+
-
R
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
এই সূরার অবতীর্ণের সময়কাল , ধর্মীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সেই সূরা যা শ্রবণে হযরত ওমর, হত্যাকারী থেকে মোমেন বান্দাতে পরিণত হন, এই ঘটনা ঘটে হিজরতের সাত বৎসর পূর্বে।
ইব্নে হিসান সম্পূর্ণ ঘটনাটির খুঁটিনাটি বর্ণনা করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর ছিলেন ইসলামের অন্যতম প্রধান নির্যাতনকারী শত্রু। তিনিও অন্যান্য কোরেশদের মত সর্বদা ষড়যন্ত্র করতেন যে কিভাবে রসুলের (সা) জীবন বিনাশ করা যায়। এরকম সময়ে তাঁকে সংবাদ দান করা হয় যে, তার বোন ফাতেমা ও ভগ্নীপতি সা'দ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেহেতু সে সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের উপরে অত্যাচার করা হতো সেহেতু তারা সযত্নে তাদের বিশ্বাসকে গোপন রেখেছিলেন। খবর শুনে ওমর রাগে অন্ধ হয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁদের বাড়ীতে গমন করেন, সে সময়ে তাঁরা তাঁদের কাছে লিখিত এই সূরার অনুলিপি পাঠ করছিলেন। ওমর তাঁর বোন ও ভগ্নীপতিকে আক্রমণ করেন। কিন্তু তাঁরা সেসময়ে প্রচন্ড ধৈর্য্যের পরিচয় দেন, কিন্তু দৃঢ়তার সাথে তাদের ঈমানের সত্যতা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। ওমর তাদের বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতা ও ধৈর্য দেখে এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে যান যে, তিনি তাঁদের কোরাণের অংশটি যা তারা পড়ছিলেন তা দেখাতে বলেন। তাঁকে তা দেয়া হয় এবং তিনি তা পাঠ করেন। এই সূরা পাঠে তার হৃদয় এতটাই অভিভূত হয়ে যায় যে, তিনি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করেন, শুধু তাই - ই নয়, তিনি হলেন ইসলামের এক শক্ত মজবুত স্তম্ভের মত একজন দৃঢ় সমর্থক।
হযরত সা'দের কাছে সূরার কয়েকটি পাতা ছিলো মাত্র ; সম্ভবতঃ তা ছিলো প্রথম দিকের। এই সূরার প্রারম্ভে " তা - হা" এই দুটি বর্ণমালা মুদ্রিত করা হয়েছে। এই বর্ণমালা দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে ? প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে এরূপ বর্ণমালা সন্নিবেশ দ্বারা ভাবগত অব্যয়কে বোঝানো হয়েছে যার অর্থ , " হে মানবকূল!" এই সূরাকে পূর্বের সূরার ধারাবাহিকতা বলা যায়। এখানে হযরত মুসার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র নিকট থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পরে যে সঙ্কট তিনি অতিক্রম করেন, তাঁর মায়ের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কিভাবে তিনি ফেরাউনের নিকটে নীত হন, কিভাবে তিনি সেখানে মিশর বাসীদের সর্বোচ্চ জ্ঞান বিজ্ঞান শেখার সুযোগ লাভ করেন যা পরবর্তীতে তিনি আল্লাহ্র সেবায় নিয়োজিত করেন। তাঁর পালিত পিতা [ ২৮ : ৯ ] ফেরাউনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে এই সূরার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মুসার কাহিনীর মধ্যে বর্ণনা আছে কিভাবে বিপথগামী এক ব্যক্তি ইসরাঈলীদের মূর্তি পূঁজাতে অনুপ্রাণীত করে, এ ভাবেই চিরশত্রু শয়তান মানুষের পতন ঘটায়। আল্লাহ্র স্তুতি ও আল্লাহ্র নিকট একান্ত প্রার্থনা আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের অবসান ঘটায়, আর এ ভাবেই আত্মাকে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ গ্রহণের যোগ্য করে তোলে।
সারসংক্ষেপ : আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ [ কোরাণ ] কোন দুঃখ দুর্দ্দশার কারণ নয় বরং তা হচ্ছে পরম করুণাময়ের করুণার উপহার। [ ২০ : ১ - ৮ ]।
আল্লাহ্ কিভাবে হযরত মুসাকে নির্বাচিত করেন এবং তাঁর ভাই হারূণ সহ হযরত মুসাকে ফেরাউনের নিকট পাঠান। [ ২০ : ৯ - ৩৬ ]।
হযরত মুসার মাতাকে আল্লাহ্ নির্দ্দেশ দান করেন শিশু মুসাকে নদীতে নিক্ষেপ করার জন্য। শিশু মুসা আল্লাহ্র তত্বাবধানে ফেরাউনের প্রাসাদে লালিত পালিত হতে থাকেন , যেনো ভবিষ্যতে মুসা ফেরাউনকে আল্লাহ্র পথে আহ্বান করতে পারেন। [ ২০ : ৩৭ - ৭৬ ]
আল্লাহ্ মুসাকে শিক্ষা দেন তাঁর লোকজনদের পরিচালনা করার জন্য এবং তাদের বিদ্রোহী মনোভাবকে দমন করার জন্য। বর্ণনা আছে কি ভাবে সামীরি ইসরাঈলীদের উত্তেজিত করে। [ ২০ : ৭৭ - ১০৪ ]
শেষ বিচারের দিনে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বই হবে একমাত্র বিচারের বিষয় এবং সকলেই প্রকৃত সত্যকে অনুধাবন করবে। মানব সন্তান সর্বদা আদমের শত্রু শয়তানের থেকে নিজেকে রক্ষা করবে। তাঁরা অহংকার পরিত্যাগ করবে এবং আল্লাহ্র প্রশংসা ও প্রার্থনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে। সেদিনের ডাকের জন্য প্রত্যেকে অপেক্ষা করবে [ ২০: ১০৫ - ১৩৫]
[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
২৫৩৪। ব্যাখ্যার জন্য দেখুন এই সূরার ভূমিকা।
২৫৩৫। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ দুভাবে মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। ১) মানুষের স্বার্থপরতা সর্বগ্রাসী। আল্লাহ্র নির্দ্দেশনা এই স্বার্থপরতাকে ও সংঙ্কীর্ণতাকে বাধা দান করে। ২) এই প্রত্যাদেশ পাপীদের বিরক্তি উৎপাদন করে যার ফলে তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের আশ্রয় গ্রহণ করে এবং অত্যাচার করে। এগুলি ঘটে কারণ মানুষের দূরদৃষ্টির অভাব। আল্লাহ্ কোরাণ অবতীর্ণ করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য , ক্লেশ দেওয়ার জন্য নয়। আয়াতটিতে রসুলুল্লাহকে (সা ) সান্তনা দেয়া হয়েছে , কারণ কাফেররা কোরাণকে অস্বীকার করলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। উপদেশ প্রদান তাঁর কর্তব্য, তা গ্রহণ করার জন্য তিনি দায়ী নন। এই আয়াতের বক্তব্য সর্ব যুগের ও সর্ব কালের জন্য প্রযোজ্য।
২৫৩৬। অনুরূপ আয়াত [ ১০:৩] এবং ব্যাখ্যার জন্য দেখুন টিকা ১৩৮৬। যেখানে , সিংহাসনে কথাটির ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। আমাদের সীমিত বিচার বুদ্ধিতে যদি কোনও কিছুকে অন্যায় অবিচার মনে হয় , তবে আল্লাহ্কে স্মরণ করতে হবে। আল্লাহ্ তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে পরিব্যপ্ত করে দয়া ও করুণার সিংহাসনে সমাসীন আছেন। তিনিই সব কিছুর নির্দ্দেশ দান করেন এবং আমাদের এই বিশ্বাস মনে রাখতে হবে যে আমাদের সকল বিপদ আপদ বাঁধা তাঁর করুণায় কল্যাণে রূপান্তরিত হবে। আল্লাহ্র কর্তৃত্ব পৃথিবীর কর্তৃত্বের মত নয়। পৃথিবীর কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা যায়, অস্বীকার করা চলে , প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আহ্বান করা যায় বা তা চিরজীবন স্থায়ী হবে না। কিন্তু আল্লাহ্র কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী , অবিনশ্বর, অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্ব-ভূবনে ,দ্যুলোকে-ভূলোকে প্রকৃতির যে, আইন তা আল্লাহ্র কর্তৃত্বের প্রকাশ মাত্র। এই আইন অমোঘ, অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী ।
২৫৩৭। আল্লাহ্র কর্তৃত্বের ধারণাকে স্বচ্ছ করার জন্য এই আয়াতটির বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীরতা পূর্ণ। আকাশমন্ডলী অর্থাৎ নভোঃমন্ডল যা গ্রহ নক্ষত্র ও গ্যালাক্সী ধারণ করে, পৃথিবী এবং নভোঃমন্ডলের মধ্যবর্তী স্থান, পৃথিবীতে এবং ভূগর্ভে সর্বত্র আল্লাহ্র কর্তৃত্ব বর্তমান।
২৫৩৮। এই আয়াতটির তিন রকম ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ১) প্রকাশ্যে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা বা সশব্দে , সজোরে বলার মাধ্যমে কোনও তথ্য বা সংবাদ আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায় না। কারণ তিনি মনের গুপ্ত, ব্যক্ত ও অব্যক্ত সকল চিন্তা ভাবনার খবর রাখেন। বাইরে সজোরে যাই প্রকাশ করা হোক না কেন অন্তরের গোপন ইচ্ছা, ভাবনা-চিন্তা সবই সেই সর্বশক্তিমানের নিকট দিবালোকের ন্যায় স্বচ্ছ। সুতারাং আল্লাহ্কে কিছু জানানোর জন্য সশব্দ হওয়ার প্রয়োজন নাই। ২) মনে এক ও মুখে অন্য কথা এরূপ মিথ্যা ভান ও অবিশ্বস্ততা কোনও মঙ্গল বয়ে আনবে না। কারণ আল্লাহ্ এসব বাহ্যিক কথাবার্তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অবগত আছেন। আল্লাহ্র কাছে যা মূল্যবান তা হচ্ছে আত্মার স্বচ্ছতা, পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততা। সুতারাং অবিশ্বস্ত কথা , প্রতিজ্ঞা , প্রার্থনা কোনও কিছুই আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ৩) সজোরে কোরাণ আবৃত্তি করা বা উচ্চস্বরে প্রার্থনা করা আল্লাহ্র কাছে খুর জরুরী নয়। কারণ এবাদতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ বাইরের শব্দচয়ন বা উচ্চস্বরের দ্বারা বিচার করবেন না। তাঁর বিচারের মানদণ্ড হবে পাঠকের বা প্রার্থনায় নিবেদিতের আত্মিক অবস্থা। অন্তরের একাগ্রতা, ও স্রষ্টার কাছে বিনয়ে একান্ত নিবেদনই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। কে আকুলভাবে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করে , আর কে করে না তা আল্লাহ্ খোলা বই এর মত, প্রখর দিবালোকের মত পাঠ করতে পারেন।
২৫৩৯। দেখুন আয়াত [ ১৭ : ১১০ ] ও টিকা ২৩২২। জীবনের সকল সৌর্ন্দয্য , পৃথিবীর সকল সুন্দর জিনিষ আল্লাহ্র শিল্পী সত্ত্বার প্রকাশ মাত্র। মানুষের সৃষ্ট শিল্প, সঙ্গীত, ভাষা, সাহিত্য সবই মানুষের দ্বারা আল্লাহ্ সৃষ্টি করান। আবার বিশ্ব প্রকৃতিতে অহরহ যে সৌন্দর্যের লীলাখেলা চলে, বিশ্ব-ভূমন্ডল যে সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি, তা আল্লাহ্রই শিল্পী সত্ত্বার প্রকাশ মাত্র। এই প্রকাশের বিভিন্নতাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য তারই অবদান। তাঁর এই গুণাবলীই তাঁর বিভিন্ন নামের প্রতি আরোপ করা হয়। এই আরোপিত নাম তাঁরই মাহাত্ম্য ও সম্মানকে ঘোষণা করে।
সূরা তা - হা
Page 1 of 10
সূরা তা - হা বা সাংকেতিক অক্ষর - ২০
১৩৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
এই সূরার অবতীর্ণের সময়কাল , ধর্মীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সেই সূরা যা শ্রবণে হযরত ওমর, হত্যাকারী থেকে মোমেন বান্দাতে পরিণত হন, এই ঘটনা ঘটে হিজরতের সাত বৎসর পূর্বে।
ইব্নে হিসান সম্পূর্ণ ঘটনাটির খুঁটিনাটি বর্ণনা করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর ছিলেন ইসলামের অন্যতম প্রধান নির্যাতনকারী শত্রু। তিনিও অন্যান্য কোরেশদের মত সর্বদা ষড়যন্ত্র করতেন যে কিভাবে রসুলের (সা) জীবন বিনাশ করা যায়। এরকম সময়ে তাঁকে সংবাদ দান করা হয় যে, তার বোন ফাতেমা ও ভগ্নীপতি সা'দ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেহেতু সে সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের উপরে অত্যাচার করা হতো সেহেতু তারা সযত্নে তাদের বিশ্বাসকে গোপন রেখেছিলেন। খবর শুনে ওমর রাগে অন্ধ হয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁদের বাড়ীতে গমন করেন, সে সময়ে তাঁরা তাঁদের কাছে লিখিত এই সূরার অনুলিপি পাঠ করছিলেন। ওমর তাঁর বোন ও ভগ্নীপতিকে আক্রমণ করেন। কিন্তু তাঁরা সেসময়ে প্রচন্ড ধৈর্য্যের পরিচয় দেন, কিন্তু দৃঢ়তার সাথে তাদের ঈমানের সত্যতা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। ওমর তাদের বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতা ও ধৈর্য দেখে এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে যান যে, তিনি তাঁদের কোরাণের অংশটি যা তারা পড়ছিলেন তা দেখাতে বলেন। তাঁকে তা দেয়া হয় এবং তিনি তা পাঠ করেন। এই সূরা পাঠে তার হৃদয় এতটাই অভিভূত হয়ে যায় যে, তিনি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করেন, শুধু তাই - ই নয়, তিনি হলেন ইসলামের এক শক্ত মজবুত স্তম্ভের মত একজন দৃঢ় সমর্থক।
হযরত সা'দের কাছে সূরার কয়েকটি পাতা ছিলো মাত্র ; সম্ভবতঃ তা ছিলো প্রথম দিকের। এই সূরার প্রারম্ভে " তা - হা" এই দুটি বর্ণমালা মুদ্রিত করা হয়েছে। এই বর্ণমালা দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে ? প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে এরূপ বর্ণমালা সন্নিবেশ দ্বারা ভাবগত অব্যয়কে বোঝানো হয়েছে যার অর্থ , " হে মানবকূল!" এই সূরাকে পূর্বের সূরার ধারাবাহিকতা বলা যায়। এখানে হযরত মুসার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র নিকট থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পরে যে সঙ্কট তিনি অতিক্রম করেন, তাঁর মায়ের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কিভাবে তিনি ফেরাউনের নিকটে নীত হন, কিভাবে তিনি সেখানে মিশর বাসীদের সর্বোচ্চ জ্ঞান বিজ্ঞান শেখার সুযোগ লাভ করেন যা পরবর্তীতে তিনি আল্লাহ্র সেবায় নিয়োজিত করেন। তাঁর পালিত পিতা [ ২৮ : ৯ ] ফেরাউনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে এই সূরার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মুসার কাহিনীর মধ্যে বর্ণনা আছে কিভাবে বিপথগামী এক ব্যক্তি ইসরাঈলীদের মূর্তি পূঁজাতে অনুপ্রাণীত করে, এ ভাবেই চিরশত্রু শয়তান মানুষের পতন ঘটায়। আল্লাহ্র স্তুতি ও আল্লাহ্র নিকট একান্ত প্রার্থনা আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের অবসান ঘটায়, আর এ ভাবেই আত্মাকে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ গ্রহণের যোগ্য করে তোলে।
সারসংক্ষেপ : আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ [ কোরাণ ] কোন দুঃখ দুর্দ্দশার কারণ নয় বরং তা হচ্ছে পরম করুণাময়ের করুণার উপহার। [ ২০ : ১ - ৮ ]।
আল্লাহ্ কিভাবে হযরত মুসাকে নির্বাচিত করেন এবং তাঁর ভাই হারূণ সহ হযরত মুসাকে ফেরাউনের নিকট পাঠান। [ ২০ : ৯ - ৩৬ ]।
হযরত মুসার মাতাকে আল্লাহ্ নির্দ্দেশ দান করেন শিশু মুসাকে নদীতে নিক্ষেপ করার জন্য। শিশু মুসা আল্লাহ্র তত্বাবধানে ফেরাউনের প্রাসাদে লালিত পালিত হতে থাকেন , যেনো ভবিষ্যতে মুসা ফেরাউনকে আল্লাহ্র পথে আহ্বান করতে পারেন। [ ২০ : ৩৭ - ৭৬ ]
আল্লাহ্ মুসাকে শিক্ষা দেন তাঁর লোকজনদের পরিচালনা করার জন্য এবং তাদের বিদ্রোহী মনোভাবকে দমন করার জন্য। বর্ণনা আছে কি ভাবে সামীরি ইসরাঈলীদের উত্তেজিত করে। [ ২০ : ৭৭ - ১০৪ ]
শেষ বিচারের দিনে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বই হবে একমাত্র বিচারের বিষয় এবং সকলেই প্রকৃত সত্যকে অনুধাবন করবে। মানব সন্তান সর্বদা আদমের শত্রু শয়তানের থেকে নিজেকে রক্ষা করবে। তাঁরা অহংকার পরিত্যাগ করবে এবং আল্লাহ্র প্রশংসা ও প্রার্থনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে। সেদিনের ডাকের জন্য প্রত্যেকে অপেক্ষা করবে [ ২০: ১০৫ - ১৩৫]
সূরা তা - হা বা সাংকেতিক অক্ষর - ২০
১৩৫ আয়াত, ৮ রুকু, মক্কী[ দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
০১। তা - হা , ২৫৩৪
২৫৩৪। ব্যাখ্যার জন্য দেখুন এই সূরার ভূমিকা।
০২। তুমি ক্লেশ পাবে এ কারণে আমি তোমার প্রতি কুর-আন অবতীর্ণ করি নাই ; ২৫৩৫
০৩। বরং যারা [ আল্লাহ্কে ] ভয় করে কেবল তাদের উপদেশের জন্য [ করেছি ]।
০৩। বরং যারা [ আল্লাহ্কে ] ভয় করে কেবল তাদের উপদেশের জন্য [ করেছি ]।
২৫৩৫। আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ দুভাবে মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। ১) মানুষের স্বার্থপরতা সর্বগ্রাসী। আল্লাহ্র নির্দ্দেশনা এই স্বার্থপরতাকে ও সংঙ্কীর্ণতাকে বাধা দান করে। ২) এই প্রত্যাদেশ পাপীদের বিরক্তি উৎপাদন করে যার ফলে তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের আশ্রয় গ্রহণ করে এবং অত্যাচার করে। এগুলি ঘটে কারণ মানুষের দূরদৃষ্টির অভাব। আল্লাহ্ কোরাণ অবতীর্ণ করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য , ক্লেশ দেওয়ার জন্য নয়। আয়াতটিতে রসুলুল্লাহকে (সা ) সান্তনা দেয়া হয়েছে , কারণ কাফেররা কোরাণকে অস্বীকার করলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। উপদেশ প্রদান তাঁর কর্তব্য, তা গ্রহণ করার জন্য তিনি দায়ী নন। এই আয়াতের বক্তব্য সর্ব যুগের ও সর্ব কালের জন্য প্রযোজ্য।
০৪। এটা একটি প্রত্যাদেশ তাঁর নিকট থেকে, যিনি পৃথিবী ও সুউচ্চ আকাশ মন্ডলী সৃষ্টি করেছেন।
০৫। পরম করুণাময় [আল্লাহ্ কর্তৃত্বের ] আসনে দৃঢ়ভাবে সমাসীন ২৫৩৬।
০৫। পরম করুণাময় [আল্লাহ্ কর্তৃত্বের ] আসনে দৃঢ়ভাবে সমাসীন ২৫৩৬।
২৫৩৬। অনুরূপ আয়াত [ ১০:৩] এবং ব্যাখ্যার জন্য দেখুন টিকা ১৩৮৬। যেখানে , সিংহাসনে কথাটির ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। আমাদের সীমিত বিচার বুদ্ধিতে যদি কোনও কিছুকে অন্যায় অবিচার মনে হয় , তবে আল্লাহ্কে স্মরণ করতে হবে। আল্লাহ্ তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে পরিব্যপ্ত করে দয়া ও করুণার সিংহাসনে সমাসীন আছেন। তিনিই সব কিছুর নির্দ্দেশ দান করেন এবং আমাদের এই বিশ্বাস মনে রাখতে হবে যে আমাদের সকল বিপদ আপদ বাঁধা তাঁর করুণায় কল্যাণে রূপান্তরিত হবে। আল্লাহ্র কর্তৃত্ব পৃথিবীর কর্তৃত্বের মত নয়। পৃথিবীর কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা যায়, অস্বীকার করা চলে , প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আহ্বান করা যায় বা তা চিরজীবন স্থায়ী হবে না। কিন্তু আল্লাহ্র কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী , অবিনশ্বর, অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্ব-ভূবনে ,দ্যুলোকে-ভূলোকে প্রকৃতির যে, আইন তা আল্লাহ্র কর্তৃত্বের প্রকাশ মাত্র। এই আইন অমোঘ, অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী ।
০৬। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে এবং এই দুই এর মধ্যে যা আছে এবং মাটির অভ্যন্তরে যা থাকে সব তাঁর অধিকারে ২৫৩৭।
২৫৩৭। আল্লাহ্র কর্তৃত্বের ধারণাকে স্বচ্ছ করার জন্য এই আয়াতটির বিবরণ অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীরতা পূর্ণ। আকাশমন্ডলী অর্থাৎ নভোঃমন্ডল যা গ্রহ নক্ষত্র ও গ্যালাক্সী ধারণ করে, পৃথিবী এবং নভোঃমন্ডলের মধ্যবর্তী স্থান, পৃথিবীতে এবং ভূগর্ভে সর্বত্র আল্লাহ্র কর্তৃত্ব বর্তমান।
০৭। তুমি যদি উচ্চস্বরে শব্দ উচ্চারণ কর [ তাতে কিছু যায় আসে না ]। কারণ তিনি তো গুপ্ত ও অব্যক্ত সকলই জানেন ২৫৩৮।
২৫৩৮। এই আয়াতটির তিন রকম ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ১) প্রকাশ্যে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা বা সশব্দে , সজোরে বলার মাধ্যমে কোনও তথ্য বা সংবাদ আল্লাহ্র কাছে পৌঁছায় না। কারণ তিনি মনের গুপ্ত, ব্যক্ত ও অব্যক্ত সকল চিন্তা ভাবনার খবর রাখেন। বাইরে সজোরে যাই প্রকাশ করা হোক না কেন অন্তরের গোপন ইচ্ছা, ভাবনা-চিন্তা সবই সেই সর্বশক্তিমানের নিকট দিবালোকের ন্যায় স্বচ্ছ। সুতারাং আল্লাহ্কে কিছু জানানোর জন্য সশব্দ হওয়ার প্রয়োজন নাই। ২) মনে এক ও মুখে অন্য কথা এরূপ মিথ্যা ভান ও অবিশ্বস্ততা কোনও মঙ্গল বয়ে আনবে না। কারণ আল্লাহ্ এসব বাহ্যিক কথাবার্তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অবগত আছেন। আল্লাহ্র কাছে যা মূল্যবান তা হচ্ছে আত্মার স্বচ্ছতা, পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততা। সুতারাং অবিশ্বস্ত কথা , প্রতিজ্ঞা , প্রার্থনা কোনও কিছুই আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ৩) সজোরে কোরাণ আবৃত্তি করা বা উচ্চস্বরে প্রার্থনা করা আল্লাহ্র কাছে খুর জরুরী নয়। কারণ এবাদতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ বাইরের শব্দচয়ন বা উচ্চস্বরের দ্বারা বিচার করবেন না। তাঁর বিচারের মানদণ্ড হবে পাঠকের বা প্রার্থনায় নিবেদিতের আত্মিক অবস্থা। অন্তরের একাগ্রতা, ও স্রষ্টার কাছে বিনয়ে একান্ত নিবেদনই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। কে আকুলভাবে স্রষ্টার সান্নিধ্য কামনা করে , আর কে করে না তা আল্লাহ্ খোলা বই এর মত, প্রখর দিবালোকের মত পাঠ করতে পারেন।
০৮। আল্লাহ্ ! তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই ! সুন্দর নাম সকল তারই জন্য নিবেদিত ২৫৩৯।
২৫৩৯। দেখুন আয়াত [ ১৭ : ১১০ ] ও টিকা ২৩২২। জীবনের সকল সৌর্ন্দয্য , পৃথিবীর সকল সুন্দর জিনিষ আল্লাহ্র শিল্পী সত্ত্বার প্রকাশ মাত্র। মানুষের সৃষ্ট শিল্প, সঙ্গীত, ভাষা, সাহিত্য সবই মানুষের দ্বারা আল্লাহ্ সৃষ্টি করান। আবার বিশ্ব প্রকৃতিতে অহরহ যে সৌন্দর্যের লীলাখেলা চলে, বিশ্ব-ভূমন্ডল যে সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি, তা আল্লাহ্রই শিল্পী সত্ত্বার প্রকাশ মাত্র। এই প্রকাশের বিভিন্নতাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য তারই অবদান। তাঁর এই গুণাবলীই তাঁর বিভিন্ন নামের প্রতি আরোপ করা হয়। এই আরোপিত নাম তাঁরই মাহাত্ম্য ও সম্মানকে ঘোষণা করে।
