+
-
R
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : যে ছয়টি সূরা আধ্যাত্মিক জগতের বর্ণনায় সমৃদ্ধ তাদের মধ্যে এই সূরার অবস্থানের জন্য দেখুন সূরা ৩৪ এর ভূমিকা। ৩৪ নং সূরার সময়কাল এবং বিষয়বস্তু সূরা নং ৩৮ এর সমগোত্রীয়। সূরা নং ৩৭ এ যে যুক্তির উত্থাপন করা হয়েছে , এখানেও ঠিক সেই একই যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে - কিন্তু বিশেষ ভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির উপরে , যখন আধ্যাত্মিক শক্তি পার্থিব ক্ষমতার সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। সেই সাথে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির গুরুত্ব ও বাস্তবতার উপরে। সে কারণেই দাউদ নবী ও সুলাইমানের উদাহরণ উত্থাপন করা হয়েছে , যারা ক্ষমতাধর নৃপতি এবং সেই সাথে নবীও ছিলেন। এদের উদাহরণের সমান্তরালভাবে আমাদের রাসুলের [ সা ] জীবনীকে চিত্রিত করা হয়েছে।
সার সংক্ষেপ : পাপীরা এবং বৈষয়িক বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা সত্য এবং ন্যায়ের পুণঃর্ভিভাবে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে যায়। দাউদ নবী , যিনি আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উভয় ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী ছিলেন, তাঁর কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, পার্থিব ক্ষমতা অপেক্ষা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অনেক বেশী শক্তিশালী। [ ৩৮ : ২৭ - ৬৪ ]
ঠিক একই ভাবে সুলাইমান পার্থিব শক্তি অপেক্ষা আল্লাহ্কে বেশী ভালোবাসতেন। পার্থিব ক্ষমতা দুষ্টলোকের অধিকারে অপব্যবহার হতে পারে। ইয়াকুব নবী ছিলেন ক্ষমতাবান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। তিনি জীবনের শেষ পরিণতি হিসেবে দুঃখ দুর্দ্দশার পরিবর্তে পরলোকের শান্তিকে বেছে নিয়েছিলেন। [ ৩৮ : ১ - ২৬ ]।
শেষ নবীর বেলাতেও তাঁর প্রচারিত আল্লাহ্র একত্ববাদ সকল হিংসা ও ঔদ্ধত্যের উপরে স্থান লাভ করবে। [ ৩৮ : ৬৫ - ৮৮ ]।
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৪১৪৬। 'Sad' একটি আরবী অক্ষর। এখানে অক্ষরটি ব্যবহৃত হয়েছে ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশের জন্য।
৪১৪৭। "শপথ উপদেশপূর্ণ কুর-আনের।" এখানে 'Zikr' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। জিক্র শব্দটি দ্বারা এক বিশাল ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এর দ্বারা প্রকাশ করা হয় ; ১) ভক্তি সহকারে আল্লাহ্কে স্মরণ করা ; ২) আল্লাহ্র আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা এবং আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করা ; ৩) আল্লাহ্র সম্বন্ধে শিক্ষাদান করা , সাবধান করা , সর্তক করা ; ৪) আয়াত [ ১৬ :৪৩ ] 'Ah-luz-Zikr' অর্থ করা হয়েছে বাণী , প্রত্যাদেশ।
৪১৪৮। এই আয়াতটির মাধ্যমে মনুষ্য চরিত্রের এক বিশেষ দিককে তুলে ধরা হয়েছে। সত্যকে অবিশ্বাস করার এবং পাপে নিমগ্ন হওয়ার প্রবণতার মূল নিহিত থাকে মানুষের অহংকার ,গর্ব ও ঔদ্ধত্যের মাঝে। অহংকার , গর্ব ও ঔদ্ধত্যের ফলেই শয়তানের পতন ঘটে বেহেশত থেকে। শয়তানের এই বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে [ ৩৮ : ৭৪ - ৭৬ ] আয়াতে। অহংকার একটি খারাপ রিপু যা থেকে হিংসা ও বিদ্বেষের উৎপত্তি ঘটে, - আর হিংসা-দ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রবণতা, প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে নিজস্ব অধিকারভুক্ত মতামতের সৃষ্টি করার চেষ্টা। যার ফলে তার আত্মার মাঝে প্রকৃত সত্যের আলো অনুপ্রবেশে বাঁধা পায় এবং আল্লাহ্র একত্বের ধারণা থেকে সে অনেক দূরে সরে যায়। একত্ববাদ হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যার উপরে প্রতিষ্ঠিত হয় জীবন বিকাশের সকল শাখা-প্রশাখা। আরব মোশরেকরা রাসুলের [সা ] প্রচারিত এই একত্ববাদকেই প্রতিহত করে। দেখুন আয়াত [ ৩৮ :৫ ] পৃথিবীতে মানুষের অধঃপতনের কারণও হচ্ছে অহংকার, হিংসা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশের ফল।
৪১৪৯। পৃথিবীতে সর্বকালে সর্বযুগে আল্লাহ্ মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন, সাবধান করেছেন এবং তার নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন, যেনো প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি জাতি সময়মত সাবধান হতে পারে। তা সত্বেও পৃতিবীতে বিভিন্ন জাতির অধঃপতনের ইতিহাস হচ্ছে আল্লাহ্ প্রদত্ত পথ নির্দ্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তা থেকে দূরে সরে যাওয়া। এই ইতিহাস থেকে পরবর্তী জাতির জন্য আছে শিক্ষণীয় বিষয় যে , প্রতিটি জাতিই আত্ম ধ্বংসের জন্য দায়ী। প্রাকৃতিক আইনের ন্যায় পৃথিবীতে আল্লাহ্ নৈতিক আইনও স্থাপন করে দিয়েছেন। আর এই আইন হচ্ছে অলঙ্ঘনীয়। যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত নৈতিক আইন লঙ্ঘন করবে তাদের ধবংস অনিবার্য। এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্র ন্যায়নীতি। অন্যায়কারীদের ধ্বংস তাদেরই কর্মফল। তবে পৃথিবীতে তাদের স্বল্পকালীন অবস্থান কালে তারা যদি অনুতাপের মাধ্যমে নিজেদের চরিত্র ও কর্মধারার সংশোধন করে, তবে আল্লাহ্ পরম করুণময় ও ক্ষমাশীল। কিন্তু তাদের আত্ম অহংকার এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধারণার ঔদ্ধত্য ; তাদের আল্লাহ্র করুণা লাভে ব্যর্থ করে। তাদের কর্মফল তাদের আত্মায় আল্লাহ্র নূর প্রবেশে বাঁধা দান করে, ফলে তারা আল্লাহ্র হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়। এ যেনো এক দুর্ভেদ্দ্য পর্দ্দা যা আলোর সামান্য রশ্মীকেও প্রবেশে বাঁধা দান করে। কিন্তু যখন তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপণীত হয়, তখন তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং আর্ত চীৎকার করে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে যাবে। ভুল সংশোধনের আর কোনও সুযোগ পাওয়া যাবে না।
৪১৫০। রাসুলের [সা ] আগমনে আরব মোশরেকরা আশ্চর্য্য বোধ করে এ জন্য যে, তাদেরই একজনকে আল্লাহ্ কেন বিশেষ ভাবে রাসুল রূপে নির্বাচিত করলেন। হিংসার আগুন তাদের সমস্ত সত্ত্বাকে বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলে তারা রাসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এবং কুরুচিপূর্ণ বাক্য প্রয়োগ করতে থাকে। যাকে আল্লাহ্ পৃথিবীর রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন তাঁকে তারা "যাদুকর" ও " মিথ্যাবাদী" রূপে অভিহিত করার প্রয়াস পায়। তাদের এই প্রয়াস তাদের বিবেক বুদ্ধির স্বল্পতারই প্রকাশ করে।
৪১৫১। আল্লাহ্র একত্ব ঘোষণায় রসুলের [সা ] ত্রুটি কোথায় ? তিনি তো কাল্পনিক উপাস্যদের বিদূরিত করে উপসনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনায়ন করেছেন। ফলে বিভিন্ন উপাস্যের উপাসকরা পরস্পর সংঘর্ষ থেকে রেহাই পায় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রাসুলের শিক্ষা এক অপূর্ব শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের সমাবেশ, তবুও অবিশ্বাসীদের চোখে তা বিদ্রূপের সামিল। এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের ব্যঙ্গক্তিকেই প্রকাশ করা হয়েছে।
৪১৫২। ইসলামের প্রথম যুগে যখন ইসলামের প্রচারক হযরত মুহম্মদের [ সা ] উপরে পৌত্তলিক কোরেশদের নির্মম নির্যাতন চলছিলো , সে সময়ে তারা রাসুলের [সা ] নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করতো, এর মধ্যে অন্যতম পন্থা ছিলো , তারা হযরতের [সা ] চাচা আবু তালিবের উপরে চাপ সৃষ্টি করা যেনো তিনি প্রকাশ্যে তাঁর প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে পরিত্যাগ করেন। এ ব্যাপারে তারা আবু তালেবের সাথে মন্ত্রণাসভারও আয়োজন করে। এ ব্যাপারে তাদের উদ্দোগ অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হয। ফলে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ [ সা ] তাঁর নিজের হাতে সমস্ত ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। হযরত ওমর [রা] ইসলাম প্রচারের ষষ্ঠ বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন যা ছিলো হিজরতের সাত বছর পূর্বে। হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণ কোরেশ প্রধানদের আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ তারা ছিলো স্বেচ্ছাচারী ,লোভী , সুতারাং ইসলামের সমতার বিধান তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকে আঘাত হানে। সুতারাং ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তারা পূণ্যাত্মা রাসুলের [সা ] ভূমিকাকে বিকৃত করে দেখানোর প্রয়াস পায়। রাসুলুল্লাহ্র [সা] ধর্ম প্রচার রোধ করার উদ্দেশ্যে কোরেশদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম থেকে লোকদের ফিরিয়ে রাখতে এই ধরণের অপপ্রচার করতো।
৪১৫৩। এখানে পৌত্তলিক কোরেশদের উক্তিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো যে,অন্য ধর্মে; ইসলামে প্রচারিত দর্শন নাই সুতারাং তা গ্রহণ করার কোনও যৌক্তিকতা নাই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ সব প্রতিমারই পূঁজা করে গেছেন ; সুতারাং তাদের ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না। তারা নিজেদের মনগড়া ধারণাতে এতটাই আত্মতৃপ্ত ছিলো যে, প্রকৃত সত্যের ধারণা তাদের নিকট অরুচিকর বোধ হলো। সুতারাং তারা প্রচারিত সত্যকে "মনগড়া উক্তিমাত্র " - আখ্যা দান করেছিলো। কোনও কোনও তফসীর কারের মতে "Millat akhirat" শব্দটি দ্বারা ইসলামের আগমনের পূর্বে শেষ যে ধর্ম পৃথিবীতে প্রচারিত হয় তাকেই বোঝানো হয়েছে , অর্থাৎ খৃষ্টীন ধর্ম যা আল্লাহ্র একত্বের ধারণা বিচ্যুত হয়ে তা পিতা পুত্র পবিত্র আত্মা এই ত্রিতত্বে পর্যবসিত হয়।
৪১৫৪। এই আয়াতটির মাধ্যমে কোরেশদের হিংসা ও দ্বেষের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো , " যদি আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পৃথিবীতে প্রেরণ করতেই হয়, তবে তা আসা উচিত প্রভাবশালী কোরেশ নেতাদের নিকট। তা না হয়ে তার আগমন কেন আব্দুল্লাহ্র এতিম পুত্রের নিকট হবে?"
৪১৫৫। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সম্পর্কে কোরেশ নেতাদের কোনওরূপ ধারণা ছিলো না। পার্থিব জিনিষ - ক্ষমতা সম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তির চারিপাশে আবর্তিত হয়। কিন্তু যা স্বর্গীয় তা লাভ করার জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি। যদি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে তবে তাদের জন্য আল্লাহ্র শাস্তি অবধারিত।
এই আয়াতগুলির মাধ্যমে মানুষের সত্য বিমুখতার প্রবণতাকে তুলে ধরা হয়েছে। তারাই সত্য বিমুখ ও সত্য -বিদ্বেষী যারা সমাজে সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করে থাকে। এ কথা সর্ব যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। ভবিষ্যতেও প্রযোজ্য হবে।
সূরা সা'দ
Page 1 of 7
সূরা সা'দ বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর সমূহ - ৩৮
৮৮ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : যে ছয়টি সূরা আধ্যাত্মিক জগতের বর্ণনায় সমৃদ্ধ তাদের মধ্যে এই সূরার অবস্থানের জন্য দেখুন সূরা ৩৪ এর ভূমিকা। ৩৪ নং সূরার সময়কাল এবং বিষয়বস্তু সূরা নং ৩৮ এর সমগোত্রীয়। সূরা নং ৩৭ এ যে যুক্তির উত্থাপন করা হয়েছে , এখানেও ঠিক সেই একই যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে - কিন্তু বিশেষ ভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির উপরে , যখন আধ্যাত্মিক শক্তি পার্থিব ক্ষমতার সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। সেই সাথে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তির গুরুত্ব ও বাস্তবতার উপরে। সে কারণেই দাউদ নবী ও সুলাইমানের উদাহরণ উত্থাপন করা হয়েছে , যারা ক্ষমতাধর নৃপতি এবং সেই সাথে নবীও ছিলেন। এদের উদাহরণের সমান্তরালভাবে আমাদের রাসুলের [ সা ] জীবনীকে চিত্রিত করা হয়েছে।
সার সংক্ষেপ : পাপীরা এবং বৈষয়িক বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা সত্য এবং ন্যায়ের পুণঃর্ভিভাবে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে যায়। দাউদ নবী , যিনি আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উভয় ক্ষমতা দ্বারা শক্তিশালী ছিলেন, তাঁর কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, পার্থিব ক্ষমতা অপেক্ষা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অনেক বেশী শক্তিশালী। [ ৩৮ : ২৭ - ৬৪ ]
ঠিক একই ভাবে সুলাইমান পার্থিব শক্তি অপেক্ষা আল্লাহ্কে বেশী ভালোবাসতেন। পার্থিব ক্ষমতা দুষ্টলোকের অধিকারে অপব্যবহার হতে পারে। ইয়াকুব নবী ছিলেন ক্ষমতাবান ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ। তিনি জীবনের শেষ পরিণতি হিসেবে দুঃখ দুর্দ্দশার পরিবর্তে পরলোকের শান্তিকে বেছে নিয়েছিলেন। [ ৩৮ : ১ - ২৬ ]।
শেষ নবীর বেলাতেও তাঁর প্রচারিত আল্লাহ্র একত্ববাদ সকল হিংসা ও ঔদ্ধত্যের উপরে স্থান লাভ করবে। [ ৩৮ : ৬৫ - ৮৮ ]।
সূরা সা'দ বা সংক্ষিপ্ত অক্ষর সমূহ - ৩৮
৮৮ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। সাদ, ৪১৪৬ শপথ কুর-আনের যা উপদেশে পরিপূর্ণ [ এটাই প্রকৃত সত্য ] ৪১৪৭।
৪১৪৬। 'Sad' একটি আরবী অক্ষর। এখানে অক্ষরটি ব্যবহৃত হয়েছে ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশের জন্য।
৪১৪৭। "শপথ উপদেশপূর্ণ কুর-আনের।" এখানে 'Zikr' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। জিক্র শব্দটি দ্বারা এক বিশাল ভাবধারাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এর দ্বারা প্রকাশ করা হয় ; ১) ভক্তি সহকারে আল্লাহ্কে স্মরণ করা ; ২) আল্লাহ্র আয়াত সমূহ আবৃত্তি করা এবং আল্লাহ্র প্রশংসা জ্ঞাপন করা ; ৩) আল্লাহ্র সম্বন্ধে শিক্ষাদান করা , সাবধান করা , সর্তক করা ; ৪) আয়াত [ ১৬ :৪৩ ] 'Ah-luz-Zikr' অর্থ করা হয়েছে বাণী , প্রত্যাদেশ।
০২। কিন্তু অবিশ্বাসীরা আত্মগরিমায় [ মত্ত ] এবং বিরোধিতায় ডুবে আছে ৪১৪৮।
৪১৪৮। এই আয়াতটির মাধ্যমে মনুষ্য চরিত্রের এক বিশেষ দিককে তুলে ধরা হয়েছে। সত্যকে অবিশ্বাস করার এবং পাপে নিমগ্ন হওয়ার প্রবণতার মূল নিহিত থাকে মানুষের অহংকার ,গর্ব ও ঔদ্ধত্যের মাঝে। অহংকার , গর্ব ও ঔদ্ধত্যের ফলেই শয়তানের পতন ঘটে বেহেশত থেকে। শয়তানের এই বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে [ ৩৮ : ৭৪ - ৭৬ ] আয়াতে। অহংকার একটি খারাপ রিপু যা থেকে হিংসা ও বিদ্বেষের উৎপত্তি ঘটে, - আর হিংসা-দ্বেষ থেকে সৃষ্টি হয় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার প্রবণতা, প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে নিজস্ব অধিকারভুক্ত মতামতের সৃষ্টি করার চেষ্টা। যার ফলে তার আত্মার মাঝে প্রকৃত সত্যের আলো অনুপ্রবেশে বাঁধা পায় এবং আল্লাহ্র একত্বের ধারণা থেকে সে অনেক দূরে সরে যায়। একত্ববাদ হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যার উপরে প্রতিষ্ঠিত হয় জীবন বিকাশের সকল শাখা-প্রশাখা। আরব মোশরেকরা রাসুলের [সা ] প্রচারিত এই একত্ববাদকেই প্রতিহত করে। দেখুন আয়াত [ ৩৮ :৫ ] পৃথিবীতে মানুষের অধঃপতনের কারণও হচ্ছে অহংকার, হিংসা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশের ফল।
০৩। কত জনগোষ্ঠিকে এদের পূর্বে আমি ধ্বংস করেছি ? শেষ পর্যন্ত তারা [ করুণা লাভের জন্য] আর্তচীৎকার করেছিলো - কিন্তু তখন উদ্ধার পাওয়ার কোন উপায় ছিলো না ৪১৪৯।
৪১৪৯। পৃথিবীতে সর্বকালে সর্বযুগে আল্লাহ্ মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দান করেছেন, সাবধান করেছেন এবং তার নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন, যেনো প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি জাতি সময়মত সাবধান হতে পারে। তা সত্বেও পৃতিবীতে বিভিন্ন জাতির অধঃপতনের ইতিহাস হচ্ছে আল্লাহ্ প্রদত্ত পথ নির্দ্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং তা থেকে দূরে সরে যাওয়া। এই ইতিহাস থেকে পরবর্তী জাতির জন্য আছে শিক্ষণীয় বিষয় যে , প্রতিটি জাতিই আত্ম ধ্বংসের জন্য দায়ী। প্রাকৃতিক আইনের ন্যায় পৃথিবীতে আল্লাহ্ নৈতিক আইনও স্থাপন করে দিয়েছেন। আর এই আইন হচ্ছে অলঙ্ঘনীয়। যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত নৈতিক আইন লঙ্ঘন করবে তাদের ধবংস অনিবার্য। এই-ই হচ্ছে আল্লাহ্র ন্যায়নীতি। অন্যায়কারীদের ধ্বংস তাদেরই কর্মফল। তবে পৃথিবীতে তাদের স্বল্পকালীন অবস্থান কালে তারা যদি অনুতাপের মাধ্যমে নিজেদের চরিত্র ও কর্মধারার সংশোধন করে, তবে আল্লাহ্ পরম করুণময় ও ক্ষমাশীল। কিন্তু তাদের আত্ম অহংকার এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধারণার ঔদ্ধত্য ; তাদের আল্লাহ্র করুণা লাভে ব্যর্থ করে। তাদের কর্মফল তাদের আত্মায় আল্লাহ্র নূর প্রবেশে বাঁধা দান করে, ফলে তারা আল্লাহ্র হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়। এ যেনো এক দুর্ভেদ্দ্য পর্দ্দা যা আলোর সামান্য রশ্মীকেও প্রবেশে বাঁধা দান করে। কিন্তু যখন তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপণীত হয়, তখন তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করতে পারে এবং আর্ত চীৎকার করে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে যাবে। ভুল সংশোধনের আর কোনও সুযোগ পাওয়া যাবে না।
০৪। এরা আশ্চর্য হচ্ছে এই ভেবে যে, তাদের মধ্য থেকেই তাদের জন্য একজন সর্তককারী এসেছে এবং অবিশ্বাসীরা বলে যে, " এ তো একজন যাদুকর , মিথ্যা বলছে ৪১৫০।
৪১৫০। রাসুলের [সা ] আগমনে আরব মোশরেকরা আশ্চর্য্য বোধ করে এ জন্য যে, তাদেরই একজনকে আল্লাহ্ কেন বিশেষ ভাবে রাসুল রূপে নির্বাচিত করলেন। হিংসার আগুন তাদের সমস্ত সত্ত্বাকে বিদ্বেষে পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলে তারা রাসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এবং কুরুচিপূর্ণ বাক্য প্রয়োগ করতে থাকে। যাকে আল্লাহ্ পৃথিবীর রহমতরূপে প্রেরণ করেছেন তাঁকে তারা "যাদুকর" ও " মিথ্যাবাদী" রূপে অভিহিত করার প্রয়াস পায়। তাদের এই প্রয়াস তাদের বিবেক বুদ্ধির স্বল্পতারই প্রকাশ করে।
০৫। " সে কি বহু দেব-দেবীদের [ সকলকে ] এক আল্লাহ্ বানিয়েছে ? সত্যিই এটা একটা অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!" ৪১৫১
৪১৫১। আল্লাহ্র একত্ব ঘোষণায় রসুলের [সা ] ত্রুটি কোথায় ? তিনি তো কাল্পনিক উপাস্যদের বিদূরিত করে উপসনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনায়ন করেছেন। ফলে বিভিন্ন উপাস্যের উপাসকরা পরস্পর সংঘর্ষ থেকে রেহাই পায় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রাসুলের শিক্ষা এক অপূর্ব শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের সমাবেশ, তবুও অবিশ্বাসীদের চোখে তা বিদ্রূপের সামিল। এই আয়াতে অবিশ্বাসীদের ব্যঙ্গক্তিকেই প্রকাশ করা হয়েছে।
০৬। তাদের মধ্যে যারা প্রধান তারা অসহিষ্ণু ভাবে চলে গেলো [ এই বলে ] ৪১৫২। "তোমরা চলে যাও, এবং তোমাদের দেবতাদের প্রতি অবিচলিত থাক। নিশ্চয়ই এটা [ তোমাদের বিরুদ্ধে ] এক অভিসন্ধি।
৪১৫২। ইসলামের প্রথম যুগে যখন ইসলামের প্রচারক হযরত মুহম্মদের [ সা ] উপরে পৌত্তলিক কোরেশদের নির্মম নির্যাতন চলছিলো , সে সময়ে তারা রাসুলের [সা ] নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করতো, এর মধ্যে অন্যতম পন্থা ছিলো , তারা হযরতের [সা ] চাচা আবু তালিবের উপরে চাপ সৃষ্টি করা যেনো তিনি প্রকাশ্যে তাঁর প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে পরিত্যাগ করেন। এ ব্যাপারে তারা আবু তালেবের সাথে মন্ত্রণাসভারও আয়োজন করে। এ ব্যাপারে তাদের উদ্দোগ অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হয। ফলে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ [ সা ] তাঁর নিজের হাতে সমস্ত ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। হযরত ওমর [রা] ইসলাম প্রচারের ষষ্ঠ বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন যা ছিলো হিজরতের সাত বছর পূর্বে। হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণ কোরেশ প্রধানদের আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ তারা ছিলো স্বেচ্ছাচারী ,লোভী , সুতারাং ইসলামের সমতার বিধান তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকে আঘাত হানে। সুতারাং ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তারা পূণ্যাত্মা রাসুলের [সা ] ভূমিকাকে বিকৃত করে দেখানোর প্রয়াস পায়। রাসুলুল্লাহ্র [সা] ধর্ম প্রচার রোধ করার উদ্দেশ্যে কোরেশদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম থেকে লোকদের ফিরিয়ে রাখতে এই ধরণের অপপ্রচার করতো।
০৭। "ইদানিং কালের জন সাধারণের মধ্যে [এরূপ ] কথা কখনও শুনি নাই। এটা কিছু নয় , মনগড়া কাহিনী মাত্র।" ৪১৫৩
৪১৫৩। এখানে পৌত্তলিক কোরেশদের উক্তিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো যে,অন্য ধর্মে; ইসলামে প্রচারিত দর্শন নাই সুতারাং তা গ্রহণ করার কোনও যৌক্তিকতা নাই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ সব প্রতিমারই পূঁজা করে গেছেন ; সুতারাং তাদের ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না। তারা নিজেদের মনগড়া ধারণাতে এতটাই আত্মতৃপ্ত ছিলো যে, প্রকৃত সত্যের ধারণা তাদের নিকট অরুচিকর বোধ হলো। সুতারাং তারা প্রচারিত সত্যকে "মনগড়া উক্তিমাত্র " - আখ্যা দান করেছিলো। কোনও কোনও তফসীর কারের মতে "Millat akhirat" শব্দটি দ্বারা ইসলামের আগমনের পূর্বে শেষ যে ধর্ম পৃথিবীতে প্রচারিত হয় তাকেই বোঝানো হয়েছে , অর্থাৎ খৃষ্টীন ধর্ম যা আল্লাহ্র একত্বের ধারণা বিচ্যুত হয়ে তা পিতা পুত্র পবিত্র আত্মা এই ত্রিতত্বে পর্যবসিত হয়।
০৮। "কি! আমাদের সকলের মধ্যে বুঝি তার নিকটেই ওহী প্রেরণ করা হয়েছে ? " ৪১৫৪। তারা আমার ওহী সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করে [ কারণ ] তারা এখনও আমার শাস্তি আস্বাদন করে নাই ৪১৫৫।
৪১৫৪। এই আয়াতটির মাধ্যমে কোরেশদের হিংসা ও দ্বেষের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিলো , " যদি আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পৃথিবীতে প্রেরণ করতেই হয়, তবে তা আসা উচিত প্রভাবশালী কোরেশ নেতাদের নিকট। তা না হয়ে তার আগমন কেন আব্দুল্লাহ্র এতিম পুত্রের নিকট হবে?"
৪১৫৫। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সম্পর্কে কোরেশ নেতাদের কোনওরূপ ধারণা ছিলো না। পার্থিব জিনিষ - ক্ষমতা সম্পদ প্রভাব প্রতিপত্তির চারিপাশে আবর্তিত হয়। কিন্তু যা স্বর্গীয় তা লাভ করার জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি। যদি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে তবে তাদের জন্য আল্লাহ্র শাস্তি অবধারিত।
এই আয়াতগুলির মাধ্যমে মানুষের সত্য বিমুখতার প্রবণতাকে তুলে ধরা হয়েছে। তারাই সত্য বিমুখ ও সত্য -বিদ্বেষী যারা সমাজে সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করে থাকে। এ কথা সর্ব যুগের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। ভবিষ্যতেও প্রযোজ্য হবে।
