Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৯ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৯২ বার
+ - R Print

সূরা লূকমান

সূরা লূকমান বা জ্ঞানী - ৩১

৩৪ আয়াত, ৪ রুকু , মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা : এই সূরাতে সকল কিছুর শেষ পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। জ্ঞান বা দিব্যজ্ঞান কি ? কোথায় তাকে অনুসন্ধান করা যায় ? এ জ্ঞান কি সময় ও প্রকৃতির রহস্য, পার্থিব জগতের উর্দ্ধে যে জগতের অবস্থান তার রহস্য সমাধান করে এবং আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য পৌঁছিয়ে দেয় ? উত্তর হবে হ্যাঁ। জ্ঞানী লুকমানের উপদেশ হচ্ছে, যদি মানব, আল্লাহ্‌র এবাদতের মাধ্যমে নিজস্ব জ্ঞানের পরিমন্ডলকে বিস্তৃত করতে চায়, জীবনের প্রতিটি কাজকে দয়া ও সহমর্মিতায় মহিমান্বিত করে, মিথ্যাকে পরিহার করে, যা কিছু আল্লাহ্‌র আইনকে লঙ্ঘন করে তা থেকে বিরত থাকে এই-ই হচ্ছে জীবনকে গুণান্বিত করার সঠিক ও সহজ রাস্তা। বিশ্ব প্রকৃতির মাঝেও এ সত্য নিহিত আছে।

এই সূরার অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের কোনও বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাই। এই সূরা প্রধানতঃ অবতীর্ণ হয় মক্কাতে অবস্থানের শেষার্ধে।

সার সংক্ষেপ : যারা পূণ্যের অনুসন্ধান করে, তারা আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশিত পথের সন্ধান লাভ করে। যারা তা না করে আত্ম অহংকারে মত্ত থাকে তদের অনিবার্য পরিণতি ধ্বংস। সৃষ্টির সকল কিছুই এই সত্যির সাক্ষ্য দেয়। জ্ঞানী লুকমান ব্যাখ্যা করেন যে,জ্ঞানের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র প্রকৃত সেবা করা যায়। [ ৩১ : ১ - ১৯ ]।

দিব্য জ্ঞান মানুষকে ধৈর্যশীল ও দৃঢ় করে এবং সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ্‌র আইনকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আল্লাহ্‌র আইন প্রতিটি বস্তুর শেষ পরিণতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যার রহস্য জানেন একমাত্র আল্লাহ্‌ [ ৩১ : ২০ - ৩৪ ]।

সূরা লূকমান বা জ্ঞানী - ৩১

৩৪ আয়াত, ৪ রুকু , মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। আলিফ্‌ , লাম , মিম।

০২। এগুলি জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত ৩৫৮০-

৩৫৮০। এই সূরাটিতে জ্ঞান [Wisdom] সম্পর্কে বলা হয়েছে। কোরাণকে যথার্থভাবেই জ্ঞানগর্ভ কিতাব অথবা জ্ঞানের ভান্ডার বলা হয়েছে। নীচে ১২ নং আয়াতে লুকমানকে জ্ঞানী [Hakim] বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এই জ্ঞানী বা হাকিম কথাটি দ্বারা বোঝায় যে তিনি পার্থিব ও ঐশ্বরিক বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানেই শুধু সমৃদ্ধ ছিলেন না , তার প্রতিদিনের জীবন বিধান [Amal] ছিলো আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং সঠিক। প্রতিটি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিলো সঠিক, এবং বাস্তব , কিন্তু তা কখনও পূর্ণাঙ্গ ছিলো না, কারণ কোনও মানুষেরই জ্ঞান পূর্ণতা প্রাপ্ত পেতে পারে না। এই পূর্ণতা পেতে হলে ব্যক্তিকে একাধারে বীর যোদ্ধা, সমাজ সংস্কারক,মনুষ্য চরিত্রের জ্ঞান ও প্রকৃতির সকল জ্ঞানের সাথে ঐশ্বরিক জ্ঞানের অধিকারী হতে হয়। শুধুমাত্র পার্থিব সকল কিছু এবং সমাজ, সংসার ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিকে জ্ঞানে সম্পূর্ণ বলা চলে না। একমাত্র আমাদের সম্মানীয় নবীর চরিত্রে এরূপ সকল জ্ঞানের সম্পূর্ণতা পাওয়া যায়। একাধারে তিনি ছিলেন যুগান্তকারী সমাজ সংস্কারক, বিচক্ষণ রাষ্ট্র নেতা, অসীম সাহসিক যোদ্ধা,আবার আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও ঐশ্বরিক চেতনায় সমৃদ্ধ। স্নেহময় পিতা, প্রেমময় স্বামী, গৃহীরূপে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ যে কিতাব প্রেরণ করেন তা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের সম্পূরক নয়। তা হচ্ছে মানুষের জীবনের আধ্যাত্মিক ও পার্থিব সকল প্রয়োজনের সঠিক দিক্‌ নির্দ্দেশনা। এই কারণেই জ্ঞানগর্ভ কিতাব [Kitab-ul- Hakim] হচ্ছে কোরাণের অপর নাম।

০৩। সৎকর্মশীলদের জন্য পথ নির্দ্দেশ ও দয়া স্বরূপ , ৩৫৮১-

৩৫৮১। এখানে কোরাণকে বলা হয়েছে " পথ নির্দ্দেশ " এবং জীবন পথের "দয়া স্বরূপ "। তবে শর্ত দেয়া হয়েছে কোরাণের পথ নির্দ্দেশ তারাই গ্রহণ করতে পারবে যারা সৎকর্মপরায়ণ বা পূণ্যাত্মা। অর্থাৎ পাপীদের আত্মায় কোরাণের বাণীর কোনও প্রভাবই পড়বে না।

০৪। যারা নিয়মিত সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত দান করে, এবং তাদের [ হৃদয়ে ] পরকালের উপরে রয়েছে স্থির বিশ্বাস ৩৫৮২।

৩৫৮২। এই আয়াতে পূণ্যাত্মাদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। পূণ্যাত্মাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের জীবন ধারণের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে :

১) তাঁরা আল্লাহ্‌র দেয় কর্তব্য নিষ্ঠার সাথে পালনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় এবং সালাত বা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অনুসন্ধান করে;

২) "যাকাত " দেয় অর্থাৎ তাঁরা দানের মাধ্যমে তাদের সাহায্যের হাত মানুষের জন্য প্রসারিত করেন;

৩) তাঁহারাই সফলকাম অর্থাৎ তাঁরা শুধু যে এই পৃথিবীতেই শান্তি লাভ করবেন তাই-ই নয়, তাদের জন্য পরকালেও আছে নিশ্চিত শান্তি। কারণ তারা পরকালের জবাবদিহিতায় স্থির বিশ্বাসী।

০৫।এরাই তাদের প্রভুর নির্দ্দেশিত পথে আছে। এরাই হবে সফলকাম ৩৫৮৩।

৩৫৮৩। উপরে যাদের কথ উল্লেখ করা হয়েছে , তারা আল্লাহ্‌র আর্শীবাদ পুষ্ট কারণ তারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনকারী। তাঁরা এই পৃথিবীতেও সফলকাম এবং তাঁরা ভবিষ্যতের লক্ষ্যেও পৌঁছাতে সক্ষম।

০৬। কিন্তু মানুষের মধ্যে অনেকে না জেনে মিথ্যা কাহিনী ক্রয় করে থাকে ৩৫৮৪, মানুষকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য ও [ সে পথ নিয়ে ] হাসি ঠাট্টা করার জন্য। এদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি।

৩৫৮৪। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট হচ্ছে : মক্কার মোশরেক ব্যবসায়ী নাদের-ইবনে-হারেস একবার পারস্য দেশ থেকে তাদের ঐতিহাসিক কাহিনী সমূহ ক্রয় করে আনে এবং মক্কার মোশরেকদের কোরাণে বর্ণিত আদ, সামুদ জাতির কথা না শুনে পারস্যের কাহিনী শোনার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। তাদেরকেই এই আয়াতে ভর্ৎসনা  করা হয়েছে। যারা প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানী তারাই একমাত্র পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে অনুধাবনে সক্ষম, এবং তারা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপকে গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেন। অপরপক্ষে ,যারা নির্বোধ তারাই প্রকৃত সত্য অপেক্ষা মূর্খতাপূর্ণ কল্প কাহিনী শুনতে ভালোবাসে এবং আল্লাহ্‌ প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করে।

০৭। এরূপ লোকের নিকট যখন আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, সে দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেনো সে ইহা শুনতে পায় নাই , যেনো তার দুই কানেই বধিরতা রয়েছে। অতএব তার নিকট তুমি ভয়াবহ শাস্তির সংবাদ ঘোষণা কর ৩৫৮৫।

৩৫৮৫। উপরে বর্ণিত নির্বোধ লোকেরা এমন ব্যবহার করে যেনো তারা এরূপ কথা জন্মেও শোনে নাই। তারা কোরাণের এ সব গুরুত্বপূর্ণ নির্দ্দেশনাকে হাসি ঠাট্টার বিষয়বস্তু রূপে কল্পনা করে। তাদের এই উপহাসে কারও কোনও ক্ষতি হবে না। ক্ষতি যা হবে তা ঐ উপহাসকারীর। কারণ তারা জীবনের উচ্চতর মহত্বর পরিপূর্ণতার দিক অনুধাবনে অক্ষম ,ফলে তারা আল্লাহ্‌র করুণা লাভেও অক্ষম হবে। আর এক্ষেত্রে তাদের অক্ষমতাই তাদের আল্লাহ্‌র করুণা থেকে বিচ্যুত করে। অজ্ঞতা এবং সেই সাথে দম্ভ অবাধ্যতা ও একগুয়েমী তাদের পতনের কারণ ঘটায়।

০৮। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে , তাদের জন্য রয়েছে [ বেহেশতের ] বাগানের অনাবিল শান্তি ; -

০৯। সেখানে তারা [ চিরকাল ] বাস করবে। আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার সত্য। ক্ষমতায় তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় ৩৫৮৬।

৩৫৮৬। আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী। তিনি তাঁর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। আর এ ব্যাপারে কেহই তাঁকে বাঁধা দান করার ক্ষমতা রাখে না। তিনি অসীম জ্ঞানের অধিকারী প্রজ্ঞাময়। সুতারাং তাঁর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই অর্থবহ - তা কখনও উদ্দেশ্যহীন নয়। আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি নিখিল বিশ্বভূবনে হারিয়ে যাওয়ার নয়, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবেই।

১০। আকাশ মন্ডলীকে তিনি খুঁটি ব্যতীতই সৃষ্টি করেছেন ৩৫৮৭ ; তোমরা তা দেখতে পাচ্ছ। তিনি পৃথিবীতে পর্বত সমূহ স্থাপন করেছেন , যা দৃঢ়ভাবে দাড়িয়ে আছে, যেনো ইহা [ পৃথিবী ] তোমাদের নিয়ে না কাঁপে ৩৫৮৮। এবং এর [ পৃথিবীর] মাঝে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন ৩৫৮৯। আমি আকাশ থেকে বৃষ্টিকে প্রেরণ করি ৩৫৯০ এবং ইহাতে উদ্‌গত করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর সৃষ্টবস্তু জোড়ায় জোড়ায় ৩৫৯১।

৩৫৮৭। দেখুন আয়াত [ ১৩ : ২ ] এবং টিকা ১৮০০।

৩৫৮৮। দেখুন আয়াত [ ১৬ : ১৫ ] এবং টিকা ২০৩৮।

৩৫৮৯। দেখুন আয়াত [ ২ : ১৬৪ ] ও টিকা ১৬৬।

৩৫৯০। লক্ষ্য করুন এই আয়াত শুরু হয়েছে " তিনি " [আল্লাহ্‌ ] দিয়ে। এখানে আল্লাহ্‌ নিজেকে তৃতীয় পুরুষ রূপে প্রকাশ করেছেন। যেখানে তাঁর সৃষ্ট পর্দাথের বর্ণনা আছে। এই সৃষ্ট পদার্থসমূহ যেমন : পাহাড়-পর্বত,প্রাণীকূল, বহু বছর থেকে পৃথিবীতে অবস্থান করছে একই ভাবে, যদিও এ সবের বিবর্তন ঘটছে অতি ধীর গতিতে। এ সব বর্ণনার সময়ে আল্লাহ্‌র পরিবর্তে সর্বনামের তৃতীয় পুরুষ " তিনি" ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আয়াতের শেষ লাইনে আল্লাহ্‌ নিজেকে প্রকাশের জন্য প্রথম পুরুষ " আমি" সর্বনাম ব্যবহার করেছেন। এখানে যে সব সৃষ্ট পর্দাথের বর্ণনা করা হয়েছে, সে সব দ্রুত পরিবর্তনশীল , যেমন : বৃষ্টি এবং উদ্ভিদ জগত। আকাশ, পৃথিবী, প্রাণীকূলের সাথে মানুষের সম্পর্ক নৈর্বক্তিক। কিন্তু বৃষ্টি ও উদ্ভিদ জগতের সাথে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত কাছের এবং নির্ভরশীল। সুতারাং গুরুত্বকে বোঝানোর জন্য এবং মানুষের সাথে আল্লাহ্‌র সম্পর্ককে গভীরভাবে উপলব্ধির জন্য ' আমি ' সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

৩৫৯১। কল্যাণকর [Karim] শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে উপকারী তরুলতা গুল্ম ও বৃক্ষের পরিবর্তে, যা ' আল্লাহ্‌ মানুষের মঙ্গলের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

১১। এই হলো আল্লাহ্‌র সৃষ্টির [রূপ ]। এখন আমাকে ৩৫৯২ দেখাও তো - তিনি ব্যতীত অন্যেরা কি সৃষ্টি করেছে। বরং সীমালঙ্ঘনকারীরা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।

৩৫৯২। পূর্বের আয়াতে ' আল্লাহ্‌' নিজেকে 'আমি' সর্বনাম দ্বারা প্রকাশ করেছেন, এই আয়াতে 'আমাকে' সর্বনাম ব্যবহার করেছেন যা আরও ব্যক্তিগত সম্পর্ক [ দেখুন আয়াত [ ২ : ৩৮ ] ও টিকা ৫৬ ] : কারণ এখানে আল্লাহ্‌ আহ্বান করেছেন মিথ্যা উপাস্যের পরিবর্তে তাঁর উপাসনা করতে।