+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ এর ভূমিকাতে যে শ্রেণীর সম্বন্ধে বলা হয়েছিলো। এই সূরাটি সেই শ্রেণীর চতুর্থ সূরা। পূর্বের ন্যায় এই সূরাতেও মন্দের পরাজয়কে প্রত্যাদেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। বেহেশতের ফেরেশতা এবং রসুলদের প্রসঙ্গ উল্লেখ দ্বারা প্রাচীন ইতিহাসের সারিবদ্ধ সংগ্রামের বিবরণ পেশ করা হয়েছে ; যে সংগ্রামের ইতিহাসে নূহ্ নবী থেকে ইউনুস নবী পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এই সূরার সময়কাল সম্বন্ধে বলা হয় মধ্য - মক্কার সময়।
সার সংক্ষেপ : স্বর্গ ও মর্তে সর্বত্র ভালোকে মন্দের বিপরীতে পৃথকীকরণ করা হয়। তাদের প্রত্যেকের শেষ পরিণতি তুলনামূলক বৈষম্য প্রদর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। [ ৩৭: ১-৭৪ ]।
নূহ্ , ইব্রাহীম , মুসা , হারুণ , ইলিয়াস , এবং লূতের বিজয় এবং শান্তি এসেছিলো তাদের পাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষে। [ ৩৭ : ৭৫-১৩৮ ]।
ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিলো ইউনুস নবীর বেলাতে তিনি যখন আল্লাহ্র গুণগানে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু স্বভাবতই মানুষ আল্লাহ্র বিরুদ্ধে তাই -ই আরোপ করে থাকে যা তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ্র নবীরা আল্লাহ্র মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য সংগ্রাম করে থাকেন এবং অবশ্যই তারা জয়ী হবেন। [ ৩৭ : ১৩৯- ১৮২ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৪০৩০। লক্ষ্য করুণ পূর্বের সূরাতে [ ইয়া-সীন ] শপথ করা হয়েছে "জ্ঞানগর্ভ কোরাণের " গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রত্যাদেশের উপরে , যার সাহায্যে মানুষ আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ জ্ঞান আহরণ করতে পারে। এই সূরাতে শপথের মাধ্যমে তিনটি মনোভাব বা আচরণকে প্রকাশ কর হয়েছে পরবর্তী তিনটি আয়াতে যা হচ্ছে মন্দের উপরে ভালোকে প্রতিষ্ঠিত করার উপায়। দেখুন পরবর্তী টিকা সমূহ।
৪০৩১। এই আয়াতসমূহের ব্যাখ্যাতে মতদ্বৈত আছে। এখানে দুধরণের মতবাদ আছে :
১) আয়াত [ ১- ৩ ] পর্যন্ত যাদের উল্লেখ আছে তারা সকলেই একই ব্যক্তি। একই ব্যক্তির মাঝে উপরে তিন ধরণের গুণের প্রকাশ ঘটেছে। অথবা এরা হলেন তিন বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তি ;
২) উভয়ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হলো এরা কারা ? মতবাদের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মতবাদ হচ্ছে : ১) যে তিনটি গুণের উল্লেখ করা হয়েছে তা একজনের জন্য প্রযোজ্য - জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলীর বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। অপরপক্ষে ২) অন্যদল মনে করেন সারিবদ্ধ ভাবে যারা দন্ডায়মান তারা ফেরেশতা এবং তাদের গুণাবলীই এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যরা মনে করেন এরা হলেন ক) ভালো লোক, খ) আল্লাহ্র রসুলগণ , ৩) যারা আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করে। কোরাণে এই তিন প্রকার লোকের সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা নাই। তবে মওলানা ইউসুফ আলীর মতে এই তিন প্রকার গুণাবলীর প্রয়োগ সার্বজনীন উভয় দলের জন্য প্রযোজ্য।
৪০৩২। তিনটি আয়াতের মাধ্যমে [ ১- ৩ ] যে তিনটি কর্মপদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে ধারাবাহিকতা এবং এই ধারাবাহিকতা প্রকাশের জন্য ফা [Fa ] শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। মওলানা ইউসুফ আলীর মতে - ফেরেশতা ও পূণ্যাত্মা ব্যক্তিদের উভয়ের কর্মপদ্ধতি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। এই উভয় সম্প্রদায় -
১) আল্লাহ্র এবাদত ও পূণ্য কাজের জন্য শৃঙ্খলা , নিয়মানুবর্তিতা ও নিজ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করে থাকেন।
২) তারা সর্বদা পাপ ও মন্দকে প্রতিহত করে থাকেন। এ কাজে তারা অত্যন্ত কঠোরতার পরিচয় দান করেন। প্রতিটি কর্মকে পাপমুক্ত ভাবে আল্লাহ্র বিধানমতে সম্পন্ন করার জন্য তারা শৃঙ্খলা ,নিয়মানুবর্তিতা ও একতাবদ্ধ ভাবে পরিচালিত হন। তারা "কঠোর পরিচালক "।
৩) আল্লাহ্র রাজত্বের উন্নতি বিধানের জন্যই তাদের পরিশ্রম। তাঁরা আল্লাহ্র বাণী ও মহিমা প্রচারে মগ্ন থাকেন।
নিয়ম ও শৃঙ্খলা আল্লাহ্র আইনের আওতাভূক্ত ; এবং আল্লাহ্র পছন্দীয়। আল্লাহ্র এবাদত , তা যে কোনও প্রকারেরই হোক না কেন তা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে হতে হবে সারিবদ্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে। উত্তম গুণাবলীর মধ্যে সর্বাগ্রে এ গুণটির উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ্র এবাদত ও সৎ কাজ করার নির্দ্দেশনা হচ্ছে : বিশৃঙ্খল না হয়ে , সারিবদ্ধ থাকা, মন্দকে প্রতিরোধ করা এবং আল্লাহ্র উপদেশাবলী নিজে পাঠ করা এবং অপরের কাছে পৌঁছানো - আল্লাহ্র সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য।
উপদেশ : এই আয়াতগুলির [ ১-৪ ] উপদেশ সার্বজনীন এবং শ্রেষ্ঠ কাজের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সর্বকালে ; এগুলি হচ্ছে : ১) শৃঙ্খলা [ সারিবদ্ধ ভাবে ] ; ২) ন্যায়নীতি [ মন্দকে প্রতিহত ও ভালোকে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কঠোর পরিচালকের ভূমিকা ] ; ৩) সৎ কাজ [আল্লাহ্র রাজত্বের মঙ্গলের জন্য কাজ করা ও সর্বদা আল্লাহ্র নির্দ্দেশবলী স্মরণ রাখে যিক্র ও কোরাণ আবৃত্তির দ্বারা ]।
৪০৩৪। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের অর্ন্তর্বতী সকল কিছুর প্রভু এক আল্লাহ্। তিনি 'Mashariq' সূর্যোদয়ের উদয়স্থলের প্রভু। তফসীরকারগণের মতে বছরে শুধুমাত্র দুদিন সূর্য বিষুবরেখার উপরে ঠিক পূর্ব প্রান্তে উদিত হয়। বৎসরের অন্যান্য সময়ে সূর্য প্রতিদিন ধীরে ধীরে দক্ষিণে অথবা উত্তরে সরে যায়। সুতারাং বৎসরে দুদিন ব্যতীত সূর্যকে ঠিক একই স্থানে উদিত হয় না। অর্থাৎ সূর্য কোনও নির্দ্দিষ্ট স্থানে সারা বৎসর উদিত হয় না। আমরা দেখি দীপ্ত সূর্য সারা বৎসর তার উদয়স্থানের পরিবর্তন করে থাকে; কিন্তু তা সত্বেও সূর্য সকল আকাশ ও পৃথিবীকে সমভাবে আলোকিত করে থাকে। এ সবই আল্লাহ্র একত্বের নিদর্শন।
৪০৩৫। অনুরূপ আয়াত দেখুন [ ৬৭ : ৫ ] এবং [ ৭২ : ৮-৯ ]। " নিম্নতম আকাশ " - বাক্যটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে আকাশের বিভিন্ন স্তরকে। মহাশূন্যে আকাশের সীমানা মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে। বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা 'হাবেল' টেলিস্কোপ স্থাপন করেছেন পৃথিবীর বাইরে,যার সাহায্যে তারা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন সপ্ত আকাশের সীমা রেখা নির্ধারণের। অসীম আকাশের পৃথিবীর নিকটবর্তী যে অংশ তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে এই আয়াতে।
এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে কোরাণ অবতীর্ণ হয়েছে আজ থেকে চৌদ্দশত বৎসর পূর্বে যখন মহাশূন্য সম্বন্ধে মানুষের ধারণা ছিলো খুবই সীমাবদ্ধ। এমন কি সৌর মন্ডল সম্বন্ধেও মানুষের প্রকৃত ধারণা ছিলো না।
৪০৩৬। তারকাশোভিত রাতের অনন্ত আকাশ প্রতিটি মানুষকে মুগ্ধ করে। এই তারকারাজির মধ্যে শ্রেণীবিভাগ বর্তমান। নক্ষত্ররাজি শব্দটি দ্বারা গ্রহ, নক্ষত্র , ধূমকেতু , উল্কাপিন্ড, ইত্যাদি , রাতের আকাশের সকল বস্তুকে নির্দ্দেশ করা হয়েছে। নির্মেঘ রাতের আকাশের এ সব বস্তুর সৌন্দর্য্য প্রবাদতুল্য। এই আয়াতে দুইটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে :
১) নক্ষত্র রাজির অপূর্ব সৌন্দর্য এবং তাদের সমষ্টিগত ভাবে ছায়াপথে অবস্থান ও পৃথিবী থেকে দ্রষ্টব্য তাদের চলমান গতি প্রভৃতি সব কিছুই নির্দ্দেশ করে স্রষ্টা এক এবং এসব বস্তু তাঁর প্রণীত একই আইনের আওতায় সমন্বিত শৃঙ্খলার সাথে অনন্ত আকাশে অবস্থান করছে।
এখানে শুধু এটুকুই বলা উদ্দেশ্য যে, এই তারকাশোভিত আকাশ সাক্ষ্য দেয় যে , এগুলি আপনা আপনি অস্তিত্ব লাভ করে নাই , বরং একজন স্রষ্টা এগুলি সৃষ্টি করেছেন ; যে সত্ত্বা এ সব বস্তুকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম তার কোন শরীক বা অংশীদার প্রয়োজন নাই। অর্থাৎ নভোমন্ডলের সকল কিছু স্রষ্টার একত্ব ঘোষণা করে তাঁর সমন্বিত আইন দ্বারা শৃঙ্খলার দ্বারা পরিচালিত হয়ে। এবং এ সকল নক্ষত্ররাজির অলক্ষ্যে যে শক্তি ও মহিমা কাজ করে তা শয়তানের প্রবল আক্রমণ থেকে প্রহরী স্বরূপ পৃথিবীকে রক্ষা করে। [দেখুন পরবর্তী আয়াত নং ৭ ]।
৪০৩৭। [ ৭ - ১১ ] আয়াত সমূহ জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডের নির্দ্দেশ দান করে। দেখুন আয়াত [ ১৫ : ১৭ - ১৮ ] এবং টিকা ১৯৫১- ৫৩। অনন্ত নভোমন্ডল যে শুধুমাত্র আল্লাহ্র ক্ষমতা ও শিল্পসত্ত্বার সাক্ষর বহন করে তাই নয় ; পৃথিবীকে শয়তানের প্রবল আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সকল দিক থেকে তাকে সুরক্ষিত করেছেন নভোমন্ডল সৃষ্টির মাধ্যমে। শয়তান কোনও স্বর্গীয় বস্তু নয়। সে আইন অমান্যকারী , অবাধ্য, বিদ্রোহী - সুতারাং আল্লাহ্র বলেছেন, " রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে" এবং " তাদের বিতারণের জন্য আছে চিরস্থায়ী শাস্তি।" [ আয়াত ৭-৯ ]
আকাশ মন্ডলী , তারকারাজি ও উল্কাপিন্ডের আলোচনার উদ্দেশ্য আল্লাহ্র একত্ববাদ প্রমাণ করা। যে সত্ত্বা এই সুবিশাল নক্ষত্ররাজি প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনিই এবাদত ও উপাসনার যোগ্য। দ্বিতীয়ত : শয়তানের শক্তিকে উপাস্য ধারণা করার কোনও কারণ নাই , কারণ শয়তান বিতাড়িত ও পরাভূত সৃষ্ট জীব।
সূরা আস্ সাফ্ফাত
Page 1 of 9
সূরা আস্ সাফ্ফাত বা যারা শ্রেণীতে সারিবদ্ধ - ৩৭
১৮২ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ এর ভূমিকাতে যে শ্রেণীর সম্বন্ধে বলা হয়েছিলো। এই সূরাটি সেই শ্রেণীর চতুর্থ সূরা। পূর্বের ন্যায় এই সূরাতেও মন্দের পরাজয়কে প্রত্যাদেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। বেহেশতের ফেরেশতা এবং রসুলদের প্রসঙ্গ উল্লেখ দ্বারা প্রাচীন ইতিহাসের সারিবদ্ধ সংগ্রামের বিবরণ পেশ করা হয়েছে ; যে সংগ্রামের ইতিহাসে নূহ্ নবী থেকে ইউনুস নবী পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এই সূরার সময়কাল সম্বন্ধে বলা হয় মধ্য - মক্কার সময়।
সার সংক্ষেপ : স্বর্গ ও মর্তে সর্বত্র ভালোকে মন্দের বিপরীতে পৃথকীকরণ করা হয়। তাদের প্রত্যেকের শেষ পরিণতি তুলনামূলক বৈষম্য প্রদর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। [ ৩৭: ১-৭৪ ]।
নূহ্ , ইব্রাহীম , মুসা , হারুণ , ইলিয়াস , এবং লূতের বিজয় এবং শান্তি এসেছিলো তাদের পাপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষে। [ ৩৭ : ৭৫-১৩৮ ]।
ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিলো ইউনুস নবীর বেলাতে তিনি যখন আল্লাহ্র গুণগানে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু স্বভাবতই মানুষ আল্লাহ্র বিরুদ্ধে তাই -ই আরোপ করে থাকে যা তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ্র নবীরা আল্লাহ্র মাহাত্ম্য প্রকাশের জন্য সংগ্রাম করে থাকেন এবং অবশ্যই তারা জয়ী হবেন। [ ৩৭ : ১৩৯- ১৮২ ]।
সূরা আস্ সাফ্ফাত বা যারা শ্রেণীতে সারিবদ্ধ - ৩৭
১৮২ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। শপথ তাদের যারা সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান ৪০৩০, ৪০৩১ ,
৪০৩০। লক্ষ্য করুণ পূর্বের সূরাতে [ ইয়া-সীন ] শপথ করা হয়েছে "জ্ঞানগর্ভ কোরাণের " গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে প্রত্যাদেশের উপরে , যার সাহায্যে মানুষ আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ জ্ঞান আহরণ করতে পারে। এই সূরাতে শপথের মাধ্যমে তিনটি মনোভাব বা আচরণকে প্রকাশ কর হয়েছে পরবর্তী তিনটি আয়াতে যা হচ্ছে মন্দের উপরে ভালোকে প্রতিষ্ঠিত করার উপায়। দেখুন পরবর্তী টিকা সমূহ।
৪০৩১। এই আয়াতসমূহের ব্যাখ্যাতে মতদ্বৈত আছে। এখানে দুধরণের মতবাদ আছে :
১) আয়াত [ ১- ৩ ] পর্যন্ত যাদের উল্লেখ আছে তারা সকলেই একই ব্যক্তি। একই ব্যক্তির মাঝে উপরে তিন ধরণের গুণের প্রকাশ ঘটেছে। অথবা এরা হলেন তিন বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তি ;
২) উভয়ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হলো এরা কারা ? মতবাদের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মতবাদ হচ্ছে : ১) যে তিনটি গুণের উল্লেখ করা হয়েছে তা একজনের জন্য প্রযোজ্য - জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলীর বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। অপরপক্ষে ২) অন্যদল মনে করেন সারিবদ্ধ ভাবে যারা দন্ডায়মান তারা ফেরেশতা এবং তাদের গুণাবলীই এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যরা মনে করেন এরা হলেন ক) ভালো লোক, খ) আল্লাহ্র রসুলগণ , ৩) যারা আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধ করে। কোরাণে এই তিন প্রকার লোকের সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা নাই। তবে মওলানা ইউসুফ আলীর মতে এই তিন প্রকার গুণাবলীর প্রয়োগ সার্বজনীন উভয় দলের জন্য প্রযোজ্য।
০২। এবং [ মন্দকে ] প্রতিরোধে যারা কঠোর ৪০৩২।
৪০৩২। তিনটি আয়াতের মাধ্যমে [ ১- ৩ ] যে তিনটি কর্মপদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে ধারাবাহিকতা এবং এই ধারাবাহিকতা প্রকাশের জন্য ফা [Fa ] শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। মওলানা ইউসুফ আলীর মতে - ফেরেশতা ও পূণ্যাত্মা ব্যক্তিদের উভয়ের কর্মপদ্ধতি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। এই উভয় সম্প্রদায় -
১) আল্লাহ্র এবাদত ও পূণ্য কাজের জন্য শৃঙ্খলা , নিয়মানুবর্তিতা ও নিজ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করে থাকেন।
২) তারা সর্বদা পাপ ও মন্দকে প্রতিহত করে থাকেন। এ কাজে তারা অত্যন্ত কঠোরতার পরিচয় দান করেন। প্রতিটি কর্মকে পাপমুক্ত ভাবে আল্লাহ্র বিধানমতে সম্পন্ন করার জন্য তারা শৃঙ্খলা ,নিয়মানুবর্তিতা ও একতাবদ্ধ ভাবে পরিচালিত হন। তারা "কঠোর পরিচালক "।
৩) আল্লাহ্র রাজত্বের উন্নতি বিধানের জন্যই তাদের পরিশ্রম। তাঁরা আল্লাহ্র বাণী ও মহিমা প্রচারে মগ্ন থাকেন।
০৩। এবং যারা [আল্লাহ্র ] মহিমা ঘোষণা করে।
০৪। অবশ্যই অবশ্যই তোমাদের আল্লাহ্ অদ্বিতীয় ৪০৩৩ -
৪০৩৩। ঐশ্বরিক উপদেশ এক কথায় প্রকাশ করা হয়েছে এই আয়াতের মাধ্যমে। ধর্মের সর্বশেষ কথা, এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস ; " নিশ্চয়ই তোমাদের আল্লাহ্ অদ্বিতীয়।" এই বিশ্বাসই হচ্ছে ঈমান, আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি। বলা হয়েছে প্রভু আল্লাহ্ আমাদের যত্ন করেন , ভালোবাসেন এবং প্রতিপালন করেন। আমরা তাঁর অতি প্রিয়। তিনি এক এবং অদ্বিতীয় সত্ত্বা। সমস্ত মঙ্গল, ভালোবাসা ; ক্ষমতা , সর্বকিছুর মূল চালিকাশক্তি এক আল্লাহ্ - এসব অর্জনের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহ্র সাহায্যই কামনা করতে হবে। বিশ্ব প্রকৃতি দেবতা, উপদেবতা বা অন্ধ ভাগ্যের খেলাধূলার স্থান নয়, যে তাদের কাছে সাহায্যের জন্য প্রতিযোগীতা করতে হবে , মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্র আইনে সমস্ত বিশ্বভূমন্ডল সমন্বিত শৃঙ্খলার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত - আকাশ ও পৃথিবী সব কিছু একই আইনের অধীনে সমন্বিত -শৃঙ্খলার সাথে অবস্থান করে। আমাদেরও আহ্বান করা হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক আল্লাহ্র আরোপিত আইনের সাথে নিজেকে সমন্বিত করার জন্য - ১) সারিবদ্ধভাবে শৃঙ্খলার সাথে , ২) মন্দকে প্রতিহত করার সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং ৩) আল্লাহ্র রাজত্বের মঙ্গলের জন্য পরস্পরের সহযোগীতায় উদ্ভাবিত কার্যের মাধ্যমে।০৪। অবশ্যই অবশ্যই তোমাদের আল্লাহ্ অদ্বিতীয় ৪০৩৩ -
নিয়ম ও শৃঙ্খলা আল্লাহ্র আইনের আওতাভূক্ত ; এবং আল্লাহ্র পছন্দীয়। আল্লাহ্র এবাদত , তা যে কোনও প্রকারেরই হোক না কেন তা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে হতে হবে সারিবদ্ধ শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে। উত্তম গুণাবলীর মধ্যে সর্বাগ্রে এ গুণটির উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ্র এবাদত ও সৎ কাজ করার নির্দ্দেশনা হচ্ছে : বিশৃঙ্খল না হয়ে , সারিবদ্ধ থাকা, মন্দকে প্রতিরোধ করা এবং আল্লাহ্র উপদেশাবলী নিজে পাঠ করা এবং অপরের কাছে পৌঁছানো - আল্লাহ্র সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য।
উপদেশ : এই আয়াতগুলির [ ১-৪ ] উপদেশ সার্বজনীন এবং শ্রেষ্ঠ কাজের সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সর্বকালে ; এগুলি হচ্ছে : ১) শৃঙ্খলা [ সারিবদ্ধ ভাবে ] ; ২) ন্যায়নীতি [ মন্দকে প্রতিহত ও ভালোকে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কঠোর পরিচালকের ভূমিকা ] ; ৩) সৎ কাজ [আল্লাহ্র রাজত্বের মঙ্গলের জন্য কাজ করা ও সর্বদা আল্লাহ্র নির্দ্দেশবলী স্মরণ রাখে যিক্র ও কোরাণ আবৃত্তির দ্বারা ]।
০৫। যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং ঐ উভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সকল কিছুর প্রভু এবং সূর্য উদয়ের প্রতিটি স্থানের প্রভু ৪০৩৪।
৪০৩৪। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদের অর্ন্তর্বতী সকল কিছুর প্রভু এক আল্লাহ্। তিনি 'Mashariq' সূর্যোদয়ের উদয়স্থলের প্রভু। তফসীরকারগণের মতে বছরে শুধুমাত্র দুদিন সূর্য বিষুবরেখার উপরে ঠিক পূর্ব প্রান্তে উদিত হয়। বৎসরের অন্যান্য সময়ে সূর্য প্রতিদিন ধীরে ধীরে দক্ষিণে অথবা উত্তরে সরে যায়। সুতারাং বৎসরে দুদিন ব্যতীত সূর্যকে ঠিক একই স্থানে উদিত হয় না। অর্থাৎ সূর্য কোনও নির্দ্দিষ্ট স্থানে সারা বৎসর উদিত হয় না। আমরা দেখি দীপ্ত সূর্য সারা বৎসর তার উদয়স্থানের পরিবর্তন করে থাকে; কিন্তু তা সত্বেও সূর্য সকল আকাশ ও পৃথিবীকে সমভাবে আলোকিত করে থাকে। এ সবই আল্লাহ্র একত্বের নিদর্শন।
০৬। নিশ্চয় আমি নিম্নতম আকাশকে ৪০৩৫ , নক্ষত্ররাজির সৌন্দর্য দ্বারা সুশোভিত করেছি ৪০৩৬ -
৪০৩৫। অনুরূপ আয়াত দেখুন [ ৬৭ : ৫ ] এবং [ ৭২ : ৮-৯ ]। " নিম্নতম আকাশ " - বাক্যটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে আকাশের বিভিন্ন স্তরকে। মহাশূন্যে আকাশের সীমানা মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে। বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা 'হাবেল' টেলিস্কোপ স্থাপন করেছেন পৃথিবীর বাইরে,যার সাহায্যে তারা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন সপ্ত আকাশের সীমা রেখা নির্ধারণের। অসীম আকাশের পৃথিবীর নিকটবর্তী যে অংশ তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে এই আয়াতে।
এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে কোরাণ অবতীর্ণ হয়েছে আজ থেকে চৌদ্দশত বৎসর পূর্বে যখন মহাশূন্য সম্বন্ধে মানুষের ধারণা ছিলো খুবই সীমাবদ্ধ। এমন কি সৌর মন্ডল সম্বন্ধেও মানুষের প্রকৃত ধারণা ছিলো না।
৪০৩৬। তারকাশোভিত রাতের অনন্ত আকাশ প্রতিটি মানুষকে মুগ্ধ করে। এই তারকারাজির মধ্যে শ্রেণীবিভাগ বর্তমান। নক্ষত্ররাজি শব্দটি দ্বারা গ্রহ, নক্ষত্র , ধূমকেতু , উল্কাপিন্ড, ইত্যাদি , রাতের আকাশের সকল বস্তুকে নির্দ্দেশ করা হয়েছে। নির্মেঘ রাতের আকাশের এ সব বস্তুর সৌন্দর্য্য প্রবাদতুল্য। এই আয়াতে দুইটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে :
১) নক্ষত্র রাজির অপূর্ব সৌন্দর্য এবং তাদের সমষ্টিগত ভাবে ছায়াপথে অবস্থান ও পৃথিবী থেকে দ্রষ্টব্য তাদের চলমান গতি প্রভৃতি সব কিছুই নির্দ্দেশ করে স্রষ্টা এক এবং এসব বস্তু তাঁর প্রণীত একই আইনের আওতায় সমন্বিত শৃঙ্খলার সাথে অনন্ত আকাশে অবস্থান করছে।
এখানে শুধু এটুকুই বলা উদ্দেশ্য যে, এই তারকাশোভিত আকাশ সাক্ষ্য দেয় যে , এগুলি আপনা আপনি অস্তিত্ব লাভ করে নাই , বরং একজন স্রষ্টা এগুলি সৃষ্টি করেছেন ; যে সত্ত্বা এ সব বস্তুকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম তার কোন শরীক বা অংশীদার প্রয়োজন নাই। অর্থাৎ নভোমন্ডলের সকল কিছু স্রষ্টার একত্ব ঘোষণা করে তাঁর সমন্বিত আইন দ্বারা শৃঙ্খলার দ্বারা পরিচালিত হয়ে। এবং এ সকল নক্ষত্ররাজির অলক্ষ্যে যে শক্তি ও মহিমা কাজ করে তা শয়তানের প্রবল আক্রমণ থেকে প্রহরী স্বরূপ পৃথিবীকে রক্ষা করে। [দেখুন পরবর্তী আয়াত নং ৭ ]।
০৭। এবং প্রত্যেক অবাধ্য , বিদ্রোহী শয়তান থেকে রক্ষা করেছি , ৪০৩৭
৪০৩৭। [ ৭ - ১১ ] আয়াত সমূহ জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডের নির্দ্দেশ দান করে। দেখুন আয়াত [ ১৫ : ১৭ - ১৮ ] এবং টিকা ১৯৫১- ৫৩। অনন্ত নভোমন্ডল যে শুধুমাত্র আল্লাহ্র ক্ষমতা ও শিল্পসত্ত্বার সাক্ষর বহন করে তাই নয় ; পৃথিবীকে শয়তানের প্রবল আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য সকল দিক থেকে তাকে সুরক্ষিত করেছেন নভোমন্ডল সৃষ্টির মাধ্যমে। শয়তান কোনও স্বর্গীয় বস্তু নয়। সে আইন অমান্যকারী , অবাধ্য, বিদ্রোহী - সুতারাং আল্লাহ্র বলেছেন, " রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে" এবং " তাদের বিতারণের জন্য আছে চিরস্থায়ী শাস্তি।" [ আয়াত ৭-৯ ]
আকাশ মন্ডলী , তারকারাজি ও উল্কাপিন্ডের আলোচনার উদ্দেশ্য আল্লাহ্র একত্ববাদ প্রমাণ করা। যে সত্ত্বা এই সুবিশাল নক্ষত্ররাজি প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনিই এবাদত ও উপাসনার যোগ্য। দ্বিতীয়ত : শয়তানের শক্তিকে উপাস্য ধারণা করার কোনও কারণ নাই , কারণ শয়তান বিতাড়িত ও পরাভূত সৃষ্ট জীব।
