Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৯৫ বার
+ - R Print

সূরা ফাতির

সূরা ফাতির - ৩৫

৪৫ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরাতে সৃষ্টির রহস্য ও সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণের সাথে যে সব শক্তি জড়িত তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। এ সব শক্তিকে 'ফেরেশতা' প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যদি আমরা আমাদের দৃষ্টিকে বিশ্বপ্রকৃতি বা মানুষের মাঝে আকৃষ্ট করি তবে দেখা যাবে সর্ব কিছুই আল্লাহ্‌র মাহত্ম্য ঘোষণা করছে এবং আল্লাহ্‌র করুণা ও দয়া তাঁর অনুরক্তদের শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করছে।

সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ হয়।

সার সংক্ষেপ : যে সব শক্তি সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত তা সবই আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। আল্লাহ্‌-ই একমাত্র প্রশংসার যোগ্য আর সব কিছুই মূল্যহীন। [ ৩৫ : ১ - ২৬ ]।

সকল কল্যাণ আল্লাহ্‌র নিকট থেকে আগত। তাহলে কে শয়তানের অনুসরণ করে নিজেকে ধবংস করবে ? [৩৫ : ২৭ - ২৬ ]।



সূরা ফাতির - ৩৫

৪৫ আয়াত, ৫ রুকু , মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র ৩৮৬৯। যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন [ শূন্য থেকে ] ৩৮৭০। তিনি বাণীবাহক ফেরেশতাদের তৈরী করেছেন , যারা দুই অথবা তিন অথবা চার [ জোড়া ] পক্ষ বিশিষ্ট ৩৮৭১। সৃষ্টিতে তিনি যা খুশী সংযুক্ত করেন ৩৮৭২। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাবান।

৩৮৬৯। দেখুন টিকা ৩৭৮৫ এবং আয়াত [ ৩৪ : ১ ]। যখন আমরা আল্লাহ্‌র প্রশংসা করি; তখন আমাদের অন্তরে আল্লাহ্‌র মহিমা, গৌরব এবং ক্ষমতা সম্বন্ধে উপলব্ধি ঘটে। আমরা অনুভবে সক্ষম হই যে, কিভাবে তাঁর ক্ষমতা সৃষ্টির কল্যাণের জন্য নিবেদিত। এই-ই হচ্ছে সূরার বিষয় বস্তু।

৩৮৭০। এই আয়াতটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে "আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা " এবং ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে , "Originator of the heaven and the earth ." "Fatara"এই আরবী শব্দটির অর্থ বিশ্বের আদিযুগীয় সৃষ্টি অবস্থা ; যে সৃষ্টির সাথে ক্রমান্বয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে নূতন জিনিষ সৃষ্টি হচ্ছে। আল্লাহ্‌ বিশ্বের সৃষ্টিকে প্রথম থেকে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন , পরিবর্ধন ও নূতন নূতন ভাবে সজ্জিত করে চলেছেন সেই আদি যুগ থেকে ; " সৃষ্টিতে তিনি যা খুশি সংযুক্ত করেন।" এই সংযুক্তি শুধুমাত্র আয়তন বা সংখ্যা তত্বের ভিত্তিতে চিন্তা করলে ভুল করা হবে, এই সংযুক্তি গুণগত মান ,কার্যে , সম্পর্কে এবং বিভিন্ন পরিবর্তনে ঘটে থাকে। সৃষ্টি তত্ব সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞান যত প্রসারিত হচ্ছে , তত মানুষ অনুধাবন করছে বিবর্তনের ধারায় সৃষ্টি প্রক্রিয়া কত জটিল। সৃষ্টি প্রক্রিয়া সর্ম্পকে মানুষ যত জ্ঞানই আহরণ করুক না কেন জীবনের উন্মেষ এবং এর রহস্য আজও তার অজানা রয়ে গেছে। জীবনের উন্মেষ এবং আধ্যাত্মিক জগত মানুষের সকল জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উর্দ্ধে রয়ে গেছে আজও। বিজ্ঞানের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার ফলে মানুষ শুধু মাত্র কার্য ও কারণের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সম্পর্ক আবিষ্কারে আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এর বাইরে যে অনুভূতির জগত তা অনুভবে সে হয় ব্যর্থ। সে ভুলে যায় ও উপলব্ধি করতে অক্ষম হয় যে, সকল কিছু সৃষ্টির মূলে রয়েছে আল্লাহ্‌র সৃষ্টি কৌশল ; যে কৌশল অত্যন্ত জটিল এবং সুক্ষ কৌশলে পূর্ণ। বিজ্ঞানের জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে অনুধাবনের চেষ্টাই হচ্ছে প্রকৃত এবাদত।

৩৮৭১। ফেরেশতারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছাকে বা প্রেরিত বার্তা বহন করার দূত বিশেষ, যাদের উপরে এই বিশেষ দায়িত্ব অর্পন করা হয়। আল্লাহ্‌র কার্যকরী আদেশ সম্পাদন করার বর্ণনা আছে [ ৭৯ : ১-৫ ] আয়াতে এবং প্রত্যাদেশ বহন করার বর্ণনা আছে [২৬ : ১৯৩ ] আয়াতে।

৩৮৭২। দেখুন টিকা ৩৮৭০; যেখানে বিবর্তনের ধারায় সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় জটিলতার ধারা বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌র সৃষ্টি প্রক্রিয়া কোন নির্দ্দিষ্ট সময়ে এসে থেমে যায় নাই। এর ধারাবাহিকতা সেই প্রাচীন যুগ থেকে চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। কারণ "তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।" তার করুণা ও দয়া সর্ব সৃষ্টির উপরে অবিরল ধারাতে বর্ষিত হয়।

০২। আল্লাহ্‌ মানব সম্প্রদায়কে কোন অনুগ্রহ দান করলে কেহ তা বন্ধ করতে পারে না। আবার যা তিনি বন্ধ করতে চান তিনি ব্যতীত কেহ তা প্রদান করতে পারে না ৩৮৭৩। ক্ষমতায় তিনি পরাক্রমশালী , প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ।

৩৮৭৩। আল্লাহ্‌ সকল জীবের সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা। তাঁর করুণা ও দয়া সকল সৃষ্টিকে আপ্লুত করে থাকে। পৃথিবীতে এমন কেউ বা এমন কিছু নাই যা তার করুণা ধারাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে , বা বান্দার জন্য তাঁর অনুগ্রহে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই। যদি তিনি কাউকে তাঁর অনুগ্রহ বঞ্চিত করতে চান তবে, পৃথিবীর কোনও শক্তির ক্ষমতা নাই তা পুণরুজ্জীবিত করা। আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তিনি বিধিবহির্ভূত কোনও ইচ্ছা করেন না। তিনি কল্যাণ এবং প্রজ্ঞার অধিকারী। তার অনুগ্রহ বিতরণ ও বঞ্চিত সবই তার সৃষ্টির কল্যাণের জন্য নিবেদিত।

০৩। হে মানব সম্প্রদায় ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ স্মরণ কর। আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কোন সৃষ্টিকর্তা আছে কি যে তোমাকে আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করতে পারবে ? ৩৮৭৪ তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তাহলে কি ভাবে তোমরা সত্য থেকে ফিরে যাচ্ছ ?

৩৮৭৪। বিশ্ব ভূবন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌র এবাদত। মানুষের কাছে আবেদন করা হয়েছে মিথ্যা উপাস্যের প্রতি ধাবিত না হয়ে , আল্লাহ্‌র দিকে ধাবিত হতে। জীবনের সকল কর্ম-কান্ড , এক কথায় প্রতিটি জীবন আল্লাহ্‌কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সব কিছুই শেষ পর্যন্ত তাঁর নিকট প্রত্যার্পন করবে। আল্লাহ্‌র দূরদর্শিতা ও সদয় তত্ত্বাবধানে পৃথিবীর সকল জীবন ও মনুষ্যকূল প্রতিপালিত হয়। তিনি সকল কিছুকে জীবনোপকরণ দান করেন। কোরাণের ভাষাতে জীবনোপকরণ বলতে জীবনের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক এবং জীবনের পূণার্ঙ্গ বিকাশের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সবই জীবনোপকরণ যেমন : আহার , সাজ-সরঞ্জাম, সুখ-শান্তি, স্বাস্থ্য,ধন-সম্পদ,মান-সম্মান ইত্যাদি। সুতারাং যে জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত আল্লাহ্‌র করুণার উপরে নির্ভরশীল তাঁর প্রত্যাদেশকে ইচ্ছাকৃত ভাবে অগ্রাহ্য করা কি চরম মূর্খতার কাজ নয় ?

০৪। এবং যদি তারা তোমাকে প্রত্যাখান করে , যে ভাবে তোমার পূর্বে অন্য রাসুলরাও প্রত্যাখাত হয়েছিলো ৩৮৭৫। [ মনে রেখো ] সকল বিষয় সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহ্‌র নিকট প্রত্যানীত হবে।

৩৮৭৫। মানুষের সহজাত প্রবণতাকে উদাহরণের মাধ্যমে এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের মানসিক বিকৃতি হচ্ছে সাধারণতঃ সে সত্যকে প্রত্যাখান করে মিথ্যাকে গ্রহণ করতে ভালোবাসে। আল্লাহ্‌র নবীদের বেলাতেও তার ব্যত্যয় ঘটে নাই। কিন্তু তাঁরা এই প্রতিবন্ধকতা সত্বেও নিরুৎসাহিত হন নাই। মানুষের জন্য এই উপদেশ যে, তারা সর্ব অবস্থায় নিরুৎসাহিত না হয়ে আল্লাহ্‌র উপরে নির্ভর করবে। সব কিছু আল্লাহ্‌র নিকট প্রত্যার্পন করবে।

০৫। হে মানব সম্প্রদায় ! আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য ৩৮৭৬। সুতারাং পার্থিব জীবন যেনো তোমাদের প্রতারিত না করে ৩৮৭৭। প্রধান প্রবঞ্চক যেনো তোমাদের আল্লাহ্‌র সম্পর্কে প্রবঞ্চনা করতে না পারে।

৩৮৭৬। আয়াত ৩ নং এ মানুষের প্রতি আবেদন করা হয়েছে অতীত ও বর্তমানকে স্মরণ করে। এই আয়াতে আবেদন করা হয়েছে ভবিষ্যতের প্রতি। আল্লাহ্‌ আমাদের বেহেশতের শান্তির অঙ্গীকার করেছেন আবার ন্যায়বিচারের শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার পূর্ণ হবেই। আমরা কোন শ্রেণীতে নিজেদের অর্ন্তভূক্ত করবো ?

৩৮৭৭। দেখুন [ ৩১ : ৩৩ ] আয়াত এবং টিকা ৩৬২৪। পাপ মানুষের চোখে মায়া অঞ্জন পরিয়ে দেয়। মানুষ পাপের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দুভাবে প্রতারিত হয়।

১) মানুষ পৃথিবীর জীবনে এতটাই বিমোহিত হয়ে পড়ে যে, সে পরকালকে ভুলে যায়। ভুলে যায় এ জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং এ জীবন পরলোকের জীবনের শিক্ষানবীশকাল মাত্র।

২) শয়তান মানুষের প্রধান শত্রু। মানুষের কামনা , বাসনা, রীপু প্রভৃতির মাধ্যমে শয়তান মানুষের সত্ত্বার সাথে মিশে থাকে এবং মানুষের চোখে এমনই মায়া অঞ্জন পরিয়ে দেয় যে, মানুষ অন্ধ হয়ে পাপ ও পূণ্যের মধ্যে পার্থক্য ভুলে যায়। সে বলে , "Evil ! be thou my good." জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই শয়তানের ফাঁদ পাতা আছে। শয়তান যেনো মন্দ কর্মকে শোভনীয় করে আমাদের তাতে লিপ্ত না করে। আমরা কি সে সম্বন্ধে সচেতন ?

০৬। নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু ; সুতারাং তাকে শত্রু হিসেবেই গণ্য করো ৩৮৭৮। সে কেবলমাত্র তার অনুগতদের আহ্বান করে, যেনো তারা জ্বলন্ত আগুনের সঙ্গী হতে পারে।

৩৮৭৮। পাপ ও মন্দ কাজ হচ্ছে শয়তানের প্রতিনিধি বা প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা যায়। শয়তান আমাদের শত্রু। সৃষ্টির আদিতে স্রষ্টা আমাদের আত্মাকে পূত পবিত্ররূপে সৃষ্টি করেন। আমাদের পাপ কাজ আত্মার এই পবিত্রতা নষ্ট করে কলুষতায় ঢেকে দেয়। শয়তান বন্ধুর ছদ্মবেশে বা অথবা আমাদের ইচ্ছার নিবৃত্ত করার সুযোগে আমাদের প্রতারণা করে থাকে। শয়তান তার নরক যন্ত্রণার অংশীদার সৃষ্টির প্রয়াসে প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতারণা করে চলেছে। আমরা কি শয়তানের ফাঁদের ব্যাপারে সর্তক হতে পারি না ?

০৭। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি ৩৮৭৯। কিন্তু যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহাপুরষ্কার।

৩৮৭৯। নশ্বর মাটির দেহের অভ্যন্তরে অবিনশ্বর আত্মার অবস্থান , যা পরমাত্মার অংশ। সকল কল্যাণ ও সত্য সুন্দরের প্রতীক এক আল্লাহ্‌। সৃষ্টির আদিতে আমাদের আত্মাকেও তারই প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি কর হয়েছে , যা সর্বদা আল্লাহ্‌র ধ্যানে নিমগ্ন থাকতে চায়। আল্লাহকে অস্বীকার করার অর্থ আত্মার এই মূল ধর্ম থেকে বিচ্যুত করা। আর স্বধর্মচ্যুত ও বিভ্রান্ত আত্মা যন্ত্রণা ভোগ করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। "যারা আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।" অপরপক্ষে মানুষকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে সে যদি সেই মহৎ উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বিত ভাবে নিজেকে বিলিন করে দেয় তবে তাদের জন্য আছে উচ্চ মর্যদা "তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরষ্কার। "