+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকা : পূর্ববর্তী সূরার ভূমিকাতে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি সূরার শিক্ষা ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে আত্মাকে উন্নতির দিকে পরিচালিত করে। কোরাণ শরীফের প্রথম সাতটি সূরাতে মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার প্রাচীন ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে ধাপে ধাপে। ক্রমান্বয়ে তা কোরাণের শিক্ষা ও হযরত মুহম্মদের (সা) বা আল্লাহ্র প্রেরিত দূতের পরিচালনায় পরিচালিত মুসলিম উম্মা বা সম্প্রদায়ের গঠন পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে। পরবর্তী শ্রেণীর সূরা হচ্ছে viii-xvi পর্যন্ত। সূরা viii-xvi পর্যন্ত সূরাগুলিতে আলোচনা করা হয়েছে নূতন সম্প্রদায়ের জন্য মনোনীত সামাজিক নিয়ম-কানুন, যাতে প্রতিটি মানুষ তাদের সামাজিক অবস্থান, সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত হতে পারে। অর্থাৎ সম্প্রদায় বা জাতি হিসেবে পৃথিবীতে চলার ও উন্নতি করার পথ নির্দেশ আছে এই সূরা গুলিতে। [দেখুন সূরা viii, x এবং xvi এর ভূমিকা ]।
ধর্মীয় ইতিহাসে নূতন সম্প্রদায়ের গঠন ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য করণীয় নির্দেশনার পরে এবারে শুরু হচ্ছে নূতন সূরার ক্রমপঞ্জিতে সূরা xvii-xxi পর্যন্ত। সম্পূর্ণ ক্রমপঞ্জিকে আবার তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। বিভক্তিগুলি নিম্নরূপ xvii-xxi পর্যন্ত; xxii-xxv পর্যন্ত এবং xxvi-xxix পর্যন্ত। ক্রমপঞ্জির প্রথম সূরা [xvii] শুরু হয়েছে "ইস্রা" শব্দটি দ্বারা। [আয়াতে উল্লেখিত মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা পর্যন্ত সফরকে "ইস্রা " বলা হয় এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত যে সফর হয়েছে তার নাম মে'রাজ।]
এই ক্রমপঞ্জির সূরা গুলিতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, কিভাবে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব কর্মের দ্বারা, চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচীন নবী রসুলদের কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশের উপরে। সূরা xxii-xxv গুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে ব্যক্তিগত এবাদতের যেমন: হজ্ব, সালাত ও প্রার্থনা , কৌমার্য, গোপনীয়তা প্রভৃতি ব্যক্তিগত এবাদত যা মানুষের আত্মিক উন্নতির সোপান স্বরূপ। সূরা xxvi-xxix গুলিতে পুণরায় প্রাচীন পয়গম্বরদের উল্লেখ আছে। এবারের প্রেক্ষাপট পূর্বের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা, এবারের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপটে আত্মিক উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও এবং মহান ব্যক্তিত্বের প্রেক্ষাপটে সামাজিক উন্নতির উপরে।
উপরের ভূমিকার প্রেক্ষাপটে আমরা সূরা xvii কে বিবেচনা করবো। এই সূরা শুরু হয়েছে মেরাজের উল্লেখের মাধ্যমে। এই রজনীতে রসুলকে (সা) মসজিদুল হারাম (মক্কা) থেকে মসজিদুল আক্সা (জেরুজালেম ) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তাঁকে আল্লাহ্র কিছু নিদর্শন দেখানো হয়। অধিকাংশ তফসীরকারের মতে তিনি সশরীরে আল্লাহ্র আরস পর্যন্ত আরোহণ করেন। হাদীস সংগ্রহে মেরাজ সম্বন্ধে বিশদভাবে বিবৃত করা হয়েছে যা পাঠে মেরাজের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। পবিত্র নবীকে (সা) প্রথমে, আল্লাহ্র প্রেরিত প্রত্যাদেশ সমূহের আদিভূমি জেরুজালেম নেয়া হয়, তার পরে তাঁকে সপ্ত আসমান ভ্রমণ শেষে আল্লাহ্র সিংহাসনে নীত করা হয়।
মেরাজের অভূতপূর্ব কাহিনী হচ্ছে ধর্মীয় জগতে মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনার পরিক্রমার প্রতীক স্বরূপ। মেরাজের পটভূমিতে বর্ণনা করা হয়েছে পৃথিবীতে আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান সমূহ। আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম ধাপই হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের উন্নতি। সততা ও সুষ্ঠরূপে নিজ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নৈতিক চরিত্রের পাঠ। সন্তান ও পিতামাতার পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য , সঙ্গী-সাথীদের প্রতি দয়া ও সহানুভুতি প্রদর্শন , বিপদে সাহস ও দৃঢ় মনোবল থাকা, ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব স্বীকার করা , নামাজ বা আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপস্থিতি নিজ সত্ত্বার ভিতরে অনুভব করা ইত্যাদি হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের উন্নতির প্রথম পাঠ।
সাধারণ ভাবে বলা হয় ,রজব মাসের ২৭ তারিখ রাত্রি ছিলো মেরাজের রাত্রি , যদিও ভিন্ন মত হচ্ছে রাবি মাসের ১৭ তারিখ রাত্রি। সনটি ছিলো হিজরতের পূর্বের বছর। এখান থেকেই সুরার প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল নির্ণয় করা যায়। যদিও এই সূরার কিছু কিছু অংশ এই সময় কালের পূর্বে অবতীর্ণ হয়।
সারসংক্ষেপ : নবীকে (সা) মেরাজের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দান করা হয়, যেনো মানুষ -আল্লাহ্র নিদর্শন উপলব্ধি করতে পারে, এবং স্বচ্ছ ধারণা জন্মে। মানুষ মন্দ দ্বারা বিপথে চালিত হয়। মানুষের সব কাজ ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব দ্বারা পরিচালিত হবে [ ১৭: ১-২২]
আল্লাহ্র সেবা নিহিত আছে সামাজিক সম্পর্কের মাঝে যথাঃ পিতামাতার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা, জ্ঞাতিদের প্রতি এবং অভাবী অনাত্মীয়ের প্রতি দয়া ও সহানুভুতি প্রদর্শন, সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালন, যৌন জীবন কে পবিত্র রাখা, মানুষের জীবনকে ন্যায় ও সম্মানের ভিত্তিতে বিচার করা, এতিমদের রক্ষা করা, যে কোন লেন-দেনে ন্যায়কে সম্মুন্নত রাখা, অহংকার ও উদ্ধত স্বভাবকে পরিহার করা। [১৭:২৩-৪০]
আল্লাহ্র মহিমা অতুলনীয়। যারা আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে জীবনে গ্রহণ করেছে , তারা অবিশ্বাসীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যারা বিশ্বাসী তারা মতদ্বৈত পরিহার করবে এবং মানুষকে সদুপদেশ দেবে। আল্লাহ্ সকল কিছুকে পরিবৃত করে আছেন। [১৭: ৪১ - ৫০]
অহংকার প্রদর্শনের ফলে ইবলিসের পতন ঘটে। কিন্তু আদম সন্তানকে আল্লাহ্ সৃষ্টির সেরা জীবরূপে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে আল্লাহ্ তার কৃত কাজের দ্বারা বিচার করবেন। নির্দ্দিষ্ট সময়ে এবং রাত্রিতে প্রার্থনা করা বা নামাজ পড়া মঙ্গলজনক। কোরাণকে অবতীর্ণ করা হয়েছে আত্মিক মুক্তি ও করুণার স্বাক্ষর হিসেবে। [১৭:৫১ - ৮৪ ]
[কোরাণের ] প্রত্যাদেশ আল্লাহ্র দয়া ও করুণা। কোন দোষত্রুটির অনুসন্ধান না করে মানুষ এর বার্তা সর্বান্তকরণে গ্রহণ করবে। আল্লাহ্র নিকট বিনয়ী হও প্রার্থনা (নামাজ) ও প্রশংসার মাধ্যমে। [ ১৭: ৮৫- ১১১]
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
২১৬৬। "ইস্রা" সম্বন্ধে ভূমিকাতে বলা হয়েছে।
২১৬৭। "Masjid" যেখানে আল্লাহ্র এবাদত করা হয়। ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে "Sacred Mosque" যার বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে পবিত্র মসজিদ। এই আয়াতে মসজিদুল হারাম মক্কার কাবা শরীফকে নির্দেশ করেছে। এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখনও কাবা শরীফে পৌত্তলিক মূর্তির অপসারণ ঘটে নাই। এই আয়াত শুভ সংবাদের প্রতীক স্বরূপ যে ভবিষ্যতে কাবা হবে শুধুমাত্র এক আল্লাহ্র এবাদতের স্থান।
২১৬৮। "মসজিদুল আক্সা" জেরুজালেমে অবস্থিত যা বায়তুল মাক্দিস [আল্ - কুদ্স] নামেও পরিচিত। মসজিদুল আক্সার ইতিহাস অতি প্রাচীন। এই মসজিদ ইহুদী ও খৃষ্টান সকলের নিকট সমভাবে পবিত্র। রসুলের (সা) সময়ে এই মসজিদ খৃষ্টানদের অধিকারে ছিলো, কারণ সে সময়ে তা বাইজেন্টাইন [রোমান] সম্রাজ্যের অন্তভূর্ক্ত ছিলো। আর রোমানরা জেরুজালেমের খৃষ্টানদের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। আল্-আক্সা মসজিদের ইতিহাস নিম্নরূপ খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ শতাব্দীতে হযরত সোলায়মান সর্ব প্রথম এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। এর অবস্থান সম্পর্কে বলা হয় তা ছিলো জেরুজালেমের মরিয়া পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। খৃষ্টপূর্ব ৫৮৬ শতাব্দীতে বেবিলনের রাজা নেবুচান্দনেজার জেরুজালেম আক্রমণ করে, এবং মসজিদটিকে ধ্বংস করে দেয়। খৃষ্টপূর্ব ৫১৫ শতাব্দীতে ইজরা ও নেহেমিয়া মসজিদটির পুনঃনির্মাণ করেন। খৃষ্টপূর্ব ১৬৭ শতাব্দীতে আলেকজান্ডারের একজন উত্তরাধীকারী এন্টীওকাস এপিফেন [Antiochus Epiphaneo] একে মূর্তিপূজার স্থানে পরিণত করে। হেরোড [Herod] [খৃষ্ট পূর্ব ১৭ শতাব্দী - ২৯ খৃষ্টাব্দ] পরবর্তীতে তার সংস্কার করেন। ৭০ খৃষ্টাব্দে সম্রাট টিটাস মসজিদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এর পর থেকে মসজিদটি বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো , হযরত ওমরের (রা) আমল পর্যন্ত। তিনি এটি পুনঃ নির্মাণ করেন। এ সব উত্থান পতন আল্লাহ্র বিশেষ নিদর্শনকেই বহন করে। কারণ যুগে যুগে যখনই পবিত্র স্থানের দোহাই দিয়ে মানুষ পাপাচারে লিপ্ত হয় তখনই ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠে। এই -ই আল্লাহ্র হুকুম। কোনও পবিত্র স্থানই তা রদ্ করতে পারে না।
২১৬৯। আল্লাহ্র জ্ঞান সকল সৃষ্টিকে বেষ্টন করে আছে। সময় বা কাল আল্লাহ্র জন্য কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি সকল কিছু দেখেন। সকল কিছু শোনেন, - সময়, কাল, যুগ, সকল কিছুর তিনি উর্দ্ধে। মেরা'জ হচ্ছে আল্লাহ্র জ্ঞানেরই প্রতিচ্ছবি।
২১৭০। 'কিতাব' - অর্থাৎ আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্ মুসাকে যে কিতাব দিয়েছেন তাতে পরিষ্কার ভাবে আল্লাহ্র একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছে। "Thou shall have no other gods before me; thou shall not make into thee any graven image " thou shall not bow down thyself to them nor serve them; for I the Lord thy God am a jealous God.." [ Exod. xx 3- 5 ] এই লাইনগুলি বাইবেল থেকে উদ্ধৃত। "তোমরা আমাকে ব্যতীত অপর কাহাকেও কর্ম বিধায়করূপে গ্রহণ করো না " -এই নির্দ্দেশ প্রচারের মূল বক্তব্য হচ্ছে এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি কর্মে আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। 'কর্মবিধায়ক' অর্থাৎ কর্মের বিধান - যা আল্লাহ্র কাছ থেকে আল্লাহ্র মনোনীত পন্থায় হতে হবে। আর এই শিক্ষাই হচ্ছে ইসলামের মূল শিক্ষা। মে'রাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ আমাদের দেখিয়েছেন যে প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কিতাবধারী জাতিদের কাছে প্রেরিত "পথ নির্দ্দেশ" রয়েছে অপরিবর্তনীয়। কিন্তু যুগে যুগে যারা ধর্মের রক্ষকরূপে নিজেদের প্রচার করেছে তারাই ধর্মের মূল শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছে।
উপদেশঃ মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদের কারণও এই আয়াতের বক্তব্যের মধ্যে নিহিত।
সূরা বণী ইসরাঈল
Page 1 of 13
পঞ্চদশ পারাসূরা বণী ইসরাঈল - ১৭
১১১ আয়াত, ১২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকা : পূর্ববর্তী সূরার ভূমিকাতে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি সূরার শিক্ষা ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে আত্মাকে উন্নতির দিকে পরিচালিত করে। কোরাণ শরীফের প্রথম সাতটি সূরাতে মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার প্রাচীন ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে ধাপে ধাপে। ক্রমান্বয়ে তা কোরাণের শিক্ষা ও হযরত মুহম্মদের (সা) বা আল্লাহ্র প্রেরিত দূতের পরিচালনায় পরিচালিত মুসলিম উম্মা বা সম্প্রদায়ের গঠন পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে। পরবর্তী শ্রেণীর সূরা হচ্ছে viii-xvi পর্যন্ত। সূরা viii-xvi পর্যন্ত সূরাগুলিতে আলোচনা করা হয়েছে নূতন সম্প্রদায়ের জন্য মনোনীত সামাজিক নিয়ম-কানুন, যাতে প্রতিটি মানুষ তাদের সামাজিক অবস্থান, সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত হতে পারে। অর্থাৎ সম্প্রদায় বা জাতি হিসেবে পৃথিবীতে চলার ও উন্নতি করার পথ নির্দেশ আছে এই সূরা গুলিতে। [দেখুন সূরা viii, x এবং xvi এর ভূমিকা ]।
ধর্মীয় ইতিহাসে নূতন সম্প্রদায়ের গঠন ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য করণীয় নির্দেশনার পরে এবারে শুরু হচ্ছে নূতন সূরার ক্রমপঞ্জিতে সূরা xvii-xxi পর্যন্ত। সম্পূর্ণ ক্রমপঞ্জিকে আবার তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। বিভক্তিগুলি নিম্নরূপ xvii-xxi পর্যন্ত; xxii-xxv পর্যন্ত এবং xxvi-xxix পর্যন্ত। ক্রমপঞ্জির প্রথম সূরা [xvii] শুরু হয়েছে "ইস্রা" শব্দটি দ্বারা। [আয়াতে উল্লেখিত মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্সা পর্যন্ত সফরকে "ইস্রা " বলা হয় এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত যে সফর হয়েছে তার নাম মে'রাজ।]
এই ক্রমপঞ্জির সূরা গুলিতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, কিভাবে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব কর্মের দ্বারা, চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারে। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচীন নবী রসুলদের কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশের উপরে। সূরা xxii-xxv গুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে ব্যক্তিগত এবাদতের যেমন: হজ্ব, সালাত ও প্রার্থনা , কৌমার্য, গোপনীয়তা প্রভৃতি ব্যক্তিগত এবাদত যা মানুষের আত্মিক উন্নতির সোপান স্বরূপ। সূরা xxvi-xxix গুলিতে পুণরায় প্রাচীন পয়গম্বরদের উল্লেখ আছে। এবারের প্রেক্ষাপট পূর্বের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা, এবারের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সামাজিক প্রেক্ষাপটে আত্মিক উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও এবং মহান ব্যক্তিত্বের প্রেক্ষাপটে সামাজিক উন্নতির উপরে।
উপরের ভূমিকার প্রেক্ষাপটে আমরা সূরা xvii কে বিবেচনা করবো। এই সূরা শুরু হয়েছে মেরাজের উল্লেখের মাধ্যমে। এই রজনীতে রসুলকে (সা) মসজিদুল হারাম (মক্কা) থেকে মসজিদুল আক্সা (জেরুজালেম ) পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে তাঁকে আল্লাহ্র কিছু নিদর্শন দেখানো হয়। অধিকাংশ তফসীরকারের মতে তিনি সশরীরে আল্লাহ্র আরস পর্যন্ত আরোহণ করেন। হাদীস সংগ্রহে মেরাজ সম্বন্ধে বিশদভাবে বিবৃত করা হয়েছে যা পাঠে মেরাজের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। পবিত্র নবীকে (সা) প্রথমে, আল্লাহ্র প্রেরিত প্রত্যাদেশ সমূহের আদিভূমি জেরুজালেম নেয়া হয়, তার পরে তাঁকে সপ্ত আসমান ভ্রমণ শেষে আল্লাহ্র সিংহাসনে নীত করা হয়।
মেরাজের অভূতপূর্ব কাহিনী হচ্ছে ধর্মীয় জগতে মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনার পরিক্রমার প্রতীক স্বরূপ। মেরাজের পটভূমিতে বর্ণনা করা হয়েছে পৃথিবীতে আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান সমূহ। আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম ধাপই হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের উন্নতি। সততা ও সুষ্ঠরূপে নিজ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নৈতিক চরিত্রের পাঠ। সন্তান ও পিতামাতার পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য , সঙ্গী-সাথীদের প্রতি দয়া ও সহানুভুতি প্রদর্শন , বিপদে সাহস ও দৃঢ় মনোবল থাকা, ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব স্বীকার করা , নামাজ বা আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপস্থিতি নিজ সত্ত্বার ভিতরে অনুভব করা ইত্যাদি হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের উন্নতির প্রথম পাঠ।
সাধারণ ভাবে বলা হয় ,রজব মাসের ২৭ তারিখ রাত্রি ছিলো মেরাজের রাত্রি , যদিও ভিন্ন মত হচ্ছে রাবি মাসের ১৭ তারিখ রাত্রি। সনটি ছিলো হিজরতের পূর্বের বছর। এখান থেকেই সুরার প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল নির্ণয় করা যায়। যদিও এই সূরার কিছু কিছু অংশ এই সময় কালের পূর্বে অবতীর্ণ হয়।
সারসংক্ষেপ : নবীকে (সা) মেরাজের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দান করা হয়, যেনো মানুষ -আল্লাহ্র নিদর্শন উপলব্ধি করতে পারে, এবং স্বচ্ছ ধারণা জন্মে। মানুষ মন্দ দ্বারা বিপথে চালিত হয়। মানুষের সব কাজ ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্ব দ্বারা পরিচালিত হবে [ ১৭: ১-২২]
আল্লাহ্র সেবা নিহিত আছে সামাজিক সম্পর্কের মাঝে যথাঃ পিতামাতার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা, জ্ঞাতিদের প্রতি এবং অভাবী অনাত্মীয়ের প্রতি দয়া ও সহানুভুতি প্রদর্শন, সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালন, যৌন জীবন কে পবিত্র রাখা, মানুষের জীবনকে ন্যায় ও সম্মানের ভিত্তিতে বিচার করা, এতিমদের রক্ষা করা, যে কোন লেন-দেনে ন্যায়কে সম্মুন্নত রাখা, অহংকার ও উদ্ধত স্বভাবকে পরিহার করা। [১৭:২৩-৪০]
আল্লাহ্র মহিমা অতুলনীয়। যারা আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে জীবনে গ্রহণ করেছে , তারা অবিশ্বাসীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যারা বিশ্বাসী তারা মতদ্বৈত পরিহার করবে এবং মানুষকে সদুপদেশ দেবে। আল্লাহ্ সকল কিছুকে পরিবৃত করে আছেন। [১৭: ৪১ - ৫০]
অহংকার প্রদর্শনের ফলে ইবলিসের পতন ঘটে। কিন্তু আদম সন্তানকে আল্লাহ্ সৃষ্টির সেরা জীবরূপে সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে আল্লাহ্ তার কৃত কাজের দ্বারা বিচার করবেন। নির্দ্দিষ্ট সময়ে এবং রাত্রিতে প্রার্থনা করা বা নামাজ পড়া মঙ্গলজনক। কোরাণকে অবতীর্ণ করা হয়েছে আত্মিক মুক্তি ও করুণার স্বাক্ষর হিসেবে। [১৭:৫১ - ৮৪ ]
[কোরাণের ] প্রত্যাদেশ আল্লাহ্র দয়া ও করুণা। কোন দোষত্রুটির অনুসন্ধান না করে মানুষ এর বার্তা সর্বান্তকরণে গ্রহণ করবে। আল্লাহ্র নিকট বিনয়ী হও প্রার্থনা (নামাজ) ও প্রশংসার মাধ্যমে। [ ১৭: ৮৫- ১১১]
সূরা বণী ইসরাঈল- ১৭
১১১ আয়াত, ১২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
০১। মহিমান্বিত [আল্লাহ্ ], যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন, ২১৬৬ পবিত্র মস্জিদ [আল্ মসজিদুল হারাম] ২১৬৭ থেকে দূরবর্তী মসজিদ [ আল্ মসজিদুল আক্সা] পর্যন্ত ২১৬৮। যার সীমানাকে আমি করেছিলাম আমার আর্শীবাদ ধন্য, যেনো আমি তাঁকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই একমাত্র যিনি [সব] শোনেন এবং দেখেন, ২১৬৯।
২১৬৬। "ইস্রা" সম্বন্ধে ভূমিকাতে বলা হয়েছে।
২১৬৭। "Masjid" যেখানে আল্লাহ্র এবাদত করা হয়। ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছে "Sacred Mosque" যার বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে পবিত্র মসজিদ। এই আয়াতে মসজিদুল হারাম মক্কার কাবা শরীফকে নির্দেশ করেছে। এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় তখনও কাবা শরীফে পৌত্তলিক মূর্তির অপসারণ ঘটে নাই। এই আয়াত শুভ সংবাদের প্রতীক স্বরূপ যে ভবিষ্যতে কাবা হবে শুধুমাত্র এক আল্লাহ্র এবাদতের স্থান।
২১৬৮। "মসজিদুল আক্সা" জেরুজালেমে অবস্থিত যা বায়তুল মাক্দিস [আল্ - কুদ্স] নামেও পরিচিত। মসজিদুল আক্সার ইতিহাস অতি প্রাচীন। এই মসজিদ ইহুদী ও খৃষ্টান সকলের নিকট সমভাবে পবিত্র। রসুলের (সা) সময়ে এই মসজিদ খৃষ্টানদের অধিকারে ছিলো, কারণ সে সময়ে তা বাইজেন্টাইন [রোমান] সম্রাজ্যের অন্তভূর্ক্ত ছিলো। আর রোমানরা জেরুজালেমের খৃষ্টানদের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। আল্-আক্সা মসজিদের ইতিহাস নিম্নরূপ খৃষ্টপূর্ব ১০০৪ শতাব্দীতে হযরত সোলায়মান সর্ব প্রথম এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। এর অবস্থান সম্পর্কে বলা হয় তা ছিলো জেরুজালেমের মরিয়া পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। খৃষ্টপূর্ব ৫৮৬ শতাব্দীতে বেবিলনের রাজা নেবুচান্দনেজার জেরুজালেম আক্রমণ করে, এবং মসজিদটিকে ধ্বংস করে দেয়। খৃষ্টপূর্ব ৫১৫ শতাব্দীতে ইজরা ও নেহেমিয়া মসজিদটির পুনঃনির্মাণ করেন। খৃষ্টপূর্ব ১৬৭ শতাব্দীতে আলেকজান্ডারের একজন উত্তরাধীকারী এন্টীওকাস এপিফেন [Antiochus Epiphaneo] একে মূর্তিপূজার স্থানে পরিণত করে। হেরোড [Herod] [খৃষ্ট পূর্ব ১৭ শতাব্দী - ২৯ খৃষ্টাব্দ] পরবর্তীতে তার সংস্কার করেন। ৭০ খৃষ্টাব্দে সম্রাট টিটাস মসজিদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এর পর থেকে মসজিদটি বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো , হযরত ওমরের (রা) আমল পর্যন্ত। তিনি এটি পুনঃ নির্মাণ করেন। এ সব উত্থান পতন আল্লাহ্র বিশেষ নিদর্শনকেই বহন করে। কারণ যুগে যুগে যখনই পবিত্র স্থানের দোহাই দিয়ে মানুষ পাপাচারে লিপ্ত হয় তখনই ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠে। এই -ই আল্লাহ্র হুকুম। কোনও পবিত্র স্থানই তা রদ্ করতে পারে না।
২১৬৯। আল্লাহ্র জ্ঞান সকল সৃষ্টিকে বেষ্টন করে আছে। সময় বা কাল আল্লাহ্র জন্য কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। তিনি সকল কিছু দেখেন। সকল কিছু শোনেন, - সময়, কাল, যুগ, সকল কিছুর তিনি উর্দ্ধে। মেরা'জ হচ্ছে আল্লাহ্র জ্ঞানেরই প্রতিচ্ছবি।
০২। আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম ২১৭০ ও উহাকে বণী ইসরাঈলীদের জন্য পথ নির্দ্দেশক করেছিলাম; [আদেশ দিয়েছিলাম] - " তোমরা আমাকে ব্যতীত অপর কাউকে [তোমাদের ] কর্ম-বিধায়ক হিসেবে গ্রহণ করো না।" ২১৭১
২১৭০। 'কিতাব' - অর্থাৎ আল্লাহ্র প্রত্যাদেশকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ্ মুসাকে যে কিতাব দিয়েছেন তাতে পরিষ্কার ভাবে আল্লাহ্র একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছে। "Thou shall have no other gods before me; thou shall not make into thee any graven image " thou shall not bow down thyself to them nor serve them; for I the Lord thy God am a jealous God.." [ Exod. xx 3- 5 ] এই লাইনগুলি বাইবেল থেকে উদ্ধৃত। "তোমরা আমাকে ব্যতীত অপর কাহাকেও কর্ম বিধায়করূপে গ্রহণ করো না " -এই নির্দ্দেশ প্রচারের মূল বক্তব্য হচ্ছে এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি কর্মে আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। 'কর্মবিধায়ক' অর্থাৎ কর্মের বিধান - যা আল্লাহ্র কাছ থেকে আল্লাহ্র মনোনীত পন্থায় হতে হবে। আর এই শিক্ষাই হচ্ছে ইসলামের মূল শিক্ষা। মে'রাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ আমাদের দেখিয়েছেন যে প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কিতাবধারী জাতিদের কাছে প্রেরিত "পথ নির্দ্দেশ" রয়েছে অপরিবর্তনীয়। কিন্তু যুগে যুগে যারা ধর্মের রক্ষকরূপে নিজেদের প্রচার করেছে তারাই ধর্মের মূল শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছে।
উপদেশঃ মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদের কারণও এই আয়াতের বক্তব্যের মধ্যে নিহিত।
