Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ২ জন
আজকের পাঠক ১২৪ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৮ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৮৫ বার
+ - R Print

সূরা মু'মিনূন

সূরা মু'মিনূন বা বিশ্বাসী - ২৩

১১৮ আয়াত, ৬ রুকু , মক্কী
[দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


ভূমিকা : এই সূরার মূল বক্তব্য হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলী যা মুমিন বা বিশ্বাসী হওয়ার 'বীজতলা ' বা মূলভিত্তি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেই রূপ পরিবেশের যখন সত্যকে অস্বীকার করা হয় এবং সত্যের অনুসারীদের অত্যাচার ও অপমানে জর্জরিত করা হয়। সত্য এক, অদ্বিতীয় এবং সন্দেহাতীত এবং শেষ পর্যন্ত সত্য চিরস্থায়ী। যারা পাপের রাস্তায় থাকে তাদের শেষ মুহুর্তের অনুতাপ গ্রহণযোগ্য হবে না।

এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ সূরাগুলির শেষ দিকে অবতীর্ণ।

সার সংক্ষেপ : বিশ্বাসের বা ঈমানের ভিত্তি যখন বিনয়, প্রার্থনা ও দানের সাথে সমন্বিত হয়; অহংকার ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকে এবং জীবন যখন একনিষ্ঠ সততার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখনই আত্মিক সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করা সম্ভব হয়। সেজন্য হয়তো তাঁকে মানুষের ঠাট্টা বিদ্রূপ সহ্য করতে হয় - যেমন করতে হয়েছিলো নূহ্‌ , মুসা এবং ঈসা নবীকে [ ২৩ : ১ - ৫০]।

আল্লাহ্‌র নবী - রসুলেরা এবং মোমেন বান্দারা একই ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু যারা বিভেদ সৃষ্টিকারী তারা কিছুতেই সত্য বিশ্বাসের বহু নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা সত্বেও আল্লাহর মহত্ব ও করুণার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে না [ ২৩ : ৫১ - ৯২ ]।

মন্দকে ভালোর দ্বারা এবং আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের দ্বারা অবদমিত করতে হবে। পরলোকের জীবন অবশ্যাম্ভবী সত্য। যারা অবিশ্বাসী তারা পরলোকে অনুতাপ করার জন্য সুযোগ প্রার্থনা করবে। কিন্তু তখন তা হবে সূদূর পরাহত। [ ২৩ : ৯৩ - ১১৮ ]

অষ্টাদশ পারা

সূরা মু'মিনূন বা বিশ্বাসী - ২৩

১১৮ আয়াত, ৬ রুকু , মক্কী
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]


০১। বিশ্বাসীরা [শেষ পর্যন্ত ] জয়ী হবে, - ২৮৬৫

২৮৬৫। "Aflaha"- জয়লাভ করা , সমৃদ্ধি লাভ করা , সাফল্য লাভ করা, নির্দ্দিষ্ট অভীষ্টে পৌঁছানো , জাগতিক দুঃখ-কষ্ট ও পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা। এই আয়াতটি ১০ এবং ১১ নম্বর আয়াতের সাথে সংযুক্ত। এই পৃথিবীতেই সাফল্য বা বিজয় আসতে পারে , কিন্তু মোমেন বান্দাদের জন্য পরলোকের সাফল্য স্থায়ী ও নির্ধারিত সত্য।

০২। যারা সালাতে নিজেদের বিনয়ী রাখে , ২৭৬৬;

২৭৬৬। মোমেন বান্দাদের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে যে সব বৈশিষ্ট্যের বা গুণাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে তার শীর্ষে রয়েছে 'বিনয়ের " বা নম্রতার স্থান। সালাতে নম্রতার অর্থ : ১) আল্লাহ্‌র উপস্থিতি নিজের আত্মার মাঝে অনুভব করা এবং সেই মহাশক্তিধরের উপস্থিতিতে নিজের ক্ষুদ্রত্ব ও অসহায়ত্ব উপলব্ধি করা। ২) আল্লাহ্‌র সাহায্য ব্যতীত নিজস্ব ক্ষমতা বা শক্তি যে মূল্যহীন এই বোধ নিজের ভিতরে অনুভব করা ; ৩) নিজস্ব চাওয়া ও পাওয়াকে আল্লাহ্‌র নিকট নিবেদন করা এবং তা আল্লাহ্‌র করুণায় পাওয়ার আকাঙ্খা করা।

০৩। যারা অসার বাক্য পরিহার করে;

০৪। যারা দান কাজে সক্রিয় ;

০৫। যারা [ অ-অনুমোদিত ] যৌন কাজ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে , ২৮৬৭

২৮৬৭। যৌন জীবন মানর জীবনচক্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এই জীবনকে উচ্ছৃঙ্খলভাবে ব্যয় করা চলবে না। সংযত যৌন জীবন যাপন আল্লাহ্‌র নির্দ্দেশ। মুসলমান সকল প্রকার যৌন অসংযতা থেকে দূরে থাকবে এবং ব্যভিচার ও উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখবে। দেখা গেছে সমাজে বিভিন্ন পাপের উৎপত্তি , জন্মলাভ করে থাকে ব্যভিচার থেকে। এ ব্যাপারে ফ্রয়েডের মনঃস্থাত্বিক বিশ্লেষণ এ কথা স্বীকার করে যে, মানুষের সুপ্ত বহু ইচ্ছা যৌন ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। আমরা দৈনন্দিক জীবনে এর প্রতিফলন দেখে থাকি। খ্যাতি , প্রভাব-প্রতিপত্তি বা শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ শিখর থেকে পতন ঘটে যৌন অধঃপতন থেকে। ইসলামের নির্দ্দেশ হচ্ছে বিবাহ বহির্ভূত যৌন জীবনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা। যৌন জীবনে বিবাহের মাধ্যমেই একমাত্র প্রবেশিধাকার লাভ করা যাবে এবং সেখানে নারী ও পুরুষের নিজস্ব অধিকারের ভিত্তিতে তা নিয়ন্ত্রিত হবে।

০৬। যাদের সাথে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ অথবা অধিকারভূক্ত দাসীগণ [ বন্দী ] ব্যতীত ২৮৬৮, এক্ষেত্রে তারা নিন্দনীয় হবে না।

২৮৬৮। এ সম্বন্ধে বিশদভাবে বলা হয়েছে [ ৪ : ২৫ ] আয়াতে।

০৭। কিন্তু যারা এই সীমাকে অতিক্রম করতে ইচ্ছা করে, তারা সীমালংঘনকারী ; -

০৮। যারা বিশ্বস্তভাবে তাদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে ২৮৬৯;

২৮৬৯। আমানত ও প্রতিশ্রুতি দুধরণের হতে পারে : লিখিত বা প্রকাশ্য এবং অলিখিত বা অপ্রকাশ্য। লিখিত আমানাত হচ্ছে : সম্পত্তি বা দায়িত্ব যা লিখিত ভাবে অন্যকে অর্পন করা হয় - যেমন চাকুরীরত কর্মকর্তারা সরকারের অধীনে জনসাধারণের কাজের জন্য নির্দ্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। জনগণের এই দায়িত্ব তাদের আমানত ইত্যাদি। অলিখিত বা অপ্রকাশ্য আমানতের উৎস বা উৎপত্তিস্থল হচ্ছে , ক্ষমতা, অথবা সুযোগ সুবিধা, মর্যদা বা সামাজিক বন্ধন ইত্যাদি যেমন :রাজার নিকট তার রাজ্য আল্লাহ্‌র নিকট থেকে প্রাপ্ত তার প্রজা সাধারণের অপ্রকাশ্য আমানত।

আমানত ও প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার দুটি শব্দ পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক। চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি জন্ম দেয় বা সৃষ্টি করে বাধ্যবাধকতার বা আমানতের, চুক্তি ও আমানত আমাদের সমাজ জীবনে লিখিত বা অলিখিত হতে পারে তাতে কিছু যায় আসে না। আমানতের প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি মানব জীবনকে সামাজিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাধ্যবাধকতার বন্ধনে আবদ্ধ করে। এ সম্বন্ধে বিশদ ব্যাখ্যার জন্য দেখুন টিকা ৬৮২ এবং আয়াত [ ৫:১ ]।

০৯।এবং যারা [ কঠিনভাবে ] তাদের সালাতকে রক্ষা করে; ২৮৭০

২৮৭০। আয়াত [ ২৩ : ২ ] এ নির্দ্দেশ দান করা হয়েছে বিনয় ও একাগ্রতার সাথে প্রার্থনা করার জন্য। এই আয়াতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে প্রার্থনা বা সালাতকে নিয়মিত ভাবে পালনের অভ্যাস গঠনের জন্য। কারণ নিয়মিত অভ্যাস আত্মিক শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। এবং সালাত ব্যক্তির আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের সহায়ক। এ ভাবেই সাতটি অমূল্য নির্দ্দেশনার মাধ্যমে ঈমানের রূপরেখাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সাতটি অমূল্য রত্ন হচ্ছে : ১) বিনয় ২) অহংকার ও আত্মগরিমা ত্যাগ করা ৩) দান ৪) যৌন পবিত্রতা ৫) আমানতের বিশ্বস্ততা ও ৬) প্রতিশ্রুতির বিশ্বস্ততা এবং ৭) একান্তভাবে আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্খা।

১০। তারাই হবে উত্তরাধীকারী , ২৮৭১

১১। তারাই উত্তরাধীকার সুত্রে জান্নাত লাভ করবে। সেখানে তারা [ চিরদিন ] বাস করবে।

২৮৭১। দেখুন আয়াত [ ২১ : ১০৫ ] যেখানে বলা হয়েছে " আমার সৎ কর্মপরায়ন বান্দাগণ পৃথিবীর অধিকারী হবে।" এই সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের কথা যারা সাফল্য অর্জন করবে। এরা হলেন মুমিন বান্দা - ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সকল সাফল্য তাদের জন্যই। কারণ পৃথিবীতে সত্যের জয় শেষ পর্যন্ত হবেই। অসত্য ও অন্যায়ের স্থায়ীত্ব ক্ষণস্থায়ী। তবে এই বিজয় দর্শন ব্যক্তিগত ভাবে কোনও ব্যক্তির জীবনে নাও ঘটতে পারে। অনেক সময়েই অন্যায় ও অসত্যের ধুম্রজাল কিছুকালের জন্যে সত্যের আলোকে ডেকে ফেলতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিথ্যা ও অন্যায়ের কালো মেঘ অপসারিত হবেই হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে কেউ এর প্রভাব প্রত্যক্ষ নাও করতে পারেন কিন্তু এ কথা সত্য যে পরবর্তী বংশধরেরা পূর্ববর্তীদের সত্যের জন্য ত্যাগ তিতিক্ষার সুফল অবশ্যই ভোগ করবে। শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবেই। এই পৃথিবীতে সকলেই তাদের সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকারে ফলাফল স্বচক্ষে দেখে যেতে নাও পারেন এ কথা সত্য , কিন্তু পরলোকে তারা তাদের কর্মফল স্বচক্ষে দেখতে সক্ষম হবেন। আল্লাহ্‌ বেহেশতের সৃষ্টি করেছেন পূণ্যাত্মা বা মোমেন বান্দাদের জন্য। মৃত্যুর পরে সকল মোমেন বান্দারা তাদের সুকর্মের ফল ভোগ করবেন।

১২। আমি মানুষকে [ কাদার ] সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি ২৮৭২;

২৮৭২। আলোচ্য আয়াত সমূহে মানব সৃষ্টির সাতটি স্তরের উল্লেখ করা হয়েছে। সর্ব প্রথম স্তর মৃত্তিকার উপাদান, দ্বিতীয় স্তর বীর্য, তৃতীয় স্তর জমাট রক্ত , চতুর্থ স্তর মাংসপিন্ড, পঞ্চম অস্থি-পিঞ্জর, ষষ্ঠ অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃতকরণ সপ্তম সৃষ্টির পূর্ণত্ব অর্থাৎ রূহ সঞ্চারকরণ। এই আয়াতগুলির মাধ্যমে মহান স্রষ্টার নিপুন শিল্পকর্মকে তুলে ধরা হয়েছে এবং মানবকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে তার শেষ পরিণতি ও ভবিষ্যত , যার উল্লেখ আছে আয়াত [ ১০ - ১১ ] তে। আয়াত [ ২ : ১১৭ ] উল্লেখ আছে আল্লাহ্‌ শূন্য থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি করেন তাঁর আদেশের মাধ্যমে। এখানে এই আয়াতগুলিতে সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থার বর্ণনা করা হয় নাই। বর্ণনা করা হয়েছে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার একটি ধাপ আর সে ধাপটি হচ্ছে মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর। সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর মূল কণিকা প্রাণহীন অজৈব পদার্থ জীবন লাভে সক্ষম হয়। মাটির অজৈব পদার্থ তরুলতার মাধ্যমে জৈব পদার্থে রূপ লাভ করে এবং খাদ্যের মাধ্যমে তা দেহভ্যন্তরে স্থান পায়। প্রাণীদেহ তা শুক্রে রূপান্তরিত করে। এই শুক্র স্ত্রীকোষের ডিম্ব দ্বারা নিষিক্ত হয়ে মায়ের জরায়ুতে নিরাপদে স্থান লাভ করে। নিষিক্ত ডিম্বটি এখানে সৃষ্টি প্রক্রিয়াতে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে। প্রথম স্তরে নিষিক্ত ডিম্বটি জমাট রক্ত পিন্ডে পরিণত হয় , যা জীববিজ্ঞানে "জাইগট" নামে পরিচিত পরবর্তী স্তরে "জাইগটের" বিভক্তিকরণ শুরু এবং ভ্রূণের সৃষ্টি হয় , পরবর্তীতে ভ্রূণ একটি নির্দ্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। ফলে ভ্রূণ থেকে হাড়, মাংস, এবং বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গের সৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত মানব শিশুর সৃষ্টি ও প্রাণীকূলের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য নাই। কিন্তু পার্থক্য আছে শেষ স্তরে। শেষ স্তরকে আল্লাহ্‌ এ ভাবে বর্ণনা করেছেন , " অবশেষে উহাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে [ ২৩ : ১৪]।" যার ফলে মানব শিশু প্রাণী শিশু থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। আর এই ভিন্নতার কারণ, মানব শিশুর মাঝে আল্লাহ্‌র রূহকে প্রবেশ করানো হয়, দেখুন আয়াত [ ১৫ : ২৯ ]। রূহ বা আত্মার এই অনুপ্রবেশ হতে পারে ধারাবাহিক। দেহের বৃদ্ধির সাথে সাথে আত্মারও পরিবর্ধন ও পরিবর্তন ঘটে। শিশু জন্মলাভ করে, বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় ও যৌবনে পদর্পন করে , আবার বার্দ্ধক্যে ক্ষয় প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের আত্মিক পরিবর্তনও সাধিত হয়। মানব জীবনে মৃত্যুই শেষ কথা নয়। মৃত্যুর মাধ্যমে সে প্রবেশ করে অন্য ভূবনে, যে ভূবনে সে এই পৃথিবীর সকল স্মৃতি ও কর্মকান্ডের হিসাব বহন করে নিয়ে যায়।