+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে মুমিন বা বিশ্বাসী ; অবিশ্বাসী ফেরাউনের লোকদের মাঝে একজনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ঈমানের নাম অনুসারে, যে নিজেকে বিশ্বাসী বলে ঘোষণা করে এবং ভবিষ্যতের পানে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে [ আয়াত ২৮-৪৫ ]। এই সূরার আর একটি নাম হচ্ছে গাফির [Gafir] বা যিনি ক্ষমা করেন [ দেখুন আয়াত নং ৩ ]। সূরা ২৩ নং এ বহুবচনে বিশ্বাসীগণকে বলা হয়েছে মুমিনুন [ Muminun ] , যেখানে যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে গুণের সমষ্টিগত শক্তির উপরে যা ঈমানের মূল ভিত্তি। এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও গুণরাজি যা ব্যক্তিকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়।
এই সূরা থেকে শুরু হচ্ছে সাতটি সূরার একটি শ্রেণী [সূরা নং ৪০ -৪৬ ]। এই সাতটি সূরার প্রারম্ভে হা-মীম [ Ha – Mim ] অক্ষর দ্বয়কে স্থাপন করা হয়েছে। কালক্রমানুসারে এই সকল সূরার সময়কাল প্রায় একই সময়। তা হচ্ছে মক্কার শেষ সময়কাল। হা-মীম্ শব্দটির প্রকৃত কোন ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় নাই , এর ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
এই শ্রেণীর সূরাগুলির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের সাথে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক ,ভালো ও মন্দের সম্পর্ক, সত্য ও মিথ্যার সম্পর্ক ,প্রত্যাদেশ গ্রহণ ও প্রত্যাখানের সম্পর্ক। এই জোড়া শব্দগুলির প্রথম শব্দগুলি মানুষের প্রকৃত বন্ধু এবং দ্বিতীয় শব্দগুলি মানুষের শত্রু।
এই অর্থে 'হা-মিম ' শব্দটি সূরা নং ৪০ ও ৪১ এ ব্যবহৃত হয়েছে [ ৪০ : ১৮ এবং ৪১ : ৩৪ ]। অন্যান্য সূরাতে অন্যান্য শব্দগুলি একই গুরুত্ব বহন করে থাকে যেমন : 'Wali' অথবা 'nasir' [ ৪২ : ৮, ৩১ ] ; 'qarlin'[ ৪৩ : ৩৬ , ৩৮] ; 'maula'[ ৪৪ : ৪১ ] ; 'auliyaa' অথবা 'nasirin'[ ৪৫ : ১৯, ৩৪ ] ; এবং 'anliyaa'[ ৪৬ : ৩২ ]।
সার সংক্ষেপ : বিশ্বাস বা ঈমানই হচ্ছে সঠিক। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল। মন্দ কাজ মন্দ পরিণাম ডেকে আনে। কারণ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাত এবং ন্যায়বান। [ ৪০ : ১ - ২০ ]।
ইতিহাস বলে মন্দ মন্দের নিকট আসবে। মন্দের দ্বারা ঈমান বা বিশ্বাসের প্রতিরোধ প্রত্যাখাত হতে পারে ; কিন্তু বিশ্বাসীকে রক্ষা করবেন স্বয়ং আল্লাহ্ এবং মন্দ শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে। [ ৪০ : ২১ - ৫০ ]
শেষ বিচারের দিন সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। আল্লাহ্র ক্ষমতা , দয়া এবং ন্যায় বিচার স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। মানুষ কি খুব দেরী হয়ে যাওয়ার পূর্বে তা গ্রহণ করবে, না শুধু তর্ক করে যাবে ? [ ৪০ : ৫১ - ৮৫ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৪৩৫৭। এই আয়াতটি সূরা [ ৩৯ :১ ] আয়াতের অনুরূপ , ব্যতিক্রম শুধুমাত্র শেষ লাইনটি যেখানে আল্লাহ্র সম্বন্ধে বিশেষ বিশেষণ প্রয়োগ করা হয়েছে। সূরা [ ৩৯: ১ ] আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ্ " প্রজ্ঞাময় " এখানে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র "প্রজ্ঞার " ও " বিচক্ষণতার " উপরে কারণ বিরোধীরা আল্লাহ্ প্রদত্ত শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করতে আগ্রহী। এই সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞানের উপরে। আল্লাহ্র জ্ঞানের তুলনায় অন্যান্যদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। কারণ তিনি সর্বজ্ঞ।
৪৩৫৮। আল্লাহ্র জ্ঞান সর্বোচ্চ, তা সব কিছুকে স্পর্শ করে থাকে। আল্লাহ্র অন্যান্য আরোপিত গুণ বা বিশেষণ যা আমাদের গভীরভাবে আগ্রহী করে তা হচ্ছে আল্লাহ্ আমাদের অনুতাপকে গ্রহণ করবেন, যদি তা আন্তরিক হয় এবং পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আন্তরিক অনুতাপ পাপীর জীবনকে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত করে দেয়। সেই সাথে তিনি ন্যায় বিচারকও - শাস্তি দানে কঠোর। সুতারাং পাপীদের পলায়নের কোনও উপায় থাকবে না ; একমাত্র অনুতাপের মাধ্যমেই পাপীদের অব্যহতি পাওয়া সম্ভব। এ ব্যতীত আল্লাহ্র অন্যান্য গুণবাচক আরোপিত বিশেষণ সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্যঃ তাঁর দয়া , জ্ঞান ও ন্যায়বিচার , তাঁর অনুগ্রহ এবং শাস্তি।
৪৩৫৯। আল্লাহ্র জ্ঞান ও আরোপিত গুণবাচক বিশেষণ সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ এবং নিখিল বিশ্ব-ভূবন সর্বদা এই সত্যকে ঘোষণা করছে। আমাদের চারিদিকে আল্লাহ্র নিদর্শনে পরিপূর্ণ। যাদের মাঝে বিশ্বাসের ঘাটতি আছে, শুধুমাত্র তারাই আল্লাহ্র নিদর্শনকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না এবং তারাই বৃথা তর্কে লিপ্ত হয়।
৪৩৬০। দেখুন আয়াত [ ৩ : ১৯৬ ]। যারা আল্লাহ্র নিদর্শন আত্মার মাঝে অনুভব করতে পারে না , তাদের বাইরের প্রদর্শনী অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়। তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি , চটপটে কথাবার্তা , দেশেবিদেশে অবাধ বিচরণ ইত্যাদি যেনো মোমেন বান্দাদের বিভ্রান্ত না করে।
৪৩৬১। দেখুন আয়াত [৩৮ : ১১ - ১৩ ] ও টিকা ৪১৫৮। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে যুগে যুগে মন্দ সর্বদা ভালো ও সত্যকে প্রতিহত করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র প্রেরিত সত্যের বিজয় হয়েছে। আল্লাহ্র প্রেরিত সত্যের বিরুদ্ধে বা এ সত্যকে যারা প্রচার করেন সে সব নবী ও রসুলদের বিরুদ্ধে বা আল্লাহ্র সুদূর প্রসারিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এসব অশুভ ও মন্দ শক্তির সমগ্র প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৪৩৬২। পৃথিবীতে আল্লাহ্ যখনই জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অত্যাবশকীয় সত্যকে প্রেরণ করেছেন বা পুরাতন প্রচারিত সত্যের বাণীকে পূনর্জীবিত করেছেন যুগে যুগে সে বাণী প্রচারে বাধা প্রাপ্ত হয়েছে। অজ্ঞ ও স্বার্থে অন্ধ ব্যক্তিরা সর্বদা সত্যের বিরুদ্ধে অসাড় তর্ক বির্তকে লিপ্ত হয়। তারা এসব মিথ্যা বাক্ -বিতন্ডার দ্বারা সত্যের দীপ্তিকে ম্লান করে দিতে বদ্ধপরিকর। তাদের ধারণা এর দ্বারা তারা আল্লাহ্র পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু তারা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী। অনেক সময়ে দেখা যায় অন্যায় বা অসত্য তাদের কূটকৌশল ও দুষ্ট বুদ্ধির সাহায্যে ক্ষণস্থায়ী বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়; সত্যকে দমিত করতে সক্ষম হয়, কিন্তু তা খুবই ক্ষণস্থায়ী , কারণ সময়ের বৃহত্তর পরিসরে সত্য প্রকাশিত হবেই এবং তা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন অন্যায়কারীদের মিথ্যা পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। তারা তাদের নিজেদের ফাঁদে নিজেরা ধৃত হয়ে পড়ে। শয়তানের ফাঁদে ধৃত হওয়ার শাস্তি ভয়ানক।
উপদেশ : পৃথিবীতে কোনও সৎ বা ভালো কাজ প্রথমেই অভিনন্দিত হবে না। মানুষরূপী শয়তান তাতে বাধা প্রদান করবেই। তবে আল্লাহ্ আমাদের সুসংবাদ দান করেছেন যে, এতে নিরাশ হওয়ার কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সৎকর্ম প্রতিষ্ঠিত হবেই ,যা ন্যায় ও সত্য ,মানুষের জন্য যা মঙ্গলজনক তা ধ্বংস করার ক্ষমতা কারও নাই।
৪৩৬৩। দেখুন আয়াত [ ১৩ : ৩২ ]।
৪৩৬৪। দেখুন [ ৩৯ : ৭১ ]। আল্লাহ্র হুকুম বা আল্লাহ্র বাণী যার সাহায্যে মন্দ বা পাপীদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে , তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কারণ তারা শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছে পৃথিবীতে এবং পরলোকে তারা হবে দোযখের অধিবাসী।
৪৩৬৫। দেখুন অনুরূপ আয়াত [৩৯ : ৭৫ ]।
৪৩৬৬।দেখুন আয়াত [ ৬ :৮০ ] ও [৭ : ৮৯ ]।
৪৩৬৭। প্রার্থনার মাঝে কোনও স্বার্থপরতা নাই। তা যে শুধুমাত্র নিজের জন্য হতে হবে তা নয়। প্রার্থনা হতে হবে সার্বজনীন। যথা প্রকৃত পূণ্যাত্মা ও আল্লাহ্র প্রতি আন্তরিক - তারা সকলেই একই ভাতৃবন্ধনে আবদ্ধ। তারা সকলেই সকলের জন্য আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করে থাকে। পাপ একটি সংক্রামক ব্যাধির ন্যায়। খুব সহজেই অন্যকে সংক্রামিত করে। পূণ্যও ঠিক তদ্রূপ। ভালো সকল সময়েই অন্যকে ভালোর দিকে আকর্ষণ করে থাকে। পূণ্যাত্মারা সর্বদা পূণ্যাত্মাদের সহচর্য কামনা করে থাকে। তারা পরস্পর পরস্পরের সুখ ও শান্তি কামনা করে এবং সকলের জন্য আল্লাহ্র অনুগ্রহ কামনা করে থাকে।
উপদেশ : এই আয়াতগুলি প্রতিটি পূণ্যাত্মার প্রার্থনা হতে পারে। যদিও এই প্রার্থনা ছিলো আল্লাহ্র আরশ্ বহনকারী ফেরেশতাদের।
৪৩৬৮। আল্লাহ্ যাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেবেন সেই তো সাফল্য লাভ করে ; কারণ সেটাই হবে তার শেষ বিচার। যদি কেউ ইহকালের পাপ থেকে আল্লাহ্র অনুগ্রহে ক্ষমা লাভ করে থাকে; তবে তাই-ই হচ্ছে সর্বোচ্চ সাফল্য। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ ধাপে ধাপে জীবনের পথ অতিক্রম করে। ধাপে ধাপে তার চাওয়া ও পাওয়ার বিবর্তন ঘটে। এর শেষ হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। মৃত্যুর সিংহদুয়ার পেরিয়ে পরলোকের জীবনে সে প্রবেশ লাভ করে এবং সে জীবনের সাফল্যই হচ্ছে সর্বোচ্চ সাফল্য। যেখানে জীবনের চাওয়া পাওয়ার সব শেষ হয়ে যায়। সকল কর্মের সিদ্ধি লাভ যেখানে ঘটে থাকে। জীবনের মহৎ পরিনতি হচ্ছে সর্বোচ্চ মুক্তি ও শান্তি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে।
৪৩৬৯। মুসলিম দর্শনে আত্মিক মুক্তি বা সাফল্যের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ। পৃথিবীতে মানুষের জন্ম শুধুমাত্র মৃত্যুর মাঝে শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য নয়। আল্লাহ্ মানুষের জন্য উচ্চতর মহৎ লক্ষ্য নির্ধারিত করে রেখেছেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনে। যে সেই মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম সেই সাফল্য লাভ করে আল্লাহ্র অনুগ্রহে ধন্য হয়।
সূরা মুমিন
Page 1 of 8
সূরা মুমিন বা বিশ্বাসী - ৪০
৮৫ আয়াত, ৯ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে মুমিন বা বিশ্বাসী ; অবিশ্বাসী ফেরাউনের লোকদের মাঝে একজনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ঈমানের নাম অনুসারে, যে নিজেকে বিশ্বাসী বলে ঘোষণা করে এবং ভবিষ্যতের পানে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে [ আয়াত ২৮-৪৫ ]। এই সূরার আর একটি নাম হচ্ছে গাফির [Gafir] বা যিনি ক্ষমা করেন [ দেখুন আয়াত নং ৩ ]। সূরা ২৩ নং এ বহুবচনে বিশ্বাসীগণকে বলা হয়েছে মুমিনুন [ Muminun ] , যেখানে যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে গুণের সমষ্টিগত শক্তির উপরে যা ঈমানের মূল ভিত্তি। এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও গুণরাজি যা ব্যক্তিকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়।
এই সূরা থেকে শুরু হচ্ছে সাতটি সূরার একটি শ্রেণী [সূরা নং ৪০ -৪৬ ]। এই সাতটি সূরার প্রারম্ভে হা-মীম [ Ha – Mim ] অক্ষর দ্বয়কে স্থাপন করা হয়েছে। কালক্রমানুসারে এই সকল সূরার সময়কাল প্রায় একই সময়। তা হচ্ছে মক্কার শেষ সময়কাল। হা-মীম্ শব্দটির প্রকৃত কোন ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় নাই , এর ব্যাখ্যা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
এই শ্রেণীর সূরাগুলির মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের সাথে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক ,ভালো ও মন্দের সম্পর্ক, সত্য ও মিথ্যার সম্পর্ক ,প্রত্যাদেশ গ্রহণ ও প্রত্যাখানের সম্পর্ক। এই জোড়া শব্দগুলির প্রথম শব্দগুলি মানুষের প্রকৃত বন্ধু এবং দ্বিতীয় শব্দগুলি মানুষের শত্রু।
এই অর্থে 'হা-মিম ' শব্দটি সূরা নং ৪০ ও ৪১ এ ব্যবহৃত হয়েছে [ ৪০ : ১৮ এবং ৪১ : ৩৪ ]। অন্যান্য সূরাতে অন্যান্য শব্দগুলি একই গুরুত্ব বহন করে থাকে যেমন : 'Wali' অথবা 'nasir' [ ৪২ : ৮, ৩১ ] ; 'qarlin'[ ৪৩ : ৩৬ , ৩৮] ; 'maula'[ ৪৪ : ৪১ ] ; 'auliyaa' অথবা 'nasirin'[ ৪৫ : ১৯, ৩৪ ] ; এবং 'anliyaa'[ ৪৬ : ৩২ ]।
সার সংক্ষেপ : বিশ্বাস বা ঈমানই হচ্ছে সঠিক। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল। মন্দ কাজ মন্দ পরিণাম ডেকে আনে। কারণ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাত এবং ন্যায়বান। [ ৪০ : ১ - ২০ ]।
ইতিহাস বলে মন্দ মন্দের নিকট আসবে। মন্দের দ্বারা ঈমান বা বিশ্বাসের প্রতিরোধ প্রত্যাখাত হতে পারে ; কিন্তু বিশ্বাসীকে রক্ষা করবেন স্বয়ং আল্লাহ্ এবং মন্দ শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে। [ ৪০ : ২১ - ৫০ ]
শেষ বিচারের দিন সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। আল্লাহ্র ক্ষমতা , দয়া এবং ন্যায় বিচার স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। মানুষ কি খুব দেরী হয়ে যাওয়ার পূর্বে তা গ্রহণ করবে, না শুধু তর্ক করে যাবে ? [ ৪০ : ৫১ - ৮৫ ]।
সূরা মুমিন বা বিশ্বাসী - ৪০
৮৫ আয়াত, ৯ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। হা - মীম ।
০২। এই কিতাবের প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে মহাপরাক্রমশালী, পরম জ্ঞানী আল্লাহ্র নিকট থেকে ৪৩৫৭।
০২। এই কিতাবের প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে মহাপরাক্রমশালী, পরম জ্ঞানী আল্লাহ্র নিকট থেকে ৪৩৫৭।
৪৩৫৭। এই আয়াতটি সূরা [ ৩৯ :১ ] আয়াতের অনুরূপ , ব্যতিক্রম শুধুমাত্র শেষ লাইনটি যেখানে আল্লাহ্র সম্বন্ধে বিশেষ বিশেষণ প্রয়োগ করা হয়েছে। সূরা [ ৩৯: ১ ] আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ্ " প্রজ্ঞাময় " এখানে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র "প্রজ্ঞার " ও " বিচক্ষণতার " উপরে কারণ বিরোধীরা আল্লাহ্ প্রদত্ত শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করতে আগ্রহী। এই সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞানের উপরে। আল্লাহ্র জ্ঞানের তুলনায় অন্যান্যদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। কারণ তিনি সর্বজ্ঞ।
০৩। যিনি পাপ ক্ষমা করে দেন, অনুতাপ গ্রহণ করেন, ৪৩৫৮ , যিনি শাস্তি দানে কঠোর , শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তার নিকটেই সকলের শেষ প্রত্যাবর্তন।
৪৩৫৮। আল্লাহ্র জ্ঞান সর্বোচ্চ, তা সব কিছুকে স্পর্শ করে থাকে। আল্লাহ্র অন্যান্য আরোপিত গুণ বা বিশেষণ যা আমাদের গভীরভাবে আগ্রহী করে তা হচ্ছে আল্লাহ্ আমাদের অনুতাপকে গ্রহণ করবেন, যদি তা আন্তরিক হয় এবং পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আন্তরিক অনুতাপ পাপীর জীবনকে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত করে দেয়। সেই সাথে তিনি ন্যায় বিচারকও - শাস্তি দানে কঠোর। সুতারাং পাপীদের পলায়নের কোনও উপায় থাকবে না ; একমাত্র অনুতাপের মাধ্যমেই পাপীদের অব্যহতি পাওয়া সম্ভব। এ ব্যতীত আল্লাহ্র অন্যান্য গুণবাচক আরোপিত বিশেষণ সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্যঃ তাঁর দয়া , জ্ঞান ও ন্যায়বিচার , তাঁর অনুগ্রহ এবং শাস্তি।
০৪। অবিশ্বাসীরা ব্যতীত আল্লাহ্র নিদর্শনসমূহ সম্বন্ধে কেহ বির্তক করে না ৪৩৫৯। সুতারাং দেশের মাঝে তাদের সগর্বে চলাচল তোমাদের যেনো বিভ্রান্ত না করে ৪৩৬০।
৪৩৫৯। আল্লাহ্র জ্ঞান ও আরোপিত গুণবাচক বিশেষণ সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ এবং নিখিল বিশ্ব-ভূবন সর্বদা এই সত্যকে ঘোষণা করছে। আমাদের চারিদিকে আল্লাহ্র নিদর্শনে পরিপূর্ণ। যাদের মাঝে বিশ্বাসের ঘাটতি আছে, শুধুমাত্র তারাই আল্লাহ্র নিদর্শনকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না এবং তারাই বৃথা তর্কে লিপ্ত হয়।
৪৩৬০। দেখুন আয়াত [ ৩ : ১৯৬ ]। যারা আল্লাহ্র নিদর্শন আত্মার মাঝে অনুভব করতে পারে না , তাদের বাইরের প্রদর্শনী অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়। তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি , চটপটে কথাবার্তা , দেশেবিদেশে অবাধ বিচরণ ইত্যাদি যেনো মোমেন বান্দাদের বিভ্রান্ত না করে।
০৫। ইহাদের পূর্বে নূহের দল এবং তার পরে [ অসৎ ] সম্প্রদায়েরা ছিলো , যারা [ নিদর্শন সমূহ ] অস্বীকার করেছিলো ৪৩৬১। এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাসুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলো, তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য এবং অহংকারের সাথে বির্তক করেছিলো সত্যকে অনুপযুক্ত ঘোষণা করার জন্য ৪৩৬২। কিন্তু আমিই তাদের পাকড়াও করেছিলাম। এবং কি [ ভয়াবহ ] হয়েছিলো আমার প্রতিশোধ ৪৩৬৩।
৪৩৬১। দেখুন আয়াত [৩৮ : ১১ - ১৩ ] ও টিকা ৪১৫৮। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে যুগে যুগে মন্দ সর্বদা ভালো ও সত্যকে প্রতিহত করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র প্রেরিত সত্যের বিজয় হয়েছে। আল্লাহ্র প্রেরিত সত্যের বিরুদ্ধে বা এ সত্যকে যারা প্রচার করেন সে সব নবী ও রসুলদের বিরুদ্ধে বা আল্লাহ্র সুদূর প্রসারিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এসব অশুভ ও মন্দ শক্তির সমগ্র প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৪৩৬২। পৃথিবীতে আল্লাহ্ যখনই জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অত্যাবশকীয় সত্যকে প্রেরণ করেছেন বা পুরাতন প্রচারিত সত্যের বাণীকে পূনর্জীবিত করেছেন যুগে যুগে সে বাণী প্রচারে বাধা প্রাপ্ত হয়েছে। অজ্ঞ ও স্বার্থে অন্ধ ব্যক্তিরা সর্বদা সত্যের বিরুদ্ধে অসাড় তর্ক বির্তকে লিপ্ত হয়। তারা এসব মিথ্যা বাক্ -বিতন্ডার দ্বারা সত্যের দীপ্তিকে ম্লান করে দিতে বদ্ধপরিকর। তাদের ধারণা এর দ্বারা তারা আল্লাহ্র পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু তারা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী। অনেক সময়ে দেখা যায় অন্যায় বা অসত্য তাদের কূটকৌশল ও দুষ্ট বুদ্ধির সাহায্যে ক্ষণস্থায়ী বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়; সত্যকে দমিত করতে সক্ষম হয়, কিন্তু তা খুবই ক্ষণস্থায়ী , কারণ সময়ের বৃহত্তর পরিসরে সত্য প্রকাশিত হবেই এবং তা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন অন্যায়কারীদের মিথ্যা পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। তারা তাদের নিজেদের ফাঁদে নিজেরা ধৃত হয়ে পড়ে। শয়তানের ফাঁদে ধৃত হওয়ার শাস্তি ভয়ানক।
উপদেশ : পৃথিবীতে কোনও সৎ বা ভালো কাজ প্রথমেই অভিনন্দিত হবে না। মানুষরূপী শয়তান তাতে বাধা প্রদান করবেই। তবে আল্লাহ্ আমাদের সুসংবাদ দান করেছেন যে, এতে নিরাশ হওয়ার কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সৎকর্ম প্রতিষ্ঠিত হবেই ,যা ন্যায় ও সত্য ,মানুষের জন্য যা মঙ্গলজনক তা ধ্বংস করার ক্ষমতা কারও নাই।
৪৩৬৩। দেখুন আয়াত [ ১৩ : ৩২ ]।
০৬। এ ভাবেই অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে আমার হুকুম সত্য প্রমাণীত হয়েছিলো ৪৩৬৪। সত্যই তারা জাহান্নামের অধিবাসী।
৪৩৬৪। দেখুন [ ৩৯ : ৭১ ]। আল্লাহ্র হুকুম বা আল্লাহ্র বাণী যার সাহায্যে মন্দ বা পাপীদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে , তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কারণ তারা শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছে পৃথিবীতে এবং পরলোকে তারা হবে দোযখের অধিবাসী।
০৭। যারা [আল্লাহ্র ] আরশ ধারণ করে ৪৩৬৫ এবং যারা ইহার চারপাশ ঘিরে তাদের প্রভুর মহিমা ও প্রশংসা কীর্তন করে; তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে; এবং যারা বিশ্বাসী তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে [ বলে] " হে আমাদের প্রভু! তোমার করুণা ও জ্ঞান সকল জিনিষকে ঘিরে রেখেছে। সুতারাং যারা অনুতাপের মাধ্যমে তোমার পথে ফিরে আসে, তাদের ক্ষমা কর এবং তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা কর ৪৩৬৬।
৪৩৬৫। দেখুন অনুরূপ আয়াত [৩৯ : ৭৫ ]।
৪৩৬৬।দেখুন আয়াত [ ৬ :৮০ ] ও [৭ : ৮৯ ]।
০৮। " হে আমাদের প্রভু ! তুমি তাদের অনন্তকালের জন্য বেহেশত্ দান কর, যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের জন্য দিয়েছিলে , তাদের পূণ্যাত্মা পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা উপযুক্ত তাদেরও [ দান কর ] ৪৩৬৭। নিশ্চয়ই তুমি মহাপরাক্রমশালী , প্রজ্ঞাময়। "।
৪৩৬৭। প্রার্থনার মাঝে কোনও স্বার্থপরতা নাই। তা যে শুধুমাত্র নিজের জন্য হতে হবে তা নয়। প্রার্থনা হতে হবে সার্বজনীন। যথা প্রকৃত পূণ্যাত্মা ও আল্লাহ্র প্রতি আন্তরিক - তারা সকলেই একই ভাতৃবন্ধনে আবদ্ধ। তারা সকলেই সকলের জন্য আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করে থাকে। পাপ একটি সংক্রামক ব্যাধির ন্যায়। খুব সহজেই অন্যকে সংক্রামিত করে। পূণ্যও ঠিক তদ্রূপ। ভালো সকল সময়েই অন্যকে ভালোর দিকে আকর্ষণ করে থাকে। পূণ্যাত্মারা সর্বদা পূণ্যাত্মাদের সহচর্য কামনা করে থাকে। তারা পরস্পর পরস্পরের সুখ ও শান্তি কামনা করে এবং সকলের জন্য আল্লাহ্র অনুগ্রহ কামনা করে থাকে।
উপদেশ : এই আয়াতগুলি প্রতিটি পূণ্যাত্মার প্রার্থনা হতে পারে। যদিও এই প্রার্থনা ছিলো আল্লাহ্র আরশ্ বহনকারী ফেরেশতাদের।
০৯। "তুমি তাদের [ সকল ] অমঙ্গল থেকে রক্ষা কর। সেদিন তুমি যাদের অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবে ৪৩৬৮ তাদের তুমি সত্যই অনুগ্রহ দান করবে। এবং [ তাদের জন্য ] তা হবে সত্য -সত্যই সর্বোচ্চ সাফল্য। " ৪৩৬৯।
৪৩৬৮। আল্লাহ্ যাকে শাস্তি থেকে রেহাই দেবেন সেই তো সাফল্য লাভ করে ; কারণ সেটাই হবে তার শেষ বিচার। যদি কেউ ইহকালের পাপ থেকে আল্লাহ্র অনুগ্রহে ক্ষমা লাভ করে থাকে; তবে তাই-ই হচ্ছে সর্বোচ্চ সাফল্য। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ ধাপে ধাপে জীবনের পথ অতিক্রম করে। ধাপে ধাপে তার চাওয়া ও পাওয়ার বিবর্তন ঘটে। এর শেষ হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। মৃত্যুর সিংহদুয়ার পেরিয়ে পরলোকের জীবনে সে প্রবেশ লাভ করে এবং সে জীবনের সাফল্যই হচ্ছে সর্বোচ্চ সাফল্য। যেখানে জীবনের চাওয়া পাওয়ার সব শেষ হয়ে যায়। সকল কর্মের সিদ্ধি লাভ যেখানে ঘটে থাকে। জীবনের মহৎ পরিনতি হচ্ছে সর্বোচ্চ মুক্তি ও শান্তি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে।
৪৩৬৯। মুসলিম দর্শনে আত্মিক মুক্তি বা সাফল্যের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ। পৃথিবীতে মানুষের জন্ম শুধুমাত্র মৃত্যুর মাঝে শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য নয়। আল্লাহ্ মানুষের জন্য উচ্চতর মহৎ লক্ষ্য নির্ধারিত করে রেখেছেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনে। যে সেই মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম সেই সাফল্য লাভ করে আল্লাহ্র অনুগ্রহে ধন্য হয়।
