে এই আয়াতগুলিতে। তাদের কাহিনীর উল্লেখ আছে অন্যান্য সূরাতে। নিম্নোক্ত সূরাগুলির মধ্যে : নূহের সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ১১ : ২৫ - ৪৮ ] আয়াত এবং অন্যান্য আয়াত সমূহে। রাস্স সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২৫ : ৩৮ ] আয়াত ও টিকা ৩০৯৪। আ'দ ও সামুদ সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২৬ : ১২৩ - ১৫৮ ] আয়াত ও অন্যান্য আয়াত সমূহ। ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ২ : ৪৯ - ৫০ ] আয়াত ও আয়াত সমূহ। লূতের সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ৭ : ৮০ - ৮৪ ] আয়াত ও অন্যান্য আয়াতসমূহ। আয়কার অধিবাসীদের জন্য দেখুন [ ১৫, ৭৮ - ৭৯ ] আয়াত ও টিকা ২০০০। এবং তুব্বা সম্প্রদায়ের জন্য দেখুন [ ৪৪ : ৩৭ ] আয়াত ও টিকা ৪৭১৫।
১৩। আ'দ,ফেরাউন এবং লূতের ভাইগণও [ সেরূপ করেছিলো ],
১৪। অরণ্যের অধিবাসীরা এবং তুব্বার লোকেরা, [ তাদের ] প্রত্যেকেই রসুলদের প্রত্যাখান করেছিলো, ফলে তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতিও পূর্ণ হয়েছিলো।
১৫। তবে কি আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেই [ এতটাই ] ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে তারা নূতন সৃষ্টি সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পতিত হয় ? ৪৯৫১
৪৯৫১। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৪৬ : ৩৬ ] ; ও টিকা ৪৯১২।
১৪। অরণ্যের অধিবাসীরা এবং তুব্বার লোকেরা, [ তাদের ] প্রত্যেকেই রসুলদের প্রত্যাখান করেছিলো, ফলে তাদের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতিও পূর্ণ হয়েছিলো।
১৫। তবে কি আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেই [ এতটাই ] ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে তারা নূতন সৃষ্টি সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পতিত হয় ? ৪৯৫১
