Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১২৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৭ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৭৭ বার
+ - R Print

সূরা আল হিজর

সূরা আল হিজর বা প্রস্তরময় ভূভাগ- ১৫

৯৯ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী।
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে]


ভূমিকা : যে ছয়টি সূরা আলিফ লাম রা দিয়ে শুরু হয়েছে সূরা আল্‌ হিজর হচ্ছে তাদের শেষতম সূরা। এর অবতীর্ণ হওয়ার সময় হচ্ছে মহানবীর মক্কার অবস্থানের শেষ অথবা মধ্যবর্তী সময়ে। বিশদ বিবরণের জন্য দেখুন সূরা ১০ এর উপক্রমনিকা।

এই সূরার বিষয় বস্তুতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আল্লাহর প্রত্যাদেশ ও আল্লাহর সত্যকে রক্ষা করার উপরে। সমস্ত পাপের উৎস বা জন্ম হয় অহংকার এবং আল্লাহর ইচ্ছাকে বিকৃত করার মাধ্যমে। কিন্তু তা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে আল্লাহর দয়া ও করুণা ভিক্ষা করা। এ কথার সত্যতা প্রতিফলিত হয়েছে হযরত ইব্রাহিম, হয়রত লূতের জীবনে। 'আইকা' বাসী এবং হিজর বাসীদের জীবনে একথা সত্য হতো যদি তারা শুধুমাত্র আল্লাহর করুণার প্রত্যাশা করতো। কোরাণ, (যে মহাগ্রন্থ সাতটি অপূর্ব আয়াত দ্বারা আরম্ভ হয়েছে), হচ্ছে আল্লাহর এবাদতের জন্য অমূল্য মাধ্যম।

সার সংক্ষেপ : অবিশ্বাসীদের শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও আল্লাহর বাণী হচ্ছে অপ্রতিরোধ্য কারণ আল্লাহই তা রক্ষা করবেন। সব কিছুর মূল উৎস আল্লাহ। তিনি তার বান্দাদের সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, এবং তিনি তাদের সকলকে একত্রিত করবেন (১৫: ১-২৫)।

ইবলিশের অহংকারই ছিলো তার পাপের উৎস। ইব্‌লিশের পাপের শাস্তি থেকে আল্লাহ তাকে সাময়িক নিবৃত্তি দেন। যারা আল্লাহর প্রত্যাদেশকে নিজের জীবনে গ্রহণ করে তাদের কোন পাপ বা ভয় স্পর্শ করবে না (১৫ : ২৬- ৫০)।

আল্লাহর করুণার বার্তা যে দেবদূতদের দ্বারা হযরত ইব্রাহিমের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো, তাদেরই প্রেরণ করা হয়েছিলো লূতের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য। কারণ লূতের সম্প্রদায় নিকৃষ্টতম পাপে লিপ্ত ছিলো, আইকাবাসী ও পার্বত্য উপত্যকাবাসীদের (হিজর) জন্য ছিলো তাদের পাপের প্রতিফল (১৫: ৫১-৮৪)।

পবিত্র কোরাণ এবং এর সূরাগুলি আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন শিক্ষা দেয়। আরও শিক্ষা দেয় বিনয়ের সাথে আল্লাহর এবাদত করার উপায় এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর সেবা করার নির্দেশ (১৫: ৮৫-৯৯)।

সূরা আল হিজর বা প্রস্তরময় ভূভাগ- ১৫

৯৯ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী।
[দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]


০১। আলিফ লাম-রা। এইগুলি কোরআনের প্রত্যাদেশের আয়াত ১৯৩৩, যা সব কিছুকে বোধগম্য করে ১৯৩৪।

১৯৩৩ : দেখুন সূরা (১০ : ১) এবং টীকা ১৩৮২।

১৯৩৪ : কুর-আনের প্রত্যাদেশের প্রকাশভঙ্গী ও ভাষার বৈশিষ্ট্য, যা বিভিন্ন মূল্যবোধকে তুলে ধরেছে, তা লক্ষণীয়। উদাহরণ হিসেবে যে সব সূরাগুলি "আলিফ-লাম-রা" দিয়ে শুরু হয়েছে তাদের কথাই ধরা যায়। বর্তমান সূরাটি "আলিফ-লাম-রা" সূরার ক্রমপঞ্জির শেষ সূরা। ক্রমপঞ্জির বিভিন্ন সূরাতে "আলিফ লাম-রা" সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে তা নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

সূরা ইউনুসে (১০:১) বলা হয়েছে "আলিফ লাম-রা। এগুলি হচ্ছে জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত", এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে আল্লাহর অত্যাচার্য সৃষ্টি এবং আল্লাহর প্রত্যাদেশের সাথে তার সৃষ্টির সম্পর্ক।

সূরা হুদে (১১:১) আমরা পড়ি "আলিফ লাম-রা, ইহার আয়াতসমূহ মৌলিক এবং বিশদভাবে বিবৃত।" এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে আল্লাহর আইনের যারা বিরুদ্ধাচারণ করবে, তাদের জন্য ন্যায় বিচার ও শাস্তির বিবরণ।

সূরা ইউসুফে (১২:১) বলা হয়েছে, "আলিফ-লাম-রা, এগুলি সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।" এই সূরার বিষয়বস্তুতে হযরত ইউসুফের কাহিনীর মাধ্যমে আল্লাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপূর্ব ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

সূরা রাদে (১৩:১) বলা হয়েছে, "আলিফ-লাম-মীম-রা, এইগুলি কুর-আনের আয়াত।" এই সূরাতে আল্লাহর প্রত্যাদেশের ধারা ও মানুষ কিভাবে তা গ্রহণ করে তার তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু ইউসুফের কাহিনীর মত বিশদ কোন উদাহরণ দেয়া হয় নাই।

সূরা ইব্রাহীমে (১৪:১) বলা হয়েছে, "আলিফ-লাম-মীম-রা; এই কিতাব, ইহা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনতে পার।" এই সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে, মানুষের কল্যাণের জন্য হযরত ইব্রাহীমের প্রার্থনা। মিথ্যা এবাদতের অন্ধকার থেকে মানুষকে একত্ববাদের সত্যের আলোতে উত্তরণের জন্য আল্লাহর করুণা ভিক্ষা।

সূরা হিজরে (১৫:১) আমরা পড়ি "আলিফ-লাম-রা; এইগুলি মহাগ্রন্থ কুর-আনের সুস্পষ্ট আয়াত" এই সূরাতে পাপের ব্যাখা দান করা হয়েছে এবং কিভাবে আল্লাহর সত্য তা থেকে রক্ষা পায় সে সম্বন্ধে বলা হয়েছে।


চতুর্দশ পারা

০২। অবিশ্বাসীরা কখনও কখনও আকাঙ্ক্ষা করে যে, তারা (আল্লাহর ইচ্ছার) কাছে নতি স্বীকার করে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হবে ১৯৩৫।

১৯৩৫ : যারা কাফের, নিজেকে মিথ্যার আড়ালে লুকিয়ে রাখে বা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, কোন না কোন সময় তাদের জন্য দুঃখ ও বিপর্যয় অবধারিত। সেই বিপর্যয়ের দিনগুলিতে তারা আন্তরিকভাবে বারে বারে আল্লাহর হেদায়েত কামনা করে, সত্যের আলোর অনুসরণ করে, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্ম-সমর্পন করতে চায়। প্রত্যেক কাফেরের মানসিক অবস্থা কোন না কোন সময়ে এ রকম হবে। হতে পারে তা খুব শীঘ্র, নিকট ভবিষ্যতে এই পৃথিবীতেই অথবা দূর ভবিষ্যতে মৃত্যুর পরে শেষ বিচারের দিনে। কিন্তু এ কথা সত্য যে, অবিশ্বাসীরা জীবনে বা মরণে কোন এক সময়ে আল্লাহ এবং আল্লাহ সত্যকে বিশ্বাসের জন্য উদগ্রীব হবে। প্রত্যেক মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সময় থাকতে নিজের প্রয়োজনেই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া।

০৩। এদের ছেড়ে দাও পৃথিবীর জীবনের আরাম-আয়েশ উপভোগ করার জন্য এবং নিজেদের আত্মতৃপ্তির জন্য। (মিথ্যা) আশা তাদের আনন্দ দিক ১৯৩৬। শীঘ্রই তারা জানতে পারবে। ১৯৩৭

১৯৩৬ : আক্ষরিক "মিথ্যা আশা তাদের আনন্দ দিক" অর্থের বিশদ ব্যাখা করা হয়েছে আয়াত (৫:৬৬) ও টীকা ৭৭৬-তে।

১৯৩৭ : যারা আল্লাহর হুকুমে, সত্যের আলোতে বিশ্বাসী নয়, তারা পৃথিবীর জীবনকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে। ভোগ-বিলাস তাদের জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সাধনা। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা তাদের কাছে মূল্যহীন। তাদের কথাই এই আয়াতে বলা হয়েছে। তারা পাপী এবং নির্বোধ। সত্যকে অবলোকন করার ক্ষমতা নাই দেখেই তারা দম্ভে অহংকারে স্ফীত হয়ে যায় এবং নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে। যদি তাদের সত্যিকারের জ্ঞান থাকতো তবে তারা বুঝতে পারতো যে তারা নির্বোধ ছাড়া আর কিছু নয়।

কারণ তারা পানাহার ও ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত থেকে মৃত্যুকে ভুলে যায়, পরকালের পুরস্কার ও শাস্তিতে বিশ্বাস করে না। তাদের সমস্ত সত্তা জুড়ে থাকে বিষয়-বৈভবের দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা। অপরপক্ষে, যারা আল্লাহর হেদায়েতের আলোতে আলোকিত মুমিন বান্দা, তাঁরা পাপীদের ক্ষণস্থায়ী পার্থিব প্রাচুর্য দেখে আশ্চর্য হন না। কারণ তাঁদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আল্লাহর প্রসন্নতা লাভ। তাঁরা পাপীদের পরিণতির ভার আল্লাহর দয়া ও ন্যায় বিচারের উপরে ছেড়ে দেন।

০৪। যে সব জনপদ আমি ধ্বংস করেছি তাদের জন্য পূর্বাহ্নেই লিপিবদ্ধ ছিলো নির্দিষ্ট সময়কাল। ১৯৩৮।

১৯৩৮ : "Kitabun ma'lum" আক্ষরিক অর্থ "লিখিত সত্য" এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটিকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখা করা যায়।

(১) আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য পৃথিবীতে এক "নির্দিষ্ট পরিমাণ সময়" ও কাজের পরিমাণ নির্দেশ করে দিয়েছেন। এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণে মেধা, ক্ষমতা ও বিভিন্ন মানসিক দক্ষতা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করে থাকেন। ব্যক্তি তার মেধা, মননশীলতা, দক্ষতা প্রয়োগ করবে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলনের জন্য। এক কথায়, তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে তার ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সমন্বিত করতে। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণ আত্ম-সমর্পণের মাধ্যমেই মানব সন্তান আল্লাহর বিশ্বজনীন ইচ্ছার কাছে নিজেকে বিলীণ করতে পারে। নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার বাহকরূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, আল্লাহ মানব সন্তানকে অনেক সময় দেন। যখন সেই সময় শেষ হয়ে যাবে, তার পরে আর অনুতাপ করার জন্য একটুও সময় দেয়া হবে না।

(২) পাপী বা পূণ্যাত্মা কেহই ইচ্ছা করলেই শেষ বিচারের দিনকে অগ্রগামী করতে পারবে না। আল্লাহর পরিকল্পনা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং সে "সময় নির্দিষ্ট"। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী।

(৩) কোনও জাতি বা ব্যক্তির ধ্বংস তার নিজেরই কর্মফল। আল্লাহ কাউকে ধ্বংস করেন না। জাতি বা ব্যক্তি যখন পাপে, অনাচারে লিপ্ত হয়- তার ফল স্বরূপ "নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তে" নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে। এই হচ্ছে আল্লাহর হুকুম বা আইন। প্রতিটি কাজেরই প্রতিফল আছে। ভালো কাজের ভালো প্রতিফল, মন্দ কাজের প্রতিফল ধ্বংস। সব কিছুর জন্য "নির্দিষ্ট সময়কাল" নির্ধারিত আছে। আল্লাহর এই শ্বাশত আইন প্রত্যাদেশের মাধ্যমে পূর্বেই সকলকে সতর্ক করে দেয়া হয়ে থাকে।

০৫। কোন জাতি তার নির্দিষ্ট কালকে ত্বরান্বিত করতে পারে না বা বিলম্বিত করতে পারে না। ১৯৩৯।

১৯৩৯ : দেখুন আয়াত (৭:৩৪) এবং এর টীকা।