+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ থেকে যে ছয়টি সূরার একটি শ্রেণীগুচ্ছ শুরু হয়েছিলো, তা এই [৩৯ নং সূরা ] সূরাটির মাধ্যমে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই শ্রেণীগুচ্ছের সূরাগুলির বিষয়বস্তু আধ্যাত্মিক জগত এবং Ma'ad বা শেষ বিচারের দিন। দেখুন সূরাগুচ্ছের প্রথম সূরা ৩৪ নং সূরার ভূমিকা।
এই সূরাটির বিষয় বস্তু হচ্ছে : সৃষ্টির বৈচিত্র সত্বেও সৃষ্টির সকল বিষয়বস্তু বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এ সকল বস্তুকে, বৈচিত্র সত্বেও সকলকেই আল্লাহ্ প্রতিপালন করে থাকেন। শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্ ভালোকে মন্দ থেকে আলাদা করে নেবেন। 'Zumar' শব্দটি ৭১ এবং ৭৩ নং আয়াতে আছে।
এই সূরাটি মক্কান সূরা।
সার সংক্ষেপঃ যদিও সৃষ্টির মাঝে বহু বৈচিত্র বিদ্যমান, কিন্তু তবুও তা সবই একই সুত্রে গ্রথিত যা এক স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে। আল্লাহ্ এক এবং অদ্বিতীয়। তিনিই সকল উপাসনার যোগ্য এবং ন্যায় এবং করুণার আঁধার তিনিই। [ ৩৯ : ১- ২১ ]
সকল প্রত্যাদেশে আল্লাহ্র একত্ব প্রকাশ পায়। একমাত্র আল্লাহ্-ই মানুষকে পথ প্রদর্শন করতে পারেন। একমাত্র তাঁরই এবাদত কর আর সবই মিথ্যা। [ ৩৯ : ২২-৫২ ]
আল্লাহ্র করুণা সৃষ্টির সকল কিছুকে পরিবৃত্ত করে থাকে। হতাশ হওয়ার কারণ নাই। বেশী দেরী হওয়ার পূর্বেই তাঁর করুণা ভিক্ষা কর। অবশ্য প্রত্যেককেই আল্লাহ্র ন্যায় বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
[ ৩৯ : ৫৩-৭৫ ]
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৪২৪২। প্রত্যাদেশের সাথে আল্লাহ্র দুটি গুণাবলীর উল্লেখ এই আয়াতে করা হয়েছে :
১) আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান , পরাক্রমশালী। সকল বাঁধা সত্বেও তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই।
২) তিনি অসীম জ্ঞানের আঁধার ও প্রজ্ঞাময়।
যারা জিজ্ঞাসা করে যে আল্লাহ্ কিভাবে তাঁর বাণী পৃথিবীতে প্রেরণ করেন ? তাদের প্রশ্নের উত্তর আছে ১নং এর বক্তব্যে এবং ২নং বক্তব্য ব্যাখ্যা করে যে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করা সম্ভব , আল্লাহ্ যা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন তার অনুসরণ দ্বারা।
৪২৪৩। বিশ্ব ভূবনের সর্বত্র স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুন্য ছড়িয়ে আছে। সকালের ঝড়ে পড়া শিউলীফুলের পেলবতা থেকে সুউচ্চ পর্বতমালার কাঠিন্য গাম্ভীর্য সর্ব স্থানে স্রষ্টার হাতের স্পর্শ বিদ্যমান। বিশ্বভূবনের সকলেই একই স্রষ্টার সৃষ্টি ; তাই পৃথিবীর সকলেই বিজ্ঞানের একই সুত্রের আওতাধীন। সূদূর মঙ্গলে জড় পদার্থের যে ধর্ম ,এই মাটির পৃথিবীর জড় পদার্থের একই ধর্ম। জীব জগতেরও জৈবিক ধর্ম সকল প্রাণীর মাঝে এক। স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয় - এ সত্যকেই প্রত্যক্ষ করা যায় সৃষ্টিকে পর্যবেক্ষণের দ্বারা। বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্-ই একমাত্র উপাসনার যোগ্য। আর সে উপাসনা হতে হবে একান্ত আন্তরিক।
৪২৪৪। মানুষ জ্ঞানতঃ বা অজ্ঞানত বশতঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্যের উপাসনা করে থাকে। এ সবের মধ্যে পীর পূঁজা ও মাজার পূঁজা অন্যতম। এদের বক্তব্য হচ্ছে যে, তারা নিরাকার আল্লাহ্র নিকট পৌঁছানোর জন্য এসব মাধ্যমের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। তাহলে খৃষ্টান ও ইহুদীদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়?
আবার আর একদল আছে যারা জাগতিক বিষয়বস্তুকে জীবনের চরম ও পরম পাওয়া বলে সাব্যস্ত করে। এরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবী করে। এদের কেউ সম্পদের , কেউ বিজ্ঞানের , কেউ শিল্পকলার , আবার কেউ নিজস্ব স্বার্থের চিন্তায় দিবারাত্র বিভোর থাকে। তারা দাবী করে যে এগুলির মাধ্যমে তারা আত্মোন্নতি করার ক্ষমতা রাখে এবং জীবনের সর্বশেষ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম।এবং এরই মাধ্যমে তারা স্রষ্টার নিকটবর্তী হওয়ার আশা রাখে। এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এরা সকলেই ভুল পথে আল্লাহ্র অন্বেষণ করছে। কোনও মাধ্যম নয়, মানুষের চিন্তার জগত, মনোজগত, আধ্যাত্মিক জগত শুধুমাত্র স্রষ্টার চিন্তায় আপ্লুত থাকলেই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব।
৪২৪৫। আল্লাহ্র প্রকৃত উপাসনা ত্যাগ করে, সঠিক পথকে পরিহার করে, মানুষ যখন মিথ্যা উপাস্যের উপাসনায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে , তখন তাদের মাঝে সীমাহীন বিভেদের ও দলের সৃষ্টি হয়। এ সব ফয়সালার মালিক একমাত্র আল্লাহ্। কিন্তু কেউ যদি সত্যকে পরিহার করে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র প্রতি করণীয় কর্তব্য ও আল্লাহ্র কাজে অনীহা প্রকাশ করে, আল্লাহ্র প্রতি প্রতিদিনের এই জীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায় , তাহলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্ প্রদর্শিত পথকে ত্যাগ করে। এরাই তারা যারা মিথ্যাবাদী ও কাফের, আল্লাহ্ তাদের হেদায়েত করেন না।
৪২৪৬। আল্লাহ্র সন্তান রয়েছে এ কথা চিন্তা করাও পাপ এবং ঈশ্বর নিন্দা। যদি সত্যিই আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করতেন তবে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর একজন স্ত্রী বিদ্যমান থাকতো [৬ : ১০১ ] ,এবং তাঁর পুত্র তাঁরই মত গুণসম্পন্ন হতো। কিন্তু সূরা [ ১১২ : ৪ ] আয়াতে বলা হয়েছে, " তাহার সমতুল্য কেহ নাই।" সন্তান জন্ম দান করা একটি জৈব প্রক্রিয়া যা প্রাণী জগতে বিদ্যমান , যা একটি যৌন প্রক্রিয়া। আল্লাহ্র সম্বন্ধে এরূপ চিন্তা বা ধারণা কিভাবে করা সম্ভব , যেখানে আল্লাহ্র অস্তিত্ব বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কিছুর উর্দ্ধে। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোনও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই - তিনি সর্বশক্তিমান। যদি সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতো , তবে তার জন্য তাকে প্রাণীজগতের যৌন প্রক্রিয়ার মত নিম্নস্তরে নামার প্রয়োজন ছিলো না। আল্লাহ্ এসবের বহু উর্দ্ধে ,তিনি মহান ও পবিত্র। নিরাকার আল্লাহ্র একত্ব আত্মার মাঝে অনুভব করা , উপলব্ধি করা যে তিনি এক ও অদ্বিতীয়, এই-ই হচ্ছে ঈমানের প্রথম ধাপ। তিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর কোনও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই।
৪২৪৭। দেখুন সূরা [ ৬ : ৭৩ ] আয়াত ও টিকা ৪৯৬।
৪২৪৮। আল্লাহ্র করুণা ও দয়া তাঁর ক্ষমতার মতই অসীম। তাঁর সমকক্ষ কেহ নাই।
৪২৪৯। দেখুন সূরা [ ৪ : ১ ] ও টিকা ৫০৪।
৪২৫০। দেখুন সূরা [ ৬ : ১৪৩ - ৪৪ ] আয়াতে আরবদের কুসংস্কারের উল্লেখ আছে উল্লেখিত চার ধরণের পশুদের জোড়া সম্বন্ধে। পূর্বের ঐ আয়াতে এই চার জোড়া পশুদের সম্বন্ধে কুসংস্কারের নিন্দা করা হয়েছে। সেই চার জোড়া গৃহপালিত পশুর উল্লেখ করা হয়েছে এখানে ; যাদের আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন মানুষের মঙ্গলের জন্য। এগুলি হলো ; ভেড়া, ছাগল,উট ও গরু। আরবদের ঐতিহ্য অনুযায়ী ঘোড়াকে তারা গৃহপালিত পশু হিসেবে পরিগণিত করে না।
আল্লাহ্র অসীম করুণা যে, আল্লাহ্ মানুষকে পশুদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন দেখুন [৩৬ : ৭১- ৭৩ ]।
৪২৫১। "ত্রিবিধ অন্ধকার " শিশু মাতৃগর্ভে ত্রিবিধ পর্দ্দায় আচ্ছাদিত থাকে ; ঝিল্লির আচ্ছাদন ,জরায়ু ও মাতৃজঠর।
৪২৫২। দেখুন সূরা [ ২২ : ৫ ] আয়াতে, যেখানে মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপগুলিকে পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র সৃষ্টি নৈপুন্যের এবং সদয় প্রতিপালকের নিদর্শন স্বরূপ।
৪২৫৩। এ কথা সত্য যে, মানুষের জীবনোপকরণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্র করুণার উপরে নির্ভরশীল। সুতারাং সেই মানুষ কিভাবে আল্লাহ্র প্রতি বিমুখ হয়?
সূরা যুমার
Page 1 of 8
সূরা যুমার বা জনতা - ৩৯
৭৫ আয়াত , ৮ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ থেকে যে ছয়টি সূরার একটি শ্রেণীগুচ্ছ শুরু হয়েছিলো, তা এই [৩৯ নং সূরা ] সূরাটির মাধ্যমে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই শ্রেণীগুচ্ছের সূরাগুলির বিষয়বস্তু আধ্যাত্মিক জগত এবং Ma'ad বা শেষ বিচারের দিন। দেখুন সূরাগুচ্ছের প্রথম সূরা ৩৪ নং সূরার ভূমিকা।
এই সূরাটির বিষয় বস্তু হচ্ছে : সৃষ্টির বৈচিত্র সত্বেও সৃষ্টির সকল বিষয়বস্তু বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এ সকল বস্তুকে, বৈচিত্র সত্বেও সকলকেই আল্লাহ্ প্রতিপালন করে থাকেন। শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্ ভালোকে মন্দ থেকে আলাদা করে নেবেন। 'Zumar' শব্দটি ৭১ এবং ৭৩ নং আয়াতে আছে।
এই সূরাটি মক্কান সূরা।
সার সংক্ষেপঃ যদিও সৃষ্টির মাঝে বহু বৈচিত্র বিদ্যমান, কিন্তু তবুও তা সবই একই সুত্রে গ্রথিত যা এক স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে। আল্লাহ্ এক এবং অদ্বিতীয়। তিনিই সকল উপাসনার যোগ্য এবং ন্যায় এবং করুণার আঁধার তিনিই। [ ৩৯ : ১- ২১ ]
সকল প্রত্যাদেশে আল্লাহ্র একত্ব প্রকাশ পায়। একমাত্র আল্লাহ্-ই মানুষকে পথ প্রদর্শন করতে পারেন। একমাত্র তাঁরই এবাদত কর আর সবই মিথ্যা। [ ৩৯ : ২২-৫২ ]
আল্লাহ্র করুণা সৃষ্টির সকল কিছুকে পরিবৃত্ত করে থাকে। হতাশ হওয়ার কারণ নাই। বেশী দেরী হওয়ার পূর্বেই তাঁর করুণা ভিক্ষা কর। অবশ্য প্রত্যেককেই আল্লাহ্র ন্যায় বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
[ ৩৯ : ৫৩-৭৫ ]
সূরা যুমার বা জনতা - ৩৯
৭৫ আয়াত , ৮ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। এই প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ্র নিকট থেকে , ৪২৪২ [ যিনি ] ক্ষমতায় পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাতে পরিপূর্ণ।
৪২৪২। প্রত্যাদেশের সাথে আল্লাহ্র দুটি গুণাবলীর উল্লেখ এই আয়াতে করা হয়েছে :
১) আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান , পরাক্রমশালী। সকল বাঁধা সত্বেও তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই।
২) তিনি অসীম জ্ঞানের আঁধার ও প্রজ্ঞাময়।
যারা জিজ্ঞাসা করে যে আল্লাহ্ কিভাবে তাঁর বাণী পৃথিবীতে প্রেরণ করেন ? তাদের প্রশ্নের উত্তর আছে ১নং এর বক্তব্যে এবং ২নং বক্তব্য ব্যাখ্যা করে যে প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করা সম্ভব , আল্লাহ্ যা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন তার অনুসরণ দ্বারা।
০২। আমিই তোমার নিকট সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতারাং একান্ত অনুগতভাবে তার এবাদত কর।
০৩। একান্ত আনুগত্য কি আল্লাহ্র প্রাপ্য নয় ? ৪২৪৩ কিন্তু যারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে রক্ষাকর্তা রূপে গ্রহণ করে [ তারা বলে ] : " আমরা তো তাদের পূঁজা করি কেবলমাত্র এজন্য যে, তারা হয়তো আমাদের আল্লাহ্র সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে।" ৪২৪৪। ওরা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে সত্যিই আল্লাহ্ তার বিচার মীমাংসা করে দেবেন। কিন্তু যারা মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞ আল্লাহ্ তাদের পথ প্রদর্শন করেন না। ৪২৪৫।
০৩। একান্ত আনুগত্য কি আল্লাহ্র প্রাপ্য নয় ? ৪২৪৩ কিন্তু যারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে রক্ষাকর্তা রূপে গ্রহণ করে [ তারা বলে ] : " আমরা তো তাদের পূঁজা করি কেবলমাত্র এজন্য যে, তারা হয়তো আমাদের আল্লাহ্র সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে।" ৪২৪৪। ওরা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে সত্যিই আল্লাহ্ তার বিচার মীমাংসা করে দেবেন। কিন্তু যারা মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞ আল্লাহ্ তাদের পথ প্রদর্শন করেন না। ৪২৪৫।
৪২৪৩। বিশ্ব ভূবনের সর্বত্র স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুন্য ছড়িয়ে আছে। সকালের ঝড়ে পড়া শিউলীফুলের পেলবতা থেকে সুউচ্চ পর্বতমালার কাঠিন্য গাম্ভীর্য সর্ব স্থানে স্রষ্টার হাতের স্পর্শ বিদ্যমান। বিশ্বভূবনের সকলেই একই স্রষ্টার সৃষ্টি ; তাই পৃথিবীর সকলেই বিজ্ঞানের একই সুত্রের আওতাধীন। সূদূর মঙ্গলে জড় পদার্থের যে ধর্ম ,এই মাটির পৃথিবীর জড় পদার্থের একই ধর্ম। জীব জগতেরও জৈবিক ধর্ম সকল প্রাণীর মাঝে এক। স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয় - এ সত্যকেই প্রত্যক্ষ করা যায় সৃষ্টিকে পর্যবেক্ষণের দ্বারা। বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্-ই একমাত্র উপাসনার যোগ্য। আর সে উপাসনা হতে হবে একান্ত আন্তরিক।
৪২৪৪। মানুষ জ্ঞানতঃ বা অজ্ঞানত বশতঃ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্যের উপাসনা করে থাকে। এ সবের মধ্যে পীর পূঁজা ও মাজার পূঁজা অন্যতম। এদের বক্তব্য হচ্ছে যে, তারা নিরাকার আল্লাহ্র নিকট পৌঁছানোর জন্য এসব মাধ্যমের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। তাহলে খৃষ্টান ও ইহুদীদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়?
আবার আর একদল আছে যারা জাগতিক বিষয়বস্তুকে জীবনের চরম ও পরম পাওয়া বলে সাব্যস্ত করে। এরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবী করে। এদের কেউ সম্পদের , কেউ বিজ্ঞানের , কেউ শিল্পকলার , আবার কেউ নিজস্ব স্বার্থের চিন্তায় দিবারাত্র বিভোর থাকে। তারা দাবী করে যে এগুলির মাধ্যমে তারা আত্মোন্নতি করার ক্ষমতা রাখে এবং জীবনের সর্বশেষ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম।এবং এরই মাধ্যমে তারা স্রষ্টার নিকটবর্তী হওয়ার আশা রাখে। এই আয়াতে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এরা সকলেই ভুল পথে আল্লাহ্র অন্বেষণ করছে। কোনও মাধ্যম নয়, মানুষের চিন্তার জগত, মনোজগত, আধ্যাত্মিক জগত শুধুমাত্র স্রষ্টার চিন্তায় আপ্লুত থাকলেই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব।
৪২৪৫। আল্লাহ্র প্রকৃত উপাসনা ত্যাগ করে, সঠিক পথকে পরিহার করে, মানুষ যখন মিথ্যা উপাস্যের উপাসনায় নিমগ্ন হয়ে পড়ে , তখন তাদের মাঝে সীমাহীন বিভেদের ও দলের সৃষ্টি হয়। এ সব ফয়সালার মালিক একমাত্র আল্লাহ্। কিন্তু কেউ যদি সত্যকে পরিহার করে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র প্রতি করণীয় কর্তব্য ও আল্লাহ্র কাজে অনীহা প্রকাশ করে, আল্লাহ্র প্রতি প্রতিদিনের এই জীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায় , তাহলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্ প্রদর্শিত পথকে ত্যাগ করে। এরাই তারা যারা মিথ্যাবাদী ও কাফের, আল্লাহ্ তাদের হেদায়েত করেন না।
০৪। যদি আল্লাহ্ পুত্র গ্রহণ করতে চাইতেন , তবে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা বেছে নিতে পারতেন ৪২৪৬। কিন্তু তিনি মহিমান্বিত। [ তিনি এ সবের উর্দ্ধে ]। তিনি আল্লাহ্, এক অদ্বিতীয় , অপ্রতিরোধ্য।
৪২৪৬। আল্লাহ্র সন্তান রয়েছে এ কথা চিন্তা করাও পাপ এবং ঈশ্বর নিন্দা। যদি সত্যিই আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করতেন তবে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর একজন স্ত্রী বিদ্যমান থাকতো [৬ : ১০১ ] ,এবং তাঁর পুত্র তাঁরই মত গুণসম্পন্ন হতো। কিন্তু সূরা [ ১১২ : ৪ ] আয়াতে বলা হয়েছে, " তাহার সমতুল্য কেহ নাই।" সন্তান জন্ম দান করা একটি জৈব প্রক্রিয়া যা প্রাণী জগতে বিদ্যমান , যা একটি যৌন প্রক্রিয়া। আল্লাহ্র সম্বন্ধে এরূপ চিন্তা বা ধারণা কিভাবে করা সম্ভব , যেখানে আল্লাহ্র অস্তিত্ব বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কিছুর উর্দ্ধে। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোনও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই - তিনি সর্বশক্তিমান। যদি সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতো , তবে তার জন্য তাকে প্রাণীজগতের যৌন প্রক্রিয়ার মত নিম্নস্তরে নামার প্রয়োজন ছিলো না। আল্লাহ্ এসবের বহু উর্দ্ধে ,তিনি মহান ও পবিত্র। নিরাকার আল্লাহ্র একত্ব আত্মার মাঝে অনুভব করা , উপলব্ধি করা যে তিনি এক ও অদ্বিতীয়, এই-ই হচ্ছে ঈমানের প্রথম ধাপ। তিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর কোনও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই।
০৫। তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে ৪২৪৭। তিনি রাত্রি দ্বারা দিনের প্রান্তদেশকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিন দ্বারা রাত্রির প্রান্তকোনকে আচ্ছাদিত করেন। তিনি সূর্য এবং চন্দ্রকে করেছেন [ তার আইনের ] নিয়মাধীন। প্রত্যেকেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত একটি গতিপথ অনুসরণ করছে। তিনি কি ক্ষমতায় মহাপরাক্রমশালী নন যিনি বারে বারে ক্ষমা করেন ? ৪২৪৮
৪২৪৭। দেখুন সূরা [ ৬ : ৭৩ ] আয়াত ও টিকা ৪৯৬।
৪২৪৮। আল্লাহ্র করুণা ও দয়া তাঁর ক্ষমতার মতই অসীম। তাঁর সমকক্ষ কেহ নাই।
০৬। তিনি তোমাদের [ সকলকে ] সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে ৪২৪৯ ; অতঃপর তিনি একই প্রকৃতি বিশিষ্ট তার সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন। তিনি তোমাদের জন্য জোড়ায় জোড়ায় [ নর-মাদী] আটটি গৃহপালিত পশু প্রেরণ করেছেন ৪২৫০। তিনি তোমাদের মায়ের গর্ভে সৃষ্টি করেছেন একের পরে এক বিভিন্ন ধাপে ৪২৫১; অন্ধকারের তিনটি আবরণের মধ্যে ৪২৫২। ইনিই আল্লাহ্ , তোমাদের প্রভু এবং প্রতিপালক। [ সকল ] রাজত্ব তারই অধীনে। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তাহলে কি ভাবে তোমরা [ তোমাদের প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু থেকে ] মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ ? ৪২৫৩
৪২৪৯। দেখুন সূরা [ ৪ : ১ ] ও টিকা ৫০৪।
৪২৫০। দেখুন সূরা [ ৬ : ১৪৩ - ৪৪ ] আয়াতে আরবদের কুসংস্কারের উল্লেখ আছে উল্লেখিত চার ধরণের পশুদের জোড়া সম্বন্ধে। পূর্বের ঐ আয়াতে এই চার জোড়া পশুদের সম্বন্ধে কুসংস্কারের নিন্দা করা হয়েছে। সেই চার জোড়া গৃহপালিত পশুর উল্লেখ করা হয়েছে এখানে ; যাদের আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন মানুষের মঙ্গলের জন্য। এগুলি হলো ; ভেড়া, ছাগল,উট ও গরু। আরবদের ঐতিহ্য অনুযায়ী ঘোড়াকে তারা গৃহপালিত পশু হিসেবে পরিগণিত করে না।
আল্লাহ্র অসীম করুণা যে, আল্লাহ্ মানুষকে পশুদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন দেখুন [৩৬ : ৭১- ৭৩ ]।
৪২৫১। "ত্রিবিধ অন্ধকার " শিশু মাতৃগর্ভে ত্রিবিধ পর্দ্দায় আচ্ছাদিত থাকে ; ঝিল্লির আচ্ছাদন ,জরায়ু ও মাতৃজঠর।
৪২৫২। দেখুন সূরা [ ২২ : ৫ ] আয়াতে, যেখানে মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপগুলিকে পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র সৃষ্টি নৈপুন্যের এবং সদয় প্রতিপালকের নিদর্শন স্বরূপ।
৪২৫৩। এ কথা সত্য যে, মানুষের জীবনোপকরণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্র করুণার উপরে নির্ভরশীল। সুতারাং সেই মানুষ কিভাবে আল্লাহ্র প্রতি বিমুখ হয়?
