+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকাঃ এই সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানদের সম্বন্ধে যারা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে সৎপথ পরিত্যাগ করে অসৎ পথ অবলম্বন করে। এ সবই ইসলাম ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র বা ভিত্তি স্থাপন করে। এই সূরাতে খৃষ্টানদের সম্পর্কে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে, যারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জাঁকজমকপূর্ণ করার মাধ্যমে যীশু খৃষ্টের শেষ নৈশভোজের (Last supper) যে অর্থ প্রদান করে, প্রকৃত সত্য তা থেকে বহু দূরে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধি বিধান সম্বন্ধে এই দুইটি প্রাচীন ধর্ম যা প্রচার করে তা সত্যের অপলাপ মাত্র। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামের আগমন। যুক্তিসঙ্গত ভাবেই খাদ্য, পচ্ছিন্নতা, ন্যায়নীতি, বিশ্বস্ততা প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনগুলি ইসলামের মাধ্যমে পুনঃর্জীবিত করা হয়।
এই সূরার তৃতীয় আয়াতটি সর্বকালের জন্য স্মরণযোগ্য। এখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাংগ করলাম।" ১০ম হিজরীতে আমাদের নবীর বিদায় হজ্বের প্রাক্কালে এই আয়াতটি নাজেল হয়।
সারসংক্ষেপঃ এই সূরা শুরু হয়েছে আল্লাহ্র সাথে অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ নামার মাধ্যমে। এই অঙ্গীকার সামাজিক, মানবিক বা ঐশ্বরিক উভয়ই হতে পারে। এই অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে ব্যক্তি লাভ করে সৎ ও সুখী জীবনের ঠিকানা। খাদ্য সম্পর্কীয় নীতিমালা, কুসংস্কার মুক্ত জীবনবোধ এবং ঘৃণা ও পক্ষপাতিত্বহীন ন্যায়নীতি, সৎ, সুখী ও শান্তিময় জীবনের ঠিকানায় পৌঁছে দেয় [৫ : ১-৫]।
শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পরস্পরের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায় নীতির অনুসরণ করাই হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধের সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা বা ধর্মানুরাগ [৫ : ৬-১১]।
যদি ইহুদী ও খৃষ্টানেরা আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং সত্য বিশ্বাস থেকে বিমুখ হয়, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে সাবধান বাণী [৫ : ১২-২৬]।
কাবিল দ্বারা হাবিলের হত্যা হচ্ছে প্রতীক স্বরূপ, যুগে যুগে হাবিলের মত ন্যায়বান ব্যক্তিরা কাবিলের ন্যায় হিংসুকদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়। অত্যাচারী ব্যক্তির শাস্তি দান করবেন স্বয়ং আল্লাহ্। ন্যায়বান ব্যক্তির জন্য দুঃখ বোধ করার কারণ নাই। [৫ : ২৭-৪৩]
মুসলমান সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে। এ ব্যাপারে যদিও সে হবে পক্ষপাতিত্ববিহীন তবুও সে হবে সর্বদা মুসলিম ভাতৃত্বের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এবং ধর্মকে অবজ্ঞা ও আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করবে। খৃষ্টানদের প্রকৃত ধর্মানুরাগ, বিনয় এবং অন্যান্য গুণাবলীকে মুসলমানদের প্রশংসা ও উপলব্ধি করতে বলা হয়েছে। [৫ : ৪৪-৮৬]
আল্লাহ্ মুসলমানদের জন্য যা কিছু হালাল করেছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে উপভোগ করবে। তবে কোনও কিছুতেই তারা বাড়াবাড়ি করবে না। শপথ করা, জুয়া খেলা, পবিত্র স্থানের পবিত্রতা নষ্ট করা, সব রকম কুসংস্কার এবং মিথ্যা সাক্ষীকে নিন্দা করা হয়েছে। [৫ : ৮৭-১০৮]
হযরত ঈসার অলৌকিকত্ব এবং তার অনুসারীরা কিভাবে তার অপব্যবহার করে তার বর্ণনা করা হয়েছে। [৫ : ১০৯-১২০]
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
৬৮২। "Uqud" যার ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে obligation; বাংলা অনুবাদ "অঙ্গীকার"। কিন্তু এই আরবী শব্দটি বহু প্রকার ভাবকে প্রকাশ করতে সক্ষম। এ বাক্যটি এত ব্যাপক অর্থবোধক যে এর ব্যাখ্যা সম্বন্ধে লিখতে গেলে পূর্ণ এক অধ্যায় লেখা সম্ভব।
প্রথমতঃ আমাদের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের, তাঁর প্রতি ঐশ্বরিক অঙ্গীকার রয়েছে। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আধ্যাত্মিক, আত্মার সাথে এর যোগাযোগ। আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জ্ঞান এবং বিবেক দান করেছেন। আমাদের অনুভূতি ও বিচার বুদ্ধি দান করেছেন। সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতিকে আল্লাহ্ মানুষের সেবার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই স্রষ্টা মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতের পরশ সমস্ত সৃষ্টিকে পরিব্যপ্ত করে আছে। ভূলোক, দ্যুলোক তাঁর অস্তিত্বের বার্তা বহন করে। বিশ্ব জাহানে তাঁর সৃষ্টির স্বাক্ষর বর্তমান। তাঁর সৃষ্টিকে অনুধাবন থেকে, তাঁকে অনুধাবন করার ক্ষমতার জন্ম লাভ করে। সৃষ্টিকে অর্থাৎ বিশ্ব প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাধ্যমে মানুষের জন্য আল্লাহ্ বিরাট পাঠশালার সৃষ্টি করেছেন। এর পরেও আল্লাহ্ আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন তাঁর দূতদের [রাসূল ও নবী] আমাদের শিক্ষা দান করার জন্য। তাঁর কিতাব, তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসূলগণ পৃথিবীকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন। সুস্থ ও সুন্দর জীবন ধারণের পথ প্রদর্শন করেছেন। আত্মিক উন্নতির জন্য মানব সন্তানদের আহবান করেছেন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রকাশ্য জীবন ধারণের ক্ষেত্রে সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের পথ প্রদর্শন করা হয়েছে। আল্লাহ্র এই অকৃপণ দান ও করুণা তখনই লাভ করা যায়, যখন মানব সন্তান আল্লাহ্র সাথে তার কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে। অঙ্গীকার যত প্রকার সবই এই শব্দের অন্তর্গত। এর প্রাথমিক প্রকার তিনটি :
(১) পালনকর্তার সাথে মানুষের অঙ্গীকার অর্থাৎ ঈমান ও নৈতিক মূল্যবোধের অঙ্গীকার।
(২) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার : অলিখিত চুক্তি [implied obligation] ব্যবসা-বাণজ্য ও সামাজিক জীবন যাত্রায় আমরা প্রতিদিন অঙ্গীকারে আবদ্ধ। সামাজিক অঙ্গীকারের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিয়ে একটি সামাজিক অঙ্গীকার [আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে]। সন্তানের দায়িত্ব, পিতামাতা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি কর্তব্য এগুলি সবই সামাজিক অঙ্গীকার। এ সমস্ত চুক্তি বিশ্বস্ততার সাথে ও পরস্পর সহযোগীতা ও সম্পর্কের ভিত্তিতে পালন করাই হচ্ছে অঙ্গীকার পালন করা। অফিস আদালতে যে দায়িত্ব যিনি নিয়োজিত, তিনি সেই দায়িত্ব পালনে চুক্তিবদ্ধ, উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যিনি শিক্ষক, তিনি আন্তরিক বিশ্বস্ততার সাথে শিক্ষাদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ। ডাক্তার বিশ্বস্ততার সাথে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রুগীর আরোগ্য লাভের জন্য আন্তরিক হবেন- এটাই তার চুক্তি। এভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার কার্যের জন্য সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ।
(৩) মানুষের সাথে মানুষের লিখিত অঙ্গীকার [Expressed Obligation] : দুই ব্যক্তি বা দুই দল, বা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত লিখিত চুক্তি। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রত্যেক দলের বা প্রত্যেক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হচ্ছে লক্ষ্য রাখা যেন চুক্তি অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদন হয়।
প্রত্যেক সমাজে তাঁর নাগরিকদের সাথে বহু ধরণের অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত অঙ্গীকার থাকে যা তাদের সমাজে সামাজিক প্রথারূপে বিরাজ করে। এসব সামাজিক অঙ্গীকার পালন করা উচিত। কিন্তু যদি তা আল্লাহ্র আইনের বহির্ভূত হয় তবে সে সমাজকে ত্যাগ করে হিজরত করা প্রয়োজন। এসব অলিখিত সামাজিক রীতিনীতির অঙ্গীকার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, গৃহকর্তা এবং অতিথির মধ্যে সৌহার্দমূলক ব্যবহারের এক সামাজিক ও অলিখিত চুক্তি থাকে, মনিব, প্রভুর মধ্যে, চাকুরীর ক্ষেত্রে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ইত্যাদি। আল্লাহ্র নির্দেশ হচ্ছে : তখনই মোমেন বান্দা হওয়া যাবে যখন তাঁর প্রতি নির্দেশিত উপরের সকল অঙ্গীকার বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহ্কে খুশী করার জন্য পালন করা হবে। বিভিন্ন সরকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি অথবা পারস্পরিক সমঝোতা, বিভিন্ন দলের পারস্পরিক অঙ্গীকার এবং দুই ব্যক্তির মধ্যকার সর্বপ্রকার লেনদেন, বিবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার, ইজারা ইত্যাদিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে সব বৈধ শর্ত স্থির করা হয় তা মেনে চলা প্রত্যেক পক্ষের অবশ্য কর্তব্য। 'বৈধ' শব্দটি প্রয়োগ করার কারণ এই যে, যা অন্যায় তা গ্রহণ করা কারও জন্যও বৈধ নয়।
কর্মের মাধ্যমে, জীবন ধারণের মাধ্যমে, জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে - আল্লাহ্র সাথে চুক্তি, আদম সন্তানকে তার সকল অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনে তার কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সেটাই হচ্ছে সর্বোচ্চ ইবাদত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করে, লোকালয় ত্যাগ করে আল্লাহ্র ধ্যানে, আল্লাহ্র ইবাদতে যে জীবন ব্যয় করে সে কাপুরুষ। কারণ সে আল্লাহ্ প্রদত্ত অঙ্গীকারকে অস্বীকার করে। "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।" এই হচ্ছে স্রষ্টার নির্দেশ। ইবাদাত ও অঙ্গীকার পূরণ করা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একে অন্যের সম্পূরক। কারণ দ্বীন ও দুনিয়া এই দুই এ মিলে ইসলাম ধর্ম। 'দুনিয়া' বিহীন দ্বীন হচ্ছে আল্লাহ্র অঙ্গীকারকে অস্বীকার করা। কারণ দুনিয়ার অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা। সত্য ও বিশ্বস্ততা হচ্ছে ধর্মের প্রধান অঙ্গ।
৬৮৩। 'আন-আম' দ্বারা উট, গরু, মেষ, ছাগল এবং অন্যান্য অহিংস ও রোমান্থনকারী জন্তুকে বুঝায়।
৬৮৪। দেখুন আয়াত [৫ : ৯৪-৯৬]। নিম্নোক্ত অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয়। (১) যখন কেহ সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থান করে (হারাম শরীফ)। অথবা (২) হজ্জ্ব অথবা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারাম শরীফে প্রবেশ করার পূর্বে বিশেষ নিয়মে নিয়ত করে যে বস্ত্র খন্ড পরিধান করা হয় তাকে 'ইহ্রাম' বলে। 'ইহ্রাম' পরিধান অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ। দেখুন আয়াত [২ : ১৯৬] এবং টিকা ২১২। উপরের দুইটি শর্তই এক কথাই প্রকাশ করে, আর তা হচ্ছে সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থানকালে বা পবিত্র স্থানে প্রবেশের উদ্দেশ্যে নিয়ত করলে সকল প্রকার হিংস্রতা নিষিদ্ধ। পবিত্র স্থান মানুষ ও পশু সকলের জন্যই আল্লাহ্ কর্তৃক নিরাপদ স্থানরূপে নির্বাচিত।
৬৮৫। "আল্লাহ্ নিজ ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আদেশ করেন।" - এ বাক্যটি দ্বারা কেহ যেনো ধারণা না করেন যে আল্লাহ্ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ। মহাবিশ্ব সম্বন্ধে তাঁর পরিকল্পনা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ, দক্ষ ও ত্রুটি বিচ্যুতি বিহীন। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ লাভ করে স্রষ্টার ইচ্ছার মাধ্যমে। স্রষ্টার জ্ঞান, মহত্ব, করুণা সবই তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত এবং তাঁর ইচ্ছার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর সম্পূর্ণতা, তাঁর দক্ষতা, তাঁর ভালোবাসা সবই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে বিশ্বভূবন সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ; তাঁর পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গতা। এই কথাকেই উপরের বাক্য "আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা আদেশ করেন" - কথাটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এ বাক্যটির দ্বারা একথা যেনো কেউ ধারণা না করে যে আল্লাহ্ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর বিশ্ব সম্পর্কে পরিকল্পনাই তাঁর ইচ্ছা যা আদেশের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
৬৮৬। দেখুন আয়াত [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা ও মারওয়াকে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতে [৫ : ২] সমস্ত প্রতীককেই হজ্জ্বের সহিত সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। যথা- (১) সাফা এবং মারওয়া অথবা কাবা অথবা আরাফাত প্রভৃতি; (২) হজ্জ্বের পুরো অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা করা হয়েছে; (৩) হাজ্জ অনুষ্ঠানের নিষিদ্ধ বস্তু সমূহ (যেমন- শিকার করা) এবং (৪) হজ্জের নির্দিষ্ট সময়কে এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। দেখুন [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা এবং মারওয়াকে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতের বৃহত্তর পরিসরকে প্রকাশ করার জন্য উপরের প্রতীকগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। দেখুন [২ : ১৫৮, ১৯৪-২০০] আয়াত এবং এদের টিকা সমূহ। উল্লেখিত আয়াত সমূহে মানব ও পালনকর্তার মধ্যে কয়েকটি চুক্তির উল্লেখ আছে।
৬৮৭। পবিত্র মাস সমূহ হচ্ছে রজব (৭ম), জুল-ক্বাদ (১১ দশ) জুল-হজ্জ্ব (১২ দশ, এই মাস হজ্জ্বের মাস) এবং মহররম (বছরের প্রথম মাস); দেখুন আয়াত [৯ : ৩৬]। এই চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ।
৬৮৮। যে সব জন্তুদের গলায় কুরবাণীর চিহ্নস্বরূপ কণ্ঠাভরণ পরানো হয়েছে সেগুলির অবমাননা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের পবিত্র প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। হেরেম শরীফে, পবিত্র সুরক্ষিত স্থানে মানুষ পশু সকলেই নিরাপত্তা ভোগ করবে।
৬৮৯। যখন তোমরা এহ্রাম থেকে মুক্ত হয়ে যাও, তখন শিকার করার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তোমরা আবার দৈনন্দিক জীবনে প্রবেশ লাভ করবে।
৬৯০। দেখুন আয়াত [২ : ১৯১] এবং টীকা ২০৫। ৬ই হিজরী সনে হোদায়বিয়ার ঘটনার সময়ে মক্কার কোরেশরা ঘৃণা ও প্রতিহিংসার মনোবৃত্তি থেকে মুসলমানদের ওমরা পালন করতে বাঁধা দান করেছিল। মুসলমানেরা তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়ে ফিরে এসেছিল। মক্কা বিজয়ের পরে, যখন মক্কাতে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন মুসলমানদের অনেকেই এর প্রতিশোধের পক্ষপাতি ছিল। এই আয়াতে এরূপ প্রতিশোধ স্পৃহাকে নিষেধ করা হয়েছে। এই আয়াতের শিক্ষা সার্বজনীন। অন্যায় ও অত্যাচারের পরিবর্তে অন্যায় ও অত্যাচার দ্বারা প্রতিশোধ নেয়া ইসলাম অনুমোদন করে না; মন্দের পরিবর্তে মন্দ প্রতিদান হয় না। বরং ইসলাম জুলুমের প্রতিদানে ইন্সাফ ও ইন্সাফে কায়েম থাকার শিক্ষা দেয়। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে ধর্মানুরাগ ও পূণ্যকাজে সাহায্য করা। দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা ও ঘৃণা ইসলাম অনুমোদন করে না। শত্রুতা ও ঘৃণাকে ক্ষমা ও মহানুভবতা দ্বারা জয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই আয়াতে। যা কিছু অন্যয় এবং মন্দ তা আমাদের প্রতিহত করতে হবে সংগ্রামের মাধ্যমে- কিন্তু এই প্রতিরোধে যেন কোন প্রকার বিদ্বেষ বা ঘৃণা প্রকাশ না পায়। এই প্রতিরোধের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে অন্যায়, অসত্য ও অত্যাচারের দমন। কোনও প্রতিশোধ বা বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসা নয়। মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত এই সংগ্রামের জন্যই পরম করুণাময় আমাদের নির্দেশ দান করেছেন এই আয়াতে।
সূরা আল-মায়েদা
Page 1 of 12
সূরা আল-মায়েদা - ৫
"বা The Table spread বা খাবার টেবিল"
আয়াত ১২০, রুকু ১৬, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকাঃ এই সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানদের সম্বন্ধে যারা ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে সৎপথ পরিত্যাগ করে অসৎ পথ অবলম্বন করে। এ সবই ইসলাম ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র বা ভিত্তি স্থাপন করে। এই সূরাতে খৃষ্টানদের সম্পর্কে বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে, যারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জাঁকজমকপূর্ণ করার মাধ্যমে যীশু খৃষ্টের শেষ নৈশভোজের (Last supper) যে অর্থ প্রদান করে, প্রকৃত সত্য তা থেকে বহু দূরে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধি বিধান সম্বন্ধে এই দুইটি প্রাচীন ধর্ম যা প্রচার করে তা সত্যের অপলাপ মাত্র। এরই প্রেক্ষিতে ইসলামের আগমন। যুক্তিসঙ্গত ভাবেই খাদ্য, পচ্ছিন্নতা, ন্যায়নীতি, বিশ্বস্ততা প্রভৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনগুলি ইসলামের মাধ্যমে পুনঃর্জীবিত করা হয়।
এই সূরার তৃতীয় আয়াতটি সর্বকালের জন্য স্মরণযোগ্য। এখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাংগ করলাম।" ১০ম হিজরীতে আমাদের নবীর বিদায় হজ্বের প্রাক্কালে এই আয়াতটি নাজেল হয়।
সারসংক্ষেপঃ এই সূরা শুরু হয়েছে আল্লাহ্র সাথে অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ নামার মাধ্যমে। এই অঙ্গীকার সামাজিক, মানবিক বা ঐশ্বরিক উভয়ই হতে পারে। এই অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে ব্যক্তি লাভ করে সৎ ও সুখী জীবনের ঠিকানা। খাদ্য সম্পর্কীয় নীতিমালা, কুসংস্কার মুক্ত জীবনবোধ এবং ঘৃণা ও পক্ষপাতিত্বহীন ন্যায়নীতি, সৎ, সুখী ও শান্তিময় জীবনের ঠিকানায় পৌঁছে দেয় [৫ : ১-৫]।
শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পরস্পরের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায় নীতির অনুসরণ করাই হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধের সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা বা ধর্মানুরাগ [৫ : ৬-১১]।
যদি ইহুদী ও খৃষ্টানেরা আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং সত্য বিশ্বাস থেকে বিমুখ হয়, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে সাবধান বাণী [৫ : ১২-২৬]।
কাবিল দ্বারা হাবিলের হত্যা হচ্ছে প্রতীক স্বরূপ, যুগে যুগে হাবিলের মত ন্যায়বান ব্যক্তিরা কাবিলের ন্যায় হিংসুকদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়। অত্যাচারী ব্যক্তির শাস্তি দান করবেন স্বয়ং আল্লাহ্। ন্যায়বান ব্যক্তির জন্য দুঃখ বোধ করার কারণ নাই। [৫ : ২৭-৪৩]
মুসলমান সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে। এ ব্যাপারে যদিও সে হবে পক্ষপাতিত্ববিহীন তবুও সে হবে সর্বদা মুসলিম ভাতৃত্বের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এবং ধর্মকে অবজ্ঞা ও আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করবে। খৃষ্টানদের প্রকৃত ধর্মানুরাগ, বিনয় এবং অন্যান্য গুণাবলীকে মুসলমানদের প্রশংসা ও উপলব্ধি করতে বলা হয়েছে। [৫ : ৪৪-৮৬]
আল্লাহ্ মুসলমানদের জন্য যা কিছু হালাল করেছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে উপভোগ করবে। তবে কোনও কিছুতেই তারা বাড়াবাড়ি করবে না। শপথ করা, জুয়া খেলা, পবিত্র স্থানের পবিত্রতা নষ্ট করা, সব রকম কুসংস্কার এবং মিথ্যা সাক্ষীকে নিন্দা করা হয়েছে। [৫ : ৮৭-১০৮]
হযরত ঈসার অলৌকিকত্ব এবং তার অনুসারীরা কিভাবে তার অপব্যবহার করে তার বর্ণনা করা হয়েছে। [৫ : ১০৯-১২০]
সূরা আল-মায়েদা - ৫
"বা The Table spread বা খাবার টেবিল"
আয়াত ১২০, রুকু ১৬, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
০১। হে মুমিনগণ ! তোমরা [সকল] অঙ্গীকার পূর্ণ করবে ৬৮২। যা তোমাদের নিকট বর্ণনা করা হচ্ছে তা ব্যতীত ৬৮৩ সকল চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হলো। পবিত্র স্থানে [হারাম শরীফ] অথবা ইহ্রাম পরা অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয় ৬৮৪। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ নিজ ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আদেশ করেন ৬৮৫।
৬৮২। "Uqud" যার ইংরেজী অনুবাদ করা হয়েছে obligation; বাংলা অনুবাদ "অঙ্গীকার"। কিন্তু এই আরবী শব্দটি বহু প্রকার ভাবকে প্রকাশ করতে সক্ষম। এ বাক্যটি এত ব্যাপক অর্থবোধক যে এর ব্যাখ্যা সম্বন্ধে লিখতে গেলে পূর্ণ এক অধ্যায় লেখা সম্ভব।
প্রথমতঃ আমাদের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের, তাঁর প্রতি ঐশ্বরিক অঙ্গীকার রয়েছে। এই অঙ্গীকার হচ্ছে আধ্যাত্মিক, আত্মার সাথে এর যোগাযোগ। আল্লাহ্ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জ্ঞান এবং বিবেক দান করেছেন। আমাদের অনুভূতি ও বিচার বুদ্ধি দান করেছেন। সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতিকে আল্লাহ্ মানুষের সেবার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই স্রষ্টা মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতের পরশ সমস্ত সৃষ্টিকে পরিব্যপ্ত করে আছে। ভূলোক, দ্যুলোক তাঁর অস্তিত্বের বার্তা বহন করে। বিশ্ব জাহানে তাঁর সৃষ্টির স্বাক্ষর বর্তমান। তাঁর সৃষ্টিকে অনুধাবন থেকে, তাঁকে অনুধাবন করার ক্ষমতার জন্ম লাভ করে। সৃষ্টিকে অর্থাৎ বিশ্ব প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাধ্যমে মানুষের জন্য আল্লাহ্ বিরাট পাঠশালার সৃষ্টি করেছেন। এর পরেও আল্লাহ্ আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন তাঁর দূতদের [রাসূল ও নবী] আমাদের শিক্ষা দান করার জন্য। তাঁর কিতাব, তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসূলগণ পৃথিবীকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন। সুস্থ ও সুন্দর জীবন ধারণের পথ প্রদর্শন করেছেন। আত্মিক উন্নতির জন্য মানব সন্তানদের আহবান করেছেন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রকাশ্য জীবন ধারণের ক্ষেত্রে সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের পথ প্রদর্শন করা হয়েছে। আল্লাহ্র এই অকৃপণ দান ও করুণা তখনই লাভ করা যায়, যখন মানব সন্তান আল্লাহ্র সাথে তার কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে। অঙ্গীকার যত প্রকার সবই এই শব্দের অন্তর্গত। এর প্রাথমিক প্রকার তিনটি :
(১) পালনকর্তার সাথে মানুষের অঙ্গীকার অর্থাৎ ঈমান ও নৈতিক মূল্যবোধের অঙ্গীকার।
(২) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার : অলিখিত চুক্তি [implied obligation] ব্যবসা-বাণজ্য ও সামাজিক জীবন যাত্রায় আমরা প্রতিদিন অঙ্গীকারে আবদ্ধ। সামাজিক অঙ্গীকারের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিয়ে একটি সামাজিক অঙ্গীকার [আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে]। সন্তানের দায়িত্ব, পিতামাতা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি কর্তব্য এগুলি সবই সামাজিক অঙ্গীকার। এ সমস্ত চুক্তি বিশ্বস্ততার সাথে ও পরস্পর সহযোগীতা ও সম্পর্কের ভিত্তিতে পালন করাই হচ্ছে অঙ্গীকার পালন করা। অফিস আদালতে যে দায়িত্ব যিনি নিয়োজিত, তিনি সেই দায়িত্ব পালনে চুক্তিবদ্ধ, উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যিনি শিক্ষক, তিনি আন্তরিক বিশ্বস্ততার সাথে শিক্ষাদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ। ডাক্তার বিশ্বস্ততার সাথে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রুগীর আরোগ্য লাভের জন্য আন্তরিক হবেন- এটাই তার চুক্তি। এভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি তার কার্যের জন্য সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ।
(৩) মানুষের সাথে মানুষের লিখিত অঙ্গীকার [Expressed Obligation] : দুই ব্যক্তি বা দুই দল, বা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত লিখিত চুক্তি। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রত্যেক দলের বা প্রত্যেক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হচ্ছে লক্ষ্য রাখা যেন চুক্তি অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদন হয়।
প্রত্যেক সমাজে তাঁর নাগরিকদের সাথে বহু ধরণের অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত অঙ্গীকার থাকে যা তাদের সমাজে সামাজিক প্রথারূপে বিরাজ করে। এসব সামাজিক অঙ্গীকার পালন করা উচিত। কিন্তু যদি তা আল্লাহ্র আইনের বহির্ভূত হয় তবে সে সমাজকে ত্যাগ করে হিজরত করা প্রয়োজন। এসব অলিখিত সামাজিক রীতিনীতির অঙ্গীকার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, গৃহকর্তা এবং অতিথির মধ্যে সৌহার্দমূলক ব্যবহারের এক সামাজিক ও অলিখিত চুক্তি থাকে, মনিব, প্রভুর মধ্যে, চাকুরীর ক্ষেত্রে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ইত্যাদি। আল্লাহ্র নির্দেশ হচ্ছে : তখনই মোমেন বান্দা হওয়া যাবে যখন তাঁর প্রতি নির্দেশিত উপরের সকল অঙ্গীকার বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহ্কে খুশী করার জন্য পালন করা হবে। বিভিন্ন সরকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি অথবা পারস্পরিক সমঝোতা, বিভিন্ন দলের পারস্পরিক অঙ্গীকার এবং দুই ব্যক্তির মধ্যকার সর্বপ্রকার লেনদেন, বিবাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার, ইজারা ইত্যাদিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে সব বৈধ শর্ত স্থির করা হয় তা মেনে চলা প্রত্যেক পক্ষের অবশ্য কর্তব্য। 'বৈধ' শব্দটি প্রয়োগ করার কারণ এই যে, যা অন্যায় তা গ্রহণ করা কারও জন্যও বৈধ নয়।
কর্মের মাধ্যমে, জীবন ধারণের মাধ্যমে, জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে - আল্লাহ্র সাথে চুক্তি, আদম সন্তানকে তার সকল অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনে তার কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সেটাই হচ্ছে সর্বোচ্চ ইবাদত। মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করে, লোকালয় ত্যাগ করে আল্লাহ্র ধ্যানে, আল্লাহ্র ইবাদতে যে জীবন ব্যয় করে সে কাপুরুষ। কারণ সে আল্লাহ্ প্রদত্ত অঙ্গীকারকে অস্বীকার করে। "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।" এই হচ্ছে স্রষ্টার নির্দেশ। ইবাদাত ও অঙ্গীকার পূরণ করা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একে অন্যের সম্পূরক। কারণ দ্বীন ও দুনিয়া এই দুই এ মিলে ইসলাম ধর্ম। 'দুনিয়া' বিহীন দ্বীন হচ্ছে আল্লাহ্র অঙ্গীকারকে অস্বীকার করা। কারণ দুনিয়ার অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা। সত্য ও বিশ্বস্ততা হচ্ছে ধর্মের প্রধান অঙ্গ।
৬৮৩। 'আন-আম' দ্বারা উট, গরু, মেষ, ছাগল এবং অন্যান্য অহিংস ও রোমান্থনকারী জন্তুকে বুঝায়।
৬৮৪। দেখুন আয়াত [৫ : ৯৪-৯৬]। নিম্নোক্ত অবস্থায় শিকার করা বৈধ নয়। (১) যখন কেহ সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থান করে (হারাম শরীফ)। অথবা (২) হজ্জ্ব অথবা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে হারাম শরীফে প্রবেশ করার পূর্বে বিশেষ নিয়মে নিয়ত করে যে বস্ত্র খন্ড পরিধান করা হয় তাকে 'ইহ্রাম' বলে। 'ইহ্রাম' পরিধান অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ। দেখুন আয়াত [২ : ১৯৬] এবং টিকা ২১২। উপরের দুইটি শর্তই এক কথাই প্রকাশ করে, আর তা হচ্ছে সুরক্ষিত পবিত্র স্থানে অবস্থানকালে বা পবিত্র স্থানে প্রবেশের উদ্দেশ্যে নিয়ত করলে সকল প্রকার হিংস্রতা নিষিদ্ধ। পবিত্র স্থান মানুষ ও পশু সকলের জন্যই আল্লাহ্ কর্তৃক নিরাপদ স্থানরূপে নির্বাচিত।
৬৮৫। "আল্লাহ্ নিজ ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আদেশ করেন।" - এ বাক্যটি দ্বারা কেহ যেনো ধারণা না করেন যে আল্লাহ্ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ। মহাবিশ্ব সম্বন্ধে তাঁর পরিকল্পনা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ, দক্ষ ও ত্রুটি বিচ্যুতি বিহীন। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ লাভ করে স্রষ্টার ইচ্ছার মাধ্যমে। স্রষ্টার জ্ঞান, মহত্ব, করুণা সবই তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত এবং তাঁর ইচ্ছার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রজ্ঞা তাঁর সম্পূর্ণতা, তাঁর দক্ষতা, তাঁর ভালোবাসা সবই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে বিশ্বভূবন সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনার আদিরূপ; তাঁর পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গতা। এই কথাকেই উপরের বাক্য "আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা আদেশ করেন" - কথাটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে। এ বাক্যটির দ্বারা একথা যেনো কেউ ধারণা না করে যে আল্লাহ্ খেয়াল খুশী মত আদেশ দান করেন। তাঁর বিশ্ব সম্পর্কে পরিকল্পনাই তাঁর ইচ্ছা যা আদেশের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
০২। হে মুমিনগণ ! আল্লাহ্র [উপাসনার] প্রতীক সমূহ, ৬৮৬ পবিত্র মাসের ৬৮৭ কুরবাণীর জন্য আনীত পশু, মালা পরানো চিহ্ন বিশিষ্ট পশু এবং নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের আশায় পবিত্র [কাবা] ঘর অভিমুখে যাত্রীদের পবিত্রতার অবমাননা করবে না ৬৮৮। কিন্তু যখন তোমরা পবিত্র স্থান থেকে বের হবে এবং ইহ্রাম মুক্ত হবে তখন তোমরা শিকার করতে পার ৬৮৯। কিছু লোক বিদ্বেষের কারণে [এক সময়ে] তোমাদের মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাঁধা দিয়েছিলো, [সে কারণে তোমাদের পক্ষ থেকে শত্রুতা যেনো] তোমাদের সীমা লংঘনে প্ররোচিত না করে ৬৯০। ন্যায়পরায়ণতা ও ধর্মানুরাগে পরস্পরকে সাহায্য করবে। কিন্তু পাপ ও হিংসায় পরস্পরকে সাহায্য করবে না। আল্লাহ্কে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।
৬৮৬। দেখুন আয়াত [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা ও মারওয়াকে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতে [৫ : ২] সমস্ত প্রতীককেই হজ্জ্বের সহিত সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। যথা- (১) সাফা এবং মারওয়া অথবা কাবা অথবা আরাফাত প্রভৃতি; (২) হজ্জ্বের পুরো অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা করা হয়েছে; (৩) হাজ্জ অনুষ্ঠানের নিষিদ্ধ বস্তু সমূহ (যেমন- শিকার করা) এবং (৪) হজ্জের নির্দিষ্ট সময়কে এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে হজ্জ্বের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। দেখুন [২ : ১৫৮] যেখানে সাফা এবং মারওয়াকে আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত প্রতীক (Sha'air) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জগতের বৃহত্তর পরিসরকে প্রকাশ করার জন্য উপরের প্রতীকগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। দেখুন [২ : ১৫৮, ১৯৪-২০০] আয়াত এবং এদের টিকা সমূহ। উল্লেখিত আয়াত সমূহে মানব ও পালনকর্তার মধ্যে কয়েকটি চুক্তির উল্লেখ আছে।
৬৮৭। পবিত্র মাস সমূহ হচ্ছে রজব (৭ম), জুল-ক্বাদ (১১ দশ) জুল-হজ্জ্ব (১২ দশ, এই মাস হজ্জ্বের মাস) এবং মহররম (বছরের প্রথম মাস); দেখুন আয়াত [৯ : ৩৬]। এই চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ।
৬৮৮। যে সব জন্তুদের গলায় কুরবাণীর চিহ্নস্বরূপ কণ্ঠাভরণ পরানো হয়েছে সেগুলির অবমাননা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের পবিত্র প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। হেরেম শরীফে, পবিত্র সুরক্ষিত স্থানে মানুষ পশু সকলেই নিরাপত্তা ভোগ করবে।
৬৮৯। যখন তোমরা এহ্রাম থেকে মুক্ত হয়ে যাও, তখন শিকার করার নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ তোমরা আবার দৈনন্দিক জীবনে প্রবেশ লাভ করবে।
৬৯০। দেখুন আয়াত [২ : ১৯১] এবং টীকা ২০৫। ৬ই হিজরী সনে হোদায়বিয়ার ঘটনার সময়ে মক্কার কোরেশরা ঘৃণা ও প্রতিহিংসার মনোবৃত্তি থেকে মুসলমানদের ওমরা পালন করতে বাঁধা দান করেছিল। মুসলমানেরা তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়ে ফিরে এসেছিল। মক্কা বিজয়ের পরে, যখন মক্কাতে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন মুসলমানদের অনেকেই এর প্রতিশোধের পক্ষপাতি ছিল। এই আয়াতে এরূপ প্রতিশোধ স্পৃহাকে নিষেধ করা হয়েছে। এই আয়াতের শিক্ষা সার্বজনীন। অন্যায় ও অত্যাচারের পরিবর্তে অন্যায় ও অত্যাচার দ্বারা প্রতিশোধ নেয়া ইসলাম অনুমোদন করে না; মন্দের পরিবর্তে মন্দ প্রতিদান হয় না। বরং ইসলাম জুলুমের প্রতিদানে ইন্সাফ ও ইন্সাফে কায়েম থাকার শিক্ষা দেয়। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে ধর্মানুরাগ ও পূণ্যকাজে সাহায্য করা। দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা ও ঘৃণা ইসলাম অনুমোদন করে না। শত্রুতা ও ঘৃণাকে ক্ষমা ও মহানুভবতা দ্বারা জয় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এই আয়াতে। যা কিছু অন্যয় এবং মন্দ তা আমাদের প্রতিহত করতে হবে সংগ্রামের মাধ্যমে- কিন্তু এই প্রতিরোধে যেন কোন প্রকার বিদ্বেষ বা ঘৃণা প্রকাশ না পায়। এই প্রতিরোধের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে অন্যায়, অসত্য ও অত্যাচারের দমন। কোনও প্রতিশোধ বা বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসা নয়। মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত এই সংগ্রামের জন্যই পরম করুণাময় আমাদের নির্দেশ দান করেছেন এই আয়াতে।
