+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]
ভূমিকাঃ এই সূরাটি বাকারার সমগোত্রীয়। কিন্তু এখানে বিষয়বস্তুকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সুরাতে বদরের যুদ্ধ, রমজান মাস এবং ২য় হিজরী ও ওহুদের যুদ্ধ সওয়ালের মাস ৩য় হিজরী যুদ্ধের যে উল্লেখ করা হয়েছে, তা থেকে ঐসব অনুচ্ছেদের নাজিল হওয়ার সময় সম্পর্কে জ্ঞান দান করে।
সূরা বাকারার মত এই সূরাতে সাধারণভাবে মানব জাতির ধর্মীয় ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে, তবে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে কিতাবী জাতিসমূহের উপর। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করা হয়েছে নূতন মুসলিম উম্মতের আবির্ভাব, তাদের ধর্মানুষ্ঠান, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি। সেই সাথে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সত্যর জন্য, ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করার উপরে; এবং উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বিশ্বাসীদের, তারা যেন সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে পথ নির্দেশের জন্য প্রার্থনা করে এবং আল্লাহর মঙ্গল ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এই সূরাতে নতুন যে বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে তা হচ্ছে; (১) খৃষ্টানদের নূতন ধর্ম গ্রহণের প্রতি আহবান করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সূরাতে ইহুদীদের বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছিল, এ সুরাতে খৃষ্টানদের সেরূপ নূতন ধর্মের দিকে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। (২) মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য বদর এবং ওহুদের যুদ্ধ এক বিশেষ শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত; এবং (৩) জাতি হিসেবে মুসলমানদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে নির্দেশ দান করা হয়েছে এবং এই দায়িত্ব ও কর্তব্য তাদের সম্প্রদায়ের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঠিক সমভাবে প্রযোজ্য বহির্বিশ্বের আদান-প্রদান এবং অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
সার-সংক্ষেপ : আল্লাহ তাঁর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে, পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ সমূহের সত্যায়ন (Confirmation) করেছেন। আমরা এই পত্যাদেশ ভক্তি সহকারে গ্রহণ করবো। এই গ্রহণ করার অর্থ, এর বক্তব্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করবো, এবং যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাবধারা বা আদর্শ প্রত্যাখ্যান করবো। [৩:১-২০]
পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা সম্পূর্ণ কিতাব প্রাপ্ত হয় নাই, তাঁরা অসম্পূর্ণ কিতাবপ্রাপ্ত জাতি। কিন্তু তারা যদি আল্লাহর এই সম্পূর্ণ প্রত্যাদেশকে প্রত্যাখান করে তবে বিশ্বাসীরা তাদের সঙ্গ পরিহার করবে। তাদের সময় শেষ। [৩:২১-৩০]
ইমরান [মেরীর পিতা] পরিবারের কাহিনী থেকে আমরা অবগত হই হযরত মুসার প্রতি প্রেরিত বিধি-বিধান, হযরত ঈসার জন্মের অলৌকিক রহস্য এবং তাঁর কার্যকাল [৩:৩১-৬৩]।
পৃথিবীতে আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রেরিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। সারা পৃথিবীর মানব জাতিকে এর ছায়াতলে আহবান করা হয়েছে। এই ধারাবাহিক প্রত্যাদেশ ইসলামে এসে সমাপ্তি লাভ করে। মুসলমানদের উপরে নির্দেশ হচ্ছে, ঐক্য এবং শৃঙ্খলার সাথে বসবাস করা, তা হলেই মুসলমানদের জন্য রয়েছে শত্রু পথের ক্ষতি থেকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার। তাদেরকে পরস্পরের জন্য বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করতে বলা হয়েছে [৩:৬৪-১২০]।
বদরের যুদ্ধে আল্লাহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কিভাবে তিনি সৎ গুণ সম্পন্ন (Virtuous) ব্যক্তিদের পক্ষ অবলম্বন করেন। ধৈর্য্য, অধ্যবসায় এবং শৃঙ্খলা সাফল্যের চাবিকাঠি। অপর পক্ষে ওহুদের যুদ্ধের শিক্ষা হচ্ছে হতাশ না হওয়া, নৈতিক গুণের চর্চা করা এবং মৃত্যু ও কষ্টকে অবজ্ঞা করা। [৩ : ১২১-১৪৮]
ওহুদের যুদ্ধের বিপর্যয়ের কারণ হলো কিছু লোকের উচ্ছৃঙ্খলতা, আবার কিছু লোকের স্বার্থপরতা ও সিদ্ধান্তের অভাব; আবার মুনাফিকদের কাপুরুষতা। কিন্তু কোন শত্রুই আল্লাহর পরিকল্পনাকে রুদ্ধ করতে পারে না। [৩ : ১৪৯-১৮০]
শত্রুদের উপহাসকে অবজ্ঞা কর। আল্লাহর এবাদত করতে হবে ঐকান্তিক আন্তরিকতা নিয়ে। তাঁর অনুগত বান্দাদের সাফল্য এবং সমৃদ্ধি দান করার তিনিই একমাত্র নিয়ামক শক্তি। [৩:১৮১-২০০]
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]
৩৪৪। [এই সুরার ৩ নং ও ৪ নং আয়াত অনুবাদের সময় অনুবাদকগণের মধ্যে কেউ ৩নং আয়াতের শেষ অংশ পরবর্তী আয়াতের সাথে মিলিয়ে ৪নং আয়াত হিসাবে অনুবাদ করেছেন। এর বিপরীত কাজ করেছেন কেউ কেউ। মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেব দ্বিতীয় সারির দলে।
৩৪৫। 'ফুরকান' - ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য মানদণ্ড। দেখুন [২ : ৫৩] এবং টিকা ৬৮।
৩৪৬। মাতৃগর্ভে প্রথম সৃষ্টির উন্মেষের সময় আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারও সাধ্য নাই তার রহস্য জানার। এখানে সৃষ্টি রহস্যের উল্লেখের মাধ্যমে হযরত ঈসার জন্মের গূঢ় রহস্যের প্রতি আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে [৩ : ৪১]।
৩৪৯। যারা জ্ঞানী এবং বিশ্বাসে অটল এ প্রার্থনা তাদেরই। যারা জ্ঞানে গভীর, শুধুমাত্র তারাই অনুধাবন করতে সক্ষম যে সেই অসীম জ্ঞানের আঁধার, সর্বজ্ঞ স্রষ্টার জ্ঞানের তুলনায় তাদের জ্ঞান কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিতকর। যতই তাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়, ততই তাদের এই অনুভূতি তীব্রতর হয়। 'সত্য' অনুভূতির ক্ষমতা বিদ্যুৎ চমকের মত তাদের অন্তরে ধরা দেয়, তাদের মনের দিগন্তকে সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাই তারা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে সত্যকে অন্তরে ধারণ করার, অনুভব করার, হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য। তাদের অন্তর সর্বদা এ 'সত্য'কে স্মরণ করে যে পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আমাদের শেষ এবং চিরস্থায়ী গন্তব্যস্থল হচ্ছে মহান আল্লাহ্র কাছে প্রত্যাবর্তন।
রুকু - ২
৩৫০। সৃষ্টির আদি থেকেই পৃথিবীতে পাপ বর্তমান। দম্ভ, অহংকার, অন্যায়-অত্যাচার, মানুষকে 'সত্য' বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ফেরাউনদের জীবন। হযরত মুসার সময়ে আমরা দেখি ফেরাউনের দম্ভ, অহংকার, অন্যায় ও অত্যাচার সীমা অতিক্রম করে। ফেরাউন নির্ভর করতো তার বাহুবল, ক্ষমতা, সৈন্য-সামন্ত, ধন-সম্পদের উপরে। তার ক্ষমতার উৎস ছিল পার্থিব বিষয়বস্তু। সে কারণে সে আল্লাহর নবী হযরত মুসাকে ক্ষমতার দম্ভে ঠাট্টা তামাসা করতে সাহস করে এবং তার অনুগতদের অন্যায় ও অত্যাচার জর্জরিত করে। কিন্তু আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান। তিনি ইহুদীদের রক্ষা করেন এবং ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গীদের শাস্তি দান করেন।
[উপদেশঃ পার্থিব বিষয়বস্তু মানুষকে দাম্ভিক ও অহংকারী করে তোলে। ফলে তার অন্তরে সত্যের আলো প্রবেশে বাঁধা পায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন আত্মা মহৎ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না, ফলে সে হয় অন্যায়কারী ও অত্যাচারী। - অনুবাদক।]
সূরা আল-ইমরান
Page 1 of 16
সূরা আল-ইমরান বা ইমরানের পরিবার - ৩
আয়াত ২০০, রুকু ২০, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]
ভূমিকাঃ এই সূরাটি বাকারার সমগোত্রীয়। কিন্তু এখানে বিষয়বস্তুকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সুরাতে বদরের যুদ্ধ, রমজান মাস এবং ২য় হিজরী ও ওহুদের যুদ্ধ সওয়ালের মাস ৩য় হিজরী যুদ্ধের যে উল্লেখ করা হয়েছে, তা থেকে ঐসব অনুচ্ছেদের নাজিল হওয়ার সময় সম্পর্কে জ্ঞান দান করে।
সূরা বাকারার মত এই সূরাতে সাধারণভাবে মানব জাতির ধর্মীয় ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে, তবে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে কিতাবী জাতিসমূহের উপর। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করা হয়েছে নূতন মুসলিম উম্মতের আবির্ভাব, তাদের ধর্মানুষ্ঠান, আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি। সেই সাথে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সত্যর জন্য, ন্যায়ের জন্য যুদ্ধ করার উপরে; এবং উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বিশ্বাসীদের, তারা যেন সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে পথ নির্দেশের জন্য প্রার্থনা করে এবং আল্লাহর মঙ্গল ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এই সূরাতে নতুন যে বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে তা হচ্ছে; (১) খৃষ্টানদের নূতন ধর্ম গ্রহণের প্রতি আহবান করা হয়েছে। পূর্ববর্তী সূরাতে ইহুদীদের বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছিল, এ সুরাতে খৃষ্টানদের সেরূপ নূতন ধর্মের দিকে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। (২) মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য বদর এবং ওহুদের যুদ্ধ এক বিশেষ শিক্ষনীয় দৃষ্টান্ত; এবং (৩) জাতি হিসেবে মুসলমানদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে নির্দেশ দান করা হয়েছে এবং এই দায়িত্ব ও কর্তব্য তাদের সম্প্রদায়ের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঠিক সমভাবে প্রযোজ্য বহির্বিশ্বের আদান-প্রদান এবং অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
সার-সংক্ষেপ : আল্লাহ তাঁর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে, পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ সমূহের সত্যায়ন (Confirmation) করেছেন। আমরা এই পত্যাদেশ ভক্তি সহকারে গ্রহণ করবো। এই গ্রহণ করার অর্থ, এর বক্তব্য অনুধাবন করতে চেষ্টা করবো, এবং যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাবধারা বা আদর্শ প্রত্যাখ্যান করবো। [৩:১-২০]
পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা সম্পূর্ণ কিতাব প্রাপ্ত হয় নাই, তাঁরা অসম্পূর্ণ কিতাবপ্রাপ্ত জাতি। কিন্তু তারা যদি আল্লাহর এই সম্পূর্ণ প্রত্যাদেশকে প্রত্যাখান করে তবে বিশ্বাসীরা তাদের সঙ্গ পরিহার করবে। তাদের সময় শেষ। [৩:২১-৩০]
ইমরান [মেরীর পিতা] পরিবারের কাহিনী থেকে আমরা অবগত হই হযরত মুসার প্রতি প্রেরিত বিধি-বিধান, হযরত ঈসার জন্মের অলৌকিক রহস্য এবং তাঁর কার্যকাল [৩:৩১-৬৩]।
পৃথিবীতে আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রেরিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। সারা পৃথিবীর মানব জাতিকে এর ছায়াতলে আহবান করা হয়েছে। এই ধারাবাহিক প্রত্যাদেশ ইসলামে এসে সমাপ্তি লাভ করে। মুসলমানদের উপরে নির্দেশ হচ্ছে, ঐক্য এবং শৃঙ্খলার সাথে বসবাস করা, তা হলেই মুসলমানদের জন্য রয়েছে শত্রু পথের ক্ষতি থেকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার। তাদেরকে পরস্পরের জন্য বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করতে বলা হয়েছে [৩:৬৪-১২০]।
বদরের যুদ্ধে আল্লাহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কিভাবে তিনি সৎ গুণ সম্পন্ন (Virtuous) ব্যক্তিদের পক্ষ অবলম্বন করেন। ধৈর্য্য, অধ্যবসায় এবং শৃঙ্খলা সাফল্যের চাবিকাঠি। অপর পক্ষে ওহুদের যুদ্ধের শিক্ষা হচ্ছে হতাশ না হওয়া, নৈতিক গুণের চর্চা করা এবং মৃত্যু ও কষ্টকে অবজ্ঞা করা। [৩ : ১২১-১৪৮]
ওহুদের যুদ্ধের বিপর্যয়ের কারণ হলো কিছু লোকের উচ্ছৃঙ্খলতা, আবার কিছু লোকের স্বার্থপরতা ও সিদ্ধান্তের অভাব; আবার মুনাফিকদের কাপুরুষতা। কিন্তু কোন শত্রুই আল্লাহর পরিকল্পনাকে রুদ্ধ করতে পারে না। [৩ : ১৪৯-১৮০]
শত্রুদের উপহাসকে অবজ্ঞা কর। আল্লাহর এবাদত করতে হবে ঐকান্তিক আন্তরিকতা নিয়ে। তাঁর অনুগত বান্দাদের সাফল্য এবং সমৃদ্ধি দান করার তিনিই একমাত্র নিয়ামক শক্তি। [৩:১৮১-২০০]
সূরা আল-ইমরান বা ইমরানের পরিবার - ৩
আয়াত ২০০, রুকু ২০, মাদানী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]
০১। আলিফ - লাম - মীম।
০২। আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত, অন্য কোন উপাস্য নাই, তিনি চিরঞ্জীব, স্বনির্ভরশীল, অনাদি ও অনন্ত।
০৩। তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি [ধাপে ধাপে] কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যা উহার পূর্বের কিতাবকে সমর্থন করে। মানব জাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য ইতিপূর্বে তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন [মুসার] তাওরাত বা সারিয়া ৩৪৪ আইন, ও [ঈসার] ইঞ্জিল বা উপদেশ। এবং তিনি অবতীর্ণ করেছেন ফুরকান [যা ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্যকারী] ৩৪৫।
০২। আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত, অন্য কোন উপাস্য নাই, তিনি চিরঞ্জীব, স্বনির্ভরশীল, অনাদি ও অনন্ত।
০৩। তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি [ধাপে ধাপে] কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যা উহার পূর্বের কিতাবকে সমর্থন করে। মানব জাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য ইতিপূর্বে তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন [মুসার] তাওরাত বা সারিয়া ৩৪৪ আইন, ও [ঈসার] ইঞ্জিল বা উপদেশ। এবং তিনি অবতীর্ণ করেছেন ফুরকান [যা ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্যকারী] ৩৪৫।
৩৪৪। [এই সুরার ৩ নং ও ৪ নং আয়াত অনুবাদের সময় অনুবাদকগণের মধ্যে কেউ ৩নং আয়াতের শেষ অংশ পরবর্তী আয়াতের সাথে মিলিয়ে ৪নং আয়াত হিসাবে অনুবাদ করেছেন। এর বিপরীত কাজ করেছেন কেউ কেউ। মাওলানা ইউসুফ আলী সাহেব দ্বিতীয় সারির দলে।
৩৪৫। 'ফুরকান' - ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য মানদণ্ড। দেখুন [২ : ৫৩] এবং টিকা ৬৮।
০৪। যারা আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তারা কঠোর শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, দণ্ডদাতা।
০৫। নিশ্চয়ই আসমান যমীনের কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না।
০৬। তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় ৩৪৬।
০৫। নিশ্চয়ই আসমান যমীনের কিছুই আল্লাহর নিকট গোপন থাকে না।
০৬। তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় ৩৪৬।
৩৪৬। মাতৃগর্ভে প্রথম সৃষ্টির উন্মেষের সময় আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারও সাধ্য নাই তার রহস্য জানার। এখানে সৃষ্টি রহস্যের উল্লেখের মাধ্যমে হযরত ঈসার জন্মের গূঢ় রহস্যের প্রতি আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে [৩ : ৪১]।
০৭। তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এতে রয়েছে কিছু আয়াত যা মূল বা ভিত্তিস্বরূপ [বিধিবদ্ধ অর্থসহ]। এগুলিই কিতাবের মূল ভিত্তি ৩৪৭। অন্যগুলি হচ্ছে রূপক বর্ণনা। যাদের হৃদয়ে সত্যকে লংঘন করার প্রবণতা রয়েছে শুধু তারাই ফিত্না [বা সন্ত্রাস] ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে রূপক বর্ণনার অন্তর্নিহিত অর্থের অনুসন্ধান করে। কিন্তু আল্লাহ্ ব্যতীত আর কেহ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলে, "আমরা এই কিতাব বিশ্বাস করি। এর সমস্তই আমাদের প্রভুর নিকট থেকে আগত।" এবং বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যতীত অন্য কেউ এর শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারবে না।
৩৪৭। এই আয়াতটি কোরান শরীফ ব্যাখ্যাদানকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হচ্ছে কুরআনকে দু'অংশে বিভক্ত করা যায়। এই দ্বিধা বিভক্তি সম্পূর্ণ আলাদা আলাদাভাবে নয়। আল্লাহ্র বাণী সমস্ত কুরআন শরীফে ছড়ানো আছে। এই বাণীর নির্দেশসমূহকে আমরা বিভক্ত করতে পারি। (১) মূল অংশ বা "The mother of the book", (২) অপর অংশ যার অর্থ সুস্পষ্টরূপে বোধগম্য নয়। 'মূল' অংশের অর্থ সুস্পষ্ট। যে কোন লোক বোঝার চেষ্টা করলে বুঝতে পারে। কিন্তু অপর অংশ রূপক। এর অর্থ অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একদল লোককে দেখা যায় এই অংশ নিয়ে মাথা ঘামায় এবং এর ব্যাখ্যা করতে অধিক আগ্রহী, কিন্তু অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা বা এর ব্যাখ্যা করা সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, ভাব ভাষার উর্ধ্বে। এর প্রকৃত অর্থের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। যারা কুরআনের এই রূপক অংশ নিয়ে নিজেদের বিদ্যা জাহির করতে চায়, তারা সত্যকে লংঘন করার প্রবৃত্তি থেকেই তা করে। সাধারণ ব্যাখ্যাকারীগণ কুরআনের বিভিন্ন অংশ যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন যাপন [শারীয়া' বা Law] প্রণালী সম্বন্ধে উপদেশ দেয় তারই ব্যাখ্যা দান করেন। এটাই কোরানের মূল অংশ আর এ অংশ সাধারণের কাছেও সহজ এবং সরলভাবে বোধগম্য।০৮। [তারা বলে] "হে আমাদের প্রভু ! আমাদের সত্য পথ প্রদর্শনের পরে তুমি আমাদের অন্তরকে বিপথে যেতে দিও না। আমাদের তোমার অনুগ্রহ দান কর। নিশ্চয়ই তুমি সীমাহীন অনুগ্রহের মালিক।
০৯। "হে আমাদের প্রভু! এতে কোন সন্দেহ নাই যে, একদিন তুমি মানব জাতিকে একত্রে সমবেত করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন না।" ৩৪৯
০৯। "হে আমাদের প্রভু! এতে কোন সন্দেহ নাই যে, একদিন তুমি মানব জাতিকে একত্রে সমবেত করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন না।" ৩৪৯
৩৪৯। যারা জ্ঞানী এবং বিশ্বাসে অটল এ প্রার্থনা তাদেরই। যারা জ্ঞানে গভীর, শুধুমাত্র তারাই অনুধাবন করতে সক্ষম যে সেই অসীম জ্ঞানের আঁধার, সর্বজ্ঞ স্রষ্টার জ্ঞানের তুলনায় তাদের জ্ঞান কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিতকর। যতই তাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়, ততই তাদের এই অনুভূতি তীব্রতর হয়। 'সত্য' অনুভূতির ক্ষমতা বিদ্যুৎ চমকের মত তাদের অন্তরে ধরা দেয়, তাদের মনের দিগন্তকে সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত করে তোলে, তাই তারা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে সত্যকে অন্তরে ধারণ করার, অনুভব করার, হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য। তাদের অন্তর সর্বদা এ 'সত্য'কে স্মরণ করে যে পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আমাদের শেষ এবং চিরস্থায়ী গন্তব্যস্থল হচ্ছে মহান আল্লাহ্র কাছে প্রত্যাবর্তন।
রুকু - ২
১০। যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের ধন-সম্পদ ও [অগণিত] সন্তান-সন্তুতি আল্লাহ্র বিরুদ্ধে কোন কাজে আসবে না। এরাই হবে অগ্নির ইন্ধন।
১১। [তাদের দুঃখ দুর্দশা] ফের-আওনী সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীদের থেকে উন্নত হবে না ৩৫০। তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করেছিলো, ফলে আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদের শাস্তি দান করেছিলেন। আল্লাহ্ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর।
১১। [তাদের দুঃখ দুর্দশা] ফের-আওনী সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীদের থেকে উন্নত হবে না ৩৫০। তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করেছিলো, ফলে আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদের শাস্তি দান করেছিলেন। আল্লাহ্ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর।
৩৫০। সৃষ্টির আদি থেকেই পৃথিবীতে পাপ বর্তমান। দম্ভ, অহংকার, অন্যায়-অত্যাচার, মানুষকে 'সত্য' বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ফেরাউনদের জীবন। হযরত মুসার সময়ে আমরা দেখি ফেরাউনের দম্ভ, অহংকার, অন্যায় ও অত্যাচার সীমা অতিক্রম করে। ফেরাউন নির্ভর করতো তার বাহুবল, ক্ষমতা, সৈন্য-সামন্ত, ধন-সম্পদের উপরে। তার ক্ষমতার উৎস ছিল পার্থিব বিষয়বস্তু। সে কারণে সে আল্লাহর নবী হযরত মুসাকে ক্ষমতার দম্ভে ঠাট্টা তামাসা করতে সাহস করে এবং তার অনুগতদের অন্যায় ও অত্যাচার জর্জরিত করে। কিন্তু আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান। তিনি ইহুদীদের রক্ষা করেন এবং ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গীদের শাস্তি দান করেন।
[উপদেশঃ পার্থিব বিষয়বস্তু মানুষকে দাম্ভিক ও অহংকারী করে তোলে। ফলে তার অন্তরে সত্যের আলো প্রবেশে বাঁধা পায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন আত্মা মহৎ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না, ফলে সে হয় অন্যায়কারী ও অত্যাচারী। - অনুবাদক।]
