Logo

খোঁজ করুন

পাঠক

অনলাইনে আছেন ৩ জন
আজকের পাঠক ১২৩ জন
সর্বমোট পাঠক ১৪৩৯৬৭ জন
সূরা পাঠ হয়েছে ১৩৫৩৬০ বার
+ - R Print

সূরা ইউনুস

সূরা ইউনুস বা জোনাহ্‌ (Jonah)- ১০

১০৯ আয়াত, ১১ রুকু, মক্কী
[ দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র নামে ]



ভূমিকা : এই সূরাটি এবং পরবর্তী পাঁচটি সূরা [সূরা ১১, ১২, ১৩, ১৪ এবং ১৫] পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এই সূরাগুলি মক্কার শেষের দিকে অবতীর্ণ হয়; যখন মক্কা থেকে মদিনাতে হিজরতের সময়কাল প্রায় নিকটবর্তী। অবশ্য হিজরতের সাথে তার কোন সম্পর্ক নাই।

এই ছয়টি সূরার বিষয়বস্তুর মধ্যে সামঞ্জস্য বিদ্যমান। সূরা ৮ এবং ৯-এ প্রধানতঃ নূতন মুসলমান সম্প্রাদায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। নূতন মুসলমান সম্প্রদায়ের অভ্যুত্থান, সংগঠন, আদর্শ এবং সর্বপরি এর প্রচার এবং প্রসার সমসাময়িক আরব মোশরেকদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা ইসলামকে সমূলে বিনাশ সাধন করতে তৎপর হয়ে ওঠে। সূরাগুলির ভূমিকাতে দেখুন। এই সূরাগুলির বিষয়বস্তু হচ্ছে, বহিঃ শত্রুতাকে কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে, আল্লাহর সাথে পৃথিবীর মানব সম্প্রদায়ের সম্পর্কের ভিত্তি। কিভাবে প্রত্যাদেশ কাজ করে? আল্লাহর করুণার অর্থ কি? এবং এই করুণা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থই বা কি?

আল্লাহ্‌র রসুলরা কিভাবে তাদের প্রতি অর্পিত আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রচারিত করেন। মানব সম্প্রদায় কিভাবে তা গ্রহণ করবে? ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়বস্তুর অবতারণা করা হয়েছে সূরাগুলিতে। ১৩ নম্বর সূরাটি ব্যতীত অন্যান্য সব সূরারই প্রথমে "আলিফ", "লাম", "রা" এই তিনটি সংক্ষিপ্ত অক্ষর সংযুক্ত করা হয়েছে, যা প্রতীকধর্মী। ১৩ নম্বর সূরাটির উপরে "আলিফ", "লাম" "মিম", "রা' এই চারটি সংক্ষিপ্ত অক্ষর সংযুক্ত করা হয়েছে। এই সূরাটির এই বিভিন্নতা আমরা ১৩ নম্বর সূরার সময়ে আলোচনা করবো।

এই ভূমিকাতে শুধুমাত্র ১০ নম্বর সূরাটি সম্বন্ধেই আলোচনা করা হবে। এই সূরাটির মর্মবাণী হচ্ছে : আল্লাহ এই বিশাল বিশ্বভূবন সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র আমাদের ভোগ বিলাসের জন্য নয়, শুধুমাত্র সৃষ্টি ও ধ্বংসের জন্য নয়। তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি শুধুমাত্র বস্তুগত সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর উদ্দেশ্য বহু উর্দ্ধে, মহত্বর কারণের জন্য। সবচেয়ে অত্যাচার্য হচ্ছে আল্লাহ্‌কে আমরা আমাদের চর্মচক্ষে দেখতে পাই না, কিন্তু তাঁকে আমরা আমাদের আত্মার মধ্যে অনুভব করতে পারি। যুগে যুগে নবী রসুলের মাধ্যমে, কিতাবের মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাদেশ আমাদের নিকট প্রকাশিত হয়। এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে, কিভাবে রসুলেরা প্রত্যাখাত হয়েছেন যুগে যুগে এবং কিভাবে সাধারণ মানুষ আল্লাহর প্রত্যাদেশকে অবিশ্বাস করেছে এবং শেষ মূহুর্তে অনুতাপের মাধ্যমে ফিরে এসেছে। এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে, ইউনুস নবীর ক'থা এবং তার সময়ের লোকদের কথা। এই সব লোকেরা আল্লাহর প্রত্যাদেশকে প্রত্যাখান করেছিলো। কিন্তু যে মূহুর্তে তারা অনুতাপ করেছে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় নাই। আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা আমাদের ধারণার অতীত যা আমাদের বিধৌত করতে সর্বদা উদগ্রীব।

সারসংক্ষেপ : বিশ্ব-বিধাতা আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ মানব কূলের হৃদয়ে অপূর্ব অত্যাচার্যভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আল্লাহর প্রত্যাদেশ ব্যতীতও তাঁর হাতের পরশ সমস্ত সৃষ্টিতে বিদ্যমান। চন্দ্র, সূর্য, তরু-লতা, আকাশ-বাতাস, দিন-রাত্রি, প্রকৃতির পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ্‌ আমাদের তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন [১০:১-২০]

জীবনের সকল সৌন্দর্য্য এবং ভালো সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বিশ্ব বিধাতা আল্লাহ। মানুষ অন্ধ, তাই এসব দেখেও সে আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে না [১০:২১-৪০]।

সব কিছুর শুরু আল্লাহ্‌, এবং তাঁর কাছেই সব কিছু প্রত্যার্পন করবে। তাঁর কাছেই সব কিছুর শেষ। তিনিই একমাত্র সত্য। মানুষ আল্লাহর প্রেরিত সত্যকে গ্রহণ করার পরিবর্তে আল্লাহর সাথে শরীক গ্রহণ করে যা সত্য বিমূখ- কারণ মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ। [১০:৪১-৭০]

আল্লাহ্‌ নূহ্‌ নবীকে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তাঁর অস্তিত্বকে প্রকাশ করেন, কিন্তু নূহ্‌ নবীর সমসাময়িক লোকেরা তা প্রত্যাখান করে, পরিণামে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ্‌ হযরত মুসার (আ) মাধ্যমে ফেরাউনের সাথে কথা বলেন। কিন্তু ফেরাউন তা বিশ্বাস করে না, কারণ সে ছিল অবাধ্য ও একগুয়ে। শেষ মহুর্তে ফেরাউন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো কিন্তু তখন অনুতাপের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল [১০:৭১-৯২]।

আল্লাহ্‌র প্রতি অবিশ্বাস মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। ইউনুস নবীর সমসাময়িক জনগণ অনুতপ্ত হয়েছিলো। ফলে তারা আল্লাহ্‌র রহমত ও করণীয় ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। ঠিক সেইভাবে যারা বিশ্বাসী বা ঈমানদার ব্যক্তি, আল্লাহ তাঁদের ধ্বংস থেকে রক্ষা করবেন। যখনই আল্লাহর সত্য (প্রত্যাদেশ) প্রকাশিত হয় যা অনুসরণ করা এবং বিপদে ও দুর্যোগে ধৈর্য্য ধারণ করা কর্তব্য। কারণ আল্লাহ্‌ সুক্ষ বিচারক [১০:৯৩-১০৯]

সূরা ইউনুস-১০

১০৯ আয়াত, ১১ রুকু, মক্কী
[দয়াময়, পরম করুণাময় আল্লাহর নামে]


০১। আলিফ - লাম - রা। এগুলি জ্ঞানগর্ভ কিতাবের আয়াত। ১৩৮২

১৩৮২: 'আয়াত' - শব্দটির শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্‌র নিদর্শন অথবা কুর-আনের পংক্তি বা চরণ। এখানে দুটো অর্থই সমভাবে প্রযোজ্য। কুর-আনের আয়াত জ্ঞানের ভান্ডার স্বরূপ। সে হিসেবে এর প্রতিটি চরণ হিরকখন্ড তুল্য। 'নিদর্শন' এ জন্য যে, আকাশে-বাতাসে পৃথিবী ও নভোমন্ডলে সর্বত্রই সেই স্রষ্টার হাতের স্পর্শ বা নিদর্শন বিদ্যমান। নক্ষত্র খচিত রাতের আকাশ আমাদের মনকে, চিন্তার দিগন্তকে সুদূরে প্রসারিত করে। মহান স্রষ্টার বিরাটত্ব অনুভব করতে সাহায্য করে। এই পৃথিবী ও নভোমন্ডলের সৃষ্টি আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ষমতা ও মহত্মের উজ্জ্বল "নিদর্শন"। সেই বিশ্ব-বিধাতা সারা নভোমন্ডল, আকাশ, বাতাস, পৃথিবী যার করতলগত, যিনি ক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দি, তিনি তার সৃষ্টির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে প্রাণ তাকেও কখনও অবহেলা করেন না। যে পাপী যে অবহেলিত, তিনি তাদের সাথেও তার রসুলদের মাধ্যমে কথা বলেন, হেদায়েত করেন, আত্মিক মুক্তির পথ প্রদর্শন করেন। এগুলি সবই তাঁর নিদর্শন।

০২। এটা কি মানুষের জন্য আশ্চর্য্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই একজনের নিকট আমার ওহী প্রেরণ করেছি ১৩৮৩? যেনো সে মনুষ্য সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে (তাদের বিপদ সম্বন্ধে) এবং মুমিনদের সুসংবাদ দিতে পারে যে, তাদের প্রভুর নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ১৩৮৪। (কিন্তু) কাফেররা বলে, "এতো এক যাদুকর"।

১৩৮৩ : আরবদের কাছে এই ব্যাপারটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ছিল যে তাদের মধ্যেই একজন নিজেকে আল্লাহ্‌র প্রেরিত পুরুষ বা রাসুল দাবী করছেন। আল্লাহ্‌র বাণী যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ভরপুর, তা রাসুলের মুখ থেকে নিঃস্বরিত। এই বাণীর ক্ষমতা, অতুলনীয় কারণ, এই বাণী মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে মুক্তির পথ দেখায়। আরও আশ্চর্যের বিষয়, রসুলের (সা) মত একজন নিরক্ষর লোকের মুখ থেকে কিভাবে এরূপ জ্ঞানের বাণী নিঃস্বরিত হতে পারে। এটা তখনই সম্ভব যখন তিনি আল্লাহর প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হন। এই সহজ সত্যটি আরবের লোকেরা বুঝতে সক্ষম হয় নাই। তারা তাঁকে যাদুকর আখ্যা দেয়, কারণ, আত্মার অন্ধকার, তাদের অনুধাবন ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, ফলে তারা তাদের দূরদর্শিতা, অনুধাবন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও ম্যাজিকের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম। তারা নিজেদের কুপমন্ডুকতার অন্ধকারে আবদ্ধ হয়ে যায়, যা তাদের অজ্ঞানতার ফল।

১৩৮৪ : "Qddama" শব্দটির অর্থ উচ্চ মর্যদা, অথবা কোনও কাজকে তাঁর প্রভুর নিকট পূর্বেই প্রেরণ করা। বাংলা অনুবাদ হয়েছে "তুমি সুসংবাদ দাও, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে উচ্চ মর্যাদা।" ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে "The good news to the Belivers/ That they have before their Lord/The good actions they have advanced" ইংরেজী অনুবাদে দ্বিতীয় অর্থটির প্রয়োগ করা হয়েছে।

আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশ সর্বদা সকলের জন্য সুখকর নয়, অনেকের জন্যই তা অপ্রীতিকর। সতর্কবাণী করা হয়ছে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য, সাবধান করা হয়েছে পাপের পরিণতি সম্পর্কে। যদি আমাদের মাঝে বিশ্বাসের দৃঢ়তা থাকে, তবে আমরা আল্লাহ্‌র সতর্কবাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারবো। যে এই বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করেছে, এবং সেই অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করতে পেরেছেন তাদের জন্য আল্লাহ্‌ এই আয়াতে উচ্চ মর্যদার সুসংবাদ দিয়েছেন। জীবনকে পরিচালিত বাক্যটি "The good action they have advance" বাক্যটি বোঝানের জন্য অথবা "মোমেনদিগের" শব্দটি বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ "Sidq" শব্দটির অর্থ বিশ্বস্ত ও খাঁটি। সুতারাং যে বিশ্বস্ত ও খাঁটি বা সৎ জীবন যাপন করে, তাদের জন্য সুসংবাদ।

০৩। অবশ্যই তোমাদের প্রভু আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন ১৩৮৫। (অতঃপর) দৃঢ়ভাবে (কর্তৃত্বের) সিংহাসনে ১৩৮৬ অধিষ্ঠিত হয়ে, সকল কিছুকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোন সুপারিশকারী (পক্ষে আবেদন) করতে পারে না। ইনিই তোমাদের প্রভু, আল্লাহ্‌। সুতরাং তাঁর এবাদত কর। (তবুও কি) তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? ১৩৮৭।

১৩৮৫ : দেখুন টিকা ১০৩১ এবং সূরা [৭:৫৪] আয়াত

১৩৮৬ : এই আয়াতে 'আরস' বা সিংহাসন শব্দটি প্রতীকধর্মী। এই শব্দটি নিম্নোক্ত অর্থবোধক : (১) সিংহাসন রাজতন্ত্রের সর্বোচ্চ অধিষ্ঠানের প্রতীক। এখানে আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্ট জগতের সবার উপরে, এই ভাবকে বোঝানো হয়েছে। সিংহাসন শব্দটি দ্বারা (২) রাজতন্ত্রে যেরূপ রাজার কর্তৃত্ব সর্বময়, আল্লাহ্‌র রাজত্বে আল্লাহ্‌র আইন সেরূপ অলঙ্ঘনীয়। প্রাকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই এ কথার সত্যতা মেলে। কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতি, আকাশ-ভূমন্ডল, জীব ও জড় প্রকৃতি সকলের জন্য সুনির্দ্দিষ্ট প্রকৃতিক আইন আছে। এই আইন আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রণীত। সে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা প্রকৃতিতে কারও নাই। (৩) তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। হিন্দু বা প্রাচীন গ্রীকদের বহু দেব- দেবী ছিল, যারা সাধারণ মানুষের ন্যায় আচরণ করতো। তাদের প্রেম-ভালবাসা, হাসি-কান্না, রাগ-অভিমান সবই ছিল সাধারণ পৃথিবীর মানুষের ন্যায়। এখানেই এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্‌ থেকে তাদের পার্থক্য। (৪) তিনি সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক এবং সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি "সকল বিষয় নিয়ন্ত্রিত করেন।" (৫) নবী, রসুল, স্ব-ইচ্ছায় কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না। " তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোন সুপারিশকারী পক্ষে আবেদন করতে পারে না।"

১৩৮৭ : দেখুন সূরা [৬:৮০] আয়াত।