+
-
R
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকা :
ক্রমপঞ্জি অনুসারে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে শেষ দিকে অবতীর্ণ হয় তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচেছ আয়াত ১১০ এবং তার পরবর্তী আয়াত সমূহ। এ ব্যাপারে সময়ের ক্রমপঞ্জি গুরূত্বপূর্ণ নয়। এই সূরার বিষয়বস্তুর সার সংক্ষেপ হচেছ মানুষের সাথে আল্লাহ্র আচরণ, যা নূতন আঙ্গিকে এই সূরাতে প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহ্ মানুষের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেন তার সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপে এবং মানুষের জীবনের মাধ্যমে তার মাহত্ব প্রকাশ পায়। নূতন বিষয় হচেছ অনুধাবন করা যে, প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাঝে আল্লাহ্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইত্যাদির স্বাক্ষর মেলে।
সার সংক্ষেপ :
সৃষ্টির সব কিছু আল্লাহ্র মহত্ব ঘোষণা করে। মানুষকে আল্লাহ্ প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যেনো সে প্রাকৃতিক জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ্র একত্বকে অনুধাবন করতে পারে। (১৬:১-২৫)
আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূলদের শিক্ষা থেকে মানুষ বিচ্যুত হবে না, কারণ আল্লাহ্ তাদের প্রেরণ করে থাকেন মানুষকে সত্য এবং একত্ববাদ শিক্ষা দেবার জন্য। সকলকে সৃষ্টি করা হয়েছে এক আল্লাহ্র এবাদত করার জন্য। (১৬:২৬-৫০)
আল্লাহ্র রহমত এবং মানুষের অকৃতজ্ঞতাকে তুলনা করা হয়েছে। তার করুণার নিদর্শন হচেছ জলভারে ভরা মেঘ যা বর্ষণ করে, গাভী যা মানুষকে দুগ্ধ দান করে, মৌমাছি যা মানুষকে মধুর যোগান দেয়, পারিবারিক জীবনে স্নেহের বন্ধন এবং সামাজিক জীবনের সুখ ও শান্তি সর্বোপরি সভ্যতার উৎকর্ষতা ও তার ফলে বিলাসী ও আরামদায়ক জীবনের প্রতিশ্রুতি। (১৬:৫১-৮৩)
যারা সত্যকে অস্বীকার করে, সত্যের প্রচারক বা আল্লাহ্র রাসুলরা শেষ বিচারের দিনে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবেন। আল্লাহ্ আমাদের বিশ্বাস ও কর্মের বিচার করবেন। (১৬:৮৪-১০০)
কোর-আণ অভ্রান্ত সত্য যা সত্যপথে চলার পথ নির্দেশ দান করে। বিশ্বাস কর এবং জীবনকে সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত কর। ইব্রাহীমের উদাহরণ অনুসরণ কর। বিশ্বাস ও ন্যায়ানুনাগে অটল হও এবং সৎ কাজ কর। (১৬:১০১-১২৮)
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
২০১৯: অর্থাৎ এই আয়াতটি মোশরেকদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের উত্তর হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। মোশরেকরা প্রায়ই এভাবে বিদ্রূপ করতো যে, "যদি তোমাদের দাবী অনুযায়ী সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র অস্তিত্ব থাকে, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে তিনি বিপথগামীদের শাস্তি দান করেন না কেন?'' এই আয়াতটি এসব বিপথগামী মোশরেকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে, " আল্লাহ্র আদেশ আসবেই।''যখন সে আদেশ আসবে তখন পাপীরা ইচছা পোষণ করবে সে আদেশ বিলম্ব করার জন্য, কিন্তু হায়, তখন তা সম্ভব হবে না। নিশ্চয় পাপীরা নিতান্ত অবোধ, কারণ তারা আল্লাহ্র ক্ষমা ও করূণা পাওয়ার যে সময় পায় তা শেষ করার জন্য আবেদন করে।
২০২০: মোশরেক বা প্যাগানরা বহু দেব দেবীতে বিশ্বাসী। তারা বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করে- এসব দেব - দেবী কেউ ভালোর কেউ মন্দের প্রতীক, কেউ সৃষ্টি, কেউ ধ্বংসের প্রতীক। এ সব দেব - দেবীরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি শক্রুভাবাপন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। বহু ঈশ্বরের পূজার ফলে মোশরেকদের মনের শান্ত ও অচঞ্চল অবস্থা নষ্ট হতে বাধ্য। কারণ ধর্মকে তারা আচার অনুষ্ঠান সম্বলিত হাস্যষ্কর বস্তুতে পরিণত করে; যার সাথে মন বা আত্মার কোনও যোগসূত্র থাকেনা। ফলে এসব লোক আল্লাহ্র একত্ববাদকে অনুধাবনে সক্ষম নয়। বিশ্ব চরাচর আল্লাহ্র একত্বের স্বাক্ষর বহন করে। বিরাট বিশ্ব জগত আল্লাহ্র ক্ষমতার স্বাক্ষর। সৃষ্টির সকলেই সেই এক আল্লাহ্র আইনের অধীনে তারই গুণগানে ব্যস্ত, এই সহজ সত্যকে অনুধাবনে মোশরেকরা হয় ব্যর্থ। তিনিই একমাত্র পূজ্য এবং সকল কর্ম তার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।
২০২১: "যথাযথ ভাবে'' এই শব্দটি দ্বারা যে ভাব প্রকাশ করা হয়েছে তা হচেছঃ এই বিশাল বিশ্বভুবন সৃষ্টি আল্লাহ্র কোন খেয়াল খুশী, বা লীলা খেলা বা আকস্মিক কিছু নয়। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এই বিশাল বিশ্বভুবনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথারই সমর্থন মেলে আয়াত (১৫:৮৫) এবং আয়াত (২১:১৬) তে। সারা বিশ্ব ভুবনে, গ্রহনক্ষত্রে, বিশ্ব চরাচরে এক আল্লাহ্র আইন বিদ্যমান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখি পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র, রসায়ন বিজ্ঞানের সূত্র, উদ্ভিদ জগতে, প্রাণী জগতে সর্বত্র একই নিয়ম চালু বা সকলে প্রকৃতির একই আইনের অধীনে পরিচালিত। এ সকলেই নির্দ্দেশ করে যে, সকল বিশ্ব চরাচরের সব কিছু একই স্রষ্টার সৃষ্টি। বিভিন্ন স্রষ্টার সৃষ্টি হলে তাদের পরিচালনার আইনও বিভিন্ন হতে বাধ্য হতো। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতিতে কোথাও অনিয়ম নাই। সর্বত্র শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়
বর্তমান।
২০২২: মানুষের জন্ম বৃত্তান্ত অত্যন্ত হীন ও ক্ষুদ্র। সেই মানব যখন সম্পদ শালী হয়ে ওঠে, সে প্রকাশ্যে তার স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। এই অস্বীকারের ফলে সে জীবনের উচচতর ও মহত্বর দিকের সন্ধান লাভে হয় ব্যর্থ।
২০২৩: 'আন্-আম' অর্থাৎ প্রাণী জগৎ বা পশু। মানুষের প্রয়োজনে, তার আরাম-আয়াসের জন্য এই পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তুকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পরবর্তী আয়াত সমূহে সে সম্বন্ধেই বলা হয়েছে।
২০২৪: এই আয়াতে বর্ণনা আছে প্র্রাণী জগত মানুষের যে উপকারে লাগে তার। শীত নিবারক উপকরণ যথা: পশম, চামড়া, চুল ইত্যাদি। উটের চামড়াতে সুন্দর আরামদায়ক শীত নিবারক বস্তু, কম্বল তৈরি হয়। এক ধরনের ছাগলের চামড়া থেকে অনুরূপ জিনিস তৈরি হয়। ভেড়ার পশমের উল ও গরম কাপড় তৈরির জন্য ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এ ছাড়া বহু লোমশ প্রাণী আছে যাদের চামড়া ব্যবহার করা হয় পোষাক, কম্বল ও বিছানা তৈরির জন্য। আমাদের পাদুকার ও ব্যাগের জন্য চামড়ার ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এসব পশুর অনেকেরই স্ত্রী প্রাণী থেকে আমরা দুগ্ধ পেয়ে থাকি যা সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে পরিগণিত হয়- এবং অতীব সুখাদ্য। অনেক প্রাণীর মাংস আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রাণী জগতের আরও বহুবিধ অবদান নীচের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫: একজন ভালো কৃষক তার পশু সম্পদের জন্য গর্ব অনুভব করে। যখন পশুপাল তৃণভুমিতে সকালে যায় ও সন্ধ্যায় গোচারণ ভূমি থেকে ফিরে আসে - তা দর্শনে কৃষকের মনে তার প্রাচুর্য ও ক্ষমতা সম্বন্ধে গর্ব হয়। পশুপালের সৌন্দর্য ও বশ্যতা তাকে করে বিমোহিত। অর্থাৎ আল্লাহ্ তাকে যে সম্পদ দান করেছেন সে সম্বন্ধে তার প্রচছন্ন গর্ব সে উপভোগ করে। মানুষ কি তার সর্ব অনুভব সেই ক্ষুদ্র সম্পদের মধ্যেই আবদ্ধ রাখবে? সে কি জীবনের বৃহত্তর মহত্তর দিক অনুভব করতে চেষ্টা করবে না? যে স্রষ্টা তার পার্থিব সম্পদকে সৃষ্টি করে দিয়েছেন - তাকে কি সে অনুভব করতে চেষ্টা করবে না?
২০২৬: পশু সম্পদের আরও বিবিধ প্রয়োজনীতা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা ভার বহন করে। পূর্বে একস্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত চলাচলের জন্য পশুর ব্যবহার ছিলো একমাত্র বাহন। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। যদি পণ্য বা ভারী বস্তু মানুষকে নিজে বহন করতে হতো। তা হলে মানুষকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হতো। শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি নূতন দেশে, সামাজিক মেলামেশা ও জীবন সম্বন্ধে উচচতর ধারণা অনুধাবনে অক্ষম হয়ে পড়তো। শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম,বিজ্ঞান, বাণিজ্য প্রভৃতি মনের বিভিন্ন দিগন্ত তার সম্মুখে উম্মোচিত হতো না। মানুষের মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে আল্লাহ্র রহমত ও করূণার ফলে। কারণ তিনিই তো মানুষের জীবনধারাকে নিত্যনূতন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের মাধ্যমে সহজতর করেছেন।
সুরা নাহল
Page 1 of 14
সুরা নাহল বা মৌমাছি-১৬
১২৮ আয়াত, ১৬ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
ভূমিকা :
ক্রমপঞ্জি অনুসারে এই সূরাটি মক্কাতে অবতীর্ণ সূরাগুলির মধ্যে শেষ দিকে অবতীর্ণ হয় তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচেছ আয়াত ১১০ এবং তার পরবর্তী আয়াত সমূহ। এ ব্যাপারে সময়ের ক্রমপঞ্জি গুরূত্বপূর্ণ নয়। এই সূরার বিষয়বস্তুর সার সংক্ষেপ হচেছ মানুষের সাথে আল্লাহ্র আচরণ, যা নূতন আঙ্গিকে এই সূরাতে প্রকাশ করা হয়েছে। আল্লাহ্ মানুষের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেন তার সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপে এবং মানুষের জীবনের মাধ্যমে তার মাহত্ব প্রকাশ পায়। নূতন বিষয় হচেছ অনুধাবন করা যে, প্রকৃতিকে অনুধাবনের মাঝে আল্লাহ্র জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইত্যাদির স্বাক্ষর মেলে।
সার সংক্ষেপ :
সৃষ্টির সব কিছু আল্লাহ্র মহত্ব ঘোষণা করে। মানুষকে আল্লাহ্ প্রকৃতির উপরে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যেনো সে প্রাকৃতিক জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ্র একত্বকে অনুধাবন করতে পারে। (১৬:১-২৫)
আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূলদের শিক্ষা থেকে মানুষ বিচ্যুত হবে না, কারণ আল্লাহ্ তাদের প্রেরণ করে থাকেন মানুষকে সত্য এবং একত্ববাদ শিক্ষা দেবার জন্য। সকলকে সৃষ্টি করা হয়েছে এক আল্লাহ্র এবাদত করার জন্য। (১৬:২৬-৫০)
আল্লাহ্র রহমত এবং মানুষের অকৃতজ্ঞতাকে তুলনা করা হয়েছে। তার করুণার নিদর্শন হচেছ জলভারে ভরা মেঘ যা বর্ষণ করে, গাভী যা মানুষকে দুগ্ধ দান করে, মৌমাছি যা মানুষকে মধুর যোগান দেয়, পারিবারিক জীবনে স্নেহের বন্ধন এবং সামাজিক জীবনের সুখ ও শান্তি সর্বোপরি সভ্যতার উৎকর্ষতা ও তার ফলে বিলাসী ও আরামদায়ক জীবনের প্রতিশ্রুতি। (১৬:৫১-৮৩)
যারা সত্যকে অস্বীকার করে, সত্যের প্রচারক বা আল্লাহ্র রাসুলরা শেষ বিচারের দিনে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবেন। আল্লাহ্ আমাদের বিশ্বাস ও কর্মের বিচার করবেন। (১৬:৮৪-১০০)
কোর-আণ অভ্রান্ত সত্য যা সত্যপথে চলার পথ নির্দেশ দান করে। বিশ্বাস কর এবং জীবনকে সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত কর। ইব্রাহীমের উদাহরণ অনুসরণ কর। বিশ্বাস ও ন্যায়ানুনাগে অটল হও এবং সৎ কাজ কর। (১৬:১০১-১২৮)
সুরা নাহল বা মৌমাছি-১৬
১২৮ আয়াত, ১৬ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে]
০১। আল্লাহ্র আদেশ (অবশ্যই)আসবেই ২০১৯ সুতরাং তুমি তা ত্বরান্বিত করতে যেও না। তিনি মহিমান্বিত এবং ওরা যে সব অংশীদারিত্ব (আল্লাহ্র প্রতি) আরোপ করে তিনি তা থেকে বহু উর্দ্ধে!
২০১৯: অর্থাৎ এই আয়াতটি মোশরেকদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের উত্তর হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। মোশরেকরা প্রায়ই এভাবে বিদ্রূপ করতো যে, "যদি তোমাদের দাবী অনুযায়ী সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র অস্তিত্ব থাকে, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে তিনি বিপথগামীদের শাস্তি দান করেন না কেন?'' এই আয়াতটি এসব বিপথগামী মোশরেকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে, " আল্লাহ্র আদেশ আসবেই।''যখন সে আদেশ আসবে তখন পাপীরা ইচছা পোষণ করবে সে আদেশ বিলম্ব করার জন্য, কিন্তু হায়, তখন তা সম্ভব হবে না। নিশ্চয় পাপীরা নিতান্ত অবোধ, কারণ তারা আল্লাহ্র ক্ষমা ও করূণা পাওয়ার যে সময় পায় তা শেষ করার জন্য আবেদন করে।
০২। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচছা স্বীয় আদেশসহ ওহী প্রেরণ করেন (এ বলে যে): "মানব সম্প্রদায়কে সাবধান কর এই বলে যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। সুতরাং আমার প্রতি তোমাদের কর্তব্য কর।'' ২০২০
২০২০: মোশরেক বা প্যাগানরা বহু দেব দেবীতে বিশ্বাসী। তারা বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করে- এসব দেব - দেবী কেউ ভালোর কেউ মন্দের প্রতীক, কেউ সৃষ্টি, কেউ ধ্বংসের প্রতীক। এ সব দেব - দেবীরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি শক্রুভাবাপন্ন রূপে কল্পনা করা হয়। বহু ঈশ্বরের পূজার ফলে মোশরেকদের মনের শান্ত ও অচঞ্চল অবস্থা নষ্ট হতে বাধ্য। কারণ ধর্মকে তারা আচার অনুষ্ঠান সম্বলিত হাস্যষ্কর বস্তুতে পরিণত করে; যার সাথে মন বা আত্মার কোনও যোগসূত্র থাকেনা। ফলে এসব লোক আল্লাহ্র একত্ববাদকে অনুধাবনে সক্ষম নয়। বিশ্ব চরাচর আল্লাহ্র একত্বের স্বাক্ষর বহন করে। বিরাট বিশ্ব জগত আল্লাহ্র ক্ষমতার স্বাক্ষর। সৃষ্টির সকলেই সেই এক আল্লাহ্র আইনের অধীনে তারই গুণগানে ব্যস্ত, এই সহজ সত্যকে অনুধাবনে মোশরেকরা হয় ব্যর্থ। তিনিই একমাত্র পূজ্য এবং সকল কর্ম তার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।
০৩। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীকে তিনি যথাযথ ভাবে সৃষ্টি করেছেন ২০২১। ওরা আল্লাহ্র প্রতি যে অংশীদারিত্ব আরোপ করে, তিনি তার বহু উর্দ্ধে।
২০২১: "যথাযথ ভাবে'' এই শব্দটি দ্বারা যে ভাব প্রকাশ করা হয়েছে তা হচেছঃ এই বিশাল বিশ্বভুবন সৃষ্টি আল্লাহ্র কোন খেয়াল খুশী, বা লীলা খেলা বা আকস্মিক কিছু নয়। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এই বিশাল বিশ্বভুবনকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথারই সমর্থন মেলে আয়াত (১৫:৮৫) এবং আয়াত (২১:১৬) তে। সারা বিশ্ব ভুবনে, গ্রহনক্ষত্রে, বিশ্ব চরাচরে এক আল্লাহ্র আইন বিদ্যমান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখি পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র, রসায়ন বিজ্ঞানের সূত্র, উদ্ভিদ জগতে, প্রাণী জগতে সর্বত্র একই নিয়ম চালু বা সকলে প্রকৃতির একই আইনের অধীনে পরিচালিত। এ সকলেই নির্দ্দেশ করে যে, সকল বিশ্ব চরাচরের সব কিছু একই স্রষ্টার সৃষ্টি। বিভিন্ন স্রষ্টার সৃষ্টি হলে তাদের পরিচালনার আইনও বিভিন্ন হতে বাধ্য হতো। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতিতে কোথাও অনিয়ম নাই। সর্বত্র শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমন্বয়
বর্তমান।
০৪। তিনি মানুষকে শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছেন; অথচ দেখ! সেই একই (মানুষ) প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী ২০২২।
২০২২: মানুষের জন্ম বৃত্তান্ত অত্যন্ত হীন ও ক্ষুদ্র। সেই মানব যখন সম্পদ শালী হয়ে ওঠে, সে প্রকাশ্যে তার স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। এই অস্বীকারের ফলে সে জীবনের উচচতর ও মহত্বর দিকের সন্ধান লাভে হয় ব্যর্থ।
০৫। গৃহপালিত পশু যা তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন ২০২৩। তোমরা তা থেকে লাভ কর উষ্ণতা এবং আরও বহুবিধ উপকার এবং তাদের (গোশ্ত) ভক্ষন কর। ২০২৪
২০২৩: 'আন্-আম' অর্থাৎ প্রাণী জগৎ বা পশু। মানুষের প্রয়োজনে, তার আরাম-আয়াসের জন্য এই পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তুকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পরবর্তী আয়াত সমূহে সে সম্বন্ধেই বলা হয়েছে।
২০২৪: এই আয়াতে বর্ণনা আছে প্র্রাণী জগত মানুষের যে উপকারে লাগে তার। শীত নিবারক উপকরণ যথা: পশম, চামড়া, চুল ইত্যাদি। উটের চামড়াতে সুন্দর আরামদায়ক শীত নিবারক বস্তু, কম্বল তৈরি হয়। এক ধরনের ছাগলের চামড়া থেকে অনুরূপ জিনিস তৈরি হয়। ভেড়ার পশমের উল ও গরম কাপড় তৈরির জন্য ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এ ছাড়া বহু লোমশ প্রাণী আছে যাদের চামড়া ব্যবহার করা হয় পোষাক, কম্বল ও বিছানা তৈরির জন্য। আমাদের পাদুকার ও ব্যাগের জন্য চামড়ার ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এসব পশুর অনেকেরই স্ত্রী প্রাণী থেকে আমরা দুগ্ধ পেয়ে থাকি যা সম্পূর্ণ খাদ্য হিসেবে পরিগণিত হয়- এবং অতীব সুখাদ্য। অনেক প্রাণীর মাংস আমরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রাণী জগতের আরও বহুবিধ অবদান নীচের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
০৬। এবং যখন তোমরা সন্ধ্যাবেলা তাদের (চারণ ভূমি থেকে) গৃহে ফিরিয়ে আন; এবং সকালে যখন উহাদের চারণভূমিতে নিয়ে যাও তখন তোমাদের হৃদয়ে অহংকার বোধ হয় ২০২৫।
২০২৫: একজন ভালো কৃষক তার পশু সম্পদের জন্য গর্ব অনুভব করে। যখন পশুপাল তৃণভুমিতে সকালে যায় ও সন্ধ্যায় গোচারণ ভূমি থেকে ফিরে আসে - তা দর্শনে কৃষকের মনে তার প্রাচুর্য ও ক্ষমতা সম্বন্ধে গর্ব হয়। পশুপালের সৌন্দর্য ও বশ্যতা তাকে করে বিমোহিত। অর্থাৎ আল্লাহ্ তাকে যে সম্পদ দান করেছেন সে সম্বন্ধে তার প্রচছন্ন গর্ব সে উপভোগ করে। মানুষ কি তার সর্ব অনুভব সেই ক্ষুদ্র সম্পদের মধ্যেই আবদ্ধ রাখবে? সে কি জীবনের বৃহত্তর মহত্তর দিক অনুভব করতে চেষ্টা করবে না? যে স্রষ্টা তার পার্থিব সম্পদকে সৃষ্টি করে দিয়েছেন - তাকে কি সে অনুভব করতে চেষ্টা করবে না?
০৭। এবং উহারা তোমাদের ভারী মাল বহন করে নিয়ে যায় দেশে দেশে, (অন্যথায়) প্রাণান্তকর ক্লেশ ব্যতীত তোমারা সেখানে পৌঁছুতে পারতে না ২০২৬। অবশ্যই তোমার প্রভু পরম দয়াময়, পরম করুণাময়।
২০২৬: পশু সম্পদের আরও বিবিধ প্রয়োজনীতা এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা ভার বহন করে। পূর্বে একস্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত চলাচলের জন্য পশুর ব্যবহার ছিলো একমাত্র বাহন। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। যদি পণ্য বা ভারী বস্তু মানুষকে নিজে বহন করতে হতো। তা হলে মানুষকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হতো। শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি নূতন দেশে, সামাজিক মেলামেশা ও জীবন সম্বন্ধে উচচতর ধারণা অনুধাবনে অক্ষম হয়ে পড়তো। শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম,বিজ্ঞান, বাণিজ্য প্রভৃতি মনের বিভিন্ন দিগন্ত তার সম্মুখে উম্মোচিত হতো না। মানুষের মনের দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে আল্লাহ্র রহমত ও করূণার ফলে। কারণ তিনিই তো মানুষের জীবনধারাকে নিত্যনূতন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের মাধ্যমে সহজতর করেছেন।
০৮। এবং (তিনি সৃষ্টি করেছেন) অশ্ব ও খচচর এবং গাধা তোমাদের আরোহণের জন্য এবং প্রদর্শনের জন্য ২০২৭। এবং তিনি সৃষ্টি করেন (আরও) বস্তু সামগ্রী যাদের সম্বন্ধে তোমাদের কোনও জ্ঞান নাই ২০২৮।
