Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ২০ জন
সর্বমোট পাঠক ১২৪০৯০ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ৮৩৩৯৯ বার
+ - R Print

সূরা বাকারা

সূরা বাকারা - ২

২৮৬ আয়াত, ৪০ রুকু, মাদানী
[দয়াময়,পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]

ভূমিকা : প্রারম্ভিক সূরা ফাতেহায় ৭টি আয়াতকে কোরআন শরীফের সার সংক্ষেপ বলা যায়, ঠিক সে রকম এই সূরায় ২৮৬টি আয়াতে সমগ্র কোরআন শরীফের শিক্ষাকে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

সার সংক্ষেপ : এই সূরায় -

১-২৯ আয়াতে গূঢ় অর্থসম্পন্ন উপদেশাবলীর মাধ্যমে তিন রকম লোকের কথা বলা হয়েছে এবং কিভাবে এই তিন শ্রেণীর লোক আল্লাহ্‌র উপদেশাবলী গ্রহণ করে সে সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। যারা আল্লাহ্‌র কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করে অবশ্যই আল্লাহ্‌র বাণী তাদের পথ প্রদর্শন করে। যারা তাঁর বাণী প্রত্যাখ্যান করে তারা চক্ষুষ্মান হয়েও অন্ধ। তাদের আত্মায় সীল-মোহর দেয়া। মুনাফিকদের জন্য করুণা, কারণ তারা নিজেরাও প্রতারিত এবং অন্যকেও প্রতারিত করতে সর্বদা থাকে সচেষ্ট। সুন্দর উপমার সাহায্যে এই কথাটি প্রকাশ করা হয়েছে। বৃষ্টি ফসলের জমিকে ফুল-ফল-ফসলে ভরিয়ে তোলে। আবার সেই বৃষ্টিই আগাছায় ভর্তি জমিতে কাঁটাগাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সেরূপ বিশ্বাসী বা ঈমানদার লোকের জন্য আল্লাহ্‌র বাণী, তার ঈমানের ভীত আরও মজবুত করে, আবার সেই একই বাণী অবিশ্বাসীদের হৃদয়ের ব্যাধি বৃদ্ধি করে।

আয়াত ৩০-৩৯ এ বলা হয়েছে মানুষের সৃষ্টি সম্বন্ধে, বলা হয়েছে সৃষ্ট জগতে তার উচ্চে অধিষ্ঠান, তার পতন, পৃথিবীতে বিবর্তণের ধারায় তার পথ চলার নির্দেশ সম্বন্ধে।
আয়াত ৪০-৮৬ এ বলা হয়েছে ইসরাইলীদের সম্পর্কে। তাদের কিতাব, তাদের ঐতিহ্য, আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নেয়ামত এবং কিভাবে তারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়েছিলো, উপমা ও সাধারণ কাহিনীর মাধ্যমে তা বর্ণনা করা হয়েছে।

আয়াত ৮৭-১২১ হযরত মুসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর সম্পর্কে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কিভাবে তাঁরা অবাধ্য ও অবিশ্বাসী জনতার সাথে সংগ্রাম করেছিলেন। কিভাবে ঐশী কিতাব প্রাপ্ত লোকেরা তাদের নিজেদের কিতাবের বাণী অস্বীকার করেছিলো। কিভাবে তারা অহংকারের স্ফীত হয়ে হযরত মুহম্মদ (দঃ) কে অস্বীকার করেছিলো; যদিও তারা জানতো যে নবুয়তের ধারাবাহিকতায় তিনিই শেষ নবী।

আয়াত ১২২-১৪১। পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর সম্বন্ধে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম একজন সতিক্যারের পূণ্যবান ইমাম ছিলেন। তিনি আরবে জন্ম গ্রহণকারী হযরত ইসমাঈলের বংশের পূর্বপুরুষ। আবার ইসরাইল সম্প্রদায়েরও পূর্বপুরুষ ছিলেন তিনি। তিনিই হযরত ইসমাঈল সহযোগে কাবা শরীফ নির্মাণ করেন এবং পরিশুদ্ধ করেন। এভাবেই তিনি সকলের জন্য একই ধর্মের অবতারণা করেন। আর তাঁর এই ধর্মের বিশ্বনন্দিত রূপই হচ্ছে ইসলাম।
আয়াত ১৪২-১৬৭। কা'বা শরীফ এখন বিশ্ব মানবের এবাদতের স্থান এবং বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।

আয়াত ১৬৮-২৪২। এভাবেই বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রতিষ্ঠা যার এক নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু ও প্রতীক আছে - আর তা হচ্ছে কা'বা শরীফ। সারা মুসলিম জাহানের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম কানুনের প্রবর্তন করা হয়েছে। তাদের সামাজিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন সম্পর্কে নিয়ম-নীতি নির্দেশ দান করা হয়েছে। একথা দ্ব্যার্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কোন ধর্ম নাই, কোনও পূণ্য নাই। পূণ্য আছে এক স্রষ্টায় বিশ্বাসে, জীবে দয়ায়, প্রার্থনায়, দানে এবং দুঃখ দুর্দশায় ধৈর্য্য ধারণের মধ্যে। সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে যেমন-খাদ্য, পানীয়, উপবাস, বিষয়-সম্পত্তির বন্টন, জিহাদ, মদ, জুয়া, এতিম এবং মেয়েদের প্রতি ব্যবহার সম্পর্কীয় নিয়ম কানুন ইত্যাদি সম্পর্কে নির্দেশ দান করা হয়েছে।

আয়াত ২৪৩-২৫৩। জিহাদকে যেনো ভুল বোঝা না হয়। জিহাদের প্রকৃতরূপকে বোঝানোর জন্য তালুত, গোলিয়াথ ডেভিডের ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে। যুগে-যুগে, কালে-কালে নবী রাসূলদের পৃথিবীকে প্রেরণ করা হয়েছে মিথ্যার বিরুদ্ধে জেহাদ এবং সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য।

আয়াত ২৫৪-২৮৩। এই আয়াতসমূহে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে সত্যিকারের গুণাবলী বা ধর্মাচারণ মুখের কথা নয়। সত্যিকারের ধর্ম নির্ভর করে-দয়া, মায়া, মহত্ব, স্রষ্টার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও ভালোবাসার মধ্যে।

আয়াত ২৫৫। এই আয়াতটিতে আল্লাহ্‌র প্রকৃতি সম্বন্ধে বলা হয়েছে। আয়াতটিকে বলা হয় "আয়তাল কুরশী"। অর্থাৎ তিনি সেই বিশ্ব প্রতিপালক যার আসন ভূলোকে, দ্যুলোকে, সর্বত্র। যার উপস্থিতি বিশ্বব্যাপী।

আয়াত ২৮৪-২৮৬। এই সূরা শেষ করা হয়েছে এক স্রষ্টায় বিশ্বাস (Faith), তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং ধর্মের ব্যাপারে ব্যক্তিগত দায় দায়িত্বের উপরে গুরুত্ব আরোপ করে।
কুরআন শরীফে সূরা বাকারা হচ্ছে সর্ববৃহৎ সূরা। ২৮২ নম্বর আয়াতটি হচ্ছে কুরআন শরীফের সর্ববৃহৎ আয়াত যা এই সূরাতে বিদ্যমান। আয়াত ৬৭-৭১ এ দেয়া উপমা অনুসারে গাভী নাম দেয়া হয়েছে। এই উপমায় দেখানো হয়েছে, যখন বিশ্বাসের ভিত থাকে দুর্বল, তখন আনুগত্য প্রকাশ করা হয় কষ্টসাধ্য। যখন বিশ্বাসের ভিতে চির ধরে মানুষ নানা অজুহাতে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। এমন কি যদিও তারা আক্ষরিক অর্থে, আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে স্রষ্টাকে মান্য করতে চেষ্টা করে কিন্তু তা হয় সম্পূর্ণ বাহ্যিক। যে বিশ্বাস, যে আনুগত্য আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত নয় তা স্রষ্টার কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব লোকেরা নিজেদের ধার্মিক বলে প্রচার করলেও এরা আত্মিক দিক থেকে মৃত। এদের আত্মা মমিতে পরিণত হয়ে যায়। তাদের আত্মম্ভরিতা, স্বার্থপরতা, স্বনির্ভরশীলতা তাদের করে তোলে অহংকারী। ফলে তারা বুঝতে অপারগ যে আত্মিক দিক থেকে তারা মৃত। কারণ স্রষ্টার যে করুণা যা বিশ্বজগতকে বেষ্টন করে আছে, যে অমিয়ধারাতে সারা সৃষ্টি অবগাহন করে ধন্য তারা তা বুঝতে অসমর্থ। স্রষ্টার অস্তিত্ব তারা অনুভব করতে অসমর্থ। জীবন বহমান-গতিশীল, কর্মচঞ্চল। হীন, নীচ, কর্দমাক্ত জীবন থেকে উর্ধ্বলোকে আরোহণের চেষ্টাই হচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্য। এটাই হচ্ছে এই সূরার মূল ধারা। এ সূরা মদিনায় নাজেল হওয়া সূরাগুলির মধ্যে প্রধান সূরা।

সূরা বাকারা - ২

২৮৬ আয়াত, ৪০ রুকু, মাদানী
[দয়াময়,পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]

১। আলিফ, লাম, মিম্‌ ২৫।

২৫। আলিফ্‌ লাম্‌ মিম্‌ -এই তিনটি অক্ষর সূরা বাকারা এবং আরও ৩, ২৯, ৩০, ৩১ এবং ৩২ এই সূরাগুলির (মোট সংখ্যা ৬) প্রারম্ভে স্থাপন করা হয়েছে। সূরা বাকারা এবং সূরা আল-ইমরানে একটা জাতির উত্থান-পতন, ভূত-ভবিষ্যত এবং তাদের সমগ্র ইতিহাস সম্বন্ধে বলা হয়েছে, আবার সেই সাথে নূতন জাগ্রত জাতি মুসলমানদের সামাজিক রীতিনীতি সম্বন্ধেও বলা হয়েছে। সূরা ২৯ এ ঠিক একইরকম যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে। তবে এখানে জাতি হিসেবে না বলে প্রতিটি আত্মার জীবন-মৃত্যু, জয়-পরাজয়, অতীত-বর্তমান অর্থাৎ এই পৃথিবীতে মানব-আত্মার অস্তিত্বের পূর্ণ ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ৩০ আমাদের বলে, আল্লাহ্‌ সকল শক্তির উৎস। সব কিছু তাঁর থেকে উৎপত্তি আবার তাঁর কাছেই সবকিছু ফিরে যাবে। সূরা ৩১ ও ৩২ শে ঐ কথাকেই পুনরায় সঞ্জিবীত করা হয়েছে।

নূতনভাবে, নূতন ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে যে, এক আল্লাহ্‌ই হচ্ছেন সবকিছুর স্রষ্টা এবং একমাত্র তিনিই শেষ বিচারের মালিক। সূতরাং সে সব সূরা আলিফ্‌, লাম্‌, মিম্‌ এই তিন অক্ষর দ্বারা শুরু হয়েছে তাদের সবার মধ্যেই অন্তর্নিহিত ভাব এক। আর তা হচ্ছে জীবন ও মৃত্যুর রহস্য, সৃষ্টির আরম্ভ ও শেষের রহস্য এবং সব রহস্যের সমাধান এক স্রষ্টার কাছে বিদ্যমান। তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। এই অক্ষর তিনটি সম্বন্ধে অনেক কথা বলা হয়েছে, অনেক আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর সবটাই অনুমান নির্ভর। প্রকৃত অর্থ জানেন একমাত্র আল্লাহ্‌। অনেকে মনে করেন এই অক্ষরগুলি প্রতীকধর্মী। সুতরাং এ সম্বন্ধে যুক্তি তর্কের অবকাশ নাই।

০২। এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নাই, ইহা আল্লাহ্‌ ভীরুদের তথা মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শক ২৬।

২৬। 'আল্লাহ্‌ ভীরু বা তাকওয়া অবলম্বনকারী'-এ আরবী শব্দটির অর্থ আল্লাহ্‌ ভীতি। আল্লাহ্‌ ভীতি অর্থ এই নয় যে অপরাধীরা যেভাবে বিচারককে ভয় পায় সেভাবে শুধুমাত্র শাস্তির ভয়ে ভয় করা। তাকওয়ার মূল ভাব হচ্ছে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালবাসা। আর এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। অর্থাৎ মনের ঐকান্তিক ইচ্ছা আল্লাহ্‌র আদেশকে মেনে চলার বা যা থেকে আল্লাহ্‌ বিরত থাকতে বলেছেন তা থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকা। আল্লাহ্‌র প্রতি এই ভালবাসাই হচ্ছে সকল কিছুর মূল চালিকাশক্তি। তাকওয়াকে এভাবে প্রকাশ করা যায়। প্রথমতঃ (১) আল্লাহ্‌কে ভয় করতে হবে ভালবেসে। (২) আল্লাহ্‌ যা অপছন্দ করেন তা থেকে দূরে থাকতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র আইন না ভাঙ্গা, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে না যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আল্লাহ্‌ বারে বারে বলেছেন-মিথ্যা কথা না বলতে, সত্যি কথা বলতে, অন্যকে না ঠকাতে, ন্যায় ও সত্যের পথে চলতে ইত্যাদি মেনে চলাই হচ্ছে আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলা। আল্লাহ্‌কে ভালবেসে, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের আশায়, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের আশায় আমাদের জিহবা (অর্থাৎ কথা বা ভাষা), হাত (অর্থাৎ কাজ, সমাজ ও সংসারের প্রতি),মন ও মেধাকে সংযত করতে হবে। অর্থাৎ নিজেকে কথায়, কাজে, সমস্ত অন্যায় ও অসত্য থেকে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্টি করার জন্য সংযত রাখতে হবে। (৩) অন্যায়, অসত্য ইত্যাদি থেকে নিজেকে সর্বদা বিরত রাখার ফলে ব্যক্তির চরিত্রে সৎগুণের জন্মলাভ করে, এই গুণাবলীই হচ্ছে ধর্মপরায়ণতার ভিত্তি। এরূপ ব্যক্তি সর্বান্তকরণে অসৎ ও অন্যায় পথ পরিহার করবে এবং নিজের জীবনে ন্যায়, সত্য ও কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য্য প্রভৃতি গুণের প্রতিফলন ঘটাবে। এর জন্য প্রয়োজন সর্বশক্তি দিয়ে আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ-Cause of God is the cause of justice and cause of oppressed। [দেখুন টিকা ৭৪০, আয়াত ৪৭ : ১৭]

০৩। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাতে দূঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং আমি তাদের যে জীবনপোকরণ সরবরাহ করেছি তা থেকে ব্যয় করে ২৭,


২৭। বিশ্বে যা কিছু সুন্দর সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি সর্বশক্তিমান এক আল্লাহ্‌। আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাকে যা কিছু নেয়ামত দান করেছেন তা থেকে সৎকাজে দান করতে বলা হয়েছে। অনেক তফসীরকারগণ মনে করেন অর্থ এবং ধন-সম্পদই একমাত্র দান করার বিষয়বস্তু। কিন্তু আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে শুধুমাত্র অর্থের নিক্তিতে মাপলে ভুল করা হবে। মানুষকে আল্লাহ্‌ সৃষ্টির সেরা জীব করেছেন সেটা শুধুমাত্র এজন্য নয় যে, সে আর্থিক সাচ্ছন্দ্য সংগ্রহে সক্ষম। মানুষ 'আশরাফুল মাখলুকাত'- সৃষ্টির সেরা জীব, কারণ তার চারিত্রিক গুণাবলী। চারিত্রিক গুণাবলীর কারণেই মানুষ কখনও ফেরেশতার সমতুল্য, আবার এর অভাবে পশুর সমান। এই সব চারিত্রিক গুণাবলী, মেধা, মননশক্তি সবই মহান আল্লাহ্‌র দান। এ সবই আল্লাহ্‌র নেয়ামত। আল্লাহ্‌র নেয়ামতকে আমরা তিন ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

প্রথমত : বস্তুগত দান, যথা ধন-সম্পদ, খাদ্য, বাসস্থান, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। অর্থাৎ যা কিছু আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করতে পারি, এ সব কিছুই এই শ্রেণীর নেয়ামতের অন্তর্গত।

দ্বিতীয়ত : স্পর্শাতীত দান অর্থাৎ যে নেয়ামত পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায় না যথা- উচ্চ মর্যাদা, বংশ মর্যাদা, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপক্তি, সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্য, প্রতিভা, মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি ইত্যাদি যা ব্যক্তির চরিত্রের প্রকাশ পায় তা সবই আল্লাহ্‌র নেয়ামত।
তৃতীয়ত : বিবেক (Spiritual gift),জাগ্রত বিবেক আল্লাহ্‌র সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। যথা-ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা,ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা, অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা, মানুষকে তার গুণাবলীর দ্বারা বিচার করার ক্ষমতা, ভালোবাসার ক্ষমতা, গুণাবলীর সনাক্ত করার ক্ষমতা,ইত্যাদি ইত্যাদি।

আল্লাহ্‌ বিভিন্ন ব্যক্তিকে তার এই নেয়ামতের বিভিন্ন অংশ দান করে থাকেন। কেউ হয়তো অর্থ-সম্পদে সম্পদশীল, আবার কেউ উচ্চ পদ মর্যাদার অধিকারী, কেউ মেধা, বুদ্ধিতে কৃতী। আল্লাহ্‌ বলেছেন যার মধ্যে এই তিন ধরনের যে কোন ধরনের নেয়ামতের প্রকাশ ঘটুক না কেন তা নিয়ে অহংকার করার কিছুই নাই। এ সবই বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র দান। এ দান কখনও একা ভোগ করতে নাই। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধানের জন্য, তার সৃষ্টির সেবার জন্য, মানুষের মঙ্গলার্থে এসব নেয়ামত বা আল্লাহ্‌র দানকে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ যার অর্থ আছে তিনি অর্থ দান করবেন জনহিতকর কাজে। যার মেধা আছে তিনি সেই মেধা, যার প্রভাব প্রতিপত্তি আছে তিনি সেই প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদি যে নেয়ামতই বান্দার থাকুক না কেন তিনি সেই নেয়ামত আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মানুষের মঙ্গলের জন্য তার সৃষ্টির সেবার জন্য ব্যয় করবেন। অর্থাৎ অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, সঙ্গীত, শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের যে দক্ষতা বা প্রতিভা যাই-ই থাকুক না কেন তা আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে আল্লাহ্‌র এবাদত করা। ঠিক সেইভাবে যে ব্যক্তি আত্মিক নেয়ামতে ধন্য বা বিবেকবান, তার উচিত তার সেই জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি সমাজের বিবেককে জাগ্রত করার কাজে নিবেদন করা। জনসাধারণের বিবেককে জাগ্রত করার জন্য, তারা যাতে ন্যায়কে-অন্যায় থেকে পার্থক্য করতে পারে, ভালকে মন্দ থেকে আলাদা করতে পারে, বিশ্ব মানবতার জন্য তাদের সেই জ্ঞানকে ব্যবহার বা বিতরণ করতে হবে। এর জন্য আমাদের কঠোর তপস্বী হওয়ার প্রয়োজন নাই অথবা অত্যন্ত কৃপণ বা অপচয়ী হওয়ারও প্রয়োজন নাই। এই হচ্ছে দানের সংজ্ঞা।

০৪। এবং তোমার নিকট যে প্রত্যাদেশ প্রেরিত হয়েছে তাতে এবং তোমার পূর্বে যা প্রেরিত হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং [যাদের হৃদয়ে] পরকালের জীবন সম্বন্ধে রয়েছে নিশ্চিত বিশ্বাস ২৮।

২৮। ঈমান বা আল্লাহ্‌তে বিশ্বাস শুধুমাত্র একটি মৌখিক স্বীকারোক্তি মাত্র নয়। এটি এমন এক বিশ্বাস যা উৎসারিত হয় গভীর বোধ, অবিচল আস্থা, সেই আস্থা ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতা থেকে-যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র আদেশ-নির্দেশের প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের বাস্তব চর্চা এবং নিঃস্বার্থ মানবসেবার মাধ্যমে।
০৫। এরাই তাদের প্রভুর নির্দেশিত [সত্য] পথে রয়েছে এবং এরাই সাফল্য লাভ করবে ২৯।

২৯। 'সফলকাম' হবে বা 'উন্নতি' লাভ করবে অর্থাৎ আল্লাহ্‌র নেয়ামতের অধিকারী হবে। এগুলি সেইসব দুর্লভ চারিত্রিক গুণাবলী যার উল্লেখ পূর্বে করা হয়েছে। অর্থাৎ বান্দা যদি আল্লাহ্‌র হুকুম বা আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলে (যথা-সত্য কথা বলে, ন্যায়ের জন্য জিহাদ করে, মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে ইত্যাদি) তবে তার চরিত্রে দুর্লভ গুণাবলীর জন্ম নেবে। বোঝানোর জন্য একটি ছোট উদাহরণ দেয়া গেলো। সত্য কথা বলার অভ্যাস করা আল্লাহ্‌র হুকুম। আমাদের রাসূল (সাঃ) জীবনে কোনওদিন এমনকি নবুয়তের পূর্বেও একটিও মিথ্যা কথা বলেন নাই। এটাই হচ্ছে আমাদের সর্বপ্রথম এবং প্রধান সুন্নত এবং ফরজ। সত্যবাদীতা এক ধরণের অভ্যাস। এর থেকে যে চারিত্রিক গুণাবলীর জন্ম নেয় তা হচ্ছে সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি। আবার মিথ্যা বলাও একধরণের অভ্যাস। এর থেকে চরিত্রে যে সব দোষের সৃষ্টি হয়-তা হচ্ছে দূর্নীতিপরায়ণতা, অবিশ্বস্ততা, স্বার্থপরতা, অন্যকে ঠকানোর প্রবণতা ইত্যাদি। আত্মার উন্নতি লাভই হচ্ছে আধ্যাত্মিক সফলতার মূল কথা। সুতরাং যারা আল্লাহ্‌র কেতাবে বিশ্বাসী এবং সেই অনুযায়ী জীবন যাপন করেন আল্লাহ্‌ তাদের আত্মিক উন্নতি দান করেন। এর ফলে যে সমাজ আল্লাহ্‌র আইন মেনে চলে সে সমাজ শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে। কারণ একটি পাপ অপর একটি পাপকে আকর্ষণ করে, অনুরূপভাবে একটি নেকীর (অর্থাৎ চারিত্রিক গুণাবলীর) বদলায় অপর নেকী বা (চারিত্রিক গুণাবলী) সৃষ্ট হয়।

'নেকী" একটি বিমূর্ত অর্থজ্ঞাপক শব্দ। কিন্তু আমাদের সমাজে নেকী শব্দটিকে বস্তুগতভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন-কোন কোন মৌলভী সাহেবেরা বলে থাকেন-অমুক কাজটি করলে আল্লাহ্‌ ৭০টি নেকী দান করবেন। নেকীকে এরকম বস্তুগতভাবে উপস্থাপন করা যায় না। নেকী হচ্ছে আল্লাহ্‌র সেই বিশেষ নেয়ামত যা আত্মাকে সমৃদ্ধ করে, ফলে আত্মা দুঃখ-কষ্ট ভরা পৃথিবীতে থেকেও দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পায়; আত্মা অপার শান্তির পরশ অনুভব করে। সেই হিসেবে নেকী হচ্ছে চারিত্রিক গুণাবলী কারণ একমাত্র শুদ্ধ চারিত্রিক গুণাবলীই মানব সন্তানকে লোভ-লালসা ভরা পৃথিবীর উর্ধ্বে স্থাপন করতে পারে। আর ব্যক্তি যখন লোভ-লালসা ভরা পৃথিবীতে থেকেও তার উর্ধ্বে অবস্থান করতে পারে, শুধু তখনই সে বেহেশতি শান্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ, ঈর্ষা-নীচতা আত্মার ভিতরে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এই আয়াতে যে তিন শ্রেণীর লোকের কথা বলা হয়েছে, এরা হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর।

০৬। যারা ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করে ৩০, তুমি তাদের সতর্ক কর বা না কর, তাদের জন্য উভয়ই সমান, তারা কখনও ঈমান আনবে না।
৩০। এই আয়াতে দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের কথা আলোচনা করা হয়েছে। কাফের শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্‌র আইন অমান্য করে তাদের। আল্লাহ্‌র সান্নিধ্য বা হেদায়েত পেতে হলে প্রয়োজন ঐকান্তিক বিশ্বাস ও আন্তরিকতা। আন্তরিকভাবে আল্লাহ্‌র কাছে হেদায়েতের জন্য আকুতি জানাতে হবে। যে আল্লাহ্‌র কাছে আন্তরিকভাবে হেদায়েত বা সত্যপথে চলার নিশানা অনুসন্ধান করে, আল্লাহ্‌র অসীম রহমত তাকে বিধৌত করে। সত্য পথে চলার নিশানা তাদের নিকট হয় স্পষ্ট প্রতীয়মান। কিন্তু যদি কেউ অহংকারে স্ফীত হয়ে আল্লাহ্‌র আইন (God's Law) লঙ্ঘন করে, তাকে আল্লাহ্‌ হেদায়েত করেন না। কারণ মানুষই একমাত্র প্রাণী যাকে আল্লাহ্‌ সীমিত আকারে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Limited free will) দান করেছেন। সত্য পথ ও ভুল পথ এর যে কোন একটা পথকে বেছে নেবার স্বাধীনতা একমাত্র মানুষেরই আছে। কারণ মানুষ হচ্ছে 'সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব'। মানুষের শারীরিক যে চাহিদা তার সাথে প্রাণীকূলের শারীরিক চাহিদারও কোনও পার্থক্য নাই। আরাম-আয়েশ, ভাল খাদ্য, প্রজনন ইত্যাদি জৈবিক ব্যাপারে মানুষ ও প্রাণীকূলের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই। পার্থক্য হচ্ছে মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। নিজের সুখ ও সাচ্ছন্দ্য নিজে সৃষ্টি করে নিতে পারে। নিজের ভাল নিজে বুঝতে পারে। ইচ্ছা করলে সে চরিত্রের মাধুর্যে ফেরেশতার সমকক্ষ হতে পারে আবার ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হয়ে পশুর থেকে নিম্নস্তরে শয়তানে পরিণত হতে পারে। মানুষকে আল্লাহ্‌ খুব 'সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি' ( Limited free will ) দান করেছেন। যা সৃষ্টির অন্য কোন প্রাণীকে দান করা হয় নাই।