Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪০৮ বার
+ - R Print

সূরা মুহম্মদ

সূরা মুহম্মদ [ নবী ] - ৪৭

৩৮ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : সূরাগুলি অবতীর্ণ হওয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে এগুলির বিষয়বস্তু অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সূরাগুলির বিন্যাসের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ব্যাখ্যাও অনুসরণ করা হয়েছে। বিন্যস্তের এই ধারাবাহিকতায় এক অপূর্ব যুক্তিসম্মত ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। এ পর্যন্ত আমরা কোরাণের পাঁচ ষষ্ঠাংশ শেষ করতে পেরেছি। অবশিষ্ট এক ষষ্ঠাংশ ছোট ছোট সূরাগুলির সমষ্টি। এই ছোট ছোট সূরাগুলি আবার বিষয়বস্তু অনুযায়ী ছোট ছোট শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে।

এরূপ প্রথম শ্রেণীটি গঠিত হয়েছে তিনটি সূরার [ ৪৭ থেকে ৪৯ ] সমন্বয়ে। এই শ্রেণীটিতে মুসলিম উম্মার বা সম্প্রদায়ের গঠন, বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সূরাটিতে আলোচনা করা হয়েছে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন সাহস এবং তেজঃপূর্ণ মনোবল। এই সূরার সময়কাল প্রথম হিজরী যে সময় মুসলমানদের অস্তিত্ব ছিলো মক্কাবাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়ার হুমকির মুখে।

সার সংক্ষেপ : বিশ্বাসীদের উপরে আক্রমণ ও শত্রুতাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে হবে তাহলেই আল্লাহ্‌ তাদের সাহায্য করবেন। [ ৪৭ : ১ - ১৯]।

দুর্বল চিত্তদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। যারা দৃঢ়ভাবে সত্যের জন্য সংগ্রাম করে এবং যারা করে না তাদের আলাদা ভাবে সনাক্ত করা হবে। [ ৪৭ : ২০ - ৩৮ ]।

সূরা মুহম্মদ [ নবী ] - ৪৭

৩৮ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। যারা আল্লাহ্‌কে প্রত্যাখান করে এবং আল্লাহ্‌র রাস্তা থেকে [ লোকদের ] নিবৃত্ত করে, - তিনি তাদের সকল কাজ ব্যর্থ করে দেবেন ৪৮১৭।

৪৮১৭। যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং অন্যকেও তাদের পথে প্রভাবিত করে ; তাদের সম্বন্ধেই এই আয়াতে বলা হয়েছে। তাদের কর্মপ্রচেষ্টা কখনই সফলতা লাভ করবে না। কারণ সকল শক্তির মূল উৎস আল্লাহ্‌। পৃথিবীর কোনও কিছুই তাঁকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না। যদি মন্দ লোক সত্যের বিরোধিতা করে এবং অন্যকে সত্য গ্রহণ না করতে প্রভাবিত করার প্রয়াস পায় তবে তাদের কৃতকর্মের ফল তাদের প্রত্যাশার বিপরীতই ঘটবে।

০২। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, এবং মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা বিশ্বাস করে - যেহেতু তা তাদের প্রভুর নিকট থেকে [আগত ] সত্য, - তিনি তাদের মন্দগুলি দূর করে দেবেন এবং তাদের অবস্থার উন্নতি করবেন ৪৮১৮।

৪৮১৮। 'Bal' শব্দটির দ্বারা পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মানসিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। এখানে উভয়বিধ অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। প্রথম অর্থে আল্লাহ্‌ মোমেন বান্দাদের ইহকাল ও পরকালের সকল অবস্থাকে কল্যাণে ভরিয়ে দেন। দ্বিতীয় অর্থে আল্লাহ্‌ মোমেন বান্দাদের মানসিক অবস্থান পরিবর্তন করে দেন। ফলে মোমেন বান্দার পক্ষে আল্লাহ্‌র সত্যকে অনুধাবন করা ও তার অনুসরণ করা অনেক সহজ হয়।

০৩। এর কারণ যারা আল্লাহ্‌কে প্রত্যাখান করে, তারা [অন্তঃসারশূন্য ] অহংকারের অনুসরণ করে, [অপরপক্ষে] যারা বিশ্বাসী তারা তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে [ আগত ] সত্যের অনুসরণ করে। এ ভাবেই আল্লাহ্‌ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন উপমার মাধ্যমে ৪৮১৯।

৪৮১৯। এই আয়াতটির মাধ্যমে জীবনের মূল্যবান নৈতিক শিক্ষা দান করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মানুষকে নৈতিক সত্য শিক্ষাদান করে থাকেন। যারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত সত্যকে প্রত্যাখান বা কুফরী করে তারা মিথ্যার অনুসরণ করে। তাদের অবস্থা এরূপ যেনো তারা মিথ্যা মরিচীকার পিছনে উদভ্রান্তের ন্যায় ছুটে চলেছে। যার প্রকৃত কোনও অস্তিত্ব নাই। ফলে কোনও দিনও সে তার প্রকৃত লক্ষ্যে পৌছাতে সক্ষম হবে না। অপর পক্ষে যরা ঈমান আনে তারা মানুষ সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনুধাবনে সক্ষম হবে ফলে তাদের মনঃজগত সুখ ও শান্তিতে ভরে উঠবে। তারা হবে মানসিক দিক থেকে সুখী,শান্তিপূর্ণ, ধীর স্থির, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ তারা দৃঢ়তার সাথে,স্বীয় লক্ষ্যের দিকে একাগ্রভাবে অগ্রসর হতে সক্ষম। তাদের মন্দ কর্মগুলি আল্লাহ্‌ ক্ষমা করে দিবেন।

০৪। সুতারাং যখন [ যুদ্ধক্ষেত্রে ] তোমরা অবিশ্বাসীদের সাথে মিলিত হও ৪৮২০; তখন তাদের গর্দানে আঘাত করবে, পরিশেষে যখন তোমরা উহাদের সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে, তখন [ উহাদের ] মজবুত করে বাঁধবে ৪৮২১। অতঃপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ ৪৮২২। যতক্ষণ না শত্রুপক্ষ অস্ত্র ত্যাগ করে [ জিহাদ চালিয়ে যাবে ] এটাই বিধান। আর যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন, অবশ্য তাদের উপরে নিজেই প্রতিশোধ নিতে পারেন, কিন্তু তিনি চান [ যুদ্ধের মাধ্যমে ] এককে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করার জন্য ৪৮২৩। কিন্তু যারা আল্লাহ্‌র রাস্তায় মারা যায় ৪৮২৪, তিনি কখনও তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না।

৪৮২০। কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে জেহাদ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যখন কেউ তা করবে তা সর্ব শক্তি দ্বারা করার আদেশ দান করা হয়েছে। "গর্দ্দানে আঘাত কর " এই বাক্যটির আক্ষরিক ও আলংকারিক উভয় অর্থ বিদ্যমান। গর্দ্দান হচ্ছে শরীরের এমন স্থান যেখানে অস্ত্রের এক আঘাতে শরীরকে মস্তকচ্যুত করা যায়। অর্থাৎ শত্রুর নিধনের উপযুক্ত স্থান। আলংকারিক অর্থে ব্যপকভাবে সেইরূপ আঘাত যা হবে প্রাণঘাতি - মৃত্যুসমতুল্য। যুদ্ধকে ছেলেখেলা হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

৪৮২১। এই আয়াতটি, [ ৮ : ৬৭ ] আয়াত ও টিকা ১২৩৪ সহিত তুলনাযোগ্য। যুদ্ধের প্রথম অবস্থায় শত্রুকে নিধন করতে হবে যতক্ষণ না তাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপরের হুকুম হচ্ছে পরাভূত শত্রুদের বন্দী করতে হবে।

৪৮২২। যখন শত্রুদের পরাভূত করে বন্দী করা হবে, তখন হয় তাদের প্রতি দয়া [ মুক্তিপণ ব্যতীত মুক্তি ] অথবা মুক্তিপণ ধার্য করতে হবে।

৪৮২৩। আল্লাহ্‌ মানুষকে দুঃখ, ব্যাথা, বিপদ, বিপর্যয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন, মানুষের ধৈর্য্যের ও আল্লাহ্‌র প্রতি নির্ভরশীলতার ও আত্মত্যাগের। জেহাদ হচ্ছে মোমেন বান্দাদের জন্য আত্মত্যাগ,নির্ভরশীলতার, একটি পরীক্ষা বিশেষ। মোমেন বান্দাদের পরীক্ষা করা হয় তাঁরা আল্লাহ্‌র রাস্তায় কতটুকু আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত। তাঁরা কি আল্লাহ্‌র রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ? জেহাদ হচ্ছে মোমেন বান্দাদের জন্য ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরীক্ষা। অপরপক্ষে শত্রুদের জন্য তা হচ্ছে নিজের ভুলকে উপলব্ধির পরীক্ষা। বিপদের মাঝে তাদের উপলব্ধির করার সুযোগ দান করা হয় যে, তারা যেনো অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসে।

৪৮২৪। এই পংক্তিটি দুভাবে পড়া যায়। ১) 'Qatalu' অর্থাৎ যারা যুদ্ধ করে ; ২) ' Qutilu' অর্থ যারা নিহত হয়। প্রথম অর্থটি ব্যপক অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে যার অন্তর্ভূক্ত হবে দ্বিতীয় অর্থটি তবে Royal Egyptian Edition এ দ্বিতীয় অর্থটি ব্যবহার করা হয়েছে সেই বিধায় এখানে দ্বিতীয় অর্থটি ব্যবহার করা হয়েছে।

০৫। শীঘ্রই তিনি তাদের পথ প্রদর্শন করবেন এবং তাদের অবস্থার উন্নতি করবেন ৪৮২৫।

৪৮২৫। ৪নং আয়াতের শেষ পক্তিটিতে আছে, " যাহারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয়।" এখানে ৫নং আয়াতে বলা হয়েছে তাদের আল্লাহ্‌ সৎপথে পরিচালিত করবেন। যার অর্থ এই দাঁড়ায় যে মৃত্যু পরবর্তী যে পথ সেই পথ অতিক্রমের সময়।

০৬। এবং তাদের বেহেশতে দাখিল করবেন, যার কথা তিনি তাদের জন্য [পূর্বেই ] ঘোষণা করেছেন ৪৮২৬।

৪৮২৬। " যার কথা তিনি তাদের জন্য পূর্বেই ঘোষণা করেছেন।" আয়াত [ ২ : ২৫ ] এ এই সুসংবাদ দান করা হয়েছে।

০৭। হে বিশ্বাসীগণ ! যদি তোমরা আল্লাহ্‌র [ রাস্তায় ] সাহায্য কর, তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়ভাবে অবিচল রাখবেন।

০৮। কিন্তু যারা আল্লাহকে প্রত্যাখান করে, - তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস এবং তিনি তাদের কর্মসমূহ ব্যর্থ করে দেবেন ৪৮২৭।

৪৮২৭। দেখুন পূর্বের আয়াত [ ৪৭ : ১ ] ও টিকা ৪৮১৭।

০৯। কারণ তারা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে ঘৃণা করে ; সুতারাং তিনি তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দেন। ৪৮২৮

৪৮২৮। যারা আল্লাহ্‌র বিধানে বিশ্বাসী নয়, আল্লাহ্‌ তাদের "কর্ম ব্যর্থ করে দেবেন।" এই জন্য যে তাদের কর্ম আল্লাহ্‌র নিকট মূল্যহীন। ফলে তারা যা করতে চায় সে অনুযায়ী সফলতা লাভ করবে না। কারণ তাদের মন্দ কাজের পরিণতি মন্দ হতে বাধ্য। তাদের মন্দ কাজ তাদের আত্মিক শক্তিকে ক্ষয় করে ফেলবে। ক্ষয়িষ্ণু আত্মা কখনও মহৎ বা উন্নত কিছু সৃষ্টি করতে অক্ষম। এ ভাবেই মন্দ কাজের পরিণতিতে আত্মার অবনতি ঘটে।

১০। তারা কি পৃথিবী ভ্রমণ করে না এবং দেখে না যে, উহাদের পূর্ববর্তীরা [ যারা পাপে আসক্ত ছিলো ], তাদের কি পরিণাম হয়েছে? আল্লাহ্‌ তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছেন এবং যারা আল্লাহকে প্রত্যাখান করে তাদের জন্য অনুরূপ পরিণাম [ অপেক্ষা করছে ]। ৪৮২৯

৪৮২৯। একটি পাপ আর একটি পাপকে টেনে আনে। মন্দ কাজের পরিণতি সর্বদা মন্দ হতে বাধ্য। পৃথিবীর অতীত ইতিহাস ও প্রথা এই সাক্ষ্য দেয় যে মন্দ কাজের শেষ পরিণতি ধ্বংস। এ থেকেও কি ভবিষ্যত প্রজন্মের মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করবে না? আল্লাহ্‌র করুণার হস্ত তাঁর অনুগত বান্দার জন্য সর্বদা প্রসারিত কিন্তু যে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আল্লাহ্‌ তাকে সাহায্য করেন না।

১১। এর কারণ যারা বিশ্বাসী আল্লাহ্‌ তাদের রক্ষাকর্তা, কিন্তু যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের কোন রক্ষাকর্তা নাই।