সূরা আম্বিয়া
সূরা আম্বিয়া বা পয়গম্বর - ২১
১১২ আয়াত , ৭ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
ভূমিকা : পূর্বের সূরাতে হযরত মুসা এবং হারুনের কাহিনী পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তা তুলনা করা হয়েছে ফেরাউন এবং সামিরীর মত দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের ক্রমবর্ধমান পাপ কার্যের প্রবণতার সাথে এবং শেষ করা হয়েছে পাপের বিরুদ্ধে সাবধান করে এবং আল্লাহ্র এবাদত এবং সালাতের মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধতার উপরে গুরুত্ব আরোপ করে। এই সূরা আরম্ভ হয়েছে আত্মিক পরিশুদ্ধতার পথে পাপের বাধাদানের প্রচেষ্টা এবং মোমেন বান্দাদের পাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার আল্লাহ্র অঙ্গীকারের মাধ্যমে। বিভিন্ন নবী ও রসুলদের উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম পৌত্তলিকতা থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন, আল্লাহ্র বিধান ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে লূত সংগ্রাম করেন, আত্ম বিশ্বাস হীনতা ও ধৈর্য্যহীনতার বিরুদ্ধে আইউব নবীর সংগ্রাম, ইসমাঈল, ইদরিস, জুরকিফ ধীর স্থির ও বিশ্বাসের ঐকান্তিকতার প্রতীক , ইউনুস নবী ক্রোধকে জয় করেন, জাকারিয়া নিঃসঙ্গতাকে জয় করেন, মেরী পৃথিবীর কামনাকে জয় করেন। এদের উদাহরণের মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধতার পথের বিশেষ দিক্গুলিকে তুলে ধরা হয়েছে। এ সব উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে যে পয়গম্বরকূলও পাপের আক্রমণে অপ্রতিরোধ্য ছিলেন না। তারা সংগ্রামের মাধ্যমে পাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, এবং আত্মিক পরিশুদ্ধতার পথের প্রতিটি ইঞ্চি তাদের কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে জয় করে নিতে হয়।
এই সূরার সময় কাল সম্বন্ধে কেহ সঠিক নয়। সম্ভবতঃ নবুয়ত প্রাপ্তির পরে মক্কায় অবস্থান কালের মাঝামাঝি সময়ে এই সূরা অবতীর্ণ হয়।
সারসংক্ষেপ : মানুষের স্বভাব ধর্ম হচ্ছে জীবনের যা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা অবহেলা করা এবং তা ঘৃণা ও উপহাসের বস্তুতে পরিণত করা। কিন্তু সব কিছুরই একদিন বিচার হবে এবং শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় অবধারিত। [২১ : ১ - ২৯ ]
বিশ্ব প্রকৃতিতে আল্লাহ্র একত্বের স্বাক্ষর এবং আল্লাহ্র অঙ্গীকার : তাঁর নিরাপত্তা , অনুগ্রহ, দয়া এবং ন্যায় বিচারের অঙ্গীকার। [ ২১ : ৩০ - ৫০ ]
হযরত ইব্রাহীমের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে বিজয় এবং আল্লাহ্র অন্যান্য নবী রসুলেরা বিভিন্ন পাপের উপরে বিজয় লাভ করেন। [ ২১ : ৫১ - ৯৩ ]
সময় থাকতে সৎ কাজ কর। জবাবদিহিতা অবশ্যই সকলকে করতে হবে এবং শুধুমাত্র ন্যায়বানেরাই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে। [ ২১ : ৯৪ - ১১২ ]
সতের পারা
সূরা আম্বিয়া বা পয়গম্বর - ২১
১১২ আয়াত , ৭ রুকু , মক্কী[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
২৬৬২। হিসাব নিকাশের সময় অর্থাৎ কেয়ামতের দিন। যে ব্যক্তি মরে যায়, তার কেয়ামতের তখনই শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ হিসাব নিকাশ শুরু হয়। মানুষ যত দীর্ঘায়ুই হোক না কেন তার মৃত্যু দূরে নয়। সেই হিসেবে হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই অমোঘ সত্যকে জানার পরেও তারা উদাসীন এবং যে বাণী বা উপদেশ তাদের পরলোকের শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
২৬৬৩। আল্লাহ্ তাঁর বিধানকে যুগোপযোগী করার জন্য যুগে যুগে নবী ও রসুলদের পাঠিয়েছেন। কিন্তু যখনই কোন নূতন নিদর্শন প্রেরিত হয়, তখন তারা একে কৌতুক ও হাস্য উপহাসচ্ছলে গ্রহণ করে পরবর্তীতে যা শত্রুতাতে পরিণত হয়।
২৬৬৪। সীমা লংঘনকারীরা পরলোক সম্বন্ধে উদাসীন , এই আয়াত তাদের মানসিক অবস্থার অতিরিক্ত বর্ণনা। আল্লাহ্র বাণীর মিষ্টতা, প্রাঞ্জলতা ও ক্রিয়াশক্তি দিবালোকের মত ভাস্বর। কিন্তু সীমালংঘনকারীরা আল্লাহ্র নিদর্শনকে গ্রহণ করার পরিবর্তে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা এর বিরুদ্দে গোপনে শলা পরামর্শ করে যেনো , লোকসমক্ষে তাদের ষড়যন্ত্রকারীরূপে চিহ্নিত করা না হয়। তাদের এই ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতার কারণ হচ্ছে তাদের অন্তরে হিংসা রীপুর আধিক্য। হিংসা তাদের বাধা দান করে সত্যকে গ্রহণ করতে। হিংসা এই জন্য যে তাদের মতই একজন সাধারণ মানুষ সত্যকে প্রচারের জন্য আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত হয়েছেন পথপ্রদর্শক ও রসুলরূপে।
উপদেশ : হিংসা সর্বদা প্রকৃত সত্যকে অনুধাবনে বাধা দান করে।
২৬৬৫। যখন আল্লাহ্র বাণীর মিষ্টতা , প্রাঞ্জলতা ও মানুষের আধ্যাত্মিক জগতের উপরে এর ক্রিয়াশক্তি, এর নৈতিক মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি এবং রসুলের [ সা ] এই বাণী প্রচারে বাগ্মীতা ও আন্তরিকতা সকলকে মুগ্ধ করে তোলে , তখন এ সব সীমালংঘনকারীরা বলে, " দেখে শুনে যাদুর কবলে পড়বে ? " তারা রসুলকে [ সা ] যাদুকররূপে অভিযুক্ত করে, যার কোন সত্যের ভিত্তি ছিলো না সম্ভবতঃ তা ছিলো প্রবঞ্চনা।
২৬৬৬। লক্ষ্য করুন, সাধারণত : আরবী ভাষাতে "Qala" শব্দটি [ According to Qiraat of Hafs ] বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উচ্চারণে পাঠ করা হয়। শব্দটি এই [ ২১ : ৪ ] আয়াতে ও [ ২১ : ১১২ ] আয়াতে এবং [২৩:১১২] আয়াতে বিদ্যমান। কিন্তু এই আয়াতগুলিতে "Qala" এর উচ্চারণ অন্য আয়াতের উচ্চারণ থেকে আলাদা [ যেমন ২০ : ১২৫ - ১২৬ ]। বসরা কিরাতে [ Basra Qiraat ] এর উচ্চারণ হয়েছে "Qul ", যার অর্থ "তুমি বল" আদেশবাচক শব্দ। " আর যদি অনুবাদ হয় "সে বলিল" তবে সে অর্থ রসুলকে [ সা ] বোঝানো হয়েছে। কিন্তু বেশীর ভাগ তফসীরকারের মতে শব্দটির অনুবাদ আদেশবাচক হওয়া উচিত এবং ইউসুফ আলী সাহেবেও এ ব্যাপারে একমত। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে, যে ভাবেই অনুবাদ করা হোক না কেন অর্থের খুব একটা হেরফের হয় না, মূল বক্তব্য একই থেকে যায়। দেখুন আয়াত [ ২৩ : ১১২ ] এবং টিকা ২৯৪৮।
২৬৬৭। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ। তিনি সব কিছুই জানেন। সরবে, নীরবে, গোপনে যা কিছুই বলা হোক না কেন সবই আল্লাহ্র নিকট জ্ঞাত। পাপিষ্ঠরা এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা যেনো ধারণা না করে যে, তাদের গোপন পরিকল্পনা আল্লাহ্র নিকট গোপন রাখা সম্ভব।
২৬৬৮। আল্লাহ্র প্রেরিত রাসুলের [ সা ] প্রতি কাফেরদের বিভিন্ন অভিযোগ গুলি এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। কেউ বললো এসব " অলীক কল্পনা " বৈ কিছু নয়, কারণ " আমরা তা বুঝতে পারি না"। অন্য জন বলে, হায় ! সে তো মিথ্যা রচনা করেছে "। কিন্তু যদি এই কল্পনা জীবনকে সমৃদ্ধ করে, তবে তারা বলে, " সে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে।" আবার অনেকে বলে " সে একজন কবি, কারণ কবিরাই উদ্ভাবন করতে পারে।" আবার অনেকে বাধাদান করে বলে, " আমরা অলৌকিক মোজেজা দেখতে চাই। যেরূপ মোজেজার অধিকারী পূর্ববর্তী রসুলেরা ছিলেন ইত্যাদি।
২৬৬৯। অলৌকিক মোজেজা কখনও ঈমান বা বিশ্বাসের ভিত্তি হতে পারে না। পূর্ববর্তী নবী রসুলদের অলৌকিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাফেররা ঈমান আনে নাই। সুতারাং মোজেজা দর্শনে ঈমান আনার কথা বলা; বাহানা বই আর কিছু নয়। অলৌকিক ক্ষমতা দর্শন ঈমানের ভিত্তি হতে পারে না। ঈমান হচ্ছে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ্র প্রতি এবং একান্ত নির্ভরশীলতা সেই স্রষ্টার প্রতি যিনি এক এবং অদ্বিতীয়। এটা এক ধরণের মানসিক অবস্থা [ State of mind ] এর সাথে মোজেজার কোনও সম্পর্ক নাই।
২৬৭০। দেখুন অনুরূপ আয়াত [ ১৬ : ৪৩ ] এবং টিকা ২০৬৯। অবিশ্বাসী বা ঈমানহীনদের কথা " সেতো আমাদের মতই সাধারণ মানুষ" এই ব্যঙ্গ বিদ্রূপের উত্তরে এই আয়াতে দেয়া হয়েছে। এ কথা সত্য যে, আল্লাহ্র রসুলদের প্রেরণ করেছেন মানুষের মধ্যে থেকেই , যেনো সাধারণ মানুষ তাদের বুঝতে পারে এবং তাঁরাও সাধারণ মানুষের মন মানসিকতা বুঝতে পারে।
২৬৭১। সাধারণ মানুষের শারীরিক যে চাহিদা ,নবী রসুলদের ছিলো সেই একই চাহিদা। কারণ তারাও ছিলেন শারীরিক দিক থেকে সাধারণ মানুষ। তারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতেন এবং তারাও ছিলেন মৃত্যুর আয়ত্তাধীন।
২৬৭২। আল্লাহ্র প্রেরিত নবী রসুলদের যদিও সাধারণ মানুষ থেকে শারীরিক দিক থেকে কোনও পার্থক্য ছিলো না কিন্তু আত্মিক দিক থেকে তারা আল্লাহ্র রহমতে ধন্য ছিলেন। তাঁদের প্রতি আল্লাহ্র অর্পিত দায়িত্ব ছিলো অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, এই দায়িত্ব সম্পন্ন করা এক অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আল্লাহ্র রহমতে এরা শেষ পর্যন্ত সাফল্য লাভ করেন, এবং বিরুদ্ধচারীরা পরাজিত হয়। বিভিন্ন সূরাতে উদাহরণের মাধ্যমে এই সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষতঃ আয়াত [ ২১ : ৫১ - ৯৩ ] গুলিতে এই সত্যকে প্রকাশ করা হয়েছে। যারা আল্লাহ্র রাসুল আল্লাহ্ তাদের রক্ষা করেন, ধ্বংস থেকে , যেখানে অবিশ্বাসীরা আল্লাহ্র ক্রোধে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এই উপদেশ সকল মানুষ , সকল জাতির জন্য, সর্বকালে, সর্বযুগে প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি বা জাতি আল্লাহ্র বিধান মেনে চলে , অর্থাৎ আল্লাহ্র ইচ্ছা ও পরিকল্পনার নিকট আত্মসমর্পন করে তাদের সাফল্য অনিবার্য অপর পক্ষে যারা আল্লাহ্র বিধান মানে না, অর্থাৎ আল্লাহ্র ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করে, আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন সেই সব পাপের পথে পা বাড়ায় তাদের শেষ পরিণতি অনিবার্য ধবংস। পৃথিবীর ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয়। পূণ্যাত্মাদের সাফল্য ও পাপীদের ধ্বংস এই -ই হচ্ছে আল্লাহ্র বিধান বা ইচ্ছা। " যাদের ইচ্ছা" বাক্যটি দ্বারা আল্লাহ্র এই বিশ্বজনীন ইচ্ছাকেই প্রকাশ করা হয়েছে যা সর্বকাল ও সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য।
