+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : প্রত্যাদেশ পুণরায় যাদের কাছে প্রেরণ করা হয় তাই হচ্ছে এই সূরার বিষয়বস্তু। কিন্তু এখানে নূতন বিষয়ের উপরে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রত্যাদেশ গ্রহণকারীরা প্রতিদিনের সাধারণ জীবন যাত্রার মাঝেও কিভাবে মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। অপরপক্ষে , দাম্ভিক ও লোভী ব্যক্তিরা কিভাবে তা প্রত্যাখান করেছিলো। সত্যকে প্রত্যাখানকারীদের সাথে পূণ্যাত্মাদের তুলনা করা হয়েছে।
সম্ভবতঃ কয়েকটি আয়াত বাদে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ হয় , হিজরতের অল্প কিছু আগে।
সারসংক্ষেপ : ফেরাউন ছিলো অন্যায়কারী , অত্যাচারী এবং উদ্ধত , অহংকারী। কিন্তু আল্লাহ্র পরিকল্পনা ছিলো দুর্বলকে রক্ষা করা। শৈশবেই মুসাকে আল্লাহর দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়। যৌবনে তিনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং আল্লাহ তাঁকে হেদায়েত করেন। নির্বাসিত জীবনেও তিনি লাভ করেন সাহায্য-সহযোগীতা ও ভালোবাসা। যখন তাঁকে কর্মক্ষেত্রে ডাকা হয় , আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন। [২৮ : ১-৪২]
ঠিক অনুরূপ ভাবে আল্লাহ্র নবী মুহম্মদের [ সা ] পূত পবিত্র আধ্যাত্মিক জীবন ছিলো আল্লাহ্র করুণায় বিধৌত। তাঁর নিকটই প্রেরিত প্রত্যাদেশকে পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ প্রাপ্তরা সনাক্ত করেন। তিনি আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন পুরাতন পবিত্র ভূমিতে, যা ছিলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে যারা নিমজ্জিত তাদের জন্য সাবধান বাণী। [ ২৮ : ৪৩ - ৬০ ]
সুন্দর ভবিষ্যত তাদের জন্যই যারা অনুতাপকারী , বিশ্বাসী এবং সৎকাজে অংশ গ্রহণকারী। কারণ সকল সত্য ও করুণার আঁধার এক আল্লাহ্। [ ২৮ : ৬১- ৭৫ ]
কিন্তু মানুষ ধনগর্বে অহংকারে স্ফীত হয় , যেমন কারূন হয়েছিলো। এদের শেষ পরিণতি মন্দ। অপরপক্ষে বিনয়ী ও পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্র করুণা লাভের সমর্থ হবে। [ ২৮ : ৭৬ - ৮৮ ]
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৩৩২৭। দেখুন আয়াত [২৬: ২ ] এবং টিকা ৩১৩৮।
৩৩২৮। হযরত মুসার কাহিনীর কিছু কিছু অংশ এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলি হচ্ছে : কিভাবে মুসার শৈশবে আল্লাহ্ তাঁর মাকে অনুপ্রাণীত করেন। মুসা যখন বড় হতে থাকেন, আল্লাহ্ কিভাবে তাঁকে মহত্তর ও বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য প্রস্তুত করেন। যৌবনে মুসা কিভাবে বিপদ বিপর্যয়ের মাঝে শুধুমাত্র আল্লাহ্র উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেন, শুধু তাঁরই সাহায্য কামনা করেন। কিভাবে তিনি নির্বাসনে পলায়ন করেও অপরের ভালোবাসা ও সাহায্য সহযোগীতা লাভ করেন তার ভালো কাজের দরুন। দায়িত্ব প্রাপ্তির পরে , আল্লাহ্র অনুগ্রহে কি ভাবে তিনি শত্রুদের পরিকল্পনা ধূলিস্যাৎ করেন। এ সব বর্ণনা দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্র পরিকল্পনা ক্রমাগত ধীরে ধীরে কাজ করে যাবে। যারা বিশ্বাসী ,তাঁরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্র হাতের স্পর্শ অনুভব করতে পারবে আত্মার মাঝে এবং প্রত্যাদেশের মাধ্যমে , যে আলো তাদের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাবে। এ সব কাহিনীর মাধ্যমে মুমিনদের আল্লাহ্র কার্যপ্রণালী অনুধাবনের উপদেশ দেয়া হয়েছে।
৩৩২৯। কোন রাজা বা প্রশাসক যখন এমন কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যা প্রজাদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ও অসন্তুষ্ট করে; বিশেষভাবে যদি প্রজাদের এক অংশকে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত করা হয়, তবে আল্লাহ্র চোখে সেই রাজা বা প্রশাসক তার কর্তব্য ত্যাগের জন্য দায়ী। একে আল্লাহ্ " অশান্তি সৃষ্টিকারী " রূপে বর্ণনা করেছেন ও তাঁর কুচক্রীদল তাদের জাতিগত মর্যদা ও পার্থিব সভ্যতার গর্বে, দম্ভ ও অহংকারে স্ফীত হয়ে ইসরাঈলীদের তুচ্ছ জ্ঞান করতো। ফলে ইহুদীদের তারা অত্যাচার ও নির্যাতন করতো। ফেরাউন ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসরাঈলীদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করা হবে, এবং মেয়ে সন্তানকে জীবিত রাখা হবে মিশরবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য। পরর্বতী আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে আল্লাহ্র ক্ষমতায় , মুসা কিরূপ অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়ে যান।
৩৩৩০। ফেরাউনের ইচ্ছা ছিলো ইসরাঈলীদের হীনবল করে ধ্বংস করা। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিলো ভিন্নরূপ। আল্লাহ্ চেয়েছিলেন ইসরাঈলীদের রক্ষা করতে, কারণ তারা ছিলো দুর্বল। আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিলো তিনি ইহুদীদের আল্লাহ্র ধর্মের রক্ষক ও নেতা রূপে নির্বাচন করবেন এবং তাদের " দুধ ও মধু প্রবাহিত দেশের [ Flowing with milk and honey ]" উত্তরাধীকারী করবেন। কার্যক্ষেত্রে ইসরাঈলীরা যতদিন আল্লাহ্র বিধান মেনে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করেছে ততদিন তারা সেখানে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
৩৩৩১। হামান ছিলেন ফেরাউনের মন্ত্রী। ওল্ড টেস্টামেন্টে [ Esther iii ] যে হামানের উল্লেখ আছে তার সাথে এই হামান এক নয়। ওল্ড টেস্টামেন্টের উল্লেখিত হামান ছিলেন পারস্যের রাজার Ahasuerus [ Xeres ] এর মন্ত্রী। এই রাজা গ্রীস আক্রমণ করেন এবং খৃষ্ট পূর্ব ৪৮৫ - ৪৬৪ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
৩৩৩২। বনী ইসরাঈলীদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধির কারণে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো। ফলে ফেরাউন তাদের ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা তো সফল হয়ই নাই উপরন্তু মুসার আহ্বানে তাদের উপরে প্লেগ রোগের প্রার্দুভাব হয় এবং হাজার হাজার লোক মারা যায় [ ৭ : ১৬৩ এবং টিকা ১০৯১ - ৯২ ]। আল্লাহ্ ফেরাউনের লোকদের ধ্বংস করেন কারণ তারা ছিলো উদ্ধত, অহংকারী এবং পাপে নিমজ্জিত। পলায়ণপর ইসরাঈলীদের অনুসরণ করতে যেয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীগণ ডুবে মারা যায়।তাদের সাবধানতা কোন কাজে আসলো না। সুতারাং ফেরাউন যে আশঙ্কা করেছিলো তা সত্যে পরিণত হলো। কারণ অত্যাচারী , অহংকারীদের শেষ পরিণতি হবে ধ্বংস। এই আল্লাহ্র বিধান। এই কাহিনীর এটাই নৈতিক উপদেশ।
৩৩৩৩। মিশরে ধাত্রীদের উপরে হুকুম ছিলো ইসরাঈলীদের ছেলে সন্তানকে জন্মের পরই মেরে ফেলার জন্য। হযরত মুসার জীবন এ থেকে গোপনে রক্ষা পায় এবং তাঁর মা তাঁকে বুকের দুধ খাইয়ে বড় করতে থাকেন। যখন আর মুসার উপস্থিতি গোপন রাখা সম্ভব ছিলো না , তখন মুসার মা তাঁকে একটি ঝুরিতে রেখে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন। ঝুড়িটি ভাসতে ভাসতে রাজার প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে থেমে থাকে। পরর্বতী আয়াতে বলা হয়েছে যে, সেখান থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। আল্লাহ্ মুসার মাতাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে তাঁর কোলে ফিরিয়ে দেবেন। বাস্তবে মুসা তাঁর মায়ের স্নেহের তত্বাবধানেই বড় হতে থাকেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহ্র নবী হন।
৩৩৩৪। "মুসা যেনো তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে।" এই আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, কিভাবে তাঁর দুরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, পরিকল্পনা কাজ করে। দুষ্ট ও পাপীরা তাদের দুরভিষন্ধির জাল নিক্ষেপ করে বিপক্ষের প্রতি, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে জাল তাদেরকেই বেষ্টন করে ফেলে , যে ভাবে তারা মুসাকে লালন-পালনের মাধ্যমে নিজেদের শাস্তির অস্ত্রকে নিজেরাই তৈরী করছিলো এবং শাণিত করেছিলো। অথবা অন্যদৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, মুসাকে আল্লাহ্ মিশরবাসীদের সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন যেনো তিনি সে সবের অন্তঃসারশূন্যতা ও প্রতারণার খেলা বুঝতে পারেন। এভাবেই আল্লাহ্র পরিকল্পনা আমাদের জীবনকে এক নির্দ্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি নিয়ে যায় যা হয়তো অনেক সময়েই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
৩৩৩৫। হযরত মুসা দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর। ফেরাউনের কোনও পুত্র সন্তান ছিলো না, শুধু একটি কন্যা ছিলো পরবর্তীতে যে কন্যা ফেরাউনের সিংহাসনের অংশ গ্রহণ করে। অনেকে মনে করেন এই ফেরাউন হচ্ছেন তুত্মাস।
৩৩৩৬। আল্লাহ্র পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা কি ভাবে কাজ করে তার অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ঐশ্বরিক বিচক্ষণতার পরিণামে দেখা যায় পাপী তার নিজস্ব কর্মের দ্বারাই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। শুধু তাই-ই নয়, পাপীর ইচ্ছা না থাকলেও অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও তারই কর্মের পরিণামে মন্দ অবদমিত হয়ে ভালো প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকে। হযরত মুসার কাহিনীর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যে বালক সম্পর্কে স্বপ্ন ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো এবং যার কারণে বনী ইসরাঈলীদের অসংখ্য নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করার আইন জারি করা হয়েছিলো , তাকে আল্লাহ্ এই ফেরাউনেরই গৃহে, তারই হাতে লালিত পালিত করলেন। এ ভাবেই বিস্ময়কর ভাবে আল্লাহ্র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা অসাধ্য। সে কারণে কোন দুর্যোগ বা বিপদে ধৈর্য্যহারা না হয়ে আল্লাহ্র প্রতি ভরসা রেখে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে। আজ যা বিপদের কালো মেঘ , আগামীতে তাই-ই হয়তো সফলতার স্বর্ণ উজ্জ্বল দিন হয়ে দেখা যাবে যার সংবাদ শুধু আল্লাহ্-ই জ্ঞাত।
সূরা কাসাস
Page 1 of 9
সূরা কাসাস বা বর্ণনা - ২৮
৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : প্রত্যাদেশ পুণরায় যাদের কাছে প্রেরণ করা হয় তাই হচ্ছে এই সূরার বিষয়বস্তু। কিন্তু এখানে নূতন বিষয়ের উপরে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রত্যাদেশ গ্রহণকারীরা প্রতিদিনের সাধারণ জীবন যাত্রার মাঝেও কিভাবে মহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। অপরপক্ষে , দাম্ভিক ও লোভী ব্যক্তিরা কিভাবে তা প্রত্যাখান করেছিলো। সত্যকে প্রত্যাখানকারীদের সাথে পূণ্যাত্মাদের তুলনা করা হয়েছে।
সম্ভবতঃ কয়েকটি আয়াত বাদে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ হয় , হিজরতের অল্প কিছু আগে।
সারসংক্ষেপ : ফেরাউন ছিলো অন্যায়কারী , অত্যাচারী এবং উদ্ধত , অহংকারী। কিন্তু আল্লাহ্র পরিকল্পনা ছিলো দুর্বলকে রক্ষা করা। শৈশবেই মুসাকে আল্লাহর দায়িত্ব প্রাপ্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়। যৌবনে তিনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং আল্লাহ তাঁকে হেদায়েত করেন। নির্বাসিত জীবনেও তিনি লাভ করেন সাহায্য-সহযোগীতা ও ভালোবাসা। যখন তাঁকে কর্মক্ষেত্রে ডাকা হয় , আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন। [২৮ : ১-৪২]
ঠিক অনুরূপ ভাবে আল্লাহ্র নবী মুহম্মদের [ সা ] পূত পবিত্র আধ্যাত্মিক জীবন ছিলো আল্লাহ্র করুণায় বিধৌত। তাঁর নিকটই প্রেরিত প্রত্যাদেশকে পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ প্রাপ্তরা সনাক্ত করেন। তিনি আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন পুরাতন পবিত্র ভূমিতে, যা ছিলো শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে যারা নিমজ্জিত তাদের জন্য সাবধান বাণী। [ ২৮ : ৪৩ - ৬০ ]
সুন্দর ভবিষ্যত তাদের জন্যই যারা অনুতাপকারী , বিশ্বাসী এবং সৎকাজে অংশ গ্রহণকারী। কারণ সকল সত্য ও করুণার আঁধার এক আল্লাহ্। [ ২৮ : ৬১- ৭৫ ]
কিন্তু মানুষ ধনগর্বে অহংকারে স্ফীত হয় , যেমন কারূন হয়েছিলো। এদের শেষ পরিণতি মন্দ। অপরপক্ষে বিনয়ী ও পূণ্যাত্মারা আল্লাহ্র করুণা লাভের সমর্থ হবে। [ ২৮ : ৭৬ - ৮৮ ]
সূরা কাসাস বা বর্ণনা - ২৮
৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। তা - সীন - মীম ;
০২। এগুলি কিতাবের আয়াত , যা [ সকল কিছু ] সুস্পষ্ট করে ৩৩২৭।
০২। এগুলি কিতাবের আয়াত , যা [ সকল কিছু ] সুস্পষ্ট করে ৩৩২৭।
৩৩২৭। দেখুন আয়াত [২৬: ২ ] এবং টিকা ৩১৩৮।
০৩। আমি তোমার নিকট মুসা ও ফিরআউনের কাহিনী যথাযথ ভাবে বর্ণনা করেছি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ৩৩২৮।
৩৩২৮। হযরত মুসার কাহিনীর কিছু কিছু অংশ এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলি হচ্ছে : কিভাবে মুসার শৈশবে আল্লাহ্ তাঁর মাকে অনুপ্রাণীত করেন। মুসা যখন বড় হতে থাকেন, আল্লাহ্ কিভাবে তাঁকে মহত্তর ও বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য প্রস্তুত করেন। যৌবনে মুসা কিভাবে বিপদ বিপর্যয়ের মাঝে শুধুমাত্র আল্লাহ্র উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেন, শুধু তাঁরই সাহায্য কামনা করেন। কিভাবে তিনি নির্বাসনে পলায়ন করেও অপরের ভালোবাসা ও সাহায্য সহযোগীতা লাভ করেন তার ভালো কাজের দরুন। দায়িত্ব প্রাপ্তির পরে , আল্লাহ্র অনুগ্রহে কি ভাবে তিনি শত্রুদের পরিকল্পনা ধূলিস্যাৎ করেন। এ সব বর্ণনা দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্র পরিকল্পনা ক্রমাগত ধীরে ধীরে কাজ করে যাবে। যারা বিশ্বাসী ,তাঁরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্র হাতের স্পর্শ অনুভব করতে পারবে আত্মার মাঝে এবং প্রত্যাদেশের মাধ্যমে , যে আলো তাদের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাবে। এ সব কাহিনীর মাধ্যমে মুমিনদের আল্লাহ্র কার্যপ্রণালী অনুধাবনের উপদেশ দেয়া হয়েছে।
০৪। ফেরাউন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিলো এবং সে [ দেশের ] অধিবাসীদের নানা দলে বিভক্ত করেছিলো ৩৩২৯। তাদের মধ্যে একটি দলকে সে অবদমিত করে রেখেছিলো। সে তাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো, কিন্তু তাদের কন্যাদের জীবিত রাখতো। অবশ্যই সে ছিলো অশান্তি সৃষ্টিকারী।
৩৩২৯। কোন রাজা বা প্রশাসক যখন এমন কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যা প্রজাদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে ও অসন্তুষ্ট করে; বিশেষভাবে যদি প্রজাদের এক অংশকে নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত করা হয়, তবে আল্লাহ্র চোখে সেই রাজা বা প্রশাসক তার কর্তব্য ত্যাগের জন্য দায়ী। একে আল্লাহ্ " অশান্তি সৃষ্টিকারী " রূপে বর্ণনা করেছেন ও তাঁর কুচক্রীদল তাদের জাতিগত মর্যদা ও পার্থিব সভ্যতার গর্বে, দম্ভ ও অহংকারে স্ফীত হয়ে ইসরাঈলীদের তুচ্ছ জ্ঞান করতো। ফলে ইহুদীদের তারা অত্যাচার ও নির্যাতন করতো। ফেরাউন ঘোষণা করেছিলেন যে, ইসরাঈলীদের সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করা হবে, এবং মেয়ে সন্তানকে জীবিত রাখা হবে মিশরবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য। পরর্বতী আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে আল্লাহ্র ক্ষমতায় , মুসা কিরূপ অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়ে যান।
০৫। এবং আমি ইচ্ছা করলাম যে, যাদের দেশের মধ্যে অবদমিত করা হয়েছিলো , তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে - তাদের [ ধর্মীয় ] নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধীকারী করতে ৩৩৩০।
৩৩৩০। ফেরাউনের ইচ্ছা ছিলো ইসরাঈলীদের হীনবল করে ধ্বংস করা। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিলো ভিন্নরূপ। আল্লাহ্ চেয়েছিলেন ইসরাঈলীদের রক্ষা করতে, কারণ তারা ছিলো দুর্বল। আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিলো তিনি ইহুদীদের আল্লাহ্র ধর্মের রক্ষক ও নেতা রূপে নির্বাচন করবেন এবং তাদের " দুধ ও মধু প্রবাহিত দেশের [ Flowing with milk and honey ]" উত্তরাধীকারী করবেন। কার্যক্ষেত্রে ইসরাঈলীরা যতদিন আল্লাহ্র বিধান মেনে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করেছে ততদিন তারা সেখানে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিলো।
০৬। দেশে তাদের ক্ষমতায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাউন, হামান, ৩৩৩১ ও তাদের বাহিনীকে সেই জিনিষ দেখাতে যার বিরুদ্ধে তারা সাবধানতা অবলম্বন করেছিলো ৩৩৩২।
৩৩৩১। হামান ছিলেন ফেরাউনের মন্ত্রী। ওল্ড টেস্টামেন্টে [ Esther iii ] যে হামানের উল্লেখ আছে তার সাথে এই হামান এক নয়। ওল্ড টেস্টামেন্টের উল্লেখিত হামান ছিলেন পারস্যের রাজার Ahasuerus [ Xeres ] এর মন্ত্রী। এই রাজা গ্রীস আক্রমণ করেন এবং খৃষ্ট পূর্ব ৪৮৫ - ৪৬৪ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
৩৩৩২। বনী ইসরাঈলীদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধির কারণে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো। ফলে ফেরাউন তাদের ধ্বংস করে দেবার পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা তো সফল হয়ই নাই উপরন্তু মুসার আহ্বানে তাদের উপরে প্লেগ রোগের প্রার্দুভাব হয় এবং হাজার হাজার লোক মারা যায় [ ৭ : ১৬৩ এবং টিকা ১০৯১ - ৯২ ]। আল্লাহ্ ফেরাউনের লোকদের ধ্বংস করেন কারণ তারা ছিলো উদ্ধত, অহংকারী এবং পাপে নিমজ্জিত। পলায়ণপর ইসরাঈলীদের অনুসরণ করতে যেয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীগণ ডুবে মারা যায়।তাদের সাবধানতা কোন কাজে আসলো না। সুতারাং ফেরাউন যে আশঙ্কা করেছিলো তা সত্যে পরিণত হলো। কারণ অত্যাচারী , অহংকারীদের শেষ পরিণতি হবে ধ্বংস। এই আল্লাহ্র বিধান। এই কাহিনীর এটাই নৈতিক উপদেশ।
০৭। সুতারাং আমি মুসার মায়ের প্রতি ওহী পাঠিয়েছিলাম যে, " [ তোমার শিশুকে ] স্তন্য দান কর। কিন্তু যখন তুমি তার সম্পর্কে আশংকা করবে তখন তাঁকে তুমি নদীতে নিক্ষেপ করবে ৩৩৩৩। কিন্তু ভয় পেয়ো না বা দুঃখিত হয়ো না। নিশ্চয়ই আমি তাঁকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেবো এবং আমি তাঁকে রাসুলদের মধ্যে একজন করবো।"
৩৩৩৩। মিশরে ধাত্রীদের উপরে হুকুম ছিলো ইসরাঈলীদের ছেলে সন্তানকে জন্মের পরই মেরে ফেলার জন্য। হযরত মুসার জীবন এ থেকে গোপনে রক্ষা পায় এবং তাঁর মা তাঁকে বুকের দুধ খাইয়ে বড় করতে থাকেন। যখন আর মুসার উপস্থিতি গোপন রাখা সম্ভব ছিলো না , তখন মুসার মা তাঁকে একটি ঝুরিতে রেখে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেন। ঝুড়িটি ভাসতে ভাসতে রাজার প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে থেমে থাকে। পরর্বতী আয়াতে বলা হয়েছে যে, সেখান থেকে তাকে তুলে নেয়া হয়। আল্লাহ্ মুসার মাতাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে তাঁর কোলে ফিরিয়ে দেবেন। বাস্তবে মুসা তাঁর মায়ের স্নেহের তত্বাবধানেই বড় হতে থাকেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহ্র নবী হন।
০৮। অতঃপর ফেরাউনের লোকজনে তাঁকে [ নদী থেকে ] উঠিয়ে নিল [ এই অভিপ্রায়ে যে মুসা ] যেনো তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে ৩৩৩৪। ফেরাউন ও হামান এবং তাদের [ সকল ] লোক লষ্কর ছিলো পাপী।
৩৩৩৪। "মুসা যেনো তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হতে পারে।" এই আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহ্ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, কিভাবে তাঁর দুরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, পরিকল্পনা কাজ করে। দুষ্ট ও পাপীরা তাদের দুরভিষন্ধির জাল নিক্ষেপ করে বিপক্ষের প্রতি, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সে জাল তাদেরকেই বেষ্টন করে ফেলে , যে ভাবে তারা মুসাকে লালন-পালনের মাধ্যমে নিজেদের শাস্তির অস্ত্রকে নিজেরাই তৈরী করছিলো এবং শাণিত করেছিলো। অথবা অন্যদৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, মুসাকে আল্লাহ্ মিশরবাসীদের সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন যেনো তিনি সে সবের অন্তঃসারশূন্যতা ও প্রতারণার খেলা বুঝতে পারেন। এভাবেই আল্লাহ্র পরিকল্পনা আমাদের জীবনকে এক নির্দ্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি নিয়ে যায় যা হয়তো অনেক সময়েই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
০৯। ফেরাউনের স্ত্রী বলেছিলো, " [ এই শিশু ] আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী ৩৩৩৫। ওকে হত্যা করো না। এমনও হতে পারে যে, সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করতে পারবো।" বস্তুতঃ তারা অনুধাবন করতে পারে নাই [কি তাদের কাজের পরিণাম ] ৩৩৩৬।
৩৩৩৫। হযরত মুসা দেখতে ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর। ফেরাউনের কোনও পুত্র সন্তান ছিলো না, শুধু একটি কন্যা ছিলো পরবর্তীতে যে কন্যা ফেরাউনের সিংহাসনের অংশ গ্রহণ করে। অনেকে মনে করেন এই ফেরাউন হচ্ছেন তুত্মাস।
৩৩৩৬। আল্লাহ্র পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা কি ভাবে কাজ করে তার অনুধাবন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ঐশ্বরিক বিচক্ষণতার পরিণামে দেখা যায় পাপী তার নিজস্ব কর্মের দ্বারাই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। শুধু তাই-ই নয়, পাপীর ইচ্ছা না থাকলেও অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও তারই কর্মের পরিণামে মন্দ অবদমিত হয়ে ভালো প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকে। হযরত মুসার কাহিনীর মাধ্যমে এই চিরন্তন সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যে বালক সম্পর্কে স্বপ্ন ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিলো এবং যার কারণে বনী ইসরাঈলীদের অসংখ্য নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করার আইন জারি করা হয়েছিলো , তাকে আল্লাহ্ এই ফেরাউনেরই গৃহে, তারই হাতে লালিত পালিত করলেন। এ ভাবেই বিস্ময়কর ভাবে আল্লাহ্র সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা অসাধ্য। সে কারণে কোন দুর্যোগ বা বিপদে ধৈর্য্যহারা না হয়ে আল্লাহ্র প্রতি ভরসা রেখে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে। আজ যা বিপদের কালো মেঘ , আগামীতে তাই-ই হয়তো সফলতার স্বর্ণ উজ্জ্বল দিন হয়ে দেখা যাবে যার সংবাদ শুধু আল্লাহ্-ই জ্ঞাত।
