Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৪ জন
আজকের পাঠক ২ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৭০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪০৪ বার
+ - R Print

সূরা যুখরুখ

সূরা যুখরুফ বা স্বর্ণ অলংকার - ৪৩

৮৯ আয়াত, ৭ রুকু , মক্কী
[দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : হা-মিম সিরিজের সাতটি সূরার মধ্যে এটা হলো চতুর্থ সূরা। হা-মিম্‌ শ্রেণীর সূরার মূল বিষয়বস্তু সম্বন্ধে দেখুন ৪০ নম্বর সূরার ভূমিক।

এই সূরাতে সত্য এবং প্রত্যাদেশের প্রকৃত দ্যুতির সাথে মিথ্যা এবং মিথ্যা উপাস্যের প্রতারণামূলক চাকচিক্যের বৈষম্য তুলনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম , মুসা , এবং ঈসার উদাহরণের মাধ্যমে মিথ্যার প্রকৃতি রূপকে অনাবৃত করা হয়েছে এবং সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। মূল শব্দটি [ Zukhruf , স্বর্ণ অলংকার ] আয়াত নং ৩৮ তে উল্লেখ করা হয়েছে , কিন্তু এর ধারণা সূরাটির সর্বত্র বিদ্যমান।

সার সংক্ষেপ : কিতাব বা প্রত্যাদেশের বই সকল কিছুর ধারণাকে স্বচ্ছ করে দেয় যদিও অজ্ঞ ও বোকারা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ স্থায়ী হবে এবং এর বিদ্রূপকারীরা ধবংস হয়ে যাবে [ ৪৩ : ১- ২৫ ]।

হযরত ইব্রাহীম গতানুগতিক উপাসনার, মিথ্যা প্রথার প্রতারণা ও অসাধুতাকে অনাবৃত করে দেন। পৃথিবীর জাগতিক ঔজ্জ্বল্য এবং সাজসজ্জা চিরস্থায়ী নয়। মুসার সাথে ফেরাউনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ যুদ্ধের শেষ পরিণতি কি হয়েছিলো ? [ ৪৩ : ২৬ - ৫৬ ]।

হযরত ঈসা ছিলেন আল্লাহ্‌র সেবক। কিন্তু তাঁর অনুসারীরা সাম্প্রদায়িকতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে হযরত ঈসা সম্বন্ধে অসার তর্কে লিপ্ত হয়। আল্লাহ্‌ প্রকৃত সত্য জানেন। অবিশ্বাস সত্বেও আল্লাহ্‌র সত্য ভাস্বর হবে। [ ৪৩ : ৫৭-৮৯]।

সূরা যুখরুফ বা স্বর্ণ অলংকার - ৪৩

৮৯ আয়াত, ৭ রুকু , মক্কী
[দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। হা - মীম

০২। সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী কিতাবের শপথ , -

০৩। আমি ইহা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুর-আন ৪৬০৫ , যেনো তোমরা [ তা ] বুঝতে সক্ষম হও [এবং জ্ঞানী হতে শেখো ]।

৪৬০৫। দেখুন [ ৪৩ : ৭ ] আয়াত ও টিকা ৪৫৩৩।

০৪। এবং নিশ্চয় ইহা আমার উপস্থিতিতে কিতাব জননীর [লওহ্‌ মাহ্‌ফুজ ] মধ্যে রয়েছে , ইহা [ মর্যদায় ] অতি উচ্চ, জ্ঞানে পরিপূর্ণ ৪৬০৬।

৪৬০৬। দেখুন [ ৩ : ৭ ] আয়াত ও টিকা ৩৪৭ এবং আয়াত [ ১৩ : ৩৯ ] ও টিকা ১৮৬৪। উম্মুল কিতাব বা প্রত্যাদেশের মূল ভিত্তি। সংরক্ষিত ফলক [ লাওহ্‌ মাহ্‌ফুজ দেখুন ৮৫ : ২২ ] হচ্ছে প্রত্যাদেশের আসল অংশ বা সারাংশ , মূল নীতিমালা অথবা বিশ্বজনীন , চিরস্থায়ী আল্লাহ্‌র আইনের মূল উৎস। এই মূল উৎস থেকে সকল জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনন্ত ধারা প্রবাহিত হয় যা সর্ব যুগে সকল মনের সৃজনশীল ক্ষমতা ও চিন্তাকে জাগ্রত করে। উম্মুল কিতাব আল্লাহ্‌র কাছে সংরক্ষিত। এই কিতাবের সম্মান ও জ্ঞান আমাদের ধারণার বাইরে।

০৫। আমি কি তোমাদের থেকে এই উপদেশবাণী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেবো এই কারণে যে, তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় ? ৪৬০৭।

৪৬০৭। আল্লাহ্‌ অনুগ্রহপূর্বক আমাদের তাঁর প্রত্যাদেশ প্রেরণ করে , অসীম করুণা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন তবুও মানুষ বিভ্রান্ত হয়, অকৃতজ্ঞ হয়, অবজ্ঞা করে , আল্লাহ্‌ শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণ করে। আল্লাহ্‌র অসীম করুণা না থাকলে, তিনি যদি ক্ষমাশীল না হতেন তবে তার হেদায়েতের আলো মানুষ জাতির উপর থেকে তুলে নেওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি তা না করে তার করুণা ধারা অনবরত মানুষের উপরে বর্ষণ করে চলেছেন, অতীতেও করেছেন , বর্তমানেও করছেন, ভবিষ্যতে যারা আসবে তারাও তা লাভ করবে।

০৬। প্রাচীনকালের সম্প্রদায়ের মধ্যে আমি কত নবী প্রেরণ করেছিলাম ? ৪৬০৮

৪৬০৮। মানুষের বিদ্রোহ এবং একঘেয়েমী সত্বেও আল্লাহ্‌ যুগে যুগে মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী ও রসুলদের প্রেরণ করেছেন।

০৭। কিন্তু এমন কোন নবী তাদের নিকট আসে নাই যাকে তারা ঠাট্টা বিদ্রূপ করে নাই।

০৮। সুতারাং [ তাদের ] আমি ধ্বংস করেছিলাম - যারা ক্ষমতায় ইহাদের থেকেও শক্তিশালী ছিলো। আর [ এভাবেই ] চলে এসেছে পূর্ববর্তীদের অনুরূপ দৃষ্টান্ত৪৬০৯।

৪৬০৯। যুগে যুগে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শাস্তি হচ্ছে তাদের পতন। রাসুলের (সা ) সমসাময়িক আরব মোশরেকদের এই আয়াতের মাধ্যমে সাবধান করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী জাতিসমূহ যাদের ধ্বংস করা হয়েছে , তারা ধনে-সম্পদে, শক্তিতে শৌর্যে বীর্যে আরবদের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী ছিলো। কিন্তু আল্লাহ্‌র আইন অস্বীকার করার দরুণ তাদের ভাগ্যেও ধ্বংস নেমে এসেছিলো। অতীতের বিদ্রোহী জনগোষ্ঠি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাক্ষী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

০৯। যদি তুমি তাদের জিজ্ঞাসা কর, " কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে ? " ৪৬১০। তারাঅবশ্যই উত্তর দেবে, " এগুলি তো সৃষ্টি করেছেন মহাপরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ্‌।" ৪৬১১।

৪৬১০। দেখুন আয়াত [ ২৯ : ৬১ ] এবং টিকা ৩৪৯৩ এবং আয়াত [ ৩১ : ২৫ ] ও টিকা ৩৬১৩। পৃথিবীতে এরূপ লোকের সংখ্যা বহু আছে যারা তাদের আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও শক্তিকে অনুধাবন করা সত্বেও আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদারিত্ব করে।দুঃখ- বিপর্যয়ে তারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি বা অন্যান্য শক্তিহীন যেমন : রত্ন পাথর , জ্যোতিষ, মাজার ইত্যাদির সাহায্য প্রার্থনা করে। এভাবেই তারা আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদারিত্বে অংশ গ্রহণ করে। ফলে তারা সৃষ্ট জীবের প্রতি আল্লাহ্‌র অসীম করুণা ও দয়াকে তাদের আত্মার মাঝে অনুভব করতে ব্যর্থ হয়।

৪৬১১। এই আয়াত সমূহের বাগ্মিতা লক্ষ্য করার মত সৌন্দর্য্যমন্ডিত। উপরে বর্ণিত এসব অসঙ্গত লোক যারা আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলতে অপারগ তাদের সঙ্গতীবিহীন বক্তব্যের জবাব এখানে দেয়া হয়েছে। এ সব লোক আল্লাহ্‌র ক্ষমতাকে অনুধাবন করে কিন্তু আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণাকে অনুধাবনে অক্ষম হয়, তাদের চৈতন্যদয়ের জন্য আলংকারিক ভাষাতে আল্লাহ্‌র রহমত ও করুণার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

১০। যিনি ৪৬১২ , তোমাদের জন্য পৃথিবীকে [ কার্পেটের ন্যায় ] বিছিয়ে দিয়েছেন ৪৬১৩ , এবং তাতে তোমাদের জন্য তৈরী করেছে রাস্তা [ ও নদীপথ ] , যেনো তোমরা সঠিক পথের নির্দশনা পেতে পার।

৪৬১২। পূর্বের টিকা দেখুন।

৪৬১৩। দেখুন আয়াত [ ২০ : ৫৩ ] ও টিকা ২৫৭৬। 'Mihad' শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয় কার্পেট বা বিস্তৃত বিছানা অর্থাৎ পৃথিবীর ভূভাগ শুধুমাত্র চলাচলের স্বাধীনতাই ধারণ করে না তা বিশ্রামেরও স্থান। চলাচলের রাস্তা বা পথ বাক্যটি দ্বারা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যার মধ্যে স্থল পথ , জলপথ ও বিমান পথ অন্তর্ভূক্ত।

১১। এবং যিনি আকাশ থেকে [মাঝে মাঝে ] পরিমিত ভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেন ৪৬১৪। অতঃপর আমি তার দ্বারা মৃত মাটিকে জীবনে ফিরিয়ে আনি। ঠিক এরূপেই তোমাদের [ মৃত্যু থেকে ] উত্থিত করা হবে ৪৬১৫।

৪৬১৪। "পরিমিত ভাবে বৃষ্টি বর্ষণ করেন " অর্থাৎ ভূখন্ডের প্রয়োজন অনুযায়ী। এই প্রয়োজন স্থানীয় হতে পারে বা সামগ্রিক ভূখন্ডের জন্য হতে পারে। কোন দেশ বা মহাদেশের বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। বন্যা বা খরা হচ্ছে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক অবস্থা , যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ক্ষমতার অস্বাভাবিক প্রকাশ ঘটে - যার উদ্দেশ্য বোঝা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

৪৬১৫। "এভাবেই তোমাদিগকে পুনরুত্থিত করা হবে" দেখুন আয়াত [ ৩৫ : ৯ ] ও টিকা ৩৮৮১। আয়াতটির ভাষা লক্ষ্য করুন। প্রথম পুরুষ "আমি " শব্দটি এখানেপরিবর্তন করে তৃতীয় পুরুষ ব্যবহার করা হয়েছে , পুনরুত্থান শব্দটিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের জন্য। এ পুনরুত্থান আল্লাহ্‌র এক বিশেষ ক্ষমতার প্রকাশ যা সৃষ্টির অন্যান্য সাধারণ কর্ম থেকে পৃথক।

১২। যিনি সব জিনিষকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন ৪৬১৬, এবং যিনি তোমাদের জন্য নৌযান ও গৃহপালিত পশু সৃষ্টি করেছেন যেনো তোমরা তাতে আরোহণ করতে পার ৪৬১৭।

৪৬১৬। দেখুন [ ২০ : ৫৩ ] আয়াতের টিকা নং ২৫৭৮। আরও দেখুন আয়াত [ ৩৬ : ৩৬ ] ও টিকা ৩৯৮১।

৪৬১৭। নৌযান ও আনআম বা পশুকে, সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ঘোড়া, উট, জাহাজ, নৌকা, স্টীমার , রেলগাড়ী , এরোপ্লেন ইত্যাদি বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমগুলির মধ্যে গৃহপালিত পশুদের প্রশিক্ষণ দান ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলনের মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োজন। এই উদ্ভাবনী ক্ষমতা আল্লাহ্‌র বিশেষ দান মানুষের প্রতি যা জীব জগতের অন্যান্য প্রাণীকে দান করা হয় নাই।