+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : ভূমিকার জন্য দেখুন সূরা নং ৩৪। এই সূরাটি পূণ্যাত্মা রাসুল [ সা ] ও তিনি যে প্রত্যাদেশ লাভ করেন তার প্রতি নিবেদিত। ইয়া-সীন এই সংক্ষিপ্ত অক্ষরদ্বয়কে রাসুলের [ সা] উপাধিরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। এই সূরাটি কোরাণের হৃৎপিন্ড স্বরূপ - বর্ণনা করা হয় - কারণ ইসলামের শিক্ষকের মূল ব্যক্তিত্ব এবং মূল মতবাদ এবং পরকাল সম্বন্ধে এই সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু এই সূরায় পরকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে , এই সূরাটি মৃত্যুপথযাত্রীর শয্যাপার্শ্বে পাঠ করা হয়।
সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় কাল সম্বন্ধে বলা হয় যে, সূরাটি মক্কার সময় কালের মধ্যবর্তী বা প্রথমে অবতীর্ণ হয়।
সার সংক্ষেপ : কোরাণ শরীফ জ্ঞানের ভান্ডার। তারাই হতভাগ্য যারা এর থেকে লাভ বা উন্নতি করতে পারে না। একজন ব্যতীত নগরীর সকলের সত্যকে পরিত্যাগের উপমা দ্বারা আল্লাহ্র নবীকে বোঝানো হয়েছে , যিনি আল্লাহ্র মহিমা ও করুণার স্বাক্ষর। [ ৩৬ : ১ - ৩২ ]।
প্রকৃতিতে এবং প্রত্যাদেশে আল্লাহ্র নিদর্শন বর্তমান। [ ৩৬ : ৩৩ - ৫০ ]।
পুণরুত্থান এবং পরকাল [ ৩৬ : ৫১ - ৮৩ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৩৯৪৩। 'ইয়া-সীন ' বর্ণমালাদ্বয় প্রতীক অর্থে ব্যবহৃত। অনেক তফসীরকার 'ইয়া ' বর্ণমালাটিকে সম্বোধন সূচক কারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং 'সীন' বর্ণটি দ্বারা মানুষ অর্থে ব্যবহার করেছেন। সে ক্ষেত্রে 'ইয়া-সীন' বর্ণমালাদ্বয়ের অর্থ দাড়াবে হে মানুষ ! এখানে মানুষ অর্থ মানব সম্প্রদায়ের নেতাকে বোঝানো হয়েছে। যিনি পৃথিবীর সকল আদম সন্তানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মহৎ ব্যক্তিত্বরূপে পরিচিত। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্র রাসুল হযরত মুহম্মদ [ সা ]। কারণ এই সূরাটি প্রধানতঃ রাসুল [ সা ] ও তাঁর প্রচারিত শিক্ষা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, এই প্রতীক অক্ষরমালার সম্বন্ধে দৃঢ়ভাবে কোনও মতবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ আল্লাহ্-ই জানেন এর প্রকৃত অর্থ। সাধারণতঃ 'ইয়াসীন ' অক্ষরমালাকে রাসুলের উপাধিরূপে ব্যবহার করা হয়।
৩৯৪৪। রাসুলের পরিচয় পত্র সম্বন্ধে এখানে দুটি যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে :
১) তিনি যে ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ [ কোরাণ ] প্রাপ্ত হন এবং
২) তিনি যে আত্মত্যাগ ও বীরত্ব পরিপূর্ণ জীবন যাপন [ সরল পথ ] করেন।
রাসুলের জীবনের এই দুটো প্রামাণিক সাক্ষ্যের প্রতি আবেদন করা হয়েছে এই সূরাতে।
৩৯৪৫। কোরাণের দুটি বৈশিষ্ট্য এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ; যার মাধ্যমে আল্লাহ্র ধারণা হৃদয়ে ধারণ করা অনেক সহজ হবে। আধ্যাত্মিক জগতকে উজ্জীবিত করার বিশেষ শক্তি ও ক্ষমতা কোরাণের আছে। কারণ কোরাণ হচেছ আল্লাহ্র বাণী। আল্লাহ্ শক্তিতে পরাক্রমশালী এবং তাঁর ইচ্ছাকে কার্যকর করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত কোরাণ মানুষের জন্য রহমত স্বরূপ ; কারণ আল্লাহ্ তো সর্বাপেক্ষা করুণাময় ও দয়ালু। এ সব বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে যে, কোরাণ আল্লাহ্র নিকট থেকে আগত।
৩৯৪৬। রাসুলের পূর্বে কোরেশদের মাঝে কোনও নবীর আগমন ঘটে নাই। সুতারাং তাদের মধ্যে থেকে একজনকে আল্লাহ্র বাণী প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হয়। সারা পৃথিবীর জন্য যে ঐশী বাণী হবে আল্লাহ্র রহমত স্বরূপ।
৩৯৪৭। দেখুন [ ৭ : ৩০ ] ও টিকা ১০১২ আরও দেখুন [ ১৭ : ১৬ ] এবং টিকা ২১৯৩। অবিশ্বাস আত্মার মাঝে ক্ষতের সৃষ্টি করে। যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে অবিশ্বাস করে থাকে অর্থাৎ যারা একগুঁয়ে ও অবাধ্যভাবে আল্লাহ্র পথ নির্দ্দেশ সাবধান বাণী উপেক্ষা করে , তাদের উপর থেকে ধীরে ধীরে আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া ফিরিয়ে নেয়া হয়। তারা মানসিক দিক থেকে বিকৃত চিন্তাধারাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মানসিক বিকৃতির ফলে , তাদের আত্মশুদ্ধির সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায় - শান্তি হয় বিদূরীত।
৩৯৪৮। পৃথিবীতে সকল কিছুই আল্লাহ্র আইনের অধীন। প্রকৃতির আইনের ন্যায়, নৈতিক আইন সমূহও আল্লাহ্র আইনের অধীন। মানুষের ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্কে এবং আল্লাহ্র আইনকে অস্বীকার করার পরিণামসমূহ রূপক অলংকারে মাধ্যমে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে।
১) আল্লাহ্র প্রেরিত নৈতিক আইন সমূহ অস্বীকার করার অর্থ, আত্মাকে অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত করার সামিল। আত্মাকে আল্লাহ্র নূর ও আল্লাহ্র সান্নিধ্য বঞ্চিত করা। মানুষ ধীরে ধীরে পাপের পঙ্কে নিমগ্ন হয় পাপের দাসত্ব গ্রহণের ফলে তার আত্মার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। উদাহরণ দিয়ে বক্তব্য সহজ করতে চেষ্টা করবো। যেমন : স্বার্থপরতা পাপ। যারা এ পাপে নিমগ্ন তারা নিজ স্বার্থের বাইরে কোনও সৌন্দর্য্য খুঁজে পায় না। পৃথিবীর বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে , সভ্যতার বিকাশের সাথে মানুষের যে ত্যাগ ও তিতিক্ষা জড়িত ,আত্ম সুখের পরিবর্তে আত্মত্যাগে যে সৌন্দর্য্য ও মহত্ব তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের সকল চিন্তা ভাবনা আত্মসুখের মাঝেই আবর্তিত হতে থাকে। প্রতিটি কর্মেরই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে। ফলাফল বিহীন কোনও কার্য-ই হতে পারে না। প্রতিটি খারাপ কাজেরই প্রতিক্রিয়া বর্তমান - যার প্রভাব পাপীর সমস্ত সত্বাকে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং আল্লাহ্র নূর আত্মার মাঝে প্রবেশে বাঁধা দান করে থাকে। একেই রূপক অলংকারের মাধ্যমে বলা হয়েছে , " গলদেশ ঘিরে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি। " এই বেরী হচ্ছে পাপের বেড়ী, এটা যদি এতটা প্রশস্ত হয় যে তা চিবুক পর্যন্ত প্রসারিত থাকে এবং শক্তভাবে বেষ্টন করে থাকে, তবে ব্যক্তির নড়াচড়ার স্বাধীনতা ব্যহত হয়। সেরূপ পাপী লোকের চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। তার চিন্তা তার পাপ কার্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। ফলে আত্মার স্বাধীনতা হারায়।
২) প্রশস্ত ও শক্ত বেড়ি যদি গলদেশকে বেষ্টন করে থাকে , তবে মাথা নড়াচড়ার ক্ষমতা থাকে না - ফলে তারা উর্দ্ধমুখী হয়ে থাকে। এই রূপক বর্ণনার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, উর্দ্ধমুখী থাকার ফলে এসব ব্যক্তি চারিপার্শ্বের অবস্থা বুঝতে অক্ষম হবে , অর্থাৎ এ সব ব্যক্তির স্বচ্ছ চিন্তা ধারা থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের মন মানসিকতা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে - চোখ থাকতেও প্রকৃত জিনিষ দেখতে পাবে না, কান থাকতেও সত্যের বাণী বুঝতে পারবে না। বুদ্ধি থাকতেও বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগ করতে পারবে না। নৈতিক বিকৃতি তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধিকে বিনষ্ট করে দেবে। বুদ্ধি থাকা সত্বেও কোন সৃজনশীল কর্ম করতে তারা অক্ষম হবে। সংস্কৃতে একটি প্রবাদ আছে , "যখন ধ্বংস দ্বারপ্রান্তে আঘাত হানে, স্বাভাবিক অনুধাবন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। " ল্যাটিন প্রবাদ বলে, " ঈশ্বর যাকে ধ্বংস করতে চান, তিনি তাদের উম্মত্ত করে দেন।" সংক্ষেপে বলা যায় ,পাপ ও অন্যায় যে শুধুমাত্র বোকামী তাই-ই নয়, তা মানুষের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটায়। মানুষের যত বুদ্ধিভ্রংশ ঘটে, তারা আরও পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়। এ এক অধার্মিকতাপূর্ণ , অসৎ আবর্তচক্র [Vicious circle] যত তারা অন্যায় ও অধার্মিকতায় আসক্ত হয় , তত তাদের দুরদৃষ্টি , অন্তর্দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে ; জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাব ঘটে শেষ পর্যন্ত জীবনের সৌন্দর্য্য সংস্কৃতি সুরুচি সব কিছু নষ্ট হয়ে যায়।
৩) এ সব-ই হচ্ছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থার ফল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থায় আত্মিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় এবং এমন এক অবস্থায় পতিত হয় যে, আত্মার সমৃদ্ধি লাভের শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। সম্মুখেও অগ্রসর হতে পারে না পূর্বাস্থাতেও ফিরতে পারে না। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৩ : ১৮০ ] ; [ ১৭ : ১৩ ] এবং [ ৪০ : ৭১ ]। [ ৭৬ : ৪ ও ৫৮৩]
৩৯৪৯। কেউ যদি প্রাচীর দ্বারা চতুর্দিক ঘেরা স্থানে অবস্থান করে , তবে সে সামনেও দেখতে পায় না পিছনেও দেখতে পায় না। আত্মা পাপে নিমগ্ন হওয়ার ফলে যখন আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত হয় তাদের অবস্থাকে উপরের রূপকের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সব লোকের আত্মিক অবস্থা কারাগারের রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এদের আত্মিক অগ্রগতি সামনেও যেতে পারে না অথবা পিছনে বা পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। এদের আত্মিক বিকাশ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ্র নূর এ সব আত্মায় প্রবেশ লাভ বন্ধ হয়ে পড়ে। এদের আত্মিক মুক্তির আর কোনও আশা নাই। আত্মিক বিকাশের শেষ রশ্মিটিও এদের নিকট অস্তমিত।
সূরা ইয়াসিন
Page 1 of 8
সূরা ইয়াসিন বা শব্দ সংক্ষেপ - ৩৬
৮৩ আয়াত , ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : ভূমিকার জন্য দেখুন সূরা নং ৩৪। এই সূরাটি পূণ্যাত্মা রাসুল [ সা ] ও তিনি যে প্রত্যাদেশ লাভ করেন তার প্রতি নিবেদিত। ইয়া-সীন এই সংক্ষিপ্ত অক্ষরদ্বয়কে রাসুলের [ সা] উপাধিরূপে ব্যাখ্যা করা হয়। এই সূরাটি কোরাণের হৃৎপিন্ড স্বরূপ - বর্ণনা করা হয় - কারণ ইসলামের শিক্ষকের মূল ব্যক্তিত্ব এবং মূল মতবাদ এবং পরকাল সম্বন্ধে এই সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু এই সূরায় পরকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে , এই সূরাটি মৃত্যুপথযাত্রীর শয্যাপার্শ্বে পাঠ করা হয়।
সূরাটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় কাল সম্বন্ধে বলা হয় যে, সূরাটি মক্কার সময় কালের মধ্যবর্তী বা প্রথমে অবতীর্ণ হয়।
সার সংক্ষেপ : কোরাণ শরীফ জ্ঞানের ভান্ডার। তারাই হতভাগ্য যারা এর থেকে লাভ বা উন্নতি করতে পারে না। একজন ব্যতীত নগরীর সকলের সত্যকে পরিত্যাগের উপমা দ্বারা আল্লাহ্র নবীকে বোঝানো হয়েছে , যিনি আল্লাহ্র মহিমা ও করুণার স্বাক্ষর। [ ৩৬ : ১ - ৩২ ]।
প্রকৃতিতে এবং প্রত্যাদেশে আল্লাহ্র নিদর্শন বর্তমান। [ ৩৬ : ৩৩ - ৫০ ]।
পুণরুত্থান এবং পরকাল [ ৩৬ : ৫১ - ৮৩ ]।
সূরা ইয়াসিন বা শব্দ সংক্ষেপ - ৩৬
৮৩ আয়াত , ৫ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। ইয়া - সীন ৩৯৪৩
৩৯৪৩। 'ইয়া-সীন ' বর্ণমালাদ্বয় প্রতীক অর্থে ব্যবহৃত। অনেক তফসীরকার 'ইয়া ' বর্ণমালাটিকে সম্বোধন সূচক কারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং 'সীন' বর্ণটি দ্বারা মানুষ অর্থে ব্যবহার করেছেন। সে ক্ষেত্রে 'ইয়া-সীন' বর্ণমালাদ্বয়ের অর্থ দাড়াবে হে মানুষ ! এখানে মানুষ অর্থ মানব সম্প্রদায়ের নেতাকে বোঝানো হয়েছে। যিনি পৃথিবীর সকল আদম সন্তানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মহৎ ব্যক্তিত্বরূপে পরিচিত। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্র রাসুল হযরত মুহম্মদ [ সা ]। কারণ এই সূরাটি প্রধানতঃ রাসুল [ সা ] ও তাঁর প্রচারিত শিক্ষা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, এই প্রতীক অক্ষরমালার সম্বন্ধে দৃঢ়ভাবে কোনও মতবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ আল্লাহ্-ই জানেন এর প্রকৃত অর্থ। সাধারণতঃ 'ইয়াসীন ' অক্ষরমালাকে রাসুলের উপাধিরূপে ব্যবহার করা হয়।
০২। কুর-আনের শপথ ৩৯৪৪ , যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ।
৩৯৪৪। রাসুলের পরিচয় পত্র সম্বন্ধে এখানে দুটি যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে :
১) তিনি যে ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ [ কোরাণ ] প্রাপ্ত হন এবং
২) তিনি যে আত্মত্যাগ ও বীরত্ব পরিপূর্ণ জীবন যাপন [ সরল পথ ] করেন।
রাসুলের জীবনের এই দুটো প্রামাণিক সাক্ষ্যের প্রতি আবেদন করা হয়েছে এই সূরাতে।
০৩। অবশ্যই তুমি রাসুলদের মধ্যে একজন
০৪। সরল পথে রয়েছ।
০৫। মহাশক্তিমান দয়াময় [আল্লাহ্ ] এই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছেন , - ৩৯৪৫
০৪। সরল পথে রয়েছ।
০৫। মহাশক্তিমান দয়াময় [আল্লাহ্ ] এই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছেন , - ৩৯৪৫
৩৯৪৫। কোরাণের দুটি বৈশিষ্ট্য এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ; যার মাধ্যমে আল্লাহ্র ধারণা হৃদয়ে ধারণ করা অনেক সহজ হবে। আধ্যাত্মিক জগতকে উজ্জীবিত করার বিশেষ শক্তি ও ক্ষমতা কোরাণের আছে। কারণ কোরাণ হচেছ আল্লাহ্র বাণী। আল্লাহ্ শক্তিতে পরাক্রমশালী এবং তাঁর ইচ্ছাকে কার্যকর করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত কোরাণ মানুষের জন্য রহমত স্বরূপ ; কারণ আল্লাহ্ তো সর্বাপেক্ষা করুণাময় ও দয়ালু। এ সব বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে যে, কোরাণ আল্লাহ্র নিকট থেকে আগত।
০৬। যেনো, তুমি সর্তক করতে পার এমন এক সম্প্রদায়কে যাদের পূর্বপুরুষেরা কোন সর্তকবাণী প্রাপ্ত হয় নাই ৩৯৪৬। সুতারাং [তারা আল্লাহ্র নিদর্শন সম্বন্ধে ] মনোযোগ দেয় না।
৩৯৪৬। রাসুলের পূর্বে কোরেশদের মাঝে কোনও নবীর আগমন ঘটে নাই। সুতারাং তাদের মধ্যে থেকে একজনকে আল্লাহ্র বাণী প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হয়। সারা পৃথিবীর জন্য যে ঐশী বাণী হবে আল্লাহ্র রহমত স্বরূপ।
০৭। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে আল্লাহ্র [ শাস্তির ] বাণী অবধারিত হয়ে গেছে। সুতারাং তারা ঈমান আনবে না ৩৯৪৭।
৩৯৪৭। দেখুন [ ৭ : ৩০ ] ও টিকা ১০১২ আরও দেখুন [ ১৭ : ১৬ ] এবং টিকা ২১৯৩। অবিশ্বাস আত্মার মাঝে ক্ষতের সৃষ্টি করে। যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে অবিশ্বাস করে থাকে অর্থাৎ যারা একগুঁয়ে ও অবাধ্যভাবে আল্লাহ্র পথ নির্দ্দেশ সাবধান বাণী উপেক্ষা করে , তাদের উপর থেকে ধীরে ধীরে আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া ফিরিয়ে নেয়া হয়। তারা মানসিক দিক থেকে বিকৃত চিন্তাধারাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের মানসিক বিকৃতির ফলে , তাদের আত্মশুদ্ধির সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায় - শান্তি হয় বিদূরীত।
০৮। আমি তাদের গলদেশ ঘিরে বেড়ী পরিয়েছি , যা তাদের চিবুক পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে। ফলে , তাদের মাথাকে উর্দ্ধমুখী করতে বাধ্য করা হয়েছে [ যেনো তারা দেখতে না পায় ] ৩৯৪৮।
৩৯৪৮। পৃথিবীতে সকল কিছুই আল্লাহ্র আইনের অধীন। প্রকৃতির আইনের ন্যায়, নৈতিক আইন সমূহও আল্লাহ্র আইনের অধীন। মানুষের ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্কে এবং আল্লাহ্র আইনকে অস্বীকার করার পরিণামসমূহ রূপক অলংকারে মাধ্যমে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে।
১) আল্লাহ্র প্রেরিত নৈতিক আইন সমূহ অস্বীকার করার অর্থ, আত্মাকে অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত করার সামিল। আত্মাকে আল্লাহ্র নূর ও আল্লাহ্র সান্নিধ্য বঞ্চিত করা। মানুষ ধীরে ধীরে পাপের পঙ্কে নিমগ্ন হয় পাপের দাসত্ব গ্রহণের ফলে তার আত্মার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। উদাহরণ দিয়ে বক্তব্য সহজ করতে চেষ্টা করবো। যেমন : স্বার্থপরতা পাপ। যারা এ পাপে নিমগ্ন তারা নিজ স্বার্থের বাইরে কোনও সৌন্দর্য্য খুঁজে পায় না। পৃথিবীর বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে , সভ্যতার বিকাশের সাথে মানুষের যে ত্যাগ ও তিতিক্ষা জড়িত ,আত্ম সুখের পরিবর্তে আত্মত্যাগে যে সৌন্দর্য্য ও মহত্ব তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের সকল চিন্তা ভাবনা আত্মসুখের মাঝেই আবর্তিত হতে থাকে। প্রতিটি কর্মেরই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে। ফলাফল বিহীন কোনও কার্য-ই হতে পারে না। প্রতিটি খারাপ কাজেরই প্রতিক্রিয়া বর্তমান - যার প্রভাব পাপীর সমস্ত সত্বাকে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং আল্লাহ্র নূর আত্মার মাঝে প্রবেশে বাঁধা দান করে থাকে। একেই রূপক অলংকারের মাধ্যমে বলা হয়েছে , " গলদেশ ঘিরে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি। " এই বেরী হচ্ছে পাপের বেড়ী, এটা যদি এতটা প্রশস্ত হয় যে তা চিবুক পর্যন্ত প্রসারিত থাকে এবং শক্তভাবে বেষ্টন করে থাকে, তবে ব্যক্তির নড়াচড়ার স্বাধীনতা ব্যহত হয়। সেরূপ পাপী লোকের চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। তার চিন্তা তার পাপ কার্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। ফলে আত্মার স্বাধীনতা হারায়।
২) প্রশস্ত ও শক্ত বেড়ি যদি গলদেশকে বেষ্টন করে থাকে , তবে মাথা নড়াচড়ার ক্ষমতা থাকে না - ফলে তারা উর্দ্ধমুখী হয়ে থাকে। এই রূপক বর্ণনার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, উর্দ্ধমুখী থাকার ফলে এসব ব্যক্তি চারিপার্শ্বের অবস্থা বুঝতে অক্ষম হবে , অর্থাৎ এ সব ব্যক্তির স্বচ্ছ চিন্তা ধারা থেকে বঞ্চিত হবে। তাদের মন মানসিকতা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে - চোখ থাকতেও প্রকৃত জিনিষ দেখতে পাবে না, কান থাকতেও সত্যের বাণী বুঝতে পারবে না। বুদ্ধি থাকতেও বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগ করতে পারবে না। নৈতিক বিকৃতি তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধিকে বিনষ্ট করে দেবে। বুদ্ধি থাকা সত্বেও কোন সৃজনশীল কর্ম করতে তারা অক্ষম হবে। সংস্কৃতে একটি প্রবাদ আছে , "যখন ধ্বংস দ্বারপ্রান্তে আঘাত হানে, স্বাভাবিক অনুধাবন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। " ল্যাটিন প্রবাদ বলে, " ঈশ্বর যাকে ধ্বংস করতে চান, তিনি তাদের উম্মত্ত করে দেন।" সংক্ষেপে বলা যায় ,পাপ ও অন্যায় যে শুধুমাত্র বোকামী তাই-ই নয়, তা মানুষের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটায়। মানুষের যত বুদ্ধিভ্রংশ ঘটে, তারা আরও পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়। এ এক অধার্মিকতাপূর্ণ , অসৎ আবর্তচক্র [Vicious circle] যত তারা অন্যায় ও অধার্মিকতায় আসক্ত হয় , তত তাদের দুরদৃষ্টি , অন্তর্দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে ; জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাব ঘটে শেষ পর্যন্ত জীবনের সৌন্দর্য্য সংস্কৃতি সুরুচি সব কিছু নষ্ট হয়ে যায়।
৩) এ সব-ই হচ্ছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থার ফল। আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত অবস্থায় আত্মিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় এবং এমন এক অবস্থায় পতিত হয় যে, আত্মার সমৃদ্ধি লাভের শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। সম্মুখেও অগ্রসর হতে পারে না পূর্বাস্থাতেও ফিরতে পারে না। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ৩ : ১৮০ ] ; [ ১৭ : ১৩ ] এবং [ ৪০ : ৭১ ]। [ ৭৬ : ৪ ও ৫৮৩]
০৯। এবং ওদের সম্মুখে প্রাচীর ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি ৩৯৪৯ ; উপরন্তু তাদের আবৃত করেছি। সুতারাং তারা [সত্যের আলো ] দেখতে পায় না।
৩৯৪৯। কেউ যদি প্রাচীর দ্বারা চতুর্দিক ঘেরা স্থানে অবস্থান করে , তবে সে সামনেও দেখতে পায় না পিছনেও দেখতে পায় না। আত্মা পাপে নিমগ্ন হওয়ার ফলে যখন আল্লাহ্র অনুগ্রহ বঞ্চিত হয় তাদের অবস্থাকে উপরের রূপকের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সব লোকের আত্মিক অবস্থা কারাগারের রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এদের আত্মিক অগ্রগতি সামনেও যেতে পারে না অথবা পিছনে বা পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। এদের আত্মিক বিকাশ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ্র নূর এ সব আত্মায় প্রবেশ লাভ বন্ধ হয়ে পড়ে। এদের আত্মিক মুক্তির আর কোনও আশা নাই। আত্মিক বিকাশের শেষ রশ্মিটিও এদের নিকট অস্তমিত।
