Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৪০২ বার
+ - R Print

সূরা হা- মীম

সূরা হা- মীম বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর অথবা আস্‌ - সাজ্‌দা অথবা ফুসিলত -৪১

৫৪ আয়াত , ৬ রুকু
[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : " হা-মিম " দিয়ে শুরু হয়েছে যে সব সূরা সেই শ্রেণীর সাতটি সূরার এটি দ্বিতীয় সূরা। এ সূরার শিরোনাম হা-মিম্‌। এই শিরোনাম যাতে হা-মিম শ্রেণীর সূরাগুলির নামকরণের সাথে বিভ্রান্তি না ঘটায় সে জন্য সূরাটির নাম হা-মিমের সাথে আস্‌ সাজদা যোগ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সূরাটির নাম হয়েছে হা-মিম ,আস্‌ সাজদা। দুটো নামকে এক সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে কারণ সাজ্‌দা নামে আর একটি সূরা আছে [ সূরা নং ৩২ ]। দুটি শিরোনামের অসুবিধা দূর করণের জন্য অনেক সময়ে এই সূরার তিন নম্বর আয়াতে দ্রষ্টব্য "ফুসিলত" শব্দটি অনুযায়ী "ফুসিলত" নামকরণ করা হয়।

সুরা ৪০ নং এর ভূমিকায় হা-মিম শ্রেণীর সময় কাল সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছেঃ বিশ্বাসের এবং প্রত্যাদেশের ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্‌র ক্ষমতা ও করুণা , যার ফল হচ্ছে মুত্তাকী অর্জন ও আধ্যাত্মিক শান্তি।

সার সংক্ষেপ : প্রত্যাদেশ ও বিশ্বাস কি ? এই দুয়ের প্রতি মানুষের মনোভাব কি ? এবং এই মনোভাবের পরিণতি কি ? [ ৪১ : ১ - ৩২ ]।

বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এবং সত্য ও মিথ্যার ফলাফল কি ? [ ৪১ : ৩৩ - ৫৪ ]।

সূরা হা- মীম বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর অথবা আস্‌- সাজ্‌দা অথবা ফুসিলত - ৪১
৫৪ আয়াত , ৬ রুকু

[ দয়াময় , পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। হা - মীম

০২। দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নিকট থেকে ৪৪৬৩, -

৪৪৬৩। পূর্বের সূরাতে [ ৪০ নং ] বলা হয়েছে যে কোরাণ এসেছে মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ্‌র নিকট থেকে। সেখানে কোরাণের উল্লেখের সাথে আল্লাহ্‌র গুণাবলীর উল্লেখ আছে। এই সূরার আয়াতে কেরাণের বিষয় বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে।

১) কোরাণ হচ্ছে সুসংবাদ দাতা ও সর্তককারী।

২) এই কিতাবে কোন কিছু অস্পষ্টরূপে বলা হয় নাই , এখানে সকল কিছু সুস্পষ্টরূপে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে।

৩) এই কিতাব আরবী ভাষাতে অবতীর্ণ হয়েছে , এর একমাত্র কারণ এই ঐশী বাণী প্রথম যাদের মাঝে প্রচারিত হবে তারা সকলে আরবী ভাষী। সুতারাং মাতৃভাষাতে আল্লাহ্‌র বাণীর নূর, বক্তব্য, অনুধাবন করা তাদের পক্ষে অনেক সহজ হবে।যদি তারা তা করতে চায়।

৪) এই কিতাব অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের দ্বারা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতার কথা বলে এবং আধ্যাত্মিক জগতের বিপদ সম্বন্ধে সর্তক করে।

০৩। একটি কিতাব , যার আয়াত সমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ; - [ ইহা ] আরবী ভাষার কুর-আন যারা বুঝতে পারে তাদের জন্য ; -

০৪। সুসংবাদদাতা এবং সর্তককারী স্বরূপ, তথাপি অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নেয়, সুতারাং তারা [ কিছুই] শোনে না ৪৪৬৪।

৪৪৬৪। যদি কেউ আন্তরিক ভাবে কোরাণের বাণী অনুধাবন করার ইচ্ছা রাখে তবে কোরাণ পাঠ তার আধ্যাত্মিক জগতের প্রভূত উপকার সাধিত করবে। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছা পোষণ না করে তবে কোরাণ পাঠের দ্বারা সে কোন আত্মিক উপকার লাভ করবে না। কোরাণ পাঠের দ্বারা আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভ না করার কারণ তাদের ইচ্ছার অভাব। ফলে তারা আত্মার মাঝে আল্লাহ্‌র হেদায়েত অনুভবে অক্ষম হয়।

০৫। তারা বলে, " তুমি যার দিকে আমাদের আহ্বান করছো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে -আচ্ছাদিত ৪৪৬৫। আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা , এবং আমাদের ও তোমার মাঝে আছে পর্দা। সুতারাং [ যা করতে চাও ] তুমি তা কর ; [ আমাদের যা করার ] আমরা করবো ৪৪৬৬।

৪৪৬৫। ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশকে প্রত্যাখান করার ফলে আল্লাহ্‌র বাণীর মর্মার্থ ও প্রত্যাখানকারীর মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয় ; বাঁধার প্রাচীর তৈরী হয়। সে বাধার প্রাচীর অতিক্রম করে, দূরত্বকে অতিক্রম করে আল্লাহ্‌র বাণী তাদের আত্মার মাঝে স্থান করে নিতে পারে না। তাদের আত্মিক জগত ধীরে ধীরে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।তাদের কান থাকতেও সত্যের আহ্বান শুনতে পাবে না। তারা হবে বধিরের ন্যায় - সত্যের আহ্বান তাদের শ্রবণে ধীরে ধীরে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাবে। তারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত রাসুলের সাথে নিজেদের দুস্তর ব্যবধানের সৃষ্টি করবে। কারণ আল্লাহ্‌ " সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" [ ৪০ : ২৮ ] ও টিকা ৪৩৯৮।

৪৪৬৬। সম্পূর্ণ আয়াতটির বক্তব্য সম্ভবতঃ অবিশ্বাসীদের বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গক্তি, অথবা আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রতি অনীহার প্রকাশ। এই মানসিকতার প্রেক্ষিতেই তারা রাসুলকে [ সা ] বলেছিলো , " আমাদের হৃদয় ও মন তোমার মহৎ বাণী শোনার বা বোঝার উপযুক্ত নয়; তোমার ব্যাখ্যা শোনার জন্য আমাদের শ্রবণ শক্তি এতটা তীক্ষ্ণ নয় ; তুমি আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ; তোমার সাথে আমাদের দুস্তর ব্যবধান। আমাদের জন্য তোমার চিন্তার কোনও কারণ নাই। তুমি তোমার পথে যাও আমরা আমাদের পথে যাব।"

উপরের বক্তব্য হচ্ছে আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের প্রকাশ। এই প্রকাশ রাসুলের সময়ে যেরূপ বিদ্যমান ছিলো , অদ্যাবধি সমভাবে বিদ্যমান আছে অবিশ্বাসী ও অংশীবাদীদের মাঝে।

০৬। তুমি বল, " আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই ৪৪৬৭। ওহীর মাধ্যমে আমাকে প্রত্যাদেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের উপাস্য এক আল্লাহ্‌। সুতারাং তাঁর দিকে সত্য পথে চল; এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।" যারা আল্লাহ্‌র সাথে অংশীদার করে তাদের দুর্ভাগ্য , - ৪৪৬৮

০৭। তারা যাকাত দেয় না এবং তারা পরকালকে অস্বীকার করে।

৪৪৬৭। অবিশ্বাসী ও অংশীবাদীদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের উত্তরে এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র প্রেরিত রাসুল [ সা ] কোনও ফেরেশতা বা অতিমানব নন। তিনি আর দশজনের মতই সাধারণ মানুষ। সেক্ষেত্রে তাঁর ও অন্যের মধ্যে কোনও ব্যবধান নাই। আল্লাহ্‌ তাঁকে মনোনীত করেছেন সত্যকে প্রচারের জন্য এবং নিরাশ হৃদয়ে আশার বাণী শোনানোর জন্য। সুতারাং তাদের উচিত আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং অনুতাপের মাধ্যমে আত্মসংশোধনের দ্বারা আল্লাহ্‌র করুণা ও ক্ষমালাভ করা।

৪৪৬৮। যারা আল্লাহ্‌র সত্যকে অস্বীকার করে এবং মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করে তাদের জন্য করুণা প্রকাশ ব্যতীত আর কিছু করার থাকে না। এদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , এরা অংশীবাদী হয়, অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কিছুর উপরে নির্ভরশীল। নিজ সম্প্রদায়ের জন্য এদের কোনও সহানুভূতি থাকে না ফলে তারা যাকাত দেয় না বা দান করে না। এমন কি এরা পরকালেও বিশ্বাসী নয়।

০৮। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে পুরষ্কার যা কখনো কম পড়বে না ৪৪৬৯।

৪৪৬৯। ইসলাম ধর্মের মর্মার্থকে এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান ও অন্তরের বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে সৎকর্মে যারা আত্মনিবেদিত তারাই ধন্য। তাদের জন্য রয়েছে " নিরবচ্ছিন্ন পুরষ্কার "।

রুকু - ২

০৯।বল, " যিনি দুই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করছো ? ৪৪৭০ এবং তোমরা কি তাঁর সাথে সমকক্ষ দাঁড় করাচ্ছ ? তিনি [ সমস্ত ] জগতসমূহের প্রভু।

৪৪৭০। ব্যাখ্যাদানকারীদের জন্য এই আয়াতটি ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ এই আয়াতে মহাকাশ ও আমাদের চারিপাশের দৃশ্যমান পৃথিবীর সৃষ্টির বিবরণ আছে। এই আয়াতে [ ৯ নং ] পৃথিবী সৃষ্টির সময়কাল বলা হয়েছে দুইদিন, পরের আয়াতে [১০ নং ] উল্লেখ করা হয়েছে চার দিনের এবং ১২ নং আয়াতে উল্লেখ আছে দুই দিনের। তাহলে মোট দিনের সংখ্যা দাঁড়ায় আট দিন। কিন্তু কোরাণশরীফের বহুস্থানে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির সময় কালকে বলা হয়েছে ছয় দিন। দেখুন নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ যেখানে ছয়দিনের উল্লেখ আছে ; [ ৭ : ৫৪ ] ও টিকা ১০৩১, [ ৩২ : ৪ ] ও টিকা ৩৬৩২ ; [ ১০ : ৩ ] ; [১১ : ৭] ; [ ২৫ : ৫৯ ] ; [ ৫৭ : ৪ ]। তফসীরকারদের মতে [ ৪১ : ১০ ] আয়াতে যে চারদিনেরউল্লেখ আছে, এই চারদিনের মধ্যে [ ৪১ : ৯ ] আয়াতেরদুই দিন অর্ন্তভূক্ত। তাহলেই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির সর্বমোট সংখ্যা দাঁড়াবে ছয়দিন। এই বিবরণ যুক্তিগ্রাহ্য, কারণ , প্রকৃত পক্ষে ১০ নং আয়াতটি ৯নং আয়াতের ধারাবাহিকতা। পৃথিবী সৃষ্টির চারদিনের মধ্যে দুদিন [ ৯ নং আয়াত ] ছিলো পৃথিবীর উপকরণ সৃষ্টি, পরবর্তীতে বিবর্তনের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের সৃজন যথাঃ পর্বত , সমুদ্র এবং এর প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত এবং সেই সাথে তাদের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ সৃষ্টি। দেখুন আয়াত [ ১৫ : ১৯ - ২০]।

১০। তিনি [ পৃথিবীর ] উপরিভাগে সৃষ্টি করেছেন সুদৃঢ় পবর্তমালা ৪৪৭১ এবং পৃথিবীতে দিয়েছেন কল্যাণ এবং চারি দিনের ৪৪৭২ মধ্যে তাদের পুষ্টির জন্য সকল জিনিষের ব্যবস্থা করেছেন পরিমিত পরিমাণে , [জীবনোপকরণ ] যাচ্‌নাকারীদের [ প্রয়োজন ] অনুযায়ী ৪৪৭৩।

৪৪৭১। দেখুন আয়াত [ ১৩ : ৩ ] এবং [ ১৬ : ১৫ ] ও টিকা ২০৩৮। এই আয়াতটি ইংরেজী ও বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজী অনুবাদ হচ্ছে "He set on [ earth ] mountains standings firm , high above" ইংরেজী সুউচ্চ শব্দটির স্থলে বাংলা "অটল " শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৯০০০ ফিট এবং সমুদ্রের সর্বোচ্চ গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১,০০০ ফিট। সুতারাং সর্বোচ্চ স্থান ও সর্বনিম্ন স্থানের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে ১১১/২ মাইল। পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা দেখতে পাই যে, নদী সমূহের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে পর্বতসমূহ। নদী হচ্ছে পৃথিবীর সকল প্রাণী জগত ও উদ্ভিদ জগতের পানীয় জলের এবং সর্বপ্রকার জীবন ধারণের পানির উৎস।সুতারাং পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের পানির সুচারুরূপে বিতরণের জন্য পর্বতের কার্যকারিতা অপরিসীম। আবার সুউচ্চ পর্বতসমূহ পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ চলমান শিলাস্তরকে স্থির রাখে ফলে ভূপৃষ্ঠে অহরহ ভূকম্পনের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবেই আল্লাহ্‌ পর্বতসমূহে মানুষের জন্য "কল্যাণ রেখেছেন।"