Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪০৫ বার
+ - R Print

সূরা দুখান

সূরা দুখান বা ধূয়া অথবা কুয়াশা - ৪৪

৫৯ আয়াত , ৩ রুকু , মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : হা-মিম্‌ সুরাগুলিতে সময়কাল ও মূল বিষয়বস্তুর জন্য দেখুন ৪০নং সূরার ভূমিকা। শ্রেণীর ক্রমপঞ্জিতে এই সূরাটির স্থান পঞ্চম।

এই সূরার বিষয় বস্তুর বৈশিষ্ট্য দুখান শব্দটি ১০নং আয়াতে দ্রষ্টব্য। এর অর্থ ধোঁয়া বা কুয়াশা। এই ধোঁয়া বা কুয়াশা দুভির্ক্ষের পূর্বাভাষ হতে পারে যা ব্যাখ্যা করা হয়েছে আয়াতের টিকাতে।

সার সংক্ষেপ : প্রত্যাদেশ ব্যাখ্যা করে কিভাবে পার্থিব অহংকার ও উদ্ধতপনা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়। আধ্যাত্মিক সত্যই স্থায়ীত্ব লাভ করে [ ৪৪ : ১ - ২৯ ]।

মানুষ আল্লাহ্‌র নেয়ামত লাভ করে আল্লাহ্‌র তরফ থেকে আমানত হিসেবে - কিন্তু মানুষ সেই আমানতের মর্যদা রাখতে সক্ষম হয় না - যেমনটি ঘটেছিলো ইসরাঈলীদের সম্পর্কে। কোরেশরা কি ভালো ও মন্দের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে ? [ ৪৪ : ৩০- ৫৯]।

সূরা দুখান বা ধূয়া (অথবা কুয়াশা )- ৪৪

৫৯ আয়াত , ৩ রুকু , মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। হা - মীম

০২। সুস্পষ্টভাবে বর্ণনাকারী কিতাবের শপথ ; - ৪৬৮৯

৪৬৮৯। পূর্বের সূরাতে [ ৪৩:৩ ] গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে কোরাণ সম্পর্কে যেনো প্রত্যেকে বুঝতে পারে। এই সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, কোরাণ শরীফ আল্লাহ্‌র তরফ থেকে করুণা ও দয়া যার সাহায্যে মানুষকে পাপের বিরুদ্ধে সর্তক করা হয়েছে।

০৩। নিশ্চয়ই আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি এক মঙ্গলময় রাত্রিতে ৪৬৯০। নিশ্চয় আমি [সবসময়ে মন্দের বিরুদ্ধে ]সাবধান করতে চাই।

৪৬৯০। "মঙ্গলময় রাত্রি " - এই রাত্রি সাধারণতঃ মনে করা হয় রমজান মাসের ২৩ শে বা ২৫ শে বা ২৭ এর রাত্রি। এই রাত্রিকে বলা হয়েছে বরকতময় রাত্রি। সাধারণতঃ ২৭শে রমজানকে ধরা হয় এই বরকতময় রাত্রি। এই রাত্রিতে কুর-আনের বাণী ধরিত্রীতে প্রথম অবতীর্ণ হয়, যা মানুষের জন্য রহমত স্বরূপ , ঠিক বৃষ্টি যেরূপ রৌদ্রদগ্ধ শুষ্ক জমিকে সিক্ত করে সেরূপ। এই রাত্রিকে আয়াত [ ২ : ১৮৫]ও আয়াতে [ ৯৭ : ১ ] বলা হয়েছে মহিমান্বিত রাত্রি। এই রাত্রিতে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়। পবিত্র এই রজনীকে শবে-কদরের রাত্রি বলে, যে রাতে কোরাণ পৃথিবীতে নাজেল হয়।

০৪। এই [ রাত্রিতে ] প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত করা হয় , ৪৬৯১-

৪৬৯১। এই সেই রাত্রি, যে রাত্রিতে ঐশি জ্ঞান ধরার বুকে আগমন করে এবং প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত করা হয় যা আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান দান করে। মানুষের জন্য যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

০৫। আমার উপস্থিতিতে আমার আদেশ অনুসারে। নিশ্চয়ই আমি [ সর্বদা প্রত্যাদেশ ] প্রেরণ করে থাকি ,

০৬। তোমার প্রভুর অনুগ্রহ স্বরূপ। নিশ্চয়ই তিনি [ সব কিছু ] শোনেন ও জানেন , ৪৬৯২ -

৪৬৯২। মহান আল্লাহ্‌ বন্ধুহীনের বন্ধু, অসহায়ের সাহায্যকারী। তিনি সকলের আন্তরিক প্রার্থনা শোনেন। তাঁর জ্ঞান সকল কিছুকে পরিবৃত করে থাকে। আমাদের দূরদৃষ্টির অভাবে আমরা অনেক সময়েই আমাদের প্রকৃত মঙ্গলকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হই না। আমাদের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক মহান আল্লাহ্‌ তা আমাদের প্রদান করেন তাঁর জ্ঞান , প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা অনুযায়ী। আমরা যে ভাবে চাই সে ভাবে তা নাও হতে পারে। কারণ আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত - অপরপক্ষে আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিভুর্ল ও সম্পূর্ণ।

০৭। যিনি আসমান , যমিন এবং এই উভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সমস্তের প্রভু, অবশ্য যদি তোমরা স্থির বিশ্বাসী হও ৪৬৯৩।

৪৬৯৩। দেখুন আয়াত [ ২ : ৪ ]। আকাশমন্ডলী , পৃথিবী ও উহাদিগের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালক আল্লাহ্‌। এই বিশাল বিশ্ব ভূবনের একজনই স্রষ্টা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা। এ কথা অনুভবের মাধ্যমে হৃদয় কন্দরে উপলব্ধি করা অসাধারণ এক বিষ্ময়কর ব্যাপার। যে আত্মায় আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসে আছে প্রচন্ডতা, দৃঢ়তায় আছে অতল সমুদ্রের গভীরতা, একমাত্র সেই আত্মার মাঝেই আল্লাহ্‌র এই বিশালত্বের ধারণা সামান্য হলেও ধারণ করা সম্ভব। বিশ্বাস যখন নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হয় শুধু তখনই স্রষ্টাকে অনুভবের মাধ্যমে আত্মার মাঝে উপলব্ধি করা সম্ভব।

০৮। তিনি ব্যতীত অন্য উপাস্য নাই। তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান । তিনি তোমাদের প্রভু এবং প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও।

০৯। তবুও তারা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে [ ধর্মকে নিয়ে ] খেলা করে ৪৬৯৪।

৪৬৯৪। এই আয়াতে কোরাইশদের কথা বলা হয়েছে। হযরতের [ সা ] নবুয়ত পাওয়ার প্রথম দিকে কোরাইশরা হযরতের প্রচারিত ধর্ম সম্বন্ধে হাসি ঠাট্টা করতো; তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের মাধ্যমে তার গুরুত্ব লাঘব করতে চাইত। প্রথমেই তারা হযরতের [ সা ] উপরে অত্যাচার নির্যাতন আরম্ভ করে নাই। প্রথমে কোরাইশরা হযরতের [ সা ] প্রচারিত ধর্ম সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে ও হাসি খেলার বস্তুতে পরিণত করতে চেষ্টা করে। অপরপক্ষে রাসুল [ সা ] ছিলেন একান্ত আন্তরিক ভাবে মনপ্রাণ দিয়ে সচেষ্ট। তিনি তাঁর দেশবাসীকে ভালোবাসেন এবং তিনি তাদের পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বদা আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

মন্তব্য : কোরেশদের এই মানসিকতা সর্ব যুগে সত্য বিরোধীদের প্রতি প্রযোজ্য। এই মানসিকতা পূর্বেও ছিলো, বর্তমানেও আছে ও ভবিষ্যতেও থাকবে।

১০। অতএব তুমি সেদিনের অপেক্ষা কর ৪৬৯৫ , যেদিন আকাশ ধূঁয়াতে [ বা কুয়াশায় ] আচ্ছন্ন হয়ে যাবে যা সুস্পষ্ট ভাবে দেখা যাবে ৪৬৯৬

১১। যা মানব সম্প্রদায়কে আবৃত করে ফেলবে। এটা হবে এক ভয়াবহ শাস্তি।

১২। [ তারা বলবে : ] " হে আমাদের প্রভু ! আমাদের উপর থেকে শাস্তি দূর করে দাও , আমরা অবশ্যই ঈমান এনেছি।"

৪৬৯৫। এখানে যে দিনের উল্লেখ করা হয়েছে সেটা কোন দিন ? অবশ্যই সে দিন হবে বিরাট বিপর্যয়ের দিন। ভাষার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, সে বিপর্যয়ের দিন হবে ভবিষ্যতে। এই সূরার ১১নং আয়াতের 'yagsha' শব্দটি সূরা [ ৮৮ : ১ ] আয়াতের 'gashiya' শব্দটির সাথে তুলনাযোগ্য। তবে শব্দটি শেষ বিচারের দিনের জন্য প্রযোজ্য হয়েছে। কিন্তু এই সূরার ১৫ নং আয়াতটিতে বলা হয়েছে , " শাস্তি কিছু কালের জন্য রহিত করিতেছি।" সুতারাং এই বিপর্যয়ের দিন শেষ বিচারের দিন হবে না। এটি হবে পৃথিবীর জীবনের বিপর্যয় যা ভবিষ্যতে সংঘটিত হবে। সম্ভবতঃ পরবর্তী মক্কাতে যে দুর্ভিক্ষ হবে তারই পূর্বাভাষ এখানে দেয়া হয়েছে।

৪৬৯৬। তফসীরকারগণ মনে করেন 'ধোঁয়া' বা কুয়াশা যাই বলা হোক না কেন তার দ্বারা মক্কার দুর্ভিক্ষের প্রতি ইঙ্গিতকরা হয়েছে। দিনের পরে দিন ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে করতে মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছায় যখন তারা চোখে ঘোর দেখে অর্থাৎ সব কিছু ঝাপসা বলে পরিগণিত হয়। মনে হবে ধোঁয়া সব কিছুকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। ইবনে কাফীর মক্কার দুইটি দুর্ভিক্ষের উল্লেখ করেছেন। একটা ছিলো নবুয়ত পাওয়ার ৮ম বর্ষে বা হিজরতের চার বছর পূর্বে , অন্যটি ছিলো হিজরতের ৮ম বর্ষে। যে কোনটি অথবা দুটোই সম্ভবতঃ প্রায় সাত বছরের মত স্থায়ী হয়। এটাও সম্ভব যে দুটো দুর্ভিক্ষই সামান্য ব্যবধানে ধারাবাহিক ভাবে চলে এসেছে বছরের পর বছর। যার প্রচন্ডতা এক এক বর্ষে এক এক রকম ভাবে অনুভূত হয়েছে। বুখারী শরীফে শুধুমাত্র হিজরতের পরবর্তী দুর্ভিক্ষের উল্লেখ আছে। সে দুর্ভিক্ষের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে সে দুর্ভিক্ষ এতটাই তীব্র ছিলো যে, মানুষ মৃত প্রাণীর গলিত শব ও হাড় ভক্ষণ করতো। আবু সুফিয়ান অষ্টম হিজরীতে রাসুলের নিকট গমন করেন আল্লাহ্‌র দরবারে রাসুলকে [ সা ] সুপারিশ করার জন্য; আল্লাহ্‌ যেনো তাদের দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দেন। যেহেতু, মোশরেক আরবরা বিশ্বাস করতো যে, দুর্ভিক্ষ রাসুলের [ সা ] অভিশাপের ফল। সূরা [ ২৩ : ৭৫ ] আয়াতে এবং টিকাতে ২৯২১ দুর্ভিক্ষের উল্লেখ আছে, যদিও সে সূরাটি বর্তমান সূরার পরে মক্কাতে অবতীর্ণ হয়। সকল সূরা সম্পূর্ণ এক সাথে অবতীর্ণ হয় নাই। অনেক সূরাই অংশ হিসেবে নাজেল হয়েছে। সুতারাং সম্ভবতঃ সূরার কোন কোন আয়াত সম্পূর্ণ সূরার নাজেল হওয়ার তারিখ থেকে আলাদা হতে পারে।

১৩। তাদের জন্য উপদেশ কি ভাবে [কার্যকর ] হবে, যখন [ ইতিমধ্যে ] তাদের নিকট সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাদানকারী একজন রসুল এসেছে,- ৪৬৯৭

৪৬৯৭। কোরাইশদের সম্মুখে রাসুলের [ সা ] জীবন ছিলো পবিত্রতার প্রতীক যে কারণে তারা তাঁকে আল্‌-আমীন [ বিশ্বাসী ]উপাধিতে ভূষিত করেছিলো। রাসুল তাদের মাঝে তাদের ভাষাতেই আল্লাহ্‌র বাণী প্রচার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিলো স্বচ্ছ ও মাধুর্য্যপূর্ণ ও যুক্তিপূর্ণ। তবুও সে বাণীর আবেদন কোরেশদের মনোজগতে কোনও আবেদন সৃষ্টি করতে পারে নাই। তাঁরা রাসুলকে প্রত্যাখান করে এই বলে যে তাঁর প্রচারিত বাণী আল্লাহ্‌র বাণী নয়, তিনি কারও শেখানো বুলি আওড়াচ্ছেন বা তিনি তো একজন উম্মাদ ব্যক্তি যার বক্তব্য সামঞ্জস্যবিহীন। এরূপ কদর্য মানসিকতাপূর্ণ ব্যক্তির অন্তরে কিভাবে আল্লাহ্‌র বাণী আসন লাভ করতে পারে ? কিভাবে তারা আল্লাহ্‌র নূরে বিধৌত হতে পারবে ?

১৪। তথাপি তারা [ নবীর ] দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বললো , " [ অন্যের দ্বারা] শিক্ষাপ্রাপ্ত এক পাগল।" ৪৬৯৮

৪৬৯৮। " অন্যের দ্বারা শিক্ষাপ্রাপ্ত " - দেখুন অনুরূপ অভিযোগ [ ১৬ : ১০৩ ] আয়াত ও টিকা ২১৪৩। "সে তো এক পাগল " - দেখুন অনুরূপ অভিযোগ [ ১৫ : ৬ ] ও টিকা ১৯৪০।

১৫। আমি স্বল্পকালের জন্য শাস্তি প্রত্যাহার করে নেবো , [ কিন্তু ] প্রকৃতপক্ষে তোমরা [তোমাদের পথে ] ফিরে যাবে ৪৬৯৯।