Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৮ জন
আজকের পাঠক ১৫২ জন
সর্বমোট পাঠক ৪৫২৭৬৩ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ৫৫৮৯৬৭ বার
+ - R Print

সূরা আল-ইমরান

রুকু - ২০

১৯০। চিন্তা কর ! আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাত্রির পরিবর্তনের মাঝে আল্লাহ্‌র নিদর্শনাবলী [নিহিত] আছে, যারা উপলব্ধি করতে পারে [শুধু] তাদের জন্য ৪৯৭।

৪৯৭। দেখুন সূরা ২, আয়াত ১৬৪। এই আয়াতটি পূর্বোক্ত [২ : ১৬৪] আয়াতেরই অনুরূপ। এখানে দু'টি উপমার ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে পূর্বোক্ত আয়াতে ছয়টি বা সাতটি উপমা ব্যবহার হয়েছে। দু'টির কারণ এই নয় যে, এই দু'টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দু'টির কারণ তা আমাদের পূর্ববর্তী সাতটি আয়াতের স্মরণ করিয়ে দেবে। কারণ এ সবগুলি উপমাই মহিমান্বিত আল্লাহ্‌র রহমতের বর্ণনা করে।

১৯১। যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে ৪৯৮ আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নভোমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টির [বিস্ময়করতা] সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করে [এবং বলে] "হে আমাদের প্রভু, তুমি ইহা নিরর্থক সৃষ্টি কর নাই। [ইহা] তোমার মহিমা ! আগুনের শাস্তি থেকে আমাদের মুক্তি দান কর ৪৯৯।

৪৯৮। এখানে বলা হয়েছে, "দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে"। এই কথাটির অর্থ প্রতীকধর্মী। অর্থাৎ জীবনের চলার পথে সকল অবস্থায়ই আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। উপরোক্ত শব্দগুলির সাহায্যে বুঝাতে চাওয়া হয়েছে আমাদের জীবনের সকল অবস্থায়, যথা - ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় যে কোনও স্থানে যে কোনও অবস্থায় আমাদের অন্তর যেনো এক মূহুর্তের জন্যও আল্লাহকে ভুলে না যায়, প্রত্যেকটি কাজে আল্লাহ্‌র সম্মতি আছে কি-না বা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত বিধান তা অনুমোদন করে কি-না তা যাচাই করে, সর্বদা তাঁকে স্মরণ করে, তাঁর কাছে সাহায্য কামান করে, তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এসব প্রকাশ যে সরবে হতে হবে তা নয়। হতে পারে অন্তরেও। কারণ আমাদের অন্তরের সাথে আল্লাহ্‌র প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিন্তা বা ভাবনা সবই আল্লাহ্‌ সব সময়ই জানতে পারেন। সুতরাং জীবনের সর্বাবস্থায় তাঁকে স্মরণ করতে বলা হয়েছে। জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা, জয়, পরাজয়, সুখে-দুঃখে, সর্বদা নিজেকে আল্লাহ্‌র চিন্তায় ব্যপৃত রাখতে বলা হয়েছে।
৪৯৯। আল্লাহ্‌ তা'আলার সীমাহীন মাহাত্ম্য ও রহমত অবগত হওয়া একটি উচ্চ পর্যায়ের ইবাদত। সীমাহীন সৃষ্টির উপর যে লোক চিন্তা-ভাবনা করে সে অবশ্যই অনুধাবন করবে যে এসব সৃষ্টি নিরর্থক নয়। এ সবের সৃষ্টির পিছনে হাজারো তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। সে সমস্তকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়ে মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করার আমন্ত্রণ জানানোতে তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। সে সমস্তকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়ে মানুষকে চিন্তা-ভাবনা করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে যে, সমগ্র পৃথিবী তাদের কল্যাণের জন্য তৈরী। একমাত্র নিঃস্বার্থ সৃষ্টির সেবার মধ্যে দিয়ে পার্থিব দাসত্ব থেকে আত্মা মুক্তি লাভ করতে পারে। পার্থিব জিনিসের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ আত্মাকে আল্লাহ্‌র চিন্তা-ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, ফলে আত্মার ভিতরে যন্ত্রণার জন্ম লাভ করে। মৃত্যুর পরে এই যন্ত্রণা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে দোযখের আগুনের রূপ নেবে। অপরপক্ষে আল্লাহর স্মরণে, সৃষ্টির সেবায়, সৎকর্মের দ্বারা আত্মা প্রশান্তি লাভ করে। আত্মায় এক অনাবিল সুখ ও শান্তির সৃষ্টি হয়। এই প্রশান্তি বেহেশতি হওয়ার পূর্বাভাস। এ-ই হচ্ছে আত্মার মুক্তি বা দোযখের আগুন থেকে মুক্তি।

১৯২। "হে আমাদের প্রভু ! যাকে তুমি আগুনে নিক্ষেপ করলে, প্রকৃতপক্ষে তাকে তুমি কলঙ্কে আবৃত করলে। এবং পাপীরা কোন সাহায্যকারী পাবে না।

১৯৩। "হে আমাদের প্রভু ! আমরা এক আহবানকারীকে [আমাদের] ঈমানের দিকে আহবান করতে শুনেছি, 'তোমরা প্রভুর দিকে ঈমান আন ?' এবং আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের প্রভু ! আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা কর, আমাদের দোষত্রুটি দূর করে দাও এবং সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে তুমি আমাদের আত্মাসমূহ গ্রহণ কর।

১৯৪। "হে আমাদের প্রভু ! তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে যা তুমি আমাদের দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তা দান কর, এবং শেষ বিচারের দিনের অপমান থেকে আমাদের রক্ষা কর। নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কর না।"

১৯৫। এবং তাদের প্রভু তাদের [প্রার্থনা] গ্রহণ করেন এবং সাড়া দিয়ে বলেন, "পুরুষ বা নারী কারও কর্ম আমি কখনও হারিয়ে যেতে দেবো না। তোমরা একে অপরের অংশ ৫০০। যারা তাদের নিজ গৃহ ত্যাগ করেছ, এবং সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছ এবং আমার কারণে নির্যাতিত হয়েছ এবং যুদ্ধ করেছ এবং নিহত হয়েছ, অবশ্যই আমি তাদের দোষত্রুটিগুলি দূর করে দেব, এবং তাদের বেহেশতের বাগানে স্থান করে দেবো যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। ইহা আল্লাহ্‌র নিকট থেকে পুরস্কার ৫০১। এবং আল্লাহ্‌র নিকট থেকেই আসে সর্বোৎকৃষ্ট পুরস্কার।

৫০০। "কোন নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ।" ইসলাম পুরুষ ও নারীর সমতায় বিশ্বাসী। আল্লাহ্‌র চোখে পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনও পার্থক্য নাই। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামে নারী পুরুষের সমতায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে যা অন্যান্য আরও আয়াতে আছে। তবে প্রকৃতিতে লিঙ্গের ভেদাভেদ লক্ষ্য করা যায়। আর এই ভেদাভেদ, সৃষ্টিকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে, আল্লাহ্‌র চোখের নারী ও পুরুষের মাঝে কোনও ভেদাভেদ নাই। সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ইত্যাদি সবই বাহ্যিক বা কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে নারীর আত্মা ও পুরুষের আত্মাকে আল্লাহ্‌র কাছে একইভাবে নীত করা হবে।

৫০১। এই আয়াত এবং ১৯৮ আয়াতে এবং আরও অনেক আয়াতে এ কথা বলা হয়েছে যে সমস্ত কল্যাণ ও প্রাচুর্য্যরে উৎস আল্লাহ্‌। এখানে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করা হয়েছে যে সুখ, শান্তির বা যে কোনও নেয়ামতের কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহ্‌। মু'মিন বান্দার আত্মিক সুখ তার সর্ব অস্তিত্বকে ঘিরে রাখে। আর এই সুখ ও শান্তি আল্লাহ্‌রই দান। রূপকের মাধ্যমে বেহেশতের নেয়ামত বলা হয়েছে। মু'মিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য অপেক্ষা আর কোনও বড় পুরস্কার নাই। তাঁর জন্য আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভ হচ্ছে- জীবনের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পাওয়া।

১৯৬। অবিশ্বাসীদের দেশে দেশে গর্বিত বিচরণ তোমাকে যেনো কিছুতেই বিভ্রান্ত না করে।

১৯৭। ইহা স্বল্পকালীন ভোগ মাত্র। তাদের সর্বশেষ বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। আর উহা কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল [শোবার জন্য]।

১৯৮। অপরপক্ষে, যারা তাদের প্রভুকে ভয় করে, তাদের জন্য আছে [বেহেশতের] বাগান, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা [চিরস্থায়ী রূপে] বাস করবে। ইহা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আতিথেয়তা। আল্লাহ্‌র নিকট থেকে যা আসে তা পূণ্যাত্মাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট [স্বর্গসুখ]।

১৯৯। এবং কিতাবীদের মধ্যে অবশ্যই এমন লোক আছে যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিনয়ে অবনত হয়ে আল্লাহ্‌র [একত্বে] বিশ্বাসী, তোমাদের প্রতি প্রেরিত প্রত্যাদেশে এবং তাদের প্রতি প্রেরিত প্রত্যাদেশে বিশ্বাসী। এবং তারা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রী করে না। এদের জন্য তাঁদের প্রভুর নিকট পুরস্কার রয়েছে। এবং আল্লাহ্‌ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

২০০। হে ঈমানদারগণ ! ধৈর্য্যরে ৫০২ সাথে অধ্যাবসায়ী এবং দৃঢ় হও। এরূপ অধ্যাবসায়ের জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতা কর; [ফলে] পরস্পরকে শক্তিশালী কর। এবং আল্লাহকে ভয় কর যেনো তোমরা সফলকাম হতে পার ৫০৩।

৫০২। সবর কথাটির পূর্ণ অর্থ এখানে প্রকাশ করা হয়েছে। এর পূর্বের আয়াতেও [২ : ৪৫ এবং টীকা ৬১] সবর সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। সবরের পূর্ণ অর্থ হচ্ছেঃ বিপদে বা ব্যর্থতায় ধৈর্য্য ধারণ, হতাশ না হয়ে অধ্যবসায়ের সাথে কর্তব্যকর্ম করে যাওয়া এবং প্রতিযোগী মনোভাব রাখা, দৃঢ়তার সাথে বিপদের মুকাবিলা করা, লোভ-লালসা থেকে আত্মসংযম করা, অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করা ইত্যাদি। এই ধরণের সকল গুণাবলীকেই সবর নামে একটি আরবী শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা যায়। এই সব গুণাবলী চরিত্রে সৃষ্টি করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য ও দায়িত্ব। কারণ তা আল্লাহ্‌র হুকুম, কুরআনের আইন। যদি আমরা তা করতে পারি তবে তা হবে আল্লাহ্‌র হুকুম মানা। আর যে আল্লাহ্‌র হুকুম মানে তার প্রতি আল্লাহ্‌র রহমত বর্ষিত হয়। ফলে ব্যক্তির চরিত্রে ঐসব গুণাবলীর প্রকাশ অন্য আর দশজনের জন্য উৎসাহ ও উদ্দীপনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তাদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হয়। তারা একে অপরের সাথে এসব গুণাবলী অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। এ প্রতিযোগিতা হবে সুষ্ঠু ও সুন্দর। যদি কেউ এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, তবে তার সাথীরা তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, ফলে সমাজ হয়ে ওঠে সুষ্ঠু ও সুন্দর। এভাবে এসব গুণাবলীপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সমষ্টিগতভাবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজ করার ইচ্ছা উদ্দীপনা বোধ করে। আল্লাহ্‌র রাস্তায় কাজ করার ইচ্ছা হবে তাদের সকলেরই মূল লক্ষ্য। এভাবেই একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সুন্দর, সুখী সমাজ গঠন সম্ভব।

৫০৩। 'ফালাহ্‌' আরবী শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে 'Prosper' এবং বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে "সফলকাম"। এই শব্দটির অর্থ অনেক ব্যাপক। আমরা যদি আমাদের চরিত্রে উপরোল্লিখিত গুণাবলী অর্জন করি, তবে আমরা পার্থিব জগতে এবং আধ্যাত্মিক জগতেও উন্নতি লাভ করতে পারবো। পৃথিবীতে সুখ-শান্তিতে বাঁচতে হলে আমাদের পার্থিক সম্পদের যেমন দরকার, ঠিক সমভাবে প্রয়োজন আত্মিক সম্পদের। সুতরাং সফলকাম কথাটির দ্বারা বুঝাতে চাওয়া হয়েছে, আল্লাহ্‌র ভালোবাসা পাওয়ার আশায় যারা চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করে, তারা এই পৃথিবীতেই সুখী হয়, অর্জন করে পার্থিব উন্নতি এবং আত্মিক সমৃদ্ধি। সমাজ হয় সমৃদ্ধিশালী।