Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ২ জন
আজকের পাঠক ১২৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৭ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৮১ বার
+ - R Print

সূরা মার্ইয়াম

সূরা মার্ইয়াম - ১৯

৯৮ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

ভূমিকা : সূরা ১৭ তে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে প্রতিটি মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল নীতিমালা হচ্ছে, নৈতিক চরিত্র, এবং সূরা ১৮ তে বলা হয়েছে, অনুধাবন করতে জীবনের রহস্য ও এর স্বল্পস্থায়িতা এবং জুলকারনাইনের কাহিনীর মাধ্যমে উদাহরণ স্থাপন করা হয়েছে কিভাবে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ক্ষমতাকে সদ্ব্যবহার করতে হয়। এই সূরা শুরু হয়েছে পরিবেশের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাসুলদের কাহিনীর মাধ্যমে ইয়াহিয়া ও তাঁর পিতা জাকারিয়া, যীশু ও তার মা মরিয়ম, ইব্রাহীম ও তাঁর অবিশ্বাসী পিতা, মুসা ও তাঁর ভাই হারূন, ইসমাঈল ও তাঁর পরিবার, এবং ইদরীস ও তাঁর উচ্চ অবস্থান। এসব মহামানবদের জীবনের ছবি চিত্রিত করে, মানুষকে বিশ্বাসহীনতার জন্য নিন্দা করা হয়েছে। নিন্দা করা হয়েছে কুসংস্কারের দ্বারা আত্মার অবনতি ঘটানোর জন্য এবং সাবধান করা হয়েছে পরকালের জন্য।

আবিসিনিয়াতে প্রথম মুসলিম অভিযাত্রীদল যখন আশ্রয় গ্রহণ করেন এই সূরা তারও পূর্বে মক্কাতে অবতীর্ণ হয়। মোটামুটিভাবে এই সূরার অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হচ্ছে হিজরতের প্রায় সাত বৎসর পূর্বে।

সারসংক্ষেপ : পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে আল্লাহ্‌র বাণী প্রচারের জন্য জাকারিয়া উদ্বিগ্ন হন এবং সে জন্য তিনি উত্তরাধিকার কামনা করেন। আল্লাহ্‌ তাঁকে ইয়াহিয়াকে দান করেন [ ১৯: ১- ১৫ ]

হযরত ঈসার মা মেরীর সম্বন্ধে তাঁর লোকেরা কুৎসা রটনা করে। কিন্তু যীশু তাঁকে সান্তনা দান করেন ও ভালো ব্যবহার করেন। [ ১৯: ১৬-৪০ ]

হযরত ইব্রাহীমকে লোকেরা তাঁর বিশ্বাসের কারণে নির্যাতন করে। এসব লোকের মধ্যে তাঁর পিতাও ছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের ত্যাগ করেন ও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভ করেন। হযরত মুসাকে তাঁর ভাই হারুন সাহায্য করেন। হযরত ইসমাঈল তাঁর পরিবারকে পূণ্যাত্মারূপে শিক্ষা দান করেন। হযরত ইদরীস ছিলেন উচ্চমানের পূণ্যাত্মা ও সত্যবাদী। তাঁর মানুষদের তিনি পথ নির্দ্দেশ দান করেছেন , কিন্তু মানুষ সেই সুন্দর জীবনের প্রত্যাশী নয় [ ১৯: ৪১ - ৬৫ ]

মানুষের পরকাল সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আল্লাহ্‌র ধারণাকে মিথ্যা দ্বারা নোংরা করবে না। [ ১৯ : ৬৬ - ৯৮ ]

সূরা মার্ইয়াম - ১৯

৯৮ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]

০১। কাফ্‌ - হা - ইয়া - আয়ান - সাদ্‌ ২৪৫৫।

২৪৫৫। এটাই একমাত্র সূরা যা পাঁচটি সংক্ষিপ্ত বর্ণমালা দিয়ে শুরু।

০২। ইহা তোমার প্রভুর অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি ২৪৫৬।

২৪৫৬। যাকারিয়ার প্রতি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ বিভিন্ন ভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে : ১) তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুরের মাধ্যমে , ২) ইয়াহিয়ার মত সন্তান দানের মাধ্যমে, ৩) পিতা ও পুত্রের মধ্যে স্নেহের বন্ধনের মাধ্যমে, উপরন্তু,আল্লাহ্‌র নবী হিসেবে পৃথিবীতে ইয়াহিয়ার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে [ দেখুন ( ৩: ৩৮ - ৪১ ) ও টিকা ]। সূরা ৩ নং এ ধর্ম যাজক হিসেবে তাঁর কর্তব্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, এই সূরাতে পিতা ও পুত্রের মধুর সম্পর্কের উপরে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

০৩। স্মরণ কর! যখন সে নিভৃতে তাঁর প্রভুকে আহ্বান করেছিলো ২৪৫৭।

২৪৫৭। " নিভৃতে " - অর্থাৎ লোকচক্ষুর অন্তরালে , গোপনে। কারণ জাকারিয়া আশঙ্কা করেন যে, তাঁর নিজ পরিবার ও আত্নীয় স্বজনেরা ভুল পথে পরিচালিত হতে যাচ্ছে। আল্লাহ্‌র বাণীকে সমুন্নত রাখাই ছিলো তাঁর একান্ত ইচ্ছা। এখানে অবশ্য পরিষ্কারভাবে বলা হয় নাই যে তাঁর আত্মীয়রাই ছিলো তাঁর সহকর্মী।

০৪। প্রার্থনা করেছিলো, "হে আমার প্রভু ! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে পড়েছে, আমার মাথার চুল ধূসর চক্‌চকে হয়েছে। হে আমার প্রভু! আমার প্রার্থনায় আমি কখনও ব্যর্থকাম হই নাই। ২৪৫৮

২৪৫৮। এই আয়াতগুলি প্রমাণ করে জাকারিয়ার আল্লাহ্‌র প্রতি ঐকান্তিক বিশ্বাস। জাকারিয়া ছিলেন আল্লাহ্‌র নিকট অত্যন্ত উচ্চমানের নবী। মসজিদই ছিলো তাঁর কাজের স্থান। তাঁর আত্মীয়রা ছিলেন তাঁর সহকর্মী। কিন্তু তিনি আশঙ্কা করেন যে তাদের চরিত্রে প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাসের উদ্দীপনা বা তেজ অনুপস্থিত। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন - কারণ কে আল্লাহ্‌র পতাকাকে সমুন্নত রাখবে তাঁর পরে ?

০৫। " [কিন্তু ] এখন আমি আশংকা করি, আমার পরে আমার আত্মীয় [ এবং সহকর্মীরা কি করবে ] ? কিন্তু আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতারাং তুমি তোমার নিকট থেকে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর ; ২৪৫৯

২৪৫৯। জাকারিয়া শুধুমাত্র পুত্র সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেন নাই। যদি তিনি শুধুমাত্র বংশ রক্ষার জন্য পুত্র সন্তানের কামনা করতেন, তবে তিনি বহুপূর্বে তাঁর যৌবন কালেই তা করতেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত ধার্মিক , সুতারাং তাঁর প্রার্থনায় ব্যক্তি স্বার্থ স্থান পেতে পারে না। তিনি যখন দেখলেন যে, আল্লাহ্‌র কাজের জন্য প্রকৃত যোগ্য লোকের ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে তখনই তিনি সকলের মঙ্গলের জন্য পূণ্যবান এক পুত্র সন্তানের কামনা করেন।

০৬। [ এমন একজন ] যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে এবং প্রতিনিধিত্ব করবে ইয়াকুবের বংশের। এবং হে আমার প্রভু ! তুমি তাঁকে তোমার সন্তোষজনক বানিও ২৪৬০। "

২৪৬০। উত্তরাধিকার কথাটির সাথে সম্পত্তির অংশীদারিত্ব জড়িত। আল্লাহ্‌র মোমেন বান্দা হিসেবে জাকারিয়ার পার্থিব সম্পদ না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার ছিলো অমূল্য চারিত্রিক গুণরাজি। তিনি সেই অমূল্য চারিত্রিক সম্পদ সমূহ তাঁর পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে প্রবাহিত করতে চেয়েছিলেন। নবী রসুলদের বংশ হিসেবে হযরত ইয়াকুবের বংশধরেরা এই সব অমূল্য নৈতিক ও চারিত্রিক গুণে সমৃদ্ধ ছিলেন। সুতারাং এই আয়াতে 'প্রতিনিধিত্ব' শব্দটি বৃহত্তর কর্তব্যের প্রতি দায়িত্বের আহ্বান। জাকারিয়া বৃদ্ধ বয়েসে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর চারিপার্শ্বের লোকেরা আল্লাহ্‌র রাস্তা থেকে বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর উত্তরাধিকারী কি তাঁর মত তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবে ?

০৭। [ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছিলো ] " হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিতেছি। তার নাম হবে ইয়াহিয়া। এই নামে পূর্বে আমি কারও নামকরণ করি নাই ২৪৬১।

২৪৬১। ইয়াহিয়া হচ্ছেন "John the Baptist" , যাকে যীশু খৃষ্টের আগমনের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর পিতার প্রার্থনার সাথে তাঁর কাজের সমন্বয় ঘটেছিলো। সে সময়ে ইহুদীরা আল্লাহ্‌র বাণীকে বিকৃত করে ফেলেছিলো। যীশুর আগমনের অগ্রদূত ইয়াহিয়া ও যীশু খৃষ্ট আল্লাহ্‌র বাণীকে পুণঃ প্রতিষ্ঠা করেন।

আরবীতে ইয়াহিয়া অর্থ ' জীবন'। হিব্রু ভাষাতে ইয়াহিয়াকে বলা হয় Johanan যার অর্থ "জোহাবার অনুগ্রহশীল। ইহুদীরা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে ' জোহাবা ' শব্দটি ব্যবহার করে।

০৮। সে বলেছিলো, "হে আমার প্রভু ! কি ভাবে আমার পুত্র হবে, যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্দ্ধক্যের শেষ সীমাতে উপণীত হয়েছি?

০৯। তিনি বললেন, " এরূপে [ তা হবে ] " ২৪৬২। তোমার প্রভু বলেছিলেন, " এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো তোমাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।" ২৪৬৩

২৪৬২। "তিনি বললেন" - এই বাক্যটির "তিনি" বলতে কাক বোঝানো হয়েছে ? এখানে অধিকাংশ তফসীরকারের মত অনুসরণ করা হয়েছে। এখানে " তিনি " হচ্ছেন দেবদূত যিনি আল্লাহ্‌র বার্তা জাকারিয়ার কাছে বহন করে আনেন। দেখুন নীচের আয়াত [ ১৯: ২১ ]। কোন কোন তফসীরকারের মতে এই " তিনি " শব্দটি জাকারিয়ার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষ অত্যাধিক আশ্চর্য হয়ে গেলে " সত্যিই তাই হবে " এরূপ বাক্য ব্যবহার করে থাকে। অর্থাৎ জাকারিয়া আশ্চর্যান্বিত ভাবে উপরোক্ত বাক্য উচ্চারণ করেন যার অর্থ হবে " সত্যিই কি এরূপ ঘটবে যে বৃদ্ধ বয়েসে আমার সন্তান লাভ ঘটবে। " পরের লাইনে বলা হয়েছে যে "তোমার প্রতিপালক বলিলেন ইত্যাদি। সে ক্ষেত্রে হবে দেবদূতের বার্তা।

২৪৬৩। এই পৃথিবীতে জন্মের পূর্বে মানুষের কোনও অস্তিত্বই ছিলো না। তাঁর সত্তা বা আত্মার অস্তিত্ব ছিলো শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র নিকট। যদিও মানুষের জন্ম ঘটে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী। সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ী জীবের দেহের গঠন প্রকৃতি গঠিত হয়। তবুও সকল সৃষ্টির পিছনে কাজ করে আল্লাহ্‌র শক্তি। এই সাধারণ অর্থ ব্যতীতও এই আয়াটিতে পরোক্ষভাবে অন্য আর এক বিশেষ ভাবের অবতারণা করেছে। জন বা ইয়াহিয়া ছিলেন যীশুর আগমনের বার্তাবাহী অগ্রদূত। তিনি যীশুর আগমনের পথ প্রশস্ত করেন। " যখন তুমি কিছুই ছিলে না " বাক্যটি দ্বারা পরোক্ষভাবে যীশুর অত্যাচার্য জন্ম ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। দেখুন আয়াত [ ১৯ : ২১ ]। আল্লাহ্‌র পক্ষে সবই সম্ভব তিনি সর্বশক্তিমান।

১০। যাকারিয়া বলেছিলো, " হে আমার প্রভু ! আমাকে একটি নিদর্শন দাও।" ২৪৬৪। উত্তর হলো, " তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি বোবা না হওয়া সত্বেও কারও সাথে তিন রাত্রি বাক্যলাপ করবে না " ২৪৬৫।

২৪৬৪। এখানে " নিদর্শন " অর্থ আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার সত্য হবেই। এই বিশ্বাস জাকারিয়ার অন্তরে উৎপন্ন করার জন্য নিদর্শন।
২৪৬৫। [৩: ৪১] আয়াতটি এই [ ১৯ : ১০ ] আয়াতের সাথে তুলনা করুন। পার্থক্যটি কৌতুহল উদ্দীপক। এই আয়াতে বলা হয়েছে তিন রাত্রির কথা পূর্বেও আয়াতে অনুরূপ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে তিন দিনের কথা। অবশ্য এর জন্য আয়াতের অর্থের কোন পরিবর্তন ঘটে না। কারণ 'দিন' বলতে আমরা শুধুমাত্র দিবাভাগকে বুঝি না। 'দিন' বলতে দিন ও রাত্রির সমন্বয়ে ২৪ ঘণ্টাকে বুঝায়। কিন্তু এই দুই আয়াতে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য লক্ষণীয় যেখানে দিনের উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানের উল্লেখ্য সময় হচ্ছে উম্মত বা জনসাধারণের সাথে যে সময় তিনি কাটাতেন। 'রাত' বলতে সেই সময়কে বোঝানো হয়েছে, যখন তিনি প্রার্থনা ও এবাদতে নিজের মধ্যে আত্মনিমগ্ন থাকতেন। লক্ষ্য করুণ পরবর্তী আয়াতে আছে " সকাল ও সন্ধ্যায়" বাক্যটি।আবার আয়াতে [ ৩:৪১] আছে " সন্ধ্যা ও সকালে " বাক্যটি। এই বাক্য গুলিতে একই বিষয়কে বিপরীতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।