+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ থেকে সূরা নং ৩৯ পর্যন্ত সূরাগুলিকে নূতন শ্রেণীতে বিন্যাস করা হয়েছে , যার বক্তব্য হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি। এই শ্রেণীর সূরাগুলি শুরু হয়েছে আল্লাহ্র প্রশংসা দিয়ে। প্রথম সূরাটি শুরু হয়েছে আল্লাহ্র করুণা এবং ক্ষমতা এবং সত্যের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে। এর পরে সূরা নং ৩৫ এ বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে ফেরেশতারা আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতা প্রদর্শন করে থাকে এবং ভালো,মন্দ এবং সত্য -মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করে। ৩৬ নং সূরাটি, পূণ্যাত্মা রাসুলের প্রতি এবং তাঁর মাধ্যমে যে গ্রন্থ কোরাণ অবতীর্ণ হয়েছে ; তারই প্রতি নিবেদিত। সূরা নং ৩৭ এ আছে শয়তানের ফাঁদের বর্ণনা; সূরা নং ৩৮ এ দাউদ নবী ও সুলাইমানের উদাহারণের মাধ্যমে বলা হয়েছে মন্দকে কি ভাবে জ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বারা পরাজিত করা যায় ; এবং ইয়াকুবের উদাহরণের মাধ্যমে বলা হয়েছে ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার সাহায্যে মন্দকে দমন করা সম্ভব। সূরা ৩৯ এ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে শেষ বিচারের দিনের উপরে যখন বিশ্বাসীদের অবিশ্বাসী থেকে পৃথক করা হবে এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে।
এই সূরা অবতীর্ণ হওয়ার সঠিক সময়কাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর অবতীর্ণ কাল হচ্ছে মক্কী সুরাগুলির প্রথম দিকে।
সার সংক্ষেপঃ সত্য এবং কোন ভালো কাজ হারিয়ে যায় না , মানুষের ক্ষমতা ও সম্পদ ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আল্লাহ্র ক্ষমতা, ন্যায় এবং সত্য চিরস্থায়ী যা শেষ বিচারের দিনে মানুষের ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বকে গুরুত্ব প্রদান করে থাকে [ ৩৪ : ১ - ৩০ ]।
বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীরা শেষ পর্যন্ত তাদের কর্মফলের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে এবং নিজেদের সঠিক অবস্থানকে বুঝতে পারবে। [ ৩৪ : ৩১ - ৫৪ ]।
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৩৭৮৫। আকাশ, পৃথিবী, বিশ্বব্রহ্মান্ড আল্লাহ্র প্রশংসায় মশ্গুল। অর্থাৎ আল্লাহ্র সৃষ্টি আল্লাহ্র করুণা ,দয়া , মহত্ব, ক্ষমতা , জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য আল্লাহ্র নামে আরোপিত [ ৭ : ১৮০ এবং ১৭ : ১১০ এবং টিকা সমূহ ]। আল্লাহ্র সম্বন্ধে ধ্যান করার অর্থ হচ্ছে, তাঁর আরোপিত বিভিন্ন গুণবাচক নাম যা শুধুমাত্র আল্লাহ্র জন্য-ই আরোপ করা হয়েছে , তা আত্মার মাঝে উপলব্ধির চেষ্টা করা। এই চেষ্টা মানুষের আত্মার মাঝে মনঃজগতকে সত্যের আলোতে প্রত্যাদেশের ন্যায় উদ্ভাসিত করবে। আল্লাহ্কে মনের মাঝে, আত্মার মাঝে ধারণ করার চেষ্টা কে পাঁচটি সূরাতে সমানভাবে বন্টন করে দেয়া হয়েছে। সূরাগুলিতে প্রথমেই আল্লাহ্র প্রশংসা আত্মাকে মহিমান্বিত করার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এই সূরাগুলি হচ্ছে ১নং , ৬নং, ১৮নং, ৩৪নং এবং ৩৫নং সূরা। ৩৪ নং সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞান, ও করুণার স্বাক্ষর যা সর্ব সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান , তা অনুধাবন করার উপরে। তিনি আকাশমন্ডলী অর্থাৎ আমাদের চেনা জানা আকাশের সীমানার বাইরে অনন্ত মহাশূন্যের এবং সীমাহীন সময়ের , এবং আমাদের চেনা জানা পৃথিবীর সকল কিছুর-ই স্রষ্টা ও মালিক। এগুলির অনুভবের মাধ্যমে আল্লাহ্কে আত্মার মাঝে অনুভব ও উপলব্ধি করতে হবে।
৩৭৮৬। বিজ্ঞানে সুন্দর এক তত্ব রয়েছে , যা বিবৃত করে যে : বস্তুর ধ্বংস নাই ; তা শুধু এক রূপ থেকে অন্যরূপ ধারণ করে। শুধু অজ্ঞ লোকেরাই ধারণা করে যে, মাটি পানিকে শোষণ করে নিয়ে পানিকে অস্তিত্ব বিহীন করে ফেলে। অথবা বীজ মাটির নীচে হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে কিছুই হারায় না। যে পানি মাটিতে প্রবেশ করে হারিয়ে যায়, সেই পানি-ই পরবর্তীতে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-কূপ, প্রভৃতি পরিপূর্ণ করতে সাহায্য করে, পৃথিবীর উদ্ভিদ জগতকে বাঁচিয়ে রাখে, নূতন উদ্ভিদের জন্ম দেয় এবং কোটি কোটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে। সৃষ্টির আদি থেকে কোটি কোটি ধরণের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে বের হয়ে আসছে, এবং নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ; নূতন প্রাণের জন্ম হচ্ছে আবার তা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে - কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুন্যে কিছুই সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায় না। জীবন ও মৃত্যু, ধ্বংস ও সৃষ্টি পাশাপাশি কাজ করে যায়। চক্রাকারে তা আবর্তিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এ সবই হচ্ছে প্রতীক, যার মাধ্যমে পার্থিব জ্ঞানের পরিধি অপার্থিব জ্ঞানকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আমরা মানব সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুকে অহরহ প্রত্যক্ষ করে থাকি। এই মৃত্যু হচ্ছে মানবের দৈহিক বা পার্থিব বা জান্তব অংশের মৃত্যু। যখন মৃত ব্যক্তিকে মাটির নীচে কবর দেয়া হয়, অজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করতে পারে যে মৃতের সব শেষ হয়ে গেলো বা সে অস্তিত্ব বিহীন হয়ে গেলো। কিন্তু আল্লাহ্র নিকট কিছুই হারায় না।
৩৭৮৭। সুন্দর উপমার মাধ্যমে আল্লাহ্র করুণা ও দয়ার চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। পানি বাস্প হয়ে আকাশে উত্থিপ হয় এবং বৃষ্টিরূপ রহমত স্বরূপ মাটিতে ঝরে পড়ে মাটিকে সজীব করে থাকে। ঠিক সেরূপই হচ্ছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও করুণা। দুঃখে-বিপদে, বিপর্যয়ে ,মানুষ যখন আন্তরিক ভাবে প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ্র সাহায্য , পথনির্দ্দেশ প্রার্থনাকারীর সকল সত্তাকে বিধৌত করে দেয়। এ অভিজ্ঞতা প্রতিটি বিজ্ঞ জনেই জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের সময়ে লাভ করেছেন। সুতারাং এ কথা আমরা যেনো ভুলে না যাই যে, আল্লাহ্ পরম করুণাময় ও দয়ালু আবার তিনি ন্যায়বিচারক ও শাস্তি দানেও সক্ষম।
৩৭৮৮। উপরের আয়াত দুটি আমাদের এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডে কাফেরদের অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, আকাশ ও ভূমন্ডলে , আল্লাহ্র সকল সৃষ্টি পরস্পর সমন্বিত [Harmony] ভাবে সঙ্গতি রক্ষা করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে। প্রতিটি বস্তু বা প্রাণকে আল্লাহ্ এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। বস্তু বা প্রাণকে সেই বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত হওয়াই হচ্ছে তার চরম ও পরম পাওয়া , এবং তখনই প্রকৃতিতে সমন্বিত [Harmony] সঙ্গতি ও শান্তি রক্ষা পায়। যে বস্তু বা প্রাণ এই সঙ্গতি রক্ষা না করে, তার ধ্বংস অনিবার্য। কারণ প্রকৃতির সমন্বিত ক্ষমতার বাইরে কেউ যেতে অক্ষম। ঠিক সেই ভাবে আল্লাহ্ মানুষের আত্মাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করার জন্য ও আল্লাহ্র প্রশংসা করার জন্য। এটাই হচ্ছে আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম। আর এই প্রশংসা ও প্রার্থনা করতে হবে স্ব-ইচ্ছায়। কারণ একমাত্র মানুষকেই স্রষ্টা সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন - যা হচ্ছে মানুষের জন্য আল্লাহ্র আমানত। কাফের বা অবিশ্বাসীরা এই আমানতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে , তাদের অবিশ্বাসের দরুণ [ দেখুন ৩৩ : ৭২ আয়াত এবং টিকা সমূহ ]। অবশ্যই এর পরিণতিতে তাদের আত্মার ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ্ বলেছেন তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি দেখুন আয়াত নং ৫ ]। মানুষের কোনও শক্তিই প্রাকৃতিক আইনের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। জাগতিক , নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সকল কর্মকান্ডই প্রাকৃতিক আইনের অধীন। আল্লাহ্ যাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন সেটাই হচ্ছে তার জন্য সেই প্রাকৃতিক আইন। প্রতিটি কাজেরই শেষ পরিণাম আছে। নিউটনের সেই বিখ্যাত সুত্র : Every action there is an equal and opposite reaction. আধ্যাত্মিক জগতের ক্ষেত্রেও এই সুত্র প্রযোজ্য যদিও আধ্যাত্মিক জগত আমাদের চোখে বস্তু জগতের ন্যায় দৃশ্যমান নয়।
৩৭৮৯। আল্লাহ্র শপথের মাধ্যমে কিয়ামতের অবশ্যম্ভবীতা সম্বন্ধে আল্লাহ্র কর্তৃত্বকে প্রকাশ করা হয়েছে এই আয়াতে; যিনি শেষ বিচারের মালিক।
৩৭৯০। "এমন কোন কিছুই নাই যা সুস্পষ্ট কিতাবে লেখা নাই।" মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা জানি লিপিবদ্ধ বিবরণী, স্মরণ শক্তি থেকে অধিক নির্ভুল , বিশ্বাসযোগ্য এবং যদি তা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হয় তবে তা চিরস্থায়ী। যদি লিপিকা সঠিক ভাবে লেখা হয়; এতে যদি দুর্বোধ্য কিছু না থাকে, তবে সময়ের ব্যবধানেও তা সঠিকভাবে পাঠোদ্ধার হয় এবং বক্তব্য সঠিকভাবে অনুধাবণ করা সম্ভব হয়, যার সম্বন্ধে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। মানুষের দোষত্রুটি মুক্ত করে আল্লাহ্র আইন এভাবেই লিপিবদ্ধ আছে সুস্পষ্ট কিতাবে। আর সে লেখা হচ্ছে নির্ভুল , যা অনন্তকাল স্থায়ী - কখনও মুছে যাবে না। ছোট-বড় , সব কিছু সেখানে স্থান লাভ করেছে এবং ভালো কাজের শেষ পরিণতি পুরষ্কার এবং মন্দ কাজের শাস্তি।
৩৭৯১। 'রিজিক ' - শব্দটির অর্থ ব্যপক। সাধারণ ভাবে রিজিক অর্থ সেই সব খাদ্য যা শরীরের পুষ্টি সাধন করে, তাই আমরা বুঝে থাকি। তবে এর অর্থ সীমাবদ্ধ নয়। রিজিক অর্থ সেই সব জাগতিক বস্তু যা শরীরের পুষ্টি সাধন করে, আধ্যাত্মিক বস্তু যা আত্মার কল্যাণ সাধন করে।
৩৭৯২। দেখুন আয়াত [ ২২ : ৫১ ]। আল্লাহ্র পরিকল্পনা ব্যর্থ করার ক্ষমতা পৃথিবীতে কোনও মানুষের নাই। যারা তা করতে চেষ্টা করবে তাদের পৃথিবী থেকে ধ্বংস করে দেয়া হবে।
৩৭৯৩। অবিশ্বাসী কাফেররা অজ্ঞ, তাই তারা আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে। কিন্তু যারা জ্ঞানী তারা প্রকৃত পক্ষে জানে যে, আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ, আত্মাকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আলোকিত করার পন্থা। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ-ই হচ্ছে প্রকৃত পথ-প্রদর্শক, যে পথে আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করা যায়। একমাত্র আল্লাহ্-ই সকল প্রশংসার দাবীদার যিনি অসীম করুণাময় , পরাক্রমশালী। আল্লাহ্র শক্তির উদাহরণ দেয়া হয়েছে [ ৩৪ : ৩ ] আয়াতে , যেখানে বলা হয়েছে, " পৃথিবীতে কিছুই তার অগোচর নহে - অণু, পরিমাণ কিছু ..........।"
৩৭৯৪। এই আয়াতটিতে কাফেরদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যারা রাসুলকে [ সা ] উপহাস বিদ্রূপ করতো। তাদের ভাষ্য ছিলো নিম্নরূপ , " এটা কি ভাবে সম্ভব মৃত্যুর পরে দেহের ধ্বংসের পরে তা মাটিতে মিশে যাওয়ার পরেও মানুষকে পুণরুত্থিত করা হবে ; এবং নূতন সৃষ্টি করা হবে ? "এর সাথে তারা যোগ করে যে, এ সবই হচ্ছে বিকৃত মস্তিষ্ক উম্মাদের কল্পনা। এরূপ মন্তব্য আজও অবিশ্বাসী কাফেররা করে থাকে ধর্মের ব্যাপারে। কারণ অবিশ্বাস তাদের আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেয়; ফলে তারা হয় অন্তর্দৃষ্টিবিহীন। তারা আত্মার মাঝে স্রষ্টার উপস্থিতি ও পরলোকের অবস্থানকে অনুভবে অক্ষম।
৩৭৯৫। যদি আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, তবে পরলোকের অস্তিত্ব স্বীকার করতেই হবে। কারণ ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে আত্মা এবং আত্মিক উন্নতির মাধ্যমে পরলোকের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। মানুষের যদি আত্মা না থাকতো , তবে পশুপাখীর ন্যায় মৃত্যুর সাথে সাথেই তার অস্তিত্ব শেষ হযে যেতো। যেহেতু আত্মা অমর এবং নৈতিক জীবনের পবিত্রতা আত্মার উন্নতির মূলধন, সে কারণেই মানব সভ্যতার সূচনা এখানেই এবং পরলোকের জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও এসে যায়। পরলোকের জীবন সর্বাপেক্ষা বড় সত্য, যার থেকে বড় সত্য আর কিছু নাই। যিনি এই সত্য শিক্ষা দেন তিনি উম্মাদ হতে পারেন না। যারা তা বলে, তারা প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই তা বলে থাকে এবং নিজ আত্মাকে ভবিষ্যত বিপদের মাঝে নিক্ষেপ করে থাকে। যারা সত্যকে অস্বীকার করে থাকে তাদের পরিণতি হচ্ছে বিপর্যয়। তারা ক্রমাগত প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরে যাবে, প্রকৃত সত্যকে তারা আত্মার মাঝে অনুধাবনে অক্ষম হবে। কারণ সত্য ধারণের অক্ষমতার ফলে আত্মা স্বচ্ছতা হারায় এবং বিভ্রান্ত আত্মা পরলোকের জীবনের প্রকৃত চিত্র উপলব্ধিতে অক্ষম হবে এবং তাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটবে।
৩৭৯৬। আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস আত্মাকে আলোর জগতে স্থাপন করে থাকে , যার ফলে আত্মার মাঝে ন্যায়-অন্যায়ের, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা উপলব্ধি ক্ষমতা, দূরদৃষ্টি, অর্ন্তদৃষ্টি , জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্ম নেয়। যে আত্মা এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী নয় সেতো আলোবিহীন অন্ধকারের যাত্রী। আধ্যাত্মিক অন্ধকার তার সমগ্র সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এরাই পরলোক সম্বন্ধে উপহাস করে। এদেরকেই বলা হয়েছে চারিপাশের প্রকৃতির মাঝে আল্লাহ্র ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে। যিনি নভোমন্ডল এবং ভূমন্ডলের স্রষ্টা। যিনি এদের সম্বন্ধে নির্দ্দিষ্ট আইন প্রবর্তন করেছেন এবং যিনি এই বিশাল ভূমন্ডলের সকল জীবের জীবনোপকরণ দিয়ে থাকেন। যার এত ক্ষমতা, তিনি কি আর এক নূতন পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারেন না ? অবিশ্বাসীরা তাকিয়ে দেখুক, নভোমন্ডলের মহাজাগতিক আইন কত কঠোর ভাবে অনুশীলিত হয়। স্রষ্টার আইন সর্বদা ন্যায় ও অবশ্যই তা প্রতিপালিত হয়ে থাকে। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এই উদাহরণও কি তাদের আল্লাহ্র হুকুমের প্রতি জ্ঞানচক্ষু উম্মীলিত করবে না ? আল্লাহ্র আইন প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং সকল মিথ্যা ধ্যান ধারণা ও অন্যায়ের অবসান ঘটে প্রকৃত সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবেই।
৩৭৯৭। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ১৬ : ৪৫ ] এবং টিকা ২০৭১। এ সব নগন্য পুঁচকে জীব কারা , যারা আল্লাহ্র ক্ষমতা ও মহিমা সম্পর্কে প্রশ্ন করে ?
৩৭৯৮। দেখুন আয়াত [ ২৬ : ১৮৭ ] যেখানে এই বাক্যটি দ্বারা অবিশ্বাসীরা হযরত সুয়েব নবীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করেছিলো। ফলশ্রুতিতে শুয়েবের সম্প্রদায়ের উপরে ছাই ও অঙ্গার বর্ষিত হয় এবং তারা তার নীচে সমাধিত হয়ে পড়ে।
সূরা সাবা
Page 1 of 7
সূরা সাবা অথবা সাবা শহর - ৩৪
৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : সূরা নং ৩৪ থেকে সূরা নং ৩৯ পর্যন্ত সূরাগুলিকে নূতন শ্রেণীতে বিন্যাস করা হয়েছে , যার বক্তব্য হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি। এই শ্রেণীর সূরাগুলি শুরু হয়েছে আল্লাহ্র প্রশংসা দিয়ে। প্রথম সূরাটি শুরু হয়েছে আল্লাহ্র করুণা এবং ক্ষমতা এবং সত্যের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে। এর পরে সূরা নং ৩৫ এ বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে ফেরেশতারা আল্লাহ্র অসীম ক্ষমতা প্রদর্শন করে থাকে এবং ভালো,মন্দ এবং সত্য -মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করে। ৩৬ নং সূরাটি, পূণ্যাত্মা রাসুলের প্রতি এবং তাঁর মাধ্যমে যে গ্রন্থ কোরাণ অবতীর্ণ হয়েছে ; তারই প্রতি নিবেদিত। সূরা নং ৩৭ এ আছে শয়তানের ফাঁদের বর্ণনা; সূরা নং ৩৮ এ দাউদ নবী ও সুলাইমানের উদাহারণের মাধ্যমে বলা হয়েছে মন্দকে কি ভাবে জ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বারা পরাজিত করা যায় ; এবং ইয়াকুবের উদাহরণের মাধ্যমে বলা হয়েছে ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার সাহায্যে মন্দকে দমন করা সম্ভব। সূরা ৩৯ এ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে শেষ বিচারের দিনের উপরে যখন বিশ্বাসীদের অবিশ্বাসী থেকে পৃথক করা হবে এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল দেয়া হবে।
এই সূরা অবতীর্ণ হওয়ার সঠিক সময়কাল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর অবতীর্ণ কাল হচ্ছে মক্কী সুরাগুলির প্রথম দিকে।
সার সংক্ষেপঃ সত্য এবং কোন ভালো কাজ হারিয়ে যায় না , মানুষের ক্ষমতা ও সম্পদ ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আল্লাহ্র ক্ষমতা, ন্যায় এবং সত্য চিরস্থায়ী যা শেষ বিচারের দিনে মানুষের ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বকে গুরুত্ব প্রদান করে থাকে [ ৩৪ : ১ - ৩০ ]।
বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীরা শেষ পর্যন্ত তাদের কর্মফলের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে এবং নিজেদের সঠিক অবস্থানকে বুঝতে পারবে। [ ৩৪ : ৩১ - ৫৪ ]।
সূরা সাবা অথবা সাবা শহর - ৩৪
৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। সকল প্রশংসা আল্লাহ্র ৩৭৮৫, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব কিছু যার অধিকারে। পরকালেও সকল প্রশংসা তারই। এবং তিনি প্রজ্ঞাময় , সকল বিষয়ে অবহিত।
৩৭৮৫। আকাশ, পৃথিবী, বিশ্বব্রহ্মান্ড আল্লাহ্র প্রশংসায় মশ্গুল। অর্থাৎ আল্লাহ্র সৃষ্টি আল্লাহ্র করুণা ,দয়া , মহত্ব, ক্ষমতা , জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য আল্লাহ্র নামে আরোপিত [ ৭ : ১৮০ এবং ১৭ : ১১০ এবং টিকা সমূহ ]। আল্লাহ্র সম্বন্ধে ধ্যান করার অর্থ হচ্ছে, তাঁর আরোপিত বিভিন্ন গুণবাচক নাম যা শুধুমাত্র আল্লাহ্র জন্য-ই আরোপ করা হয়েছে , তা আত্মার মাঝে উপলব্ধির চেষ্টা করা। এই চেষ্টা মানুষের আত্মার মাঝে মনঃজগতকে সত্যের আলোতে প্রত্যাদেশের ন্যায় উদ্ভাসিত করবে। আল্লাহ্কে মনের মাঝে, আত্মার মাঝে ধারণ করার চেষ্টা কে পাঁচটি সূরাতে সমানভাবে বন্টন করে দেয়া হয়েছে। সূরাগুলিতে প্রথমেই আল্লাহ্র প্রশংসা আত্মাকে মহিমান্বিত করার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এই সূরাগুলি হচ্ছে ১নং , ৬নং, ১৮নং, ৩৪নং এবং ৩৫নং সূরা। ৩৪ নং সূরাতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে আল্লাহ্র জ্ঞান, ও করুণার স্বাক্ষর যা সর্ব সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান , তা অনুধাবন করার উপরে। তিনি আকাশমন্ডলী অর্থাৎ আমাদের চেনা জানা আকাশের সীমানার বাইরে অনন্ত মহাশূন্যের এবং সীমাহীন সময়ের , এবং আমাদের চেনা জানা পৃথিবীর সকল কিছুর-ই স্রষ্টা ও মালিক। এগুলির অনুভবের মাধ্যমে আল্লাহ্কে আত্মার মাঝে অনুভব ও উপলব্ধি করতে হবে।
০২। তিনি জানেন, ভূমিতে যা কিছু প্রবেশ করে ৩৭৮৬ এবং যা কিছু উহা থেকে বের হয়; যা কিছু আকাশ থেকে পতিত হয় ৩৭৮৭ এবং যা কিছু উহাতে আরোহণ করে। এবং তিনি অতীব দয়াময় , ক্ষমাশীল।
৩৭৮৬। বিজ্ঞানে সুন্দর এক তত্ব রয়েছে , যা বিবৃত করে যে : বস্তুর ধ্বংস নাই ; তা শুধু এক রূপ থেকে অন্যরূপ ধারণ করে। শুধু অজ্ঞ লোকেরাই ধারণা করে যে, মাটি পানিকে শোষণ করে নিয়ে পানিকে অস্তিত্ব বিহীন করে ফেলে। অথবা বীজ মাটির নীচে হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে কিছুই হারায় না। যে পানি মাটিতে প্রবেশ করে হারিয়ে যায়, সেই পানি-ই পরবর্তীতে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-কূপ, প্রভৃতি পরিপূর্ণ করতে সাহায্য করে, পৃথিবীর উদ্ভিদ জগতকে বাঁচিয়ে রাখে, নূতন উদ্ভিদের জন্ম দেয় এবং কোটি কোটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে। সৃষ্টির আদি থেকে কোটি কোটি ধরণের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে বের হয়ে আসছে, এবং নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ; নূতন প্রাণের জন্ম হচ্ছে আবার তা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে - কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুন্যে কিছুই সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায় না। জীবন ও মৃত্যু, ধ্বংস ও সৃষ্টি পাশাপাশি কাজ করে যায়। চক্রাকারে তা আবর্তিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এ সবই হচ্ছে প্রতীক, যার মাধ্যমে পার্থিব জ্ঞানের পরিধি অপার্থিব জ্ঞানকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আমরা মানব সন্তানের জন্ম ও মৃত্যুকে অহরহ প্রত্যক্ষ করে থাকি। এই মৃত্যু হচ্ছে মানবের দৈহিক বা পার্থিব বা জান্তব অংশের মৃত্যু। যখন মৃত ব্যক্তিকে মাটির নীচে কবর দেয়া হয়, অজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করতে পারে যে মৃতের সব শেষ হয়ে গেলো বা সে অস্তিত্ব বিহীন হয়ে গেলো। কিন্তু আল্লাহ্র নিকট কিছুই হারায় না।
৩৭৮৭। সুন্দর উপমার মাধ্যমে আল্লাহ্র করুণা ও দয়ার চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। পানি বাস্প হয়ে আকাশে উত্থিপ হয় এবং বৃষ্টিরূপ রহমত স্বরূপ মাটিতে ঝরে পড়ে মাটিকে সজীব করে থাকে। ঠিক সেরূপই হচ্ছে আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও করুণা। দুঃখে-বিপদে, বিপর্যয়ে ,মানুষ যখন আন্তরিক ভাবে প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ্র সাহায্য , পথনির্দ্দেশ প্রার্থনাকারীর সকল সত্তাকে বিধৌত করে দেয়। এ অভিজ্ঞতা প্রতিটি বিজ্ঞ জনেই জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের সময়ে লাভ করেছেন। সুতারাং এ কথা আমরা যেনো ভুলে না যাই যে, আল্লাহ্ পরম করুণাময় ও দয়ালু আবার তিনি ন্যায়বিচারক ও শাস্তি দানেও সক্ষম।
০৩। অবিশ্বাসীরা বলে ৩৭৮৮, " আমাদের নিকট [ কেয়ামতের ] ক্ষণ আসবে না।" বল, " না , আমার প্রভুর শপথ ৩৭৮৯, নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট উহা আসবেই।" যিনি অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন; যার নিকট আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অণু পরিমাণ জিনিষও গোপন থাকে না। বরং তার থেকে ছোট অথবা বড় এমন কোন কিছুই নাই যা সুস্পষ্টরূপে কিতাবে লেখা নাই ৩৭৯০-
৩৭৮৮। উপরের আয়াত দুটি আমাদের এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডে কাফেরদের অবস্থানকে বুঝতে সাহায্য করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, আকাশ ও ভূমন্ডলে , আল্লাহ্র সকল সৃষ্টি পরস্পর সমন্বিত [Harmony] ভাবে সঙ্গতি রক্ষা করে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে। প্রতিটি বস্তু বা প্রাণকে আল্লাহ্ এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। বস্তু বা প্রাণকে সেই বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত হওয়াই হচ্ছে তার চরম ও পরম পাওয়া , এবং তখনই প্রকৃতিতে সমন্বিত [Harmony] সঙ্গতি ও শান্তি রক্ষা পায়। যে বস্তু বা প্রাণ এই সঙ্গতি রক্ষা না করে, তার ধ্বংস অনিবার্য। কারণ প্রকৃতির সমন্বিত ক্ষমতার বাইরে কেউ যেতে অক্ষম। ঠিক সেই ভাবে আল্লাহ্ মানুষের আত্মাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করার জন্য ও আল্লাহ্র প্রশংসা করার জন্য। এটাই হচ্ছে আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম। আর এই প্রশংসা ও প্রার্থনা করতে হবে স্ব-ইচ্ছায়। কারণ একমাত্র মানুষকেই স্রষ্টা সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন - যা হচ্ছে মানুষের জন্য আল্লাহ্র আমানত। কাফের বা অবিশ্বাসীরা এই আমানতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে , তাদের অবিশ্বাসের দরুণ [ দেখুন ৩৩ : ৭২ আয়াত এবং টিকা সমূহ ]। অবশ্যই এর পরিণতিতে তাদের আত্মার ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ্ বলেছেন তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি দেখুন আয়াত নং ৫ ]। মানুষের কোনও শক্তিই প্রাকৃতিক আইনের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। জাগতিক , নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সকল কর্মকান্ডই প্রাকৃতিক আইনের অধীন। আল্লাহ্ যাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন সেটাই হচ্ছে তার জন্য সেই প্রাকৃতিক আইন। প্রতিটি কাজেরই শেষ পরিণাম আছে। নিউটনের সেই বিখ্যাত সুত্র : Every action there is an equal and opposite reaction. আধ্যাত্মিক জগতের ক্ষেত্রেও এই সুত্র প্রযোজ্য যদিও আধ্যাত্মিক জগত আমাদের চোখে বস্তু জগতের ন্যায় দৃশ্যমান নয়।
৩৭৮৯। আল্লাহ্র শপথের মাধ্যমে কিয়ামতের অবশ্যম্ভবীতা সম্বন্ধে আল্লাহ্র কর্তৃত্বকে প্রকাশ করা হয়েছে এই আয়াতে; যিনি শেষ বিচারের মালিক।
৩৭৯০। "এমন কোন কিছুই নাই যা সুস্পষ্ট কিতাবে লেখা নাই।" মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা জানি লিপিবদ্ধ বিবরণী, স্মরণ শক্তি থেকে অধিক নির্ভুল , বিশ্বাসযোগ্য এবং যদি তা সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা হয় তবে তা চিরস্থায়ী। যদি লিপিকা সঠিক ভাবে লেখা হয়; এতে যদি দুর্বোধ্য কিছু না থাকে, তবে সময়ের ব্যবধানেও তা সঠিকভাবে পাঠোদ্ধার হয় এবং বক্তব্য সঠিকভাবে অনুধাবণ করা সম্ভব হয়, যার সম্বন্ধে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। মানুষের দোষত্রুটি মুক্ত করে আল্লাহ্র আইন এভাবেই লিপিবদ্ধ আছে সুস্পষ্ট কিতাবে। আর সে লেখা হচ্ছে নির্ভুল , যা অনন্তকাল স্থায়ী - কখনও মুছে যাবে না। ছোট-বড় , সব কিছু সেখানে স্থান লাভ করেছে এবং ভালো কাজের শেষ পরিণতি পুরষ্কার এবং মন্দ কাজের শাস্তি।
০৪। ইহা এজন্য যে, যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তিনি তাদের পুরষ্কৃত করতে পারেন। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও উত্তম জীবনোপকরণ ৩৭৯১।
৩৭৯১। 'রিজিক ' - শব্দটির অর্থ ব্যপক। সাধারণ ভাবে রিজিক অর্থ সেই সব খাদ্য যা শরীরের পুষ্টি সাধন করে, তাই আমরা বুঝে থাকি। তবে এর অর্থ সীমাবদ্ধ নয়। রিজিক অর্থ সেই সব জাগতিক বস্তু যা শরীরের পুষ্টি সাধন করে, আধ্যাত্মিক বস্তু যা আত্মার কল্যাণ সাধন করে।
০৫। যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করার জন্য সংগ্রাম করে ৩৭৯২, - তাদের জন্য আছে ভয়াবহ অপমানকর শাস্তি,
৩৭৯২। দেখুন আয়াত [ ২২ : ৫১ ]। আল্লাহ্র পরিকল্পনা ব্যর্থ করার ক্ষমতা পৃথিবীতে কোনও মানুষের নাই। যারা তা করতে চেষ্টা করবে তাদের পৃথিবী থেকে ধ্বংস করে দেয়া হবে।
০৬। যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছে ৩৭৯৩, তারা জানে যে, তোমার প্রভুর নিকট থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে , তাই-ই হলো সত্য। ইহা পরাক্রমশালী সকল প্রশংসার যোগ্য আল্লাহ্র পথ নির্দ্দেশ।
৩৭৯৩। অবিশ্বাসী কাফেররা অজ্ঞ, তাই তারা আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে। কিন্তু যারা জ্ঞানী তারা প্রকৃত পক্ষে জানে যে, আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ, আত্মাকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আলোকিত করার পন্থা। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ-ই হচ্ছে প্রকৃত পথ-প্রদর্শক, যে পথে আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করা যায়। একমাত্র আল্লাহ্-ই সকল প্রশংসার দাবীদার যিনি অসীম করুণাময় , পরাক্রমশালী। আল্লাহ্র শক্তির উদাহরণ দেয়া হয়েছে [ ৩৪ : ৩ ] আয়াতে , যেখানে বলা হয়েছে, " পৃথিবীতে কিছুই তার অগোচর নহে - অণু, পরিমাণ কিছু ..........।"
০৭। অবিশ্বাসীরা [ ব্যঙ্গ করে ] বলে যে, " আমরা কি এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিব যে তোমাদের বলে যে, তোমরা [ মৃত্যুর পরে ] ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়লেও নূতন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হবেই ? ৩৭৯৪
৩৭৯৪। এই আয়াতটিতে কাফেরদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যারা রাসুলকে [ সা ] উপহাস বিদ্রূপ করতো। তাদের ভাষ্য ছিলো নিম্নরূপ , " এটা কি ভাবে সম্ভব মৃত্যুর পরে দেহের ধ্বংসের পরে তা মাটিতে মিশে যাওয়ার পরেও মানুষকে পুণরুত্থিত করা হবে ; এবং নূতন সৃষ্টি করা হবে ? "এর সাথে তারা যোগ করে যে, এ সবই হচ্ছে বিকৃত মস্তিষ্ক উম্মাদের কল্পনা। এরূপ মন্তব্য আজও অবিশ্বাসী কাফেররা করে থাকে ধর্মের ব্যাপারে। কারণ অবিশ্বাস তাদের আত্মার স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেয়; ফলে তারা হয় অন্তর্দৃষ্টিবিহীন। তারা আত্মার মাঝে স্রষ্টার উপস্থিতি ও পরলোকের অবস্থানকে অনুভবে অক্ষম।
০৮। " সে কি আল্লাহ্র সম্বন্ধে মিথ্যার উদ্ভাবন করেছে না সে ভূতে [ আক্রান্ত ] হয়েছে ৩৭৯৫? " না বরং যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না তারাই রয়েছে [ প্রকৃত ] শাস্তির মাঝে এবং সুদূর পথ ভ্রষ্টতাতে।
৩৭৯৫। যদি আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, তবে পরলোকের অস্তিত্ব স্বীকার করতেই হবে। কারণ ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে আত্মা এবং আত্মিক উন্নতির মাধ্যমে পরলোকের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। মানুষের যদি আত্মা না থাকতো , তবে পশুপাখীর ন্যায় মৃত্যুর সাথে সাথেই তার অস্তিত্ব শেষ হযে যেতো। যেহেতু আত্মা অমর এবং নৈতিক জীবনের পবিত্রতা আত্মার উন্নতির মূলধন, সে কারণেই মানব সভ্যতার সূচনা এখানেই এবং পরলোকের জবাবদিহিতার প্রশ্নটিও এসে যায়। পরলোকের জীবন সর্বাপেক্ষা বড় সত্য, যার থেকে বড় সত্য আর কিছু নাই। যিনি এই সত্য শিক্ষা দেন তিনি উম্মাদ হতে পারেন না। যারা তা বলে, তারা প্রকৃত জ্ঞানের অভাবেই তা বলে থাকে এবং নিজ আত্মাকে ভবিষ্যত বিপদের মাঝে নিক্ষেপ করে থাকে। যারা সত্যকে অস্বীকার করে থাকে তাদের পরিণতি হচ্ছে বিপর্যয়। তারা ক্রমাগত প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরে যাবে, প্রকৃত সত্যকে তারা আত্মার মাঝে অনুধাবনে অক্ষম হবে। কারণ সত্য ধারণের অক্ষমতার ফলে আত্মা স্বচ্ছতা হারায় এবং বিভ্রান্ত আত্মা পরলোকের জীবনের প্রকৃত চিত্র উপলব্ধিতে অক্ষম হবে এবং তাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটবে।
০৯। ওরা কি তাদের সামনে ও পিছনে , আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার প্রতি লক্ষ্য করে না ? ৩৭৯৬ যদি আমি ইচ্ছা করতাম , তবে মাটি তাদের গ্রাস করে ফেলতো ৩৭৯৭, অথবা আকাশের একখন্ড তাদের উপরে পতিত হতো ৩৭৯৮। প্রত্যেক অনুগত বান্দা যারা [ অনুতাপের মাধ্যমে] আমার নিকট ফিরে আসে তাদের জন্য অবশ্যই এতে রয়েছে নিদর্শন।
৩৭৯৬। আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস আত্মাকে আলোর জগতে স্থাপন করে থাকে , যার ফলে আত্মার মাঝে ন্যায়-অন্যায়ের, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা উপলব্ধি ক্ষমতা, দূরদৃষ্টি, অর্ন্তদৃষ্টি , জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্ম নেয়। যে আত্মা এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী নয় সেতো আলোবিহীন অন্ধকারের যাত্রী। আধ্যাত্মিক অন্ধকার তার সমগ্র সত্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এরাই পরলোক সম্বন্ধে উপহাস করে। এদেরকেই বলা হয়েছে চারিপাশের প্রকৃতির মাঝে আল্লাহ্র ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে। যিনি নভোমন্ডল এবং ভূমন্ডলের স্রষ্টা। যিনি এদের সম্বন্ধে নির্দ্দিষ্ট আইন প্রবর্তন করেছেন এবং যিনি এই বিশাল ভূমন্ডলের সকল জীবের জীবনোপকরণ দিয়ে থাকেন। যার এত ক্ষমতা, তিনি কি আর এক নূতন পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারেন না ? অবিশ্বাসীরা তাকিয়ে দেখুক, নভোমন্ডলের মহাজাগতিক আইন কত কঠোর ভাবে অনুশীলিত হয়। স্রষ্টার আইন সর্বদা ন্যায় ও অবশ্যই তা প্রতিপালিত হয়ে থাকে। বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের এই উদাহরণও কি তাদের আল্লাহ্র হুকুমের প্রতি জ্ঞানচক্ষু উম্মীলিত করবে না ? আল্লাহ্র আইন প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং সকল মিথ্যা ধ্যান ধারণা ও অন্যায়ের অবসান ঘটে প্রকৃত সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবেই।
৩৭৯৭। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ১৬ : ৪৫ ] এবং টিকা ২০৭১। এ সব নগন্য পুঁচকে জীব কারা , যারা আল্লাহ্র ক্ষমতা ও মহিমা সম্পর্কে প্রশ্ন করে ?
৩৭৯৮। দেখুন আয়াত [ ২৬ : ১৮৭ ] যেখানে এই বাক্যটি দ্বারা অবিশ্বাসীরা হযরত সুয়েব নবীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করেছিলো। ফলশ্রুতিতে শুয়েবের সম্প্রদায়ের উপরে ছাই ও অঙ্গার বর্ষিত হয় এবং তারা তার নীচে সমাধিত হয়ে পড়ে।
