Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪০৬ বার
+ - R Print

সূরা জাছিয়া

সূরা জাছিয়া অথবা নতজানু - ৪৫

৩৭ আয়াত , ৪ রুকু , মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : হা-মিম সিরিজের এটা ৬ষ্ঠ সূরা। সূরার সাধারণ বিষয়বস্তুর জন্য দেখুন ৪০ নং সূরার ভূমিকা।

সার সংক্ষেপ : নতজানু করা শব্দটিকে চয়ন করা হয়েছে এই সূরার ২৮ নং আয়াত থেকে যা এই সূরার মূল বিষয়বস্তু। পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র নিদর্শন সমূহ ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মানুষ আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, বরং বিশ্বাসের প্রতি ব্যঙ্গ বিদ্রূপ প্রদর্শন করে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নতজানু হয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে হবে।

সূরা জাছিয়া অথবা নতজানু - ৪৫

৩৭ আয়াত , ৪ রুকু , মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। হা - মীম

০২। এই কিতাব পরাক্রমশালী , প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্‌র নিকট থেকে অবতীর্ণ ৪৭৩৬।

৪৭৩৬। [ ৪০ : ২ ] আয়াতটি ও এই আয়াতটি [ ৪৫ : ২ ] একই রূপ শুধুমাত্র পূর্বের আয়াতের [ ৪০: ২ ] পরম জ্ঞানী শব্দটির স্থলে এই আয়াতে [ ৪৫ : ২ ] প্রজ্ঞাময় শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সূরার বিষয়বস্তুর সাথে " প্রজ্ঞাময়" শব্দটি সঠিক ভাবে প্রযোজ্য হয়েছে কারণ এই সূরার বিষয়বস্তুতে সেই সব মহামূর্খদের আলোচনা করা হয়েছে যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর নিদর্শনকে প্রত্যাখান করে। অপরপক্ষে ৪০ নং সূরাটি মানুষের ব্যক্তিগত গুণাবলী ও ঈমানের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে।

০৩। যারা ঈমান এনেছে নিশ্চয়ই তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে নিদর্শন সমূহ রয়েছে ৪৭৩৭।

৪৭৩৭। সূরা [ ২ : ১৬৪ ] আয়াতের বর্ণনায় আল্লাহ্‌র মাহত্ব্যের যে ছবি আকাঁ হয়েছে তারই দুই একটির পুণরাবৃত্তি করা হয়েছে এই সূরাতে তবে এর প্রেক্ষাপট আলাদা। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে বক্তব্যকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে , এবং এই তিনটি ভাগ তিনটি আয়াতে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ১) [ ৪৫ : ৩ ] আয়াতে আল্লাহ্‌র যে সব নিদর্শনের উল্লেখ করা হয়েছে তা মানুষের ধরা ছোয়ার বাইরে , তবে তা অনুভব করতে হয় আত্মার মাঝে, যার জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসের বা ঈমানের। এগুলিকে বলা হয়েছে মোমেন বান্দাদের জন্য নিদর্শন সমূহ যা তাদের ঈমানের ভিত্তিকে আরও মজবুত করে। অন্য দুটির জন্য দেখুন পরবর্তী টিকা দুটি।

০৪। এবং তোমাদের সৃষ্টিতে ও জীব জন্তুর [ পৃথিবীর ] চারিদিকে ছড়িয়ে থাকার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী ৪৭৩৮।

৪৭৩৮। ২) এবারে যে নিদর্শনের উল্লেখ করা হয়েছে তা মানুষের সৃষ্টি ও তার প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতার মাঝে নিহিত। আরও নিহিত আছে বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের মাঝে। অর্থাৎ প্রাণী জগত ও উদ্ভিদ জগতের সৃষ্টি কৌশলের মাঝে আল্লাহ্‌র নিদর্শন বর্তমান। এই সব নিদর্শনসমূহকে আত্মার মাঝে মানুষ অনুভব করতে সক্ষম বিজ্ঞানের জ্ঞানের মাধ্যমে। বিশ্ব প্রকৃতিতে যে সব প্রাকৃতিক আইন সবই আল্লাহ্‌র ক্ষমতার প্রকাশ বা আল্লাহ্‌র নিদর্শন। প্রকৃতির এই জ্ঞানই হচ্ছে 'বিজ্ঞান' বা ' বিশেষ জ্ঞান '। এই বিশেষ জ্ঞান মোমেন বান্দাদের ঈমানকে আরও নিশ্চিত করে। এই জ্ঞান 'নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য"। কারণ অবিশ্বাসীদের এই জ্ঞান আরও কাফেরে পরিণত করে।

০৫। এবং রাত্রি ও দিনের পরিবর্তনে ৪৭৩৯ , এবং আকাশ থেকে আল্লাহ্‌ যে জীবনোপকরণ প্রেরণ করেন ৪৭৪০, এবং তার দ্বারা মৃত ধরণীকে পুণর্জীবিত করেন, তাতে এবং বায়ুর পরিবর্তনে নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য।

৪৭৩৯। ৩) এই আয়াতে আল্লাহ্‌র নিদর্শন সমূহকে তুলে ধরা হয়েছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রাকৃতিক শক্তির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। এসব প্রাকৃতিক শক্তি বিভিন্নভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে , নিয়ন্ত্রিত করে - আমাদের জীবনের সাথে এ সব প্রাকৃতিক শক্তি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যারা " চিন্তাশীল ও জ্ঞানী সম্প্রদায় " তারাই পারে এসব পর্যবেক্ষণের দ্বারা আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে প্রত্যক্ষ করতে ও স্থির সিদ্ধান্তে উপণীত হতে।

৪৭৪০। বৃষ্টি বা বারি হচ্ছে "আকাশ থেকে" জীবনোপকরণের প্রতীক। বৃষ্টির ফলে ফসল উৎপন্ন হয়, উৎপন্ন ফসল রিযিক, তাই বৃষ্টির জন্য রিযিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টি শুষ্ক মাটিকে সিক্ত করে মাটিতে জীবনের সঞ্চার করে। ফলে মাটি শস্য - শ্যামল রূপ ধারণ করে ; শুষ্ক ঊষর মাটিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। ঠিক সেরকমই আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের শক্তি মৃত আত্মার মাঝে প্রাণের সঞ্চার করার ক্ষমতা রাখে। এখানে বৃষ্টিকে, আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের ক্ষমতাকে বুঝানোর জন্য প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনুরূপ প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তনকে। দিবা ও রাত্রির পরিবর্তন ,বায়ু প্রবাহের পরিবর্তন , প্রকৃতির এই অত্যাচার্য ঘটনাবলীকে তুলে ধরা হয়েছে উপমা হিসেবে আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে বুঝানোর জন্য। রাত্রি হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পরিবর্তন , রাত হচ্ছে অন্ধকার , দিন হচ্ছে উজ্জ্বল আলো। রাত্রিকে বা অন্ধকারকে তুলনা করা হয়েছে আধ্যাত্মিক অজ্ঞতার সাথে। অন্ধকার আধ্যাত্মিক অজ্ঞতার প্রতীক। দিন বা আলোকে তুলনা করা হয়েছে আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞায়তার প্রতীক হিসেবে, অথবা রাত্রি হচ্ছে বিশ্রামের জন্য। রাত্রিকে আধ্যাত্মিক নিষ্কৃয়তার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ; অপর পক্ষে দিন হচ্ছে কর্মব্যস্ততার জন্য। সেভাবে দিন বা দিনের আলোকে আধ্যাত্মিক কর্মচাঞ্চল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বায়ুর পরিবর্তনের সাথে পৃথিবীতে ঋতুর পরিবর্তন ঘটে ফলে পৃথিবীর বিরাট প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটে যার ফলে বিভিন্ন ঋতুতে পৃথিবী বিভিন্ন ফল ও ফসলে ভরে ওঠে। এভাবেই আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ মানুষের আত্মার মাঝে কল্যাণকর , মঙ্গলজনক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। প্রাকৃতিক এই ঘটনাবলীকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে  প্রতীক হিসেবে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের ক্ষমতাকে উপলব্ধি করার জন্য। আল্লাহ্‌র রহমতে মানব আত্মা হয় ধন্য ,তখন আত্মার বিকাশ ঐ সুজলা সুফলা শস্য শ্যামল ভূমির ন্যায় ধারণ করে, আল্লাহ্‌র নেয়ামত সীমাহীন তিনি সীমাহীন নেয়ামতের আঁধার।

০৬। এগুলি হচ্ছে আল্লাহ্‌র আয়াত , যা আমি[আল্লাহ্‌ ] তোমার নিকট সত্যসহ তিলাওয়াত করছি। এর পরেও আল্লাহ্‌ ও তাঁর আয়াতের পরিবর্তে তারা কোন ব্যাখ্যাতে বিশ্বাস করবে ? ৪৭৪১

৪৭৪১। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশের বাণী , প্রকৃতির মাঝে তাঁর নিদর্শন সমূহ যদি কারও হৃদয় ও মনে সাড়া না জাগায় ; যদি তা তাদের মনে বিশ্বাস উৎপন্ন না করে; যদি তা তাদের প্রত্যয় উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে তারা আর কোন ধরণের বর্ণনা গ্রহণ করবে ?

০৭। প্রত্যেক পাপী ও মিথ্যার বেসাতীদের জন্য দুভার্গ্য ৪৭৪২।

৪৭৪২। উপরের টিকাতে যাদের বর্ণনা করা হয়েছে তারা আধ্যাত্মিক দিক থেকে মৃত। এরা প্রকৃতপক্ষেই হতভাগ্য। কারণ এরা কখনও সত্যের আলো হৃদয়ের মাঝে উপলব্ধি করতে পারবে না।এদের প্রধান অবলম্বন হবে মিথ্যা, - এই মিথ্যা তাদের সমগ্র সত্ত্বার মাঝে পরিব্যপ্ত হবে। তাদের কর্মে , চিন্তায় , চরিত্রে, উপাসনায়, আল্লাহ্‌র প্রতি মানসিকতায়। তাদের মানসিকতাকে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। এরা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে ,পরিহাস করে থাকে ; এবং ভান করে যে সে এসবের উর্দ্ধে অবস্থান করে জ্ঞানে ও গরিমায়। এরাই হচ্ছে তারা যারা কান থাকতেও আল্লাহ্‌র বাণী শুনতে পাবে না বা হৃদয়ে বধিরএবং চোখ থাকতেও আল্লাহ্‌র নিদর্শনাবলী দেখতে পাবে না বা আত্মায় অন্ধ। কোরাণের আয়াত দ্বারা এরা কোনওরূপ লাভবান হবে না। এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আধ্যাত্মিক বধিরতা ও অন্ধত্ব অন্য কারও ক্ষতি করবে না ক্ষতি তার নিজেরই।

০৮। সে আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহের তেলাওয়াত শোনে , অথচ ঔদ্ধত্যের সাথে অটল থাকে, যেনো সে উহা শোনে নাই। তাহলে তুমি তার নিকট ভয়াবহ শাস্তির ঘোষণা দাও।

০৯। এবং যখন সে আমার আয়াতসমূহের কিছু অবগত হয়, সে তা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি ৪৭৪৩।

৪৭৪৩। লক্ষ করুন আয়াত [ ৮ -১১ ] নং পর্যন্ত পাপের শাস্তি বর্ণনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন অলংকারময় ভাষার প্রয়োগ করা হয়েছে - যা কৃত পাপের গুরুত্ব অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ।

১) ৮ নং আয়াতেবলা হয়েছে, যে ঔদ্ধত্য ও অহংকারের সাথে আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে তার অহংকারের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ শাস্তি।

২) যারা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে তাদের জন্য আছে " লাঞ্ছনাদায়ক " শাস্তি। সে নিজেকে হাস্যষ্করভাবে বোকা প্রমাণিত করে থাকে।

৩) নম্বর শাস্তির বর্ণনা আছে নিম্নোক্ত আয়াত সমূহে।

১০। এদের সামনে রয়েছে জাহান্নাম , তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের কোন উপকারে আসবে না , তারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে যে অভিভাবক গ্রহণ করেছে তারাও [ কাজে আসবে ] না। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি ৪৭৪৪।

৪৭৪৪। (৩) যারা অবিশ্বাসী ও পাপী তারা পৃথিবীর জীবনটাকেই সর্বোচ্চ চাওয়া ও পাওয়ার বস্তু বলে গণ্য করে। কারণ তাদের নিকট মৃত্যুর পরে আর কোনও জীবন নাই। সুতারাং এই জীবনের যা কিছু কাম্য বস্তু তারা তার পিছনেই ছুটে বেড়ায় জীবন ভরে এবং সম্মান , প্রভাব-প্রতিপত্তি , ধন-সম্পদ ইত্যাদি পার্থিব ভোগ্য বস্তু সম্ভারের পাহাড় গড়ে তোলে এবং মনে করে এগুলি তাকে ইহকাল ও পরকাল উভয় কালেই রক্ষা করতে পারবে। বিশ্বাস যখন প্রকৃত না হয়, তখন কার্য ও কার্যকরণ সিদ্ধান্ত ভুল হয়। তাদের এ সব পার্থিব বস্তু সামগ্রী পরলোকে কোনও কাজেই আসবে না। তাদের জন্য আছে মহা শাস্তি। আল্লাহ্‌র পরিবর্তে তারা পৃথিবীতে পার্থিব বস্তু পাওয়ার জন্য সাধনা করেছে , যা তাদের কাছে মনে হতো মানব জীবনের একমাত্র কাম্য, যা ছিলো তাদের উপাসনার বিষয় এবং যাকে তারা মনে করতো যে, তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে, একমাত্র অভিভাবক , পরলোকে তাদের সে সব উপাস্য ও অভিভাবক কোনও কাজেইআসবে না।

১১। ইহাই [ এই কুর-আন ] সত্য পথ প্রদর্শক। যারা তাদের প্রভুর আয়াত সমূহকে প্রত্যাখান করে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ যাতনাময় শাস্তি ৪৭৪৫।
৪৭৪৫।(৪) যারা অবজ্ঞাভরে কোরাণের প্রদর্শিত সৎপথকে পরিহার করে এবং রসুলের সাবধান বাণীকে উপেক্ষা করে তাদের জন্য রয়েছে জঘন্য বা মর্মন্তুদ শাস্তি। কারণ সে পৃথিবীতেই সকলের নিকট থেকে ঘৃণা কুড়িয়েছে - তার পাপ কার্যের দরুণ। সুতারাং তার জন্য আছে অবর্ণনীয় ঘৃণা মিশ্রিত আতঙ্কজনিত শাস্তি।