+
-
R
ভূমিকাঃ- সূরা ১০ থেকে ১৫ পর্যন্ত সূরার সাধারণ মর্মার্থ এবং এই সূরার ক্রম অনুসারে এর অবস্থানের জন্য দেখুন ১০ এর ভূমিকা। এই সূরাতে পিতা ইয়াকুবের ১২টি ছেলের মধ্যে ইউসুফের কাহিনীর বিশেষ বিশেষ অংশকে তুলে ধরা হয়েছে। এই কাহিনীকে আল্লাহ্ অত্যন্ত সুন্দর কাহিনীরূপে উল্লেখ করেছেন [১২:৩] আয়াতে। কারণ হিসেবে বলা যায়; ১) কোরানে বর্ণিত অন্যান্য ঘটনার থেকে ইউসুফের কাহিনী অত্যন্ত বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২)এই কাহিনীর মাধ্যমে মানুষের উত্থান পতনের বর্ণনা করা হয়েছে; ফলে স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে এর আবেদন পৌছায় । ৩) সুন্দর ভাবে অঙ্কিত করা হয়েছে এর আধ্যাত্মিক নিহিতার্থ, জীবনের বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করা হয়েছে, বৃদ্ধ পিতার সন্তানের জন্য আকুতি, পিতা এবং তাঁর আদরের ছোট সন্তানের মধ্যে আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক, বড় ভাইদের ছোট ভাই এর প্রতি হিংসা-দ্বেষ, তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাদের পিতার দুঃখ, নামমাত্র মূল্যে পিতার আদরের সন্তানকে দাসত্বের জন্য বিক্রী করা; ভালোবাসার কামজ প্রবৃত্তিকে পবিত্রতা ও সংযমের পটভূমিতে তুলে ধরা, মিথ্যা অভিযোগ, কারাগার, স্বপ্নের অর্থ, সাধারণ জীবন ও অর্থবহ জীবন ইত্যাদি। নিষ্পাপ জীবন সম্মান বয়ে আনে , ক্ষমা ও বদান্যতা প্রকাশ করা হয়েছে মিষ্টি প্রতিশোধ আকারে,প্রশাসনের উচ্চ কার্যাবলী, উচ্চপদে অধিষ্ঠানে থেকেও বিনয়, বাৎসল্য ও সর্বপরি ধর্মানুরাগ ও সত্যানুরাগ ইত্যাদির বর্ণনা এখানে আছে।
এই কাহিনী যদিও বাইবেলে বর্ণিত কাহিনীর অনুরূপ তবুও এই কাহিনী ও বাইবেলে বর্ণিত কাহিনী এক নয়। বাইবেলে বর্ণিত কাহিনী লোকগাঁথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- যেখানে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের কোনও স্থান নাই। সেখানে ইহুদীদের মিশরবাসীদের উর্দ্ধে স্থাপনের জন্য প্রয়াস পায় এ ভাবে যে ইহুদীরা মিশরবাসী অপেক্ষা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও আর্থিক ব্যাপারে অত্যন্ত বিচক্ষণ ছিল । সেখানে দেখানো হয়েছে যে ইউসুফ দুভির্ক্ষের সুযোগ গ্রহণ করে গরীব মিশর বাসীদের জমি ও গৃহপালিত পশু হস্তগত করেন রাষ্ট্রের নামে। এভাবেই ইসরাঈলীরা ফেরাউনের পশুসম্পদের অধিকারী হয়, এখানেই বাইবেলের কাহিনীর সাথে কোরানের কাহিনীর পার্থক্য - কোরান কাহিনীর আধ্যাত্মিক দিকটি অল্প বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছে। রূপক বর্ণনার মাধ্যমে জীবনের পরস্পর বিরোধী দিক তুলে ধরেছে, বলা হয়েছে অসত্য ও পরিবর্তনশীল পৃথিবীর মাঝে সত্যিকারের গুণাবলী একমাত্র স্থায়ী ভাবে থাকে। ইতিহাসের বিরাট ক্যানভাসে আঁকা হয়েছে; কিভাবে আল্লাহ্র পরিকল্পনা ধীরে ধীরে কার্যকররূপ গ্রহণ করে। মুসলিম ব্যাখ্যাকারীদের নিকট কাহিনীর এই বিশেষ দিক অত্যন্ত প্রিয় ।
সার সংক্ষেপঃ জীবন একটা স্বপ্ন যা উপমা ও কাহিনীর মাধ্যমে প্রাঞ্জল ভাষায় কোরানে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র নবী হযরত ইউসুফ স্বপ্নে যে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেন, তা তার সৎ ভাইদের কাছে অরুচিকর মনে হয়। তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং নামমাত্র মূল্যে তাঁকে বণিকদের কাছে ক্রীতদাসরূপে বিক্রী করে দেয় । [১২:১-২০]
বনীকেরা হযরত ইউসুফকে মিশরে নিয়ে আসে এবং মিশরের প্রধানমন্ত্রীর (আজিজ) সম্মুখে আনায়ন করে, পরবর্তীতে আজিজ হযরত ইউসুফকে দত্তক পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। আজিজের স্ত্রী হযরত ইউসুফকে প্রেমিকরূপে পেতে চান- কিন্তু কামজ প্রেমে হযরত ইউসুফকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। তাঁর প্রত্যাখান তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। কিন্তু হযরত ইউসুফ কারাগারে থেকেও সত্যকে খুঁজে ফেরেন এবং সেখানে তিনি তার দয়ালু স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর একজন সঙ্গী -বন্দী, যার কাছে তিনি স্বপ্নের ব্যাখা দান করেছিলেন, মুক্তি পায় এবং রাজ অনুগ্রহ লাভ করে রাজার পানপাত্র বহনকারী হয়। [১২: ২১-৪২]
রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দানের সুযোগে ইউসুফ রাজার নিকট নিজের নির্দ্দোষিতা প্রমাণের সুযোগ পেলেন। হযরত ইউসুফ দাবী করলেন যে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধ থেকে সকল অপবাদ মিথ্যারূপে ঘোষণা করা হোক । তিনি রাজ অনুগ্রহ লাভ করেন এবং উজির পদে মনোনীত হন। তাঁর সৎ ভাইরা দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়ে মিশর আগমন করে এবং ইউসুফ দ্বারা সহৃদয়তার সাথে গৃহিত হয়। তারা ইউসুফের পরিচয় জানতে পারে না । হযরত ইউসুফ তাঁর আপন ভাই বেঞ্জামিনকে মিশরে আনতে বলেন। [১২: ৪৩-৬৮]
হযরত ইউসুফ কৌশলে বেঞ্জামিনকে আটকিয়ে রাখেন এবং তাঁর সৎ - ভাইদের তাদের অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করে। পরে তাদের ক্ষমা করে দেয় এবং তাদের ক্যানন থেকে হযরত ইয়াকুব ও তাদের পরিবারদের মিশরে আনার জন্য প্রেরণ করেন । [১২: ৬৯-৯৩]
হযরত ইসরাঈল (ইয়াকুব) মিশরে এসে বসতি স্থাপন করেন ও শান্তি লাভ করেন। আল্লাহ্র নামকে মহিমান্বিত করা হয়। আল্লাহ্র সত্য চিরস্থায়ী হবে এবং আল্লাহ্র ইচ্ছা পরলোকে পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হবে। [ ১২: ৯৪ - ১১১]
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১৬২৮: Ayat: আল্লাহ্র নিদর্শন এবং কোরানের স্তবক বা চরণ। হযরত ইউসুফের কাহিনী আল্লাহ্র এক অপূর্ব নিদর্শন , বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা যার মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রকাশ করেছেন কিভাবে তাঁর উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সফল বাস্তবায়ন হয়।
১৬২৯: দেখুন সূরা [৫: ১৫] আয়াত এবং টিকা ৭১৬ । এখানে Mubin শব্দটির প্রধান অর্থ করা হয়েছে, যা কোন কিছুকে স্পষ্ট ভাবে ব্যাখা করে ।
১৬৩০: Qur-an কথাটির অর্থ ১) যা পঠিত হইবে, অথবা ২) আবৃত্তি করা হইবে, অথবা, ৩) ঘোষণা করা হইবে। এই কথাগুলি কোরানের যে কোন স্তবক বা চরণ অথবা সূরা বা , সর্ম্পূণ গ্রন্থ সম্বন্ধে প্রযোজ্য। এই আয়াতে কোরানকে আরবী ভাষাতে নাজেল করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় পাঠক যাতে কোরান পড়ে বুঝতে পারে, সে কারণেই এই মহাগ্রন্থকে আরবী ভাষাতে নাজেল করা হয়েছে [কারণ আরবের লোকের ভাষা আরবী]
১৬৩১ : "সুন্দর কাহিনী" দেখুন এই সূরার ভূমিকাতে । এই কাহিনীর আলঙ্কারিক সুন্দর বর্ণনা তাদের জন্যই ইঙ্গিতময় , যারা আল্লাহ্র ইঙ্গিত বুঝতে চায়, জ্ঞান আহরণ করতে চায়। এই সৌন্দর্য শুধু যে ইউসুফের কাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাই নয়, হযরত ইউসুফ নিজেও ছিলেন সুন্দর - সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপবান যুবক । মিশরের মহিলারা তাঁকে বলতো 'স্বর্গের দেবদূত' বা মহিমান্বিত ফেরেশতা' [১২: ৩১] তিনি ছিলেন ভিতরে ও বাহিরে সমভাবে সুন্দর । তাঁর বাইরের অবয়বের সৌন্দর্য্য ছিলো তাঁর আত্মার সৌন্দর্যের প্রতীক।
১৬৩২: এই আয়াতটিতে উপমার সাহায্যে বোঝানো হয়েছে যে, ইউসুফ ছিলেন আল্লাহ্র মনোনীত ব্যক্তি। কাহিনী বোঝার সুবিধার্থে কিছু পূর্বের ইতিহাস এখানে আলোচনা করা হলো । হযরত ইউসুফের বংশ তালিকা এভাবে প্রকাশ করা যায় : হযরত ইব্রাহিমের কনিষ্ঠ সন্তান হযরত ইসাহাকের পুত্র ছিলেন হযরত ইয়াকুব। যার অপর নাম ছিলো হযরত ইসরাঈল । হযরত ইব্রাহীমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন হযরত ইসমাইল যার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে সূরা [২: ১২৪ - ১২৯] আয়াতে পয়গম্বরকুলের বংশ চূরামনিতে হযরত ইব্রাহীমের স্থান। হযরত ইয়াকুবের চার স্ত্রী ছিলো ।তাঁর তিন স্ত্রীর গর্ভে দশটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বৃদ্ধ বয়েসে তাঁর সুন্দরী চতুর্থ স্ত্রীর [রাহেল] নিকট থেকে তিনি দুটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। তাঁদের নাম ছিলো যথাক্রমে ইউসুফ ও সর্বকনিষ্ঠ বেঞ্জামিন । যে স্থানে হযরত ইয়াকুব তাঁর পরিবারবর্গ নিয়ে বাস করতেন তা ছিলো ক্যানন প্রদেশে, বর্তমান জেরুজালেম থেকে ত্রিশ মাইল উত্তরে বর্তমান Nablus [পুরাতন Shecem ] নামক স্থানে । পুরুষনুক্রমিক ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে এখানেরই একটি কূপে হযরত ইউসুফকে নিক্ষেপ করা হয় । যা এখনও দর্শনীয় বস্তু ।
১৬৩৩ : এই স্বপ্নের কাহিনী যখন বর্ণনা করা হয় , তখন হযরত ইউসুফ ছিলেন বালকমাত্র। কিন্তু সে সময়েই তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়। তিনি ছিলেন সরল, সত্যবাদী ও পূন্যাত্মা । তিনি ছিলেন সচ্চরিত্র ও পৌরুষের প্রতীক। তাঁর পিতা তাঁকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। ফলে তাঁর সৎ ভাইরা তাকে ঈর্ষা এবং ঘৃণা করতো । এই স্বপ্নের মাধ্যমে বলা হয় যে, তাঁর ভাগ্য আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত, তিনি আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত ! তাঁকে আল্লাহ্ তাঁর এগারো ভাই [ একাদশ নক্ষত্র] ও পিতা মাতা [সূর্য এবং চন্দ্র ] অপেক্ষা বহু উর্দ্ধে স্থাপন করবেন - স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে এই শুভ সংবাদ দান করা হয় । পরবর্তীতে আমরা দেখি; খ্যাতি, সম্মান, অর্থ বিত্ত, সৌন্দর্য সব কিছুর শীর্ষে অবস্থান করেও হযরত ইউসুফ তাঁর চরিত্রের বিনয়কে হারান নাই। অহংকারে আত্মবিস্মৃত হন নাই। তিনি তাঁর পিতা মাতাকে সর্বদা সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত রাখতেন এবং তাঁর সৎ ভাইদের ঘৃণা ও ঈর্ষার প্রতিদানে তিনি তাদের ক্ষমা ও দয়া করেন। এই ছিলো তাঁর মিষ্টি প্রতিশোধ।
১৬৩৪: বালক ইউসুফ ছিলেন সরলতার প্রতীক । তিনি তাঁর ভাইদের তীব্র ঘৃণা ও ঈর্ষার বিষয় অবগত ছিলেন না । কিন্তু তাঁর পিতা তা অবগত ছিলেন এবং তিনি সে সম্বদ্ধে ইউসুফকে সাবধান করেন।
১৬৩৫: কাহিনীর মধ্যবর্তী স্থানে এখানে এসে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানেই কোরানের কাহিনীর সৌন্দর্য। হযরত ইউসুফের ভাইরা শয়তানের হাতের পুতুল ছিলো মাত্র। শয়তান তাদের যে ভাবে পরিচালিত করতো তারা সেভাবেই পরিচালিত হতো । ফলে তারা তাদের মনুষত্বকে, ব্যক্তিত্বকে শয়তানের দুষ্টফন্দির নিকট সমর্পিত করেছিলো। তারা ভুলে গেলো যে, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু । মানুষের চরিত্র, মনুষত্ব ও ব্যক্তিত্ব সব কিছু শয়তান বা পাপ ধ্বংস করে দেয় ।
১৬৩৬: ইউসুফ ছিলেন আল্লাহ্র মনোনীত। আল্লাহ্ ইউসুফ কে "মনোনীত" করবেন। সুতারাং তিনি আল্লাহ্র নিদর্শন ও ঘটনার সঠিক ব্যাখা বোঝার ক্ষমতা রাখবেন। যারা পূণ্যাত্মা তাদের কল্পনায় সত্য ধরা পরে। তারা সত্যকে বুঝতে পারেন। এ একটি বিশেষ ক্ষমতা যা আল্লাহ্র দান। অপর পক্ষে যাদের এই ক্ষমতা নাই তারা তা বুঝতে পারবে না। পূণ্যাত্মারা পূর্বাহ্নেই স্বপ্নে বড় বড় ঘটনার ইঙ্গিত পান। অপর পক্ষে যারা তুচ্ছ তারা এ ক্ষমতা রাখে না , এই ক্ষমতা আল্লাহ্রই দান। হযরত ইউসুফের চরিত্রের মাধ্যমে, আল্লাহ্ বিশ্বের সমস্ত পূন্যাত্মাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। জীবনের পথে আমাদের অনেক চড়াই উৎরাই পথ অতিক্রম করতে হয় । যখন দুর্যোগের কালো মেঘ আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে যারা পূন্যাত্মা তারা সেই বিপদ ও দুর্যোগকে মোকাবিলা করেন ধৈর্য্য, বিনয় ও আল্লাহ্র প্রতি একান্ত নির্ভরশীলতার মাধ্যমে। আল্লাহ্র প্রতি কোনও অভিযোগ তাঁরা উচ্চারণ করেন না । তাঁরা সর্বদা আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে নিবেদিত থাকেন। বিপদে দুঃখে তাঁরা যেমন ধীর স্থির থাকেন, সৌভাগ্য এবং সফলতাতেও তারা উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেন না । তিনি সর্বদা বিনয়াবনত ভাবে শত্রু মিত্র সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন । তাঁর সর্ব কাজ থাকে এক আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি নিবেদিত। হযরত ইউসুফের চরিত্রের এই বিশেষ দিকটি প্রতিটি পূন্যাত্মাদের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং কোরানের শিক্ষার মাধ্যমে এই বিশেষ দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।
১৬৩৭: এই আয়াতটি হযরত ইয়াকুবের উপদেশ তাঁর সন্তান হযরত ইউসুফের প্রতি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সব কিছুর নিয়ন্ত্রন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র হাতে । তিনি মঙ্গলময় এবং সর্বজ্ঞানী তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নাই। সুতারাং আমরা তাঁর প্রতি আমাদের আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করবো। ইউসুফকে তার পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম, হযরত ইস্হাকের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম , হযরত ইসাহাক ছিলেন প্রকৃত ধর্মভীরু, বিশ্বাসী এবং আল্লাহ্র প্রতি নিবেদিত প্রাণ । তাঁদের এই বিশ্বাস ও আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সমুন্নত রাখতে সাহায্য করে, সমস্ত মলিনতা মুক্ত রাখে, সমস্ত বাঁধাকে জয় করতে সাহায্য করে।
সূরা ইউসুফ
Page 1 of 15
সূরা ইউসুফ -১২
ভূমিকাঃ- সূরা ১০ থেকে ১৫ পর্যন্ত সূরার সাধারণ মর্মার্থ এবং এই সূরার ক্রম অনুসারে এর অবস্থানের জন্য দেখুন ১০ এর ভূমিকা। এই সূরাতে পিতা ইয়াকুবের ১২টি ছেলের মধ্যে ইউসুফের কাহিনীর বিশেষ বিশেষ অংশকে তুলে ধরা হয়েছে। এই কাহিনীকে আল্লাহ্ অত্যন্ত সুন্দর কাহিনীরূপে উল্লেখ করেছেন [১২:৩] আয়াতে। কারণ হিসেবে বলা যায়; ১) কোরানে বর্ণিত অন্যান্য ঘটনার থেকে ইউসুফের কাহিনী অত্যন্ত বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২)এই কাহিনীর মাধ্যমে মানুষের উত্থান পতনের বর্ণনা করা হয়েছে; ফলে স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে এর আবেদন পৌছায় । ৩) সুন্দর ভাবে অঙ্কিত করা হয়েছে এর আধ্যাত্মিক নিহিতার্থ, জীবনের বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করা হয়েছে, বৃদ্ধ পিতার সন্তানের জন্য আকুতি, পিতা এবং তাঁর আদরের ছোট সন্তানের মধ্যে আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক, বড় ভাইদের ছোট ভাই এর প্রতি হিংসা-দ্বেষ, তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাদের পিতার দুঃখ, নামমাত্র মূল্যে পিতার আদরের সন্তানকে দাসত্বের জন্য বিক্রী করা; ভালোবাসার কামজ প্রবৃত্তিকে পবিত্রতা ও সংযমের পটভূমিতে তুলে ধরা, মিথ্যা অভিযোগ, কারাগার, স্বপ্নের অর্থ, সাধারণ জীবন ও অর্থবহ জীবন ইত্যাদি। নিষ্পাপ জীবন সম্মান বয়ে আনে , ক্ষমা ও বদান্যতা প্রকাশ করা হয়েছে মিষ্টি প্রতিশোধ আকারে,প্রশাসনের উচ্চ কার্যাবলী, উচ্চপদে অধিষ্ঠানে থেকেও বিনয়, বাৎসল্য ও সর্বপরি ধর্মানুরাগ ও সত্যানুরাগ ইত্যাদির বর্ণনা এখানে আছে।
এই কাহিনী যদিও বাইবেলে বর্ণিত কাহিনীর অনুরূপ তবুও এই কাহিনী ও বাইবেলে বর্ণিত কাহিনী এক নয়। বাইবেলে বর্ণিত কাহিনী লোকগাঁথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- যেখানে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের কোনও স্থান নাই। সেখানে ইহুদীদের মিশরবাসীদের উর্দ্ধে স্থাপনের জন্য প্রয়াস পায় এ ভাবে যে ইহুদীরা মিশরবাসী অপেক্ষা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও আর্থিক ব্যাপারে অত্যন্ত বিচক্ষণ ছিল । সেখানে দেখানো হয়েছে যে ইউসুফ দুভির্ক্ষের সুযোগ গ্রহণ করে গরীব মিশর বাসীদের জমি ও গৃহপালিত পশু হস্তগত করেন রাষ্ট্রের নামে। এভাবেই ইসরাঈলীরা ফেরাউনের পশুসম্পদের অধিকারী হয়, এখানেই বাইবেলের কাহিনীর সাথে কোরানের কাহিনীর পার্থক্য - কোরান কাহিনীর আধ্যাত্মিক দিকটি অল্প বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছে। রূপক বর্ণনার মাধ্যমে জীবনের পরস্পর বিরোধী দিক তুলে ধরেছে, বলা হয়েছে অসত্য ও পরিবর্তনশীল পৃথিবীর মাঝে সত্যিকারের গুণাবলী একমাত্র স্থায়ী ভাবে থাকে। ইতিহাসের বিরাট ক্যানভাসে আঁকা হয়েছে; কিভাবে আল্লাহ্র পরিকল্পনা ধীরে ধীরে কার্যকররূপ গ্রহণ করে। মুসলিম ব্যাখ্যাকারীদের নিকট কাহিনীর এই বিশেষ দিক অত্যন্ত প্রিয় ।
সার সংক্ষেপঃ জীবন একটা স্বপ্ন যা উপমা ও কাহিনীর মাধ্যমে প্রাঞ্জল ভাষায় কোরানে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্র নবী হযরত ইউসুফ স্বপ্নে যে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেন, তা তার সৎ ভাইদের কাছে অরুচিকর মনে হয়। তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং নামমাত্র মূল্যে তাঁকে বণিকদের কাছে ক্রীতদাসরূপে বিক্রী করে দেয় । [১২:১-২০]
বনীকেরা হযরত ইউসুফকে মিশরে নিয়ে আসে এবং মিশরের প্রধানমন্ত্রীর (আজিজ) সম্মুখে আনায়ন করে, পরবর্তীতে আজিজ হযরত ইউসুফকে দত্তক পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। আজিজের স্ত্রী হযরত ইউসুফকে প্রেমিকরূপে পেতে চান- কিন্তু কামজ প্রেমে হযরত ইউসুফকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। তাঁর প্রত্যাখান তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। কিন্তু হযরত ইউসুফ কারাগারে থেকেও সত্যকে খুঁজে ফেরেন এবং সেখানে তিনি তার দয়ালু স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর একজন সঙ্গী -বন্দী, যার কাছে তিনি স্বপ্নের ব্যাখা দান করেছিলেন, মুক্তি পায় এবং রাজ অনুগ্রহ লাভ করে রাজার পানপাত্র বহনকারী হয়। [১২: ২১-৪২]
রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দানের সুযোগে ইউসুফ রাজার নিকট নিজের নির্দ্দোষিতা প্রমাণের সুযোগ পেলেন। হযরত ইউসুফ দাবী করলেন যে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধ থেকে সকল অপবাদ মিথ্যারূপে ঘোষণা করা হোক । তিনি রাজ অনুগ্রহ লাভ করেন এবং উজির পদে মনোনীত হন। তাঁর সৎ ভাইরা দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়ে মিশর আগমন করে এবং ইউসুফ দ্বারা সহৃদয়তার সাথে গৃহিত হয়। তারা ইউসুফের পরিচয় জানতে পারে না । হযরত ইউসুফ তাঁর আপন ভাই বেঞ্জামিনকে মিশরে আনতে বলেন। [১২: ৪৩-৬৮]
হযরত ইউসুফ কৌশলে বেঞ্জামিনকে আটকিয়ে রাখেন এবং তাঁর সৎ - ভাইদের তাদের অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করে। পরে তাদের ক্ষমা করে দেয় এবং তাদের ক্যানন থেকে হযরত ইয়াকুব ও তাদের পরিবারদের মিশরে আনার জন্য প্রেরণ করেন । [১২: ৬৯-৯৩]
হযরত ইসরাঈল (ইয়াকুব) মিশরে এসে বসতি স্থাপন করেন ও শান্তি লাভ করেন। আল্লাহ্র নামকে মহিমান্বিত করা হয়। আল্লাহ্র সত্য চিরস্থায়ী হবে এবং আল্লাহ্র ইচ্ছা পরলোকে পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হবে। [ ১২: ৯৪ - ১১১]
সূরা ইউসুফ - ১২
১১১ আয়াত, ১২ রুকু, মক্কী[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে ]
১। আলিফ- লাম রা; এইগুলি ১৬২৮ সুস্পষ্ট কিতাবের প্রতীক [বা আয়াত] ১৬২৯ ।
১৬২৮: Ayat: আল্লাহ্র নিদর্শন এবং কোরানের স্তবক বা চরণ। হযরত ইউসুফের কাহিনী আল্লাহ্র এক অপূর্ব নিদর্শন , বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনা যার মাধ্যমে আল্লাহ্ প্রকাশ করেছেন কিভাবে তাঁর উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সফল বাস্তবায়ন হয়।
১৬২৯: দেখুন সূরা [৫: ১৫] আয়াত এবং টিকা ৭১৬ । এখানে Mubin শব্দটির প্রধান অর্থ করা হয়েছে, যা কোন কিছুকে স্পষ্ট ভাবে ব্যাখা করে ।
২। আমি ইহা আরবী ভাষায় কুর-আন অবতীর্ণ করেছি, যেনো তোমরা জ্ঞান আহরণ করতে পার ১৬৩০।
১৬৩০: Qur-an কথাটির অর্থ ১) যা পঠিত হইবে, অথবা ২) আবৃত্তি করা হইবে, অথবা, ৩) ঘোষণা করা হইবে। এই কথাগুলি কোরানের যে কোন স্তবক বা চরণ অথবা সূরা বা , সর্ম্পূণ গ্রন্থ সম্বন্ধে প্রযোজ্য। এই আয়াতে কোরানকে আরবী ভাষাতে নাজেল করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় পাঠক যাতে কোরান পড়ে বুঝতে পারে, সে কারণেই এই মহাগ্রন্থকে আরবী ভাষাতে নাজেল করা হয়েছে [কারণ আরবের লোকের ভাষা আরবী]
৩। প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুর-আনের [অংশ বিশেষ ] প্রেরণ করে আমি তোমার নিকট এক অত্যন্ত সুন্দর কাহিনীর বর্ণনা করছি। এর পূর্বে তুমি ছিলে যারা এর কিছু জানে না তাদের দলে ১৬৩১।
১৬৩১ : "সুন্দর কাহিনী" দেখুন এই সূরার ভূমিকাতে । এই কাহিনীর আলঙ্কারিক সুন্দর বর্ণনা তাদের জন্যই ইঙ্গিতময় , যারা আল্লাহ্র ইঙ্গিত বুঝতে চায়, জ্ঞান আহরণ করতে চায়। এই সৌন্দর্য শুধু যে ইউসুফের কাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাই নয়, হযরত ইউসুফ নিজেও ছিলেন সুন্দর - সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপবান যুবক । মিশরের মহিলারা তাঁকে বলতো 'স্বর্গের দেবদূত' বা মহিমান্বিত ফেরেশতা' [১২: ৩১] তিনি ছিলেন ভিতরে ও বাহিরে সমভাবে সুন্দর । তাঁর বাইরের অবয়বের সৌন্দর্য্য ছিলো তাঁর আত্মার সৌন্দর্যের প্রতীক।
৪। স্মরণ কর, ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলো, "হে আমার পিতা! ১৬৩২। আমি তো দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, এবং সূর্য এবং চন্দ্র । আমি দেখলাম তারা আমাকে সেজদা করছে ১৬৩৩ ।
১৬৩২: এই আয়াতটিতে উপমার সাহায্যে বোঝানো হয়েছে যে, ইউসুফ ছিলেন আল্লাহ্র মনোনীত ব্যক্তি। কাহিনী বোঝার সুবিধার্থে কিছু পূর্বের ইতিহাস এখানে আলোচনা করা হলো । হযরত ইউসুফের বংশ তালিকা এভাবে প্রকাশ করা যায় : হযরত ইব্রাহিমের কনিষ্ঠ সন্তান হযরত ইসাহাকের পুত্র ছিলেন হযরত ইয়াকুব। যার অপর নাম ছিলো হযরত ইসরাঈল । হযরত ইব্রাহীমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন হযরত ইসমাইল যার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে সূরা [২: ১২৪ - ১২৯] আয়াতে পয়গম্বরকুলের বংশ চূরামনিতে হযরত ইব্রাহীমের স্থান। হযরত ইয়াকুবের চার স্ত্রী ছিলো ।তাঁর তিন স্ত্রীর গর্ভে দশটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। বৃদ্ধ বয়েসে তাঁর সুন্দরী চতুর্থ স্ত্রীর [রাহেল] নিকট থেকে তিনি দুটি পুত্র সন্তান লাভ করেন। তাঁদের নাম ছিলো যথাক্রমে ইউসুফ ও সর্বকনিষ্ঠ বেঞ্জামিন । যে স্থানে হযরত ইয়াকুব তাঁর পরিবারবর্গ নিয়ে বাস করতেন তা ছিলো ক্যানন প্রদেশে, বর্তমান জেরুজালেম থেকে ত্রিশ মাইল উত্তরে বর্তমান Nablus [পুরাতন Shecem ] নামক স্থানে । পুরুষনুক্রমিক ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে এখানেরই একটি কূপে হযরত ইউসুফকে নিক্ষেপ করা হয় । যা এখনও দর্শনীয় বস্তু ।
১৬৩৩ : এই স্বপ্নের কাহিনী যখন বর্ণনা করা হয় , তখন হযরত ইউসুফ ছিলেন বালকমাত্র। কিন্তু সে সময়েই তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়। তিনি ছিলেন সরল, সত্যবাদী ও পূন্যাত্মা । তিনি ছিলেন সচ্চরিত্র ও পৌরুষের প্রতীক। তাঁর পিতা তাঁকে প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। ফলে তাঁর সৎ ভাইরা তাকে ঈর্ষা এবং ঘৃণা করতো । এই স্বপ্নের মাধ্যমে বলা হয় যে, তাঁর ভাগ্য আল্লাহ্ কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত, তিনি আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত ! তাঁকে আল্লাহ্ তাঁর এগারো ভাই [ একাদশ নক্ষত্র] ও পিতা মাতা [সূর্য এবং চন্দ্র ] অপেক্ষা বহু উর্দ্ধে স্থাপন করবেন - স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে এই শুভ সংবাদ দান করা হয় । পরবর্তীতে আমরা দেখি; খ্যাতি, সম্মান, অর্থ বিত্ত, সৌন্দর্য সব কিছুর শীর্ষে অবস্থান করেও হযরত ইউসুফ তাঁর চরিত্রের বিনয়কে হারান নাই। অহংকারে আত্মবিস্মৃত হন নাই। তিনি তাঁর পিতা মাতাকে সর্বদা সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত রাখতেন এবং তাঁর সৎ ভাইদের ঘৃণা ও ঈর্ষার প্রতিদানে তিনি তাদের ক্ষমা ও দয়া করেন। এই ছিলো তাঁর মিষ্টি প্রতিশোধ।
৫। [পিতা] বলেছিলো, "হে আমার [প্রিয়] বৎস! তোমার স্বপ্ন বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের নিকট প্রকাশ করো না । করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ষড়যন্ত্র করবে ১৬৩৪ । কারণ শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু । " ১৬৩৫।
১৬৩৪: বালক ইউসুফ ছিলেন সরলতার প্রতীক । তিনি তাঁর ভাইদের তীব্র ঘৃণা ও ঈর্ষার বিষয় অবগত ছিলেন না । কিন্তু তাঁর পিতা তা অবগত ছিলেন এবং তিনি সে সম্বদ্ধে ইউসুফকে সাবধান করেন।
১৬৩৫: কাহিনীর মধ্যবর্তী স্থানে এখানে এসে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানেই কোরানের কাহিনীর সৌন্দর্য। হযরত ইউসুফের ভাইরা শয়তানের হাতের পুতুল ছিলো মাত্র। শয়তান তাদের যে ভাবে পরিচালিত করতো তারা সেভাবেই পরিচালিত হতো । ফলে তারা তাদের মনুষত্বকে, ব্যক্তিত্বকে শয়তানের দুষ্টফন্দির নিকট সমর্পিত করেছিলো। তারা ভুলে গেলো যে, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু । মানুষের চরিত্র, মনুষত্ব ও ব্যক্তিত্ব সব কিছু শয়তান বা পাপ ধ্বংস করে দেয় ।
৬। এভাবে তোমার প্রভু তোমাকে মনোনীত করবেন, এবং তোমাকে [স্বপ্নের ঘটনা এবং] কাহিনীর ব্যাখা শিক্ষা দেবেন ১৬৩৬ । এবং তোমার প্রতি এবং ইয়াকুবের পরিবার পরিজনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তা পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম ও ইস্হাকের প্রতি, নিশ্চয়্ই আল্লাহ্ জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ ১৬৩৭।
১৬৩৬: ইউসুফ ছিলেন আল্লাহ্র মনোনীত। আল্লাহ্ ইউসুফ কে "মনোনীত" করবেন। সুতারাং তিনি আল্লাহ্র নিদর্শন ও ঘটনার সঠিক ব্যাখা বোঝার ক্ষমতা রাখবেন। যারা পূণ্যাত্মা তাদের কল্পনায় সত্য ধরা পরে। তারা সত্যকে বুঝতে পারেন। এ একটি বিশেষ ক্ষমতা যা আল্লাহ্র দান। অপর পক্ষে যাদের এই ক্ষমতা নাই তারা তা বুঝতে পারবে না। পূণ্যাত্মারা পূর্বাহ্নেই স্বপ্নে বড় বড় ঘটনার ইঙ্গিত পান। অপর পক্ষে যারা তুচ্ছ তারা এ ক্ষমতা রাখে না , এই ক্ষমতা আল্লাহ্রই দান। হযরত ইউসুফের চরিত্রের মাধ্যমে, আল্লাহ্ বিশ্বের সমস্ত পূন্যাত্মাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। জীবনের পথে আমাদের অনেক চড়াই উৎরাই পথ অতিক্রম করতে হয় । যখন দুর্যোগের কালো মেঘ আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে যারা পূন্যাত্মা তারা সেই বিপদ ও দুর্যোগকে মোকাবিলা করেন ধৈর্য্য, বিনয় ও আল্লাহ্র প্রতি একান্ত নির্ভরশীলতার মাধ্যমে। আল্লাহ্র প্রতি কোনও অভিযোগ তাঁরা উচ্চারণ করেন না । তাঁরা সর্বদা আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে নিবেদিত থাকেন। বিপদে দুঃখে তাঁরা যেমন ধীর স্থির থাকেন, সৌভাগ্য এবং সফলতাতেও তারা উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেন না । তিনি সর্বদা বিনয়াবনত ভাবে শত্রু মিত্র সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন । তাঁর সর্ব কাজ থাকে এক আল্লাহ্র সন্তুষ্টির প্রতি নিবেদিত। হযরত ইউসুফের চরিত্রের এই বিশেষ দিকটি প্রতিটি পূন্যাত্মাদের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং কোরানের শিক্ষার মাধ্যমে এই বিশেষ দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।
১৬৩৭: এই আয়াতটি হযরত ইয়াকুবের উপদেশ তাঁর সন্তান হযরত ইউসুফের প্রতি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সব কিছুর নিয়ন্ত্রন সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র হাতে । তিনি মঙ্গলময় এবং সর্বজ্ঞানী তাঁর অজ্ঞাত কিছুই নাই। সুতারাং আমরা তাঁর প্রতি আমাদের আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করবো। ইউসুফকে তার পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম, হযরত ইস্হাকের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম , হযরত ইসাহাক ছিলেন প্রকৃত ধর্মভীরু, বিশ্বাসী এবং আল্লাহ্র প্রতি নিবেদিত প্রাণ । তাঁদের এই বিশ্বাস ও আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সমুন্নত রাখতে সাহায্য করে, সমস্ত মলিনতা মুক্ত রাখে, সমস্ত বাঁধাকে জয় করতে সাহায্য করে।
