+
-
R
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এই সূরাটি পূর্ববর্তী সূরা ও পরবর্তী দুইটি সূরার সমপ্রকৃতির । এই সূরাটির সময়ের ক্রমপঞ্জি মধ্য মক্কান।
হযরত মুসার কাহিনীর পবিত্র আগুন, সাদা উজ্জ্বল হাত , লাঠি, সুলাইমানের কাহিনীর পাখীর ভাষা , মানুষ ও জ্বীনের ভীড়ে ক্ষুদ্র পিপীলিকার আত্মরক্ষার প্রয়াস ,হুপী পাখী ও সেবার রাণী ; সালেহ্র কাহিনীর নয়জন দুষ্ট লোকের পরাজয়; লূতের কাহিনীর প্রকাশ্য পাপ; আমাদের সত্য ও মিথ্যা উপাস্যের পার্থক্য শিক্ষা দেয়া ও আল্লাহ্র করুণা ও প্রত্যাদেশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সূরা।
সার সংক্ষেপ : হযরত মুসার দৃষ্ট পবিত্র আগুন আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের মতই এক অলৌকিক ঘটনা। পবিত্র আলো ছিলো আল্লাহ্র মহিমার প্রকাশের ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র। [ ২৭ : ১ - ১৪ ]।
সুলাইমান পাখীর ভাষা বুঝতে পারতেন। তাঁর অধীনে বিশাল জ্বিনের ও মানুষের বাহিনী ছিলো। ক্ষুদ্র ও জ্ঞানী পিপীলিকা সুলাইমানের বাহিনীর অজ্ঞানতাপ্রসূত ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার উপায় অবলম্বন করে। হুপী পাখী তার তালিকাভূক্তির হাজিরা থেকে অনুপস্থিত থাকা সত্বেও সুলাইমানের জন্য কাজ করেছে। সেবার রাণীর বিরাট রাজত্ব ছিলো; কিন্তু তবুও সে জ্ঞানী সুলাইমানের নিকট আত্মসমর্পন করে। [ ২৭ : ১৫ - ৪৪ ]
সালেহ্ নবীর কাহিনীতে নির্বোধেরাই মঙ্গল চিহ্নকে মন্দ ভাগ্যরূপে চিহ্নিত করে। লূতের কাহিনীতে বিকৃত পাপকে প্রকাশ্য করে। কিন্তু পাপীদের সকল পরিকল্পনা ও ক্রোধ আল্লাহ্ ধ্বংস করে দেন। [ ২৭ : ৪৫ - ৫৮ ]
আল্লাহ্র মহিমা ও কল্যাণ সৃষ্টির সকল কিছুর উর্দ্ধে। শেষ পর্যন্ত সত্যের ও প্রকৃত মূল্যবোধের নিকট অবিশ্বাস নতি স্বীকার করবে। সুতারাং আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ অনুসরণ কর, আল্লাহ্র সেবা কর এবং তাঁর প্রতি সর্ব বিশ্বাস স্থাপন কর। [ ২৭ : ৫৯ - ৯৩ ]
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
৩২৪০। এগুলির অর্থ একমাত্র প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্-ই জানেন।
৩২৪১। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে তিনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে :
১) প্রত্যাদেশ আমাদের জ্ঞাত করে আল্লাহ্র অপার মহিমা ও করুণা, আল্লাহ্র গুণাবলী , স্রষ্টার সাথে আমাদের এবং বিশ্বচরাচরের সম্পর্ক।
২) প্রত্যাদেশের অর্থাৎ কোরাণের আয়াতের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনে চলার পথের নির্দ্দেশ খুঁজে পাই। আমাদের জীবন পথের সঠিক নির্দ্দেশনার মানদণ্ড এই কোরাণ। সঠিক পথ নির্দ্দেশ ও পাপকে সনাক্ত করণের উপায় হচ্ছে আল্লাহ্র আয়াত বা প্রত্যাদেশ।
৩) যারা আল্লাহ্র পথ নির্দ্দেশকে জীবনে গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্য আছে আল্লাহ্র ক্ষমা , আত্মিক পরিশুদ্ধতা ও আত্মার মুক্তির সুসংবাদ।
৩২৪২। যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধানকে প্রত্যাখান করে এবং পাপের পথে নিজেকে পরিচালিত করে , তাদের নিজেদের কর্মকে তাদের নিজের চোখে অতিশয় মনোহর বলে মনে হবে এবং তারা আত্মগর্বে বিমোহিত থাকবে। এই হচ্ছে বিধির বিধান। যদিও তাদের কৃতকর্ম অন্য কেউ পছন্দ করবে না, কিন্তু পাপীদের চোখে নিজস্ব পাপকে স্বীয় সাফল্যের মানদন্ডরূপে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহ্ তা তাদের চোখে শোভন করেন। কারণ যেহেতু তারা আল্লাহ্ প্রদত্ত পথকে প্রত্যাখান করেছে, সেহেতু আল্লাহ্ তাদের গৃহীত পাপের পথকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দেন। অন্যায় ও পাপকে তখন আর তাদের ধারণায় অন্যায় ও পাপ বলে বোধ হয় না। ন্যায় ও সত্য তাদের চোখে মনে হবে হাস্যস্কর ব্যাপার মাত্র। আল্লাহ্ তাদের অনুতাপ করার জন্য আরও সুযোগ দান করেন। কিন্তু এসব পাপীরা আর সুপথে ফিরে আসে না , তারা তাদের নিজস্ব কল্পনা ও খেয়ালেরই অনুসরণ করে থাকে। ফলে তারা আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিভ্রান্তকর অবস্থায় পৌঁছে যায়। এই বিশ্বচরাচরের সকল কিছুই এক স্রষ্টার আদেশ মান্য করে চলেছে। মানুষকেও সেই একই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই নশ্বর দেহের মাঝে যে অমর আত্মার বাস তার ধর্মই হচ্ছে এক আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, আয়াতে (৫১:৫৬) বলা হয়েছে " আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি এজন্য যে, তারা শুধু আমারই এবাদত করবে।" যখন সে আল্লাহ্ প্রদত্ত পথ নির্দ্দেশকে উপেক্ষা করে পাপের পথে ধাবিত হয় , তখন সে তার আদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়। ফলে আত্মা হয় পথ ভ্রান্ত , বিভ্রান্ত ও স্ব ধর্মচ্যুত। কারণ আত্মার জন্য তখন অনুসরণযোগ্য কোনও নির্দ্দিষ্ট মানদণ্ড তখন থাকে না। আত্মার প্রকৃত গুণাবলী নষ্ট হয়ে যায় , সেই আত্মা বিশ্বস্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা হারায়। উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করবো : স্বচ্ছ সলিল সে কোনও বস্তুর ময়লাধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দেয়। কিন্তু সেই পানিই যদি ড্রেনের ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি হয়, তবে তা পরিষ্কার করার যোগ্যতা হারায় - যদিও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সে পানিরও মূল উপাদান ঐ স্বচ্ছ পানির ন্যায়।
সেই রূপ পাপে আসক্ত আত্মা - ঐ ড্রেনের পানির সমতুল্য , যার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায় , ফলে সে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা হারায়।
৩২৪৩। সব কাজেরই মূল্যায়ন ঘটে শেষ যোগফলের মাধ্যমে। এ সব পাপী আত্মার শেষ পরিণতি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পরলোকে যখন হিসাবের জন্য এ সব আত্মাকে উপস্থিত করা হবে, তখন দেখা যাবে তারা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন। পার্থিব জগতের পাপ কাজ তাদের যে আত্মপ্রসাদ ও পরিতৃপ্তি দান করতো তার শেষ পরিণতি হবে সর্বাধিক ক্ষতি।
৩২৪৪। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ২০: ৯ - ২৪ ]। উল্লেখিত আয়াতগুলি এবং এই আয়াতে যে আগুনের উল্লেখ আছে তা হচ্ছে হযরত মুসার হৃদয়ে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পাওয়ার ঊষালগ্নের বিবরণ। পূর্বের বর্ণনায় যার উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা আনুসঙ্গিক টিকাতে দ্রষ্টব্য। এই আয়াতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ঐশ্বরিক আগুনের প্রকৃতির উপরে এবং বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে হযরত মুসা ঐশ্বরিক আলোতে অবগাহন করে পরিবর্তিত মানুষে রূপান্তরিত হন। বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মুসা পরিবার পরিজন সহ সিনাই উপত্যকাতে পরিভ্রমণ করছিলেন। তিনি আলো উষ্ণতার জন্য সাধারণ আগুনের অন্বেষণে ছিলেন - কিন্তু আল্লাহ্ তাঁকে সর্বোচ্চ আলো ও আল্লাহ্ প্রেমের উষ্ণতা দান করেন যা ছিলো আল্লাহ্র নৈকট্য এবং আল্লাহ্র অলৌকিক নিদর্শন। আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ কোনও অলৌকিক বা আকস্মিক ঘটনা নয়। ব্যক্তির আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতাই হচ্ছে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায়। মানুষের আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা হচ্ছে মানুষের অন্তরের ইতিহাস। পৃথিবীর মানদন্ডে ক্ষমতা অবস্থান যা ব্যক্তিকে সাধারণ মানুষের চোখে সম্মানীয় ও স্মরণীয় হতে সাহায্য করে, তার সাথে আত্মিক পরিশুদ্ধতার কোনও যোগসূত্র নাই। আত্মিক শুদ্ধতা হচ্ছে একমাত্র মানদন্ড যা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের একান্ত নিজস্ব ইতিহাস। হযরত মুসা আধ্যাত্মিক আলো লাভের পূর্বেই সেই পরিশুদ্ধতা লাভ করেন।
৩২৪৫। তফসীরকারগণ মনে করেন যে, এটা কোনও জাগতিক আগুন নয় , এটা ছিলো স্বর্গীয় আলোর বিচ্ছুরণ , আল্লাহ্র নূরের প্রকাশ।
৩২৪৬। হযরত মুসা এখন এক সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষ। স্বর্গীয় আলোর স্পর্শে তিনি আত্মিক দিক থেকে এক নূতন পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছেন। যা তিনি মনে করেছিলেন সাধারণ আগুন তা ছিলো স্বর্গীয় আলোর বিচ্ছুরণ। জাগতিক জীবনের মলিনতার উর্দ্ধে ঐশ্বরিক আলোর ভূবনে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঐশ্বরিক আলোর মাধ্যমে তিনি দিব্যজ্ঞান ও ক্ষমতা লাভ করেন। তাঁর মেষ চরানোর সাধারণ লাঠি আর প্রাণহীন লাঠিমাত্র ছিলো না। তা রূপান্তরিত হয় জীবন্ত প্রাণীতে। জীবনের সকল অনুভব সে লাঠিতে বিরাজ করে। ঠিক সেই রকম স্বর্গীয় আলোর সংস্পর্শে হযরত মুসা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষে পরিণত হন। মুসার পরিবর্তন বর্ণনা করা হয়েছে পরবর্তী টিকাতে।
৩২৪৭। হযরত মুসা এখন সম্পূর্ণ নূতন এক আধ্যাত্মিক জগতে আগমন করেছেন। এই নূতন জগতের অপূর্ব সৌন্দর্য ও আলোর ঝলকানি তাঁকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। অন্ধকার থেকে আলোতে হঠাৎ প্রবেশ কালে চক্ষুকে যেরূপ আলোর সাথে বিন্যস্ত করে নিতে হয়, সেরূপ আধ্যাত্মিক ভাবে ঐশ্বরিক আলোতে আলোকিত উদ্ভাসিত জগতের সাথে সামঞ্জস্য বিধানে মুসাকে চেষ্টা করতে হয়। প্রাণহীন লাঠি সাপে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে তিনি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। যদিও লাঠিটি ছিলো তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী, মেষ চারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ। এখন হযরত মুসার কর্মক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়েছে। মেষ পাল পরিচালনার পরিবর্তে এখন তাঁকে ইসরাঈলীদের রাসুল রূপে প্রেরণ করা হবে ; তাই তাঁর লাঠিকেও পরিবর্তিত কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করা হয়। সুতারাং তাঁর মন থেকে সকল ভয় দূর করতে বলা হয় - কারণ তিনি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্বাচিত ব্যক্তি।
৩২৪৮। মিশরে অবস্থান কালে হযরত মুসা দুর্ঘটনাক্রমে একজন মিশরবাসীকে হত্যা করে ফেলেন। [ দেখুন টিকা ৩১৪৬ এবং আয়াত ২৬ : ১৪ ] যদিও হত্যাটি সংঘটিত হয় অত্যাচারীকে প্রতিরোধ এবং নির্যাতিতকে রক্ষা কল্পে; তবে তা ছিলো একটি দুর্ঘটনা বই আর কিছু নয়। তবুও সেই পাপ থেকে হযরত মুসার পরিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আল্লাহ্ তাঁকে শুধু ক্ষমাই করেন নাই তাঁকে আরও অলৌকিক ক্ষমতা দান করেন। এই আয়াতটি যদিও হযরত মুসার নবুয়ত পাওয়ার প্রেক্ষিতে বর্ণনা করা হয়েছে , কিন্তু এর আবেদন সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। যদি কেউ জুলুম করে, অর্থাৎ আত্মার প্রতি জুলুম করে। আত্মার প্রতি জুলুম , তখনই ঘটে যখন কেউ পাপ কাজে আসক্ত হয়ে যায়। যদি কেউ পাপ করে তখন সে নিজ আত্মার প্রতি জুলুম করে। পরবর্তীতে যদি সে অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে সৎ ও ভালো কাজে নিয়োজিত করে তবে পরম করুণাময় আল্লাহ্ তার প্রতি ক্ষমাশীল। বিশ্ব মানবের জন্য এ এক মহান বার্তা।
৩২৪৯। দেখুন আয়াত [ ২০: ২২ ] যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে , "Draw thy hand close to thy side" হাতের প্রাকৃতিক ধর্মের দিক থেকে উপরের বর্ণনা ও এই আয়াতের বর্ণনার মধ্যে খুব বেশী পার্থক্য নাই। কারণ হাতের যে বৈশিষ্ট্য তা উভয় আয়াতে একই রূপ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মুসার পোষাক ছিলো ঢিলা ঢোলা - প্রাচীন যুগের লোকদের যেরূপ থাকতো। যদি তিনি তাঁর ডান হাতকে ঢিলা পোষাকের ডান দিক দিয়ে প্রবেশ করান , তবে তা বুকের বাঁ দিকে পৌঁছাবে। অনুরূপ ভাবে বাঁ হাত ডান দিকে পৌঁছাবে। সুতারাং দুইটি আয়াতেরই বর্ণনা সামঞ্জস্যপূর্ণ। যখন হযরত মুসা হাতকে বের করে আনেন তখন তা উজ্জ্বল সাদা আলো বিচ্ছুরণ করে। সাধারণভাবে শরীরের কোনও অংশ সাদা হওয়াকে শ্বেত কুষ্ঠের পরিণতি হিসেবে পরিগণিত করা হয়। কিন্তু এখানের সাদা ছিলো ঠিক তার বিপরীত। এই সাদা ছিলো পূত পবিত্রতা ও স্বর্গীয় আলোর প্রতীক।
৩২৫০। নয়টি নিদর্শনের জন্য দেখুন টিকা ১০৯১ এবং আয়াত [ ৭ : ১৩৩ ]।
৩২৫১। যদি ফেরাউনের লোকেরা প্রকৃত সত্যকে অনুধাবন করতে চাইত, তবে হযরত মুসার নিকট প্রেরিত আল্লাহ্র স্পষ্ট নিদর্শন সমূহ তাদের জ্ঞান চক্ষুকে উন্মীলনে সাহায্য করতো। কিন্তু যারা জ্ঞান পাপী, বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন , তারা সত্যকে তাদের হৃদয়ে অনুধাবন করলেও তা গ্রহণ করে না। সত্যকে তাদের হৃদয়ে অনুভব করে; কিন্তু উদ্ধতভাবে তারা সত্যকে বা আল্লাহ্র নিদর্শনকে প্রত্যাখান করে। তাদের অন্তর এগুলিকে সত্য বলে অনুধাবন করলেও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এভাবেই তারা তাদের বিবেককে অন্যায় ও অসত্যের নীচে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে। এ ভাবেই তারা তাদের পাপের পাত্র পূর্ণ করে। এরাই হলো বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ফেরাউনের উদাহরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে সর্বযুগে বিপর্যয়কারী এ সব লোকের কথাই বলা হয়েছে।
সূরা নাম্ল
Page 1 of 8
সূরা নাম্ল বা পিপড়া - ২৭
৯৩ আয়াত, ৭ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : এই সূরাটি পূর্ববর্তী সূরা ও পরবর্তী দুইটি সূরার সমপ্রকৃতির । এই সূরাটির সময়ের ক্রমপঞ্জি মধ্য মক্কান।
হযরত মুসার কাহিনীর পবিত্র আগুন, সাদা উজ্জ্বল হাত , লাঠি, সুলাইমানের কাহিনীর পাখীর ভাষা , মানুষ ও জ্বীনের ভীড়ে ক্ষুদ্র পিপীলিকার আত্মরক্ষার প্রয়াস ,হুপী পাখী ও সেবার রাণী ; সালেহ্র কাহিনীর নয়জন দুষ্ট লোকের পরাজয়; লূতের কাহিনীর প্রকাশ্য পাপ; আমাদের সত্য ও মিথ্যা উপাস্যের পার্থক্য শিক্ষা দেয়া ও আল্লাহ্র করুণা ও প্রত্যাদেশের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই সূরা।
সার সংক্ষেপ : হযরত মুসার দৃষ্ট পবিত্র আগুন আল্লাহ্র প্রত্যাদেশের মতই এক অলৌকিক ঘটনা। পবিত্র আলো ছিলো আল্লাহ্র মহিমার প্রকাশের ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র। [ ২৭ : ১ - ১৪ ]।
সুলাইমান পাখীর ভাষা বুঝতে পারতেন। তাঁর অধীনে বিশাল জ্বিনের ও মানুষের বাহিনী ছিলো। ক্ষুদ্র ও জ্ঞানী পিপীলিকা সুলাইমানের বাহিনীর অজ্ঞানতাপ্রসূত ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার উপায় অবলম্বন করে। হুপী পাখী তার তালিকাভূক্তির হাজিরা থেকে অনুপস্থিত থাকা সত্বেও সুলাইমানের জন্য কাজ করেছে। সেবার রাণীর বিরাট রাজত্ব ছিলো; কিন্তু তবুও সে জ্ঞানী সুলাইমানের নিকট আত্মসমর্পন করে। [ ২৭ : ১৫ - ৪৪ ]
সালেহ্ নবীর কাহিনীতে নির্বোধেরাই মঙ্গল চিহ্নকে মন্দ ভাগ্যরূপে চিহ্নিত করে। লূতের কাহিনীতে বিকৃত পাপকে প্রকাশ্য করে। কিন্তু পাপীদের সকল পরিকল্পনা ও ক্রোধ আল্লাহ্ ধ্বংস করে দেন। [ ২৭ : ৪৫ - ৫৮ ]
আল্লাহ্র মহিমা ও কল্যাণ সৃষ্টির সকল কিছুর উর্দ্ধে। শেষ পর্যন্ত সত্যের ও প্রকৃত মূল্যবোধের নিকট অবিশ্বাস নতি স্বীকার করবে। সুতারাং আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ অনুসরণ কর, আল্লাহ্র সেবা কর এবং তাঁর প্রতি সর্ব বিশ্বাস স্থাপন কর। [ ২৭ : ৫৯ - ৯৩ ]
সূরা নাম্ল বা পিপড়া - ২৭
৯৩ আয়াত, ৭ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। তা - সীন্ ৩২৪০। এইগুলি আল্ কুর-আনের আয়াত - যে কিতাব [সকল বিষয় ] সুস্পষ্ট করে।
৩২৪০। এগুলির অর্থ একমাত্র প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্-ই জানেন।
০২। যা বিশ্বাসীদের পথ নির্দ্দেশ ও সুসংবাদ ৩২৪১,-
০৩। যারা নিয়মিত নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, এবং পরকালের প্রতি স্থির বিশ্বাস রাখে।
০৩। যারা নিয়মিত নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, এবং পরকালের প্রতি স্থির বিশ্বাস রাখে।
৩২৪১। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে তিনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে :
১) প্রত্যাদেশ আমাদের জ্ঞাত করে আল্লাহ্র অপার মহিমা ও করুণা, আল্লাহ্র গুণাবলী , স্রষ্টার সাথে আমাদের এবং বিশ্বচরাচরের সম্পর্ক।
২) প্রত্যাদেশের অর্থাৎ কোরাণের আয়াতের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনে চলার পথের নির্দ্দেশ খুঁজে পাই। আমাদের জীবন পথের সঠিক নির্দ্দেশনার মানদণ্ড এই কোরাণ। সঠিক পথ নির্দ্দেশ ও পাপকে সনাক্ত করণের উপায় হচ্ছে আল্লাহ্র আয়াত বা প্রত্যাদেশ।
৩) যারা আল্লাহ্র পথ নির্দ্দেশকে জীবনে গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্য আছে আল্লাহ্র ক্ষমা , আত্মিক পরিশুদ্ধতা ও আত্মার মুক্তির সুসংবাদ।
০৪। যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের দৃষ্টিতে আমি তাদের কর্মকে শোভন করেছি ৩২৪২। সুতারাং তারা বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়।
৩২৪২। যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধানকে প্রত্যাখান করে এবং পাপের পথে নিজেকে পরিচালিত করে , তাদের নিজেদের কর্মকে তাদের নিজের চোখে অতিশয় মনোহর বলে মনে হবে এবং তারা আত্মগর্বে বিমোহিত থাকবে। এই হচ্ছে বিধির বিধান। যদিও তাদের কৃতকর্ম অন্য কেউ পছন্দ করবে না, কিন্তু পাপীদের চোখে নিজস্ব পাপকে স্বীয় সাফল্যের মানদন্ডরূপে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহ্ তা তাদের চোখে শোভন করেন। কারণ যেহেতু তারা আল্লাহ্ প্রদত্ত পথকে প্রত্যাখান করেছে, সেহেতু আল্লাহ্ তাদের গৃহীত পাপের পথকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করে দেন। অন্যায় ও পাপকে তখন আর তাদের ধারণায় অন্যায় ও পাপ বলে বোধ হয় না। ন্যায় ও সত্য তাদের চোখে মনে হবে হাস্যস্কর ব্যাপার মাত্র। আল্লাহ্ তাদের অনুতাপ করার জন্য আরও সুযোগ দান করেন। কিন্তু এসব পাপীরা আর সুপথে ফিরে আসে না , তারা তাদের নিজস্ব কল্পনা ও খেয়ালেরই অনুসরণ করে থাকে। ফলে তারা আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিভ্রান্তকর অবস্থায় পৌঁছে যায়। এই বিশ্বচরাচরের সকল কিছুই এক স্রষ্টার আদেশ মান্য করে চলেছে। মানুষকেও সেই একই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই নশ্বর দেহের মাঝে যে অমর আত্মার বাস তার ধর্মই হচ্ছে এক আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, আয়াতে (৫১:৫৬) বলা হয়েছে " আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি এজন্য যে, তারা শুধু আমারই এবাদত করবে।" যখন সে আল্লাহ্ প্রদত্ত পথ নির্দ্দেশকে উপেক্ষা করে পাপের পথে ধাবিত হয় , তখন সে তার আদি ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়। ফলে আত্মা হয় পথ ভ্রান্ত , বিভ্রান্ত ও স্ব ধর্মচ্যুত। কারণ আত্মার জন্য তখন অনুসরণযোগ্য কোনও নির্দ্দিষ্ট মানদণ্ড তখন থাকে না। আত্মার প্রকৃত গুণাবলী নষ্ট হয়ে যায় , সেই আত্মা বিশ্বস্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা হারায়। উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করবো : স্বচ্ছ সলিল সে কোনও বস্তুর ময়লাধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দেয়। কিন্তু সেই পানিই যদি ড্রেনের ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি হয়, তবে তা পরিষ্কার করার যোগ্যতা হারায় - যদিও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সে পানিরও মূল উপাদান ঐ স্বচ্ছ পানির ন্যায়।
সেই রূপ পাপে আসক্ত আত্মা - ঐ ড্রেনের পানির সমতুল্য , যার পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায় , ফলে সে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের যোগ্যতা হারায়।
০৫। এদের জন্যই [ অপেক্ষা করছে ] ভয়াবহ শাস্তি। এবং পরকালে রয়েছে আরও অধিক ক্ষতি ৩২৪৩।
৩২৪৩। সব কাজেরই মূল্যায়ন ঘটে শেষ যোগফলের মাধ্যমে। এ সব পাপী আত্মার শেষ পরিণতি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পরলোকে যখন হিসাবের জন্য এ সব আত্মাকে উপস্থিত করা হবে, তখন দেখা যাবে তারা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন। পার্থিব জগতের পাপ কাজ তাদের যে আত্মপ্রসাদ ও পরিতৃপ্তি দান করতো তার শেষ পরিণতি হবে সর্বাধিক ক্ষতি।
০৬। তোমার জন্য, কুর-আনকে অবতীর্ণ করা হয়েছে প্রজ্ঞাময় এবং সর্বজ্ঞের নিকট থেকে।
০৭। স্মরণ কর! মুসা তাঁর পরিবারকে বলেছিলো,৩২৪৪: " আমি আগুনের [ অস্তিত্ব ] উপলব্ধি করছি। শীঘ্রই আমি ঐ স্থান থেকে তোমাদের জন্য কোন সংবাদ অথবা, তোমাদের জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার আনবো যা হবে তোমাদের উষ্ণ করার জন্য জ্বালানী।
০৭। স্মরণ কর! মুসা তাঁর পরিবারকে বলেছিলো,৩২৪৪: " আমি আগুনের [ অস্তিত্ব ] উপলব্ধি করছি। শীঘ্রই আমি ঐ স্থান থেকে তোমাদের জন্য কোন সংবাদ অথবা, তোমাদের জন্য জ্বলন্ত অঙ্গার আনবো যা হবে তোমাদের উষ্ণ করার জন্য জ্বালানী।
৩২৪৪। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ২০: ৯ - ২৪ ]। উল্লেখিত আয়াতগুলি এবং এই আয়াতে যে আগুনের উল্লেখ আছে তা হচ্ছে হযরত মুসার হৃদয়ে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ পাওয়ার ঊষালগ্নের বিবরণ। পূর্বের বর্ণনায় যার উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা আনুসঙ্গিক টিকাতে দ্রষ্টব্য। এই আয়াতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ঐশ্বরিক আগুনের প্রকৃতির উপরে এবং বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে হযরত মুসা ঐশ্বরিক আলোতে অবগাহন করে পরিবর্তিত মানুষে রূপান্তরিত হন। বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মুসা পরিবার পরিজন সহ সিনাই উপত্যকাতে পরিভ্রমণ করছিলেন। তিনি আলো উষ্ণতার জন্য সাধারণ আগুনের অন্বেষণে ছিলেন - কিন্তু আল্লাহ্ তাঁকে সর্বোচ্চ আলো ও আল্লাহ্ প্রেমের উষ্ণতা দান করেন যা ছিলো আল্লাহ্র নৈকট্য এবং আল্লাহ্র অলৌকিক নিদর্শন। আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ কোনও অলৌকিক বা আকস্মিক ঘটনা নয়। ব্যক্তির আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধতাই হচ্ছে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায়। মানুষের আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা হচ্ছে মানুষের অন্তরের ইতিহাস। পৃথিবীর মানদন্ডে ক্ষমতা অবস্থান যা ব্যক্তিকে সাধারণ মানুষের চোখে সম্মানীয় ও স্মরণীয় হতে সাহায্য করে, তার সাথে আত্মিক পরিশুদ্ধতার কোনও যোগসূত্র নাই। আত্মিক শুদ্ধতা হচ্ছে একমাত্র মানদন্ড যা আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের একান্ত নিজস্ব ইতিহাস। হযরত মুসা আধ্যাত্মিক আলো লাভের পূর্বেই সেই পরিশুদ্ধতা লাভ করেন।
০৮। কিন্তু যখন সে [ আগুনের ] কাছে এলো, একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেলো; " যারা এই আলোর মধ্যে এবং এর চর্তুপাশ্বে আছে তারা আশীর্বাদ ধন্য। সকল মহিমা জগতসমূহের প্রভু আল্লাহ্র ৩২৪৫।
৩২৪৫। তফসীরকারগণ মনে করেন যে, এটা কোনও জাগতিক আগুন নয় , এটা ছিলো স্বর্গীয় আলোর বিচ্ছুরণ , আল্লাহ্র নূরের প্রকাশ।
০৯। হে মুসা ! অবশ্যই আমি মহাপরাক্রমশালী , প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্।
১০। " এখন তুমি তোমার লাঠিটি নিক্ষেপ কর ৩২৪৬।" কিন্তু যখন সে উহাকে সাপের মত [ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ] নড়াচড়া করতে দেখলো , সে পিছন ফিরে পশ্চাদপসরণ করলো এবং আর সামনে গেলো না। [ বলা হলো ], " হে মুসা! ভয় পেয়ো না : কেননা যাদের রাসুল বলা হয়, তাদের আমার সান্নিধ্যে কোন ভয় নাই , ৩২৪৭ -
১০। " এখন তুমি তোমার লাঠিটি নিক্ষেপ কর ৩২৪৬।" কিন্তু যখন সে উহাকে সাপের মত [ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ] নড়াচড়া করতে দেখলো , সে পিছন ফিরে পশ্চাদপসরণ করলো এবং আর সামনে গেলো না। [ বলা হলো ], " হে মুসা! ভয় পেয়ো না : কেননা যাদের রাসুল বলা হয়, তাদের আমার সান্নিধ্যে কোন ভয় নাই , ৩২৪৭ -
৩২৪৬। হযরত মুসা এখন এক সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষ। স্বর্গীয় আলোর স্পর্শে তিনি আত্মিক দিক থেকে এক নূতন পৃথিবীর সন্ধান পেয়েছেন। যা তিনি মনে করেছিলেন সাধারণ আগুন তা ছিলো স্বর্গীয় আলোর বিচ্ছুরণ। জাগতিক জীবনের মলিনতার উর্দ্ধে ঐশ্বরিক আলোর ভূবনে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঐশ্বরিক আলোর মাধ্যমে তিনি দিব্যজ্ঞান ও ক্ষমতা লাভ করেন। তাঁর মেষ চরানোর সাধারণ লাঠি আর প্রাণহীন লাঠিমাত্র ছিলো না। তা রূপান্তরিত হয় জীবন্ত প্রাণীতে। জীবনের সকল অনুভব সে লাঠিতে বিরাজ করে। ঠিক সেই রকম স্বর্গীয় আলোর সংস্পর্শে হযরত মুসা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষে পরিণত হন। মুসার পরিবর্তন বর্ণনা করা হয়েছে পরবর্তী টিকাতে।
৩২৪৭। হযরত মুসা এখন সম্পূর্ণ নূতন এক আধ্যাত্মিক জগতে আগমন করেছেন। এই নূতন জগতের অপূর্ব সৌন্দর্য ও আলোর ঝলকানি তাঁকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। অন্ধকার থেকে আলোতে হঠাৎ প্রবেশ কালে চক্ষুকে যেরূপ আলোর সাথে বিন্যস্ত করে নিতে হয়, সেরূপ আধ্যাত্মিক ভাবে ঐশ্বরিক আলোতে আলোকিত উদ্ভাসিত জগতের সাথে সামঞ্জস্য বিধানে মুসাকে চেষ্টা করতে হয়। প্রাণহীন লাঠি সাপে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে তিনি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। যদিও লাঠিটি ছিলো তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী, মেষ চারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ। এখন হযরত মুসার কর্মক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়েছে। মেষ পাল পরিচালনার পরিবর্তে এখন তাঁকে ইসরাঈলীদের রাসুল রূপে প্রেরণ করা হবে ; তাই তাঁর লাঠিকেও পরিবর্তিত কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করা হয়। সুতারাং তাঁর মন থেকে সকল ভয় দূর করতে বলা হয় - কারণ তিনি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্বাচিত ব্যক্তি।
১১। "কিন্তু যদি কেউ পাপ করে ফেলে। এবং তারপরে মন্দের পরিবর্তে সৎকর্ম করে, তবে নিশ্চয় আমি বারে বারে ক্ষমাশীল , পরম করুণাময় ৩২৪৮।
৩২৪৮। মিশরে অবস্থান কালে হযরত মুসা দুর্ঘটনাক্রমে একজন মিশরবাসীকে হত্যা করে ফেলেন। [ দেখুন টিকা ৩১৪৬ এবং আয়াত ২৬ : ১৪ ] যদিও হত্যাটি সংঘটিত হয় অত্যাচারীকে প্রতিরোধ এবং নির্যাতিতকে রক্ষা কল্পে; তবে তা ছিলো একটি দুর্ঘটনা বই আর কিছু নয়। তবুও সেই পাপ থেকে হযরত মুসার পরিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আল্লাহ্ তাঁকে শুধু ক্ষমাই করেন নাই তাঁকে আরও অলৌকিক ক্ষমতা দান করেন। এই আয়াতটি যদিও হযরত মুসার নবুয়ত পাওয়ার প্রেক্ষিতে বর্ণনা করা হয়েছে , কিন্তু এর আবেদন সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। যদি কেউ জুলুম করে, অর্থাৎ আত্মার প্রতি জুলুম করে। আত্মার প্রতি জুলুম , তখনই ঘটে যখন কেউ পাপ কাজে আসক্ত হয়ে যায়। যদি কেউ পাপ করে তখন সে নিজ আত্মার প্রতি জুলুম করে। পরবর্তীতে যদি সে অনুতপ্ত হয়ে নিজেকে সৎ ও ভালো কাজে নিয়োজিত করে তবে পরম করুণাময় আল্লাহ্ তার প্রতি ক্ষমাশীল। বিশ্ব মানবের জন্য এ এক মহান বার্তা।
১২। "এখন তোমার হাতকে তোমার বগলে রাখ; ইহা বের হয়ে আসবে শুভ্র নির্মল অবস্থায় ৩২৪৯। [ এই দুটি ] নয়টি নিদর্শনের অর্ন্তগত। [ ইহা নিয়ে ] তুমি ফেরাউন ও তার জাতির নিকটে যাও, কেননা তারা এক বিদ্রোহী ও সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় ৩২৫০। "
৩২৪৯। দেখুন আয়াত [ ২০: ২২ ] যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে , "Draw thy hand close to thy side" হাতের প্রাকৃতিক ধর্মের দিক থেকে উপরের বর্ণনা ও এই আয়াতের বর্ণনার মধ্যে খুব বেশী পার্থক্য নাই। কারণ হাতের যে বৈশিষ্ট্য তা উভয় আয়াতে একই রূপ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মুসার পোষাক ছিলো ঢিলা ঢোলা - প্রাচীন যুগের লোকদের যেরূপ থাকতো। যদি তিনি তাঁর ডান হাতকে ঢিলা পোষাকের ডান দিক দিয়ে প্রবেশ করান , তবে তা বুকের বাঁ দিকে পৌঁছাবে। অনুরূপ ভাবে বাঁ হাত ডান দিকে পৌঁছাবে। সুতারাং দুইটি আয়াতেরই বর্ণনা সামঞ্জস্যপূর্ণ। যখন হযরত মুসা হাতকে বের করে আনেন তখন তা উজ্জ্বল সাদা আলো বিচ্ছুরণ করে। সাধারণভাবে শরীরের কোনও অংশ সাদা হওয়াকে শ্বেত কুষ্ঠের পরিণতি হিসেবে পরিগণিত করা হয়। কিন্তু এখানের সাদা ছিলো ঠিক তার বিপরীত। এই সাদা ছিলো পূত পবিত্রতা ও স্বর্গীয় আলোর প্রতীক।
৩২৫০। নয়টি নিদর্শনের জন্য দেখুন টিকা ১০৯১ এবং আয়াত [ ৭ : ১৩৩ ]।
১৩। কিন্তু যখন আমার নিদর্শন সমূহ তাদের নিকট এসেছিলো , যার ফলে তাদের [ জ্ঞান ] চক্ষু উন্মোচিত হওয়া উচিত ছিলো, তারা বলেছিলো, " ইহা তো স্পষ্ট যাদু ! " ৩২৫১
৩২৫১। যদি ফেরাউনের লোকেরা প্রকৃত সত্যকে অনুধাবন করতে চাইত, তবে হযরত মুসার নিকট প্রেরিত আল্লাহ্র স্পষ্ট নিদর্শন সমূহ তাদের জ্ঞান চক্ষুকে উন্মীলনে সাহায্য করতো। কিন্তু যারা জ্ঞান পাপী, বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন , তারা সত্যকে তাদের হৃদয়ে অনুধাবন করলেও তা গ্রহণ করে না। সত্যকে তাদের হৃদয়ে অনুভব করে; কিন্তু উদ্ধতভাবে তারা সত্যকে বা আল্লাহ্র নিদর্শনকে প্রত্যাখান করে। তাদের অন্তর এগুলিকে সত্য বলে অনুধাবন করলেও তারা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এভাবেই তারা তাদের বিবেককে অন্যায় ও অসত্যের নীচে পাথর চাপা দিয়ে ফেলে। এ ভাবেই তারা তাদের পাপের পাত্র পূর্ণ করে। এরাই হলো বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ফেরাউনের উদাহরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে সর্বযুগে বিপর্যয়কারী এ সব লোকের কথাই বলা হয়েছে।
১৪। এবং তারা সেই সব নিদর্শন অন্যায় উদ্ধত্যের সাথে প্রত্যাখান করেছিলো, যদিও তাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিলো। সুতারাং যারা মিথ্যার বেসাতি করে, তাদের শেষ পরিণতি দেখো।
